‘স্বপ্ন’।।১৬ (ব্লগারদের সম্মিলিত গল্প)

রেজওয়ানা কবির ২৭ আগস্ট ২০২০, বৃহস্পতিবার, ১২:০৮:০১পূর্বাহ্ন গল্প ৬৪ মন্তব্য

শবনম আপুর কিল খেয়ে বেঁচারা তৌহিদ ভাইয়ের অসহায় মুখখানা ভেবে মনের অজান্তেই হাসি পেল। শুধু হাসলে হবে ? সোনেলার সব ব্লগাররা ” স্বপ্ন ” নিয়ে এত সুন্দর সুন্দর পর্ব লিখছে যে, মাথাটাই ধরে যাচ্ছে। কেননা এবার তো আমার লেখার পালা। দুর ! বাবা ! মাথায়  তো কিছুই আসছে না। উফ !  এই ‘স্বপ্ন’ শব্দটা মাথার মধ্যে শুধু ঘোরপাক খাচ্ছে।

#স্বপ্ন

একটা মানসিক অবস্থা , এছাড়া ধারাবাহিক কতগুলো ছবি ও আবেগের যোগফল। ঘুমন্ত অবস্থায় বিভিন্ন কাল্পনিক ঘটনা যা অবচেতনভাবে মানুষ অনুভব  করে সেটাই “স্বপ্ন”। স্বপ্নে মানুষ অধিকাংশ সময় যেকোন গত হওয়া ঘটনা সম্পর্কে দেখে, কেননা স্মৃতি অবচেতন মনে  মস্তিষ্কে ছাপ ফেলে যায়। কিন্তু মানুষ যখন তার কল্পনাকে অবচেতন মনে দেখে তখন তা সত্যি মনে হয়। তাই আমিও স্বপ্ন দেখার জন্য মাথায় বালিশ নিয়ে অনেককিছু কল্পনা করতে লাগলাম এবং সাইড টেবিলে আমার ডায়েরীটা রাখলাম, যাতে মাথায় কিছু আসার সাথে সাথে লিখে ফেলতে পারি। ‘স্বপ্ন’ নিয়ে এক গবেষণায় পড়েছিলাম, পেটে কোন সমস্যা থাকলে বা উল্টাপাল্টা বেশি খেলে “স্বপ্নের” মাত্রা বাড়তে পারে। আমারতো আজ পেটে কোন সমস্যা নেই সেজন্য  উল্টাপাল্টা খাবার  বেশি খেলাম যেন ‘স্বপ্নটা’ দেখতে পারি। এত আয়োজন, কিন্তু সাঁধের স্বপ্নের দেখাতো মিলছে না। বিরক্ত লাগছে!!!! এই দুঃসময়েও দুই লাইন কবিতা মাথায় আসছে,,,,,,

“স্বপ্ন এ কেমন তোমার  আজব বাড়াবাড়ি?
তাই তোমার সাথে আজ নিলাম আড়ি”।।।

আসলে হয়তো, স্বপ্ন নিয়ে এত চিন্তার ফলে মস্তিষ্কে আমার রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলো ভাবনায় আর জড়ো হচ্ছে না। ফলাফল শুন্য। মাথা পুরাই এলোমেলো লাগছে।হায়রে ! “Oneirology” তোমার দেখা পাওয়া ঢের দেরী।

অদ্ভুততো? “স্বপ্ন” কি কলা আর মলা নাকি? যে ইচ্ছে হলো চাইলাম আর সাথে সাথে  পাইলাম। পারিবারিক সূত্রে দাদী,বাবা,আম্মু,দাদা আমার ছোট ভাইটা সেও ভালো লেখে। সেই সুবাদে লেখালেখি একটু পারি, বলে’ স্বপ্নও’ কি খুব সহজে দেখতে পারবো? তাও আবার এই সেই স্বপ্ন না, সুন্দর স্বপ্ন হতে হবে? মাথা নষ্ট ম্যান ! আর ভাবতে পারছি না। তবু ভাবতে হবে ! ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বড় বড় লেখকদের বইয়ে পড়া একটা শব্দ মাথায় আসলো। বাহ ! দারুনতো ! ইয়াহু,,,পেয়ে গেছি,,, কে বলেছে আমি পারি না? যেই ভাবা সেই কাজ,শব্দটি হলো

“প্লানচেট”।

আমি জানি পাঠকবৃন্দ, আপনারা অনেকেই এই শব্দের সাথে পরিচিত। কিন্তু তবুও একটু ভেঙ্গে বলি,,,,

“আত্না অবিনশ্বর”। যেকোন অশরীরি আত্নার সাথে কোন জীবিত মানুষের যোগাযোগের মাধ্যমকেই প্লানচেট বলে।

প্লানচেটের মাধ্যমে একজন মৃত ব্যক্তির আত্নাকে উপস্থিত করা যায়,কিন্তু তাকে দেখাও যায় না,ছোঁয়াও যায় না,তার কথাও শোনা যায় না,শুধু অনুভুতি হয়। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী সহ আরো অনেকেই এই প্লানচেট ব্যবহার করেছিলেন।

তাই ভাবলাম, আমিও এই প্লানচেটের মাধ্যমে কোন মৃত ব্যক্তি কে এনে, তার কাছে স্বপ্ন নিয়ে কি লিখবো? সেই ব্যাপারটি জেনে লেখা শুরু করি। তড়িঘড়ি করে সারাদিনের কাজ শেষ করে রাতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। গভীর রাত হলো,বাইরে প্রচন্ডরকমভাবে বৃষ্টি হচ্ছে,আকাশে বিদুৎ চঁমকাচ্ছে,সাথে টিনের চালে ঝনঝন করে শীলা পাথর পড়ছে। বৃষ্টি আমার খুব ভালো লাগে, আজ খুব বিরক্ত লাগছে প্লানচেটের টেনশনে। সব চিন্তা বাদ দিয়ে ঘরের দরজা,জানালা বন্ধ করে, লাইট অফ করে আসন পেতে বসে পড়লাম।

আমার সামনে একটা চেয়ার রাখলাম আত্নাকে বসার জন্য। সাথে নিলাম একমগ কফি, আর চেয়ারে রাখলাম আরেক মগ কফি, আত্নার যদি খেতে ইচ্ছে হয় সেজন্য । সাথে ফ্রিজ থেকে বের করে চেয়ারের পাশে রেখেছি পিৎজা, বার্গার আর ডেজার্ট।
শুনেছি কবরেতো আত্নারা ভালো ভালো খাবার খেতে পারে না, ভাবলাম, এসব খাবার খেয়ে যদি দয়া করে আত্না আমাকে ‘স্বপ্ন’ লেখার ধারনাটি দেয় সেইজন্যই আমার এত আয়োজন।
এভাবে এত আয়োজন করে আজাদ কেও কখনো খাওয়াইনি।

যাইহোক, এখন একটা মোমবাতি জ্বালালাম,কেননা অন্ধকার ঘরে খুব ভয় ভয় লাগছিলো। চোখ বন্ধ করলাম,ভাবতে লাগলাম,হুমায়ুন আহমেদের আত্নাকে যিনি আমার আমার প্রিয় লেখক। ইশ !  তিনি যদি তাড়াতাড়ি এসে আমাকে সুন্দরভাবে লেখার idea দেয়, তাহলেতো সোনেলার সকল ব্লগাররা দারুন অবাক হয়ে ভাববে ! এই রেজওয়ানা এত ভালো লেখে ? ভেবেই আনন্দ হচ্ছে। কিন্তু কই হুমায়ুন আহমেদ আসছে না কেন? হঠাৎ জোঁরে শব্দ হলো।
চোখ খুললাম,জানালা লাগিয়েছিলাম কিন্তু ভালোভাবে লাগেনি,  মোমবাতিটি বাইরের বাতাসে নিভে গেছে। পুনরায়  জানালা লাগিয়ে ধ্যানে বসলাম।

এবার প্লানচেটের মাধ্যমে সমরেশ মজুমদার অথবা সৈয়দ শামসুল হক কে  আনার চেষ্টা করলাম। দুজনেই বিখ্যাত লেখক,তাদের যেকোনো একজনের  কাছে idea
পাওয়া মানে আরো অসাধারণ। তাছাড়া সৈয়দ শামসুল হক কুড়িগ্রামের মানুষ, সেই সুবাদে যদি idea দেয়তো দারুন হবে ! চোখ বন্ধ করে আবার ভাবতে লাগলাম,
আবার,,,!  শব্দ,,উফফফফ,,,দরজায় আজাদ নক করছে,বিরক্ত হয়ে লাইট জ্বালিয়ে ওকে জোরেসোরে ধমক মারলাম,এই মুহুর্তে বলে কিনা তার সাথে বৃষ্টি দেখতে হবে? আজব আর অসময়ে অদ্ভূত  আবদার । বেঁচারা আজাদ মন খারাপ করে চলে গেল। আচ্ছা যাক,ওকে পরে ম্যানেজ করে নিবো।
তারপর আবার দরজা লাগালাম,লাইট অফ করলাম। এবার মনে প্রানে আত্মার কামনা করছি। আয় বাবা আত্না তাড়াতাড়ি আয়, প্লিজ প্লিজ প্লিজ !
এবার যে মুখটা আমার সামনে ভেসে উঠছে সেটা আমার খুব চিরচেনা,তার গায়ের গন্ধটাও আমার খুব চেনা,তিনি যে পাউডার শরীরে মেখেছেন সেটা ও আমার খুব পরিচিত।এমনিতেই আমি ভূতে খুব ভয় পাই, তারউপর আবার মৃত ব্যক্তির আত্না আনার অভিযান?

ভাবেন, এই সোনেলায় লিখতে
গিয়ে কত ভয়ংকর ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছি? আমার দুচোখ কালো কাপড়ে বাঁধা, কাপড় পাতলা জন্য আবছা আবছা সেই পরিচিত মুখটি দেখতে পাচ্ছি,সে ধীর পায়ে এগিয়ে সেই চেয়ারে বসলো। প্রচন্ড ভয়ে আমি জঁড়োসড়ো হয়ে বসলাম, প্রচুর অস্বস্থি হচ্ছে,শরীর কাঁটা দিয়ে উঠছে। ভয়ে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। কি ঘটছে কিছু বুঝতেছি না। দিপু মনি সেই আত্নার মুখে নামটি শুনে আমার বুকের ভিতর ধক করে উঠলো।

আরে এই কন্ঠও আমার খুব চেনা, এটাতো আমার দাদু ভাই। তার মানে দাদু ভাইয়ের আত্না এসেছে। আনন্দে আমার চোখে পানি এসে গেল। দাদু ভাইকে কাঁদতে কাঁদতে বললাম, দাদু ভাই কতদিন তোমাকে দেখি না,তুমি আমাদের কেন ছেড়ে গেলে? এরকম অনেক কথা নিজে নিজেই দাদু ভাইকে বলতে লাগলাম।
তারপর বললাম জানো দাদু ভাই আমি সোনেলায় যে লিখবো, আমিতো অত ভালো লিখতে পারি না,তুমি একটু বলোতো কি নিয়ে লিখবো ? ওপাশ থেকে কোন আওয়াজ নাই,চোখের কালো কাপড় খুলে ফেললাম,তারপর আশেপাশে দাদু ভাইকে খুঁজতে খুঁজতে কখন যে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম টেরও পাই নি। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দেখি আজাদ আমার মাথায় পানি ঢালছে, পানি ঢালা শেষ হলে আমাকে আজাদ বিছানায় শুয়ে দিলো।

আমি আবার ভাবতে লাগলাম কি লিখবো সোনেলায়? হঠাৎ আবার সেই রুমে গেলাম এবং দেখলাম আত্নার চেয়ারে একটা কাগজ মানে চিরকুট পড়ে আছে।চিরকুটটি হাতে লুকিয়ে আবার শুয়ে পড়লাম।

ঘুম আসছে না কি করা যায়? জিসান ভাইকে একটা ফোন দেই,আমার মাথায় একটা idea এসেছে। কিছুদিন আগে সোনেলার মিলনমেলায় রুকু আপুসহ গিয়েছিলাম। সারোয়ার ভাই,জিসান ভাই,ইঞ্জা ভাই,তৌহিদ ভাই,সুপায়ন দা,সাবিনা আপু,ফাল্গুনী আপু,বন্যা আপু,মনি আপু,নিতাই দা,লিটন ভাইসহ প্রত্যেক ব্লগারদের সাথে দেখা হয়েছিল,অনেক আড্ডা হয়েছিল, খুব ভালো লেগেছিলো সেই মিলনমেলা। তাই আর দেরী না করে ফোন দিলাম জিসান ভাইকে আমার  আইডিয়ার ব্যাপারে জানানোর জন্য। কথোপোকথনের শুরুটা ছিল এমন,,,,,

আমিঃ হ্যালো ভাইয়া,কেমন আছেন?
জিসান ভাইঃ দীপ্তি আমি তো নাচতেই পারি না আপু,কিভাবে নাচবো?
আমিঃঃ  একটু অবাক ! বলি
কি আর শোনে কি?
আমিঃ আবার !  ভাইয়া বলছি কেমন আছেন?
জিসান ভাইঃ আরে আপু এত রাতে আমি নাঁচবো কেন? বউ প্যাদানী দিবেতো।
আমিঃ বিরক্ত হয়ে ফোনটা কেটে দিলাম।
পরক্ষনেই মনে হলো,আহারে ! বেঁচারা জিসান ভাইতো কানে কম শোনে, তাই বলেছি কেমন আছেন ?শুনেছে কেমন নাঁচেন ? মুহুর্তেই তাকে সরি লিখে এস এম এস পাঠালাম। ভাইয়াও রিপ্লাই দিল ইট’স ওকে।
যাক  বাঁচা গেল, ব্যাপারটি মিটলো তবে।

কিন্তু আমার প্লানের কথাতো বলা হলোনা,এবার কিছু না ভেবেই ইঞ্জা ভাইকে ফো্ন দিলাম।
ফোনে রিং হচ্ছে।।।।
আমিঃ হ্যালো ভাইয়া
ইঞ্জা ভাইঃ ওপাশ থেকে  হ্যাঁ আপু কি অবস্থা?
আমিঃ ভাইয়া সামনে তো ‘স্বপ্ন’ বইটির মোড়ক উন্মোচন, সেটা নিয়ে আমার  মাথায় একটা ভাবনা এসেছে।
ইঞ্জা ভাইঃ হ্যাঁ বলো
আমিঃ ভাইয়া আমি ভাবছি বইটির মোড়ক উন্মোচন আমাদের কুড়িগ্রামে করলে কেমন হয়? পাশাপাশি কুড়িগ্রাম শহরটাও আপনাদের দেখা হবে। দেশের সব বিখ্যাত লোকজনকে ইনভাইট  করলাম।আমি সব এরেন্জ করবো,আপনারা শুধু কার্ড ছাপিয়ে  গেস্ট ইনভাইট ,করবেন আর বাকিসব আমার দায়িত্ব।
ইঞ্জা ভাইয়াঃ বাহ ! অসাধারণ আইডিয়া আপু,তুমি যদি সব আয়োজন করতে পারো তবেতো ব্যাপারটি একদম ডিফরেন্ট ও সুন্দর   হয়। কেননা সব প্রোগ্রামতো ঢাকায় হয়,এটা ওখানে হলে আরও ভালো। তুমি আয়োজন শুরু করো,আমি বাকি ব্লগারদের সাথে কথা বলে বাকিটা ম্যানেজ করছি।
আমিঃ ভাইয়া আরেকটা কথা, আমি জাস্টিন ট্টুডো কেও ইনভাইট করব, উনি এখন বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছে।
ইঞ্জা ভাইঃ কিছুক্ষন চুপ,তারপর বললো কোন জাস্টিন ট্রুডো ?
আমিঃ কানাডার প্রধানমন্ত্রী । উনি আমার ফুপির বন্ধু। ফুপির মাধ্যমে ওনাকে নিয়ে আসাবো
ইঞ্জা ভাইঃ একটু হেসে ! দেখ, আসলেই ভালো।
আমিঃ ভাইয়া আসবে না মানে?আসতে বাধ্য। বিশ্বের বড় বড় লেখকরা যত বই লিখেছে সবই নারীদের ঘিরে,কেননা পৃথিবীর প্রত্যেক পুরুষেরই মেয়েদের প্রতি একটা আকর্ষন থাকে,সেখানেতো জাস্টিন ট্রুডো  ও একজন পুরুষ। তাছাড়া এত সুন্দর সুন্দর রমনী থাকবে,সুন্দরীরাতো মৌ মৌ করবে।
ইঞ্জা ভাইঃ হাসতে হাসতেই ঠিক আছে বলে রেখে দিল।

এত তাড়াতাড়ি রাজী হয়ে যাবে ভাবতেও পারি নি।
খুব ভালো লাগছে,কিন্তু আনন্দ হলেতো হবে না,সবকিছু সুন্দর ও ভালোভাবে করতে হবে। রুকু আপু,আজাদ, লিয়ন,বিপুল আবুল ভাইসহ অনেককেই ডাকলাম তারপর সেদিনের ব্রেকফাস্ট থেকে শুরু করে, লাঞ্চ,বিকেলের নাস্তা,ভেন্যুসহ পুরো প্রোগ্রামের দায়িত্ব সবাইকে আলাদা আলাদাভাবে কাগজে লিখে ভাগ করে দিলাম।তারপর লিস্ট অনুযায়ী সেই কাজগুলো সবাইকে মুখস্থ করালাম,যেন তারা সঠিকভাবে কাজগুলো করতে পারে। দিন রাত পরিশ্রম  করছি সেই পোগ্রামের কাজ,আর ভাবছি কোন মিস হলো কিনা? আল্লাহ যেন মিস না হ্য় কিছু। কুড়িগ্রামের মানসম্মান বলে কথা। অবশেষে ঘনিয়ে এল,সেই  মোড়ক উন্মোচনের দিন। সারারাত সবকিছুর তদারকি আর টেনশনে ঘুম হয় নি ভালোভাবে। তবুও ভোরবেলা উঠে গোসল করে রুকু আপুর দেয়া নীল শাড়ী বের করে রেডী হতে শুরু করলাম। আজাদ কে ছাড়া আমি শাড়ী কেন কোন সাজগোজ করতে পারি না,এটা আমার গোপন রহস্য। শুরু করলাম সাজ। সাজগোজের প্রতি আমার অদ্ভূত দুর্বলতা, সারাদিন না খেয়ে থাকতে পারবো কিন্তু সাজ পরিপূর্ন নাহলে আমি কেঁদে অস্থির। আমি আবার ছিঁচকাদুনে স্বভাবের। কপালে নীল টিপ পড়লাম,হাতে নীল কাঁচের চুড়ি,গলায় নীল পাথরের মালা আর আজাদ দিয়ে দিল চোখে আইল্যানার। হায়রে ! আজাদ, বিরক্ত হলেও মুখে মেকি হাসি নিয়ে আছে,ভাবখানা এমন যে আমি বুঝতে পারছি না। আমি তোয়াক্কা না করে সাজগোজ পরিপূর্ন করলাম। উফ ! এবার শান্তি।
তারপর আজাদকে ম্যাচিং নীল পাঞ্জাবি বের করে দিয়ে ফোনে সবাইকে ভেন্যুর সব ঠিক আছে কিনা? সব জেনে নিলাম,রুকু আপুকেও নীল শাড়ী পড়ে আসতে বললাম।

এরপর চলে গেলাম সেই ভেন্যু “কুড়িগ্রাম ধরলা নদীর পাড়ে”।ধরলার পাড়ে হরেকরকমের তাবু টাঙ্গানো হয়েছে,পুরো ব্রিজ লাল নীল বাঁতিতে সাজানো, ছোট ছোট নৌকাগুলো সুন্দর করে সাজানো। নদীর মাঝখানে সুন্দর একটা স্টেজ সাজানো। সব মিলিয়ে ধরলা নদীর পাড় আজ আরও অসাধারণ লাগছে।সোনেলার সব ব্লগারদের রিসিভ করে তাদের আপ্যায়নের সব ব্যবস্থা আমার সহকর্মী আনোয়ারুল ভাই,খোরশেদ ভাই,রাজিমুল ভাই কে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। সোনেলার সবাই সুন্দর করে সেজেছে।তাদের দেখতে সুন্দর লাগছে,হাজার হলেও’ স্বপ্নের ‘মোড়ক উন্মোচন বলে কথা।
সামনের সারিতে জাস্টিন ট্রুডো,  (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়) প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, বানিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশী, পনির এম পি সহ আরও অনেকে। আমি সুপায়ন দার কাছে জানতে পারলাম আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শারীরিক অসুস্থতার কারণে আসতে পারে নি, প্রতিনিধি হিসাবে বাকিদের পাঠিয়েছেন। যাই হোক অনুস্ঠানকে সাজানো হয়েছে বিভিন্ন ভাগে। তার মধ্যে প্রথমে শুভেচ্ছা বিনিময়, তারপর কালচারাল প্রোগ্রাম, খাওয়াদাওয়া,লেট নাইট পার্টি সবশেষে  ‘স্বপ্ন’ বইটির মোড়ক উন্মোচন।  যথারীতি শুরু হল,একের পর এক আয়োজন । বড় বড় শিল্পীরা গান গাইছে,ফেরদৌস ওয়াহিদ, আসিফ,সাবিনা ইয়াসমিন রুনা লায়লা  সহ এ প্রজন্মের সকল জনপ্রিয় শিল্পী। আজাদ ও তার ব্যান্ড দল নিয়ে গান গাইল। ব্লগের অনেকেই তাদের পারফর্মেন্স করল,সাবিনা আপু সুন্দর আবৃত্তি করল।খুব ভালোভাবেই কালচারাল প্রোগ্রাম শেষ হল,তারপর কুড়িগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবারের মাধ্যমে সবাইকে আপ্যায়ন করা হল।

এরপর শুরু হল, লেট নাইট পার্টির আয়োজন। হঠাৎ দেখতে পেলাম, জাস্টিন ট্রুডোর আশেপাশে অনেক সুন্দরী মেয়েরা সেলফি তুলছে।
আমিও ছবি তোলার লোভ সামলাতে না পেরে চলে গেলাম সেখানে। এত মানুষের ভীড়ে কোন পাত্তা পেলাম না। ভীরে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম ঠিক তখনি, কে যেন আমার হাতটা ধরে আমাকে উঠিয়ে নিল।
আমি তার দিকে তাকাতেই দিশেহারা হয়ে গেলাম।
আরে ! এ কাকে দেখছি? স্বপ্ন নয়তো?
না,না না। সত্যিতো !
যিনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি হলেন ‘আরনেস্টো গুয়েভারা’ ।

‘চে গুয়েভারা’  ছিলেন একজন আর্জেন্টিনীয় মার্কসবাদী বিপ্লবী চিকিৎসক, লেখক, বুদ্ধীজীবি, গেরিলা নেতা ও একাধারে কিউবার বিপ্লবের প্রধান ব্যক্তিত্ব।
তিনি এক সময়ে আমার জীবনের স্বপ্নের
নায়ক ছিল। তাকে আমি কলেজ জীবন থেকে লালন করেছিলাম।হোস্টেলে যখন ছিলাম,তখন তার সিগারেট ধরা একটা পিকচার আমার দেয়ালের সামনে টাঙ্গিয়ে রেখেছিলাম। আমি আমার ঘুম থেকে উঠে  আমার প্রথম সকাল  ‘চে গুয়েভারা ‘কে দেখে শুরু করতাম। আজ সেই মানুষটি আমার চোখের সামনে! স্বপ্ন
নয়তো???

পাঠকবৃন্দ, আজ আপনাদের একটা গোপন কথা বলি,আমি আজাদের প্রেমে পড়েছিলাম তার চুল দেখে,কেননা তার চুল ‘চে গুয়েভারা’র মতো ছিল হয়ত তাই !

যাইহোক তারপর ‘চে গুয়েভারা’ আমাকে বাংলায় বলল,চল্লল্লল্ল, ডা্ন্স কারি।।।আমি তার মুখে বাংলা শুনে আরোও অবাক ! তারপর কিছু না ভেবেই তাকে নিয়ে চলে গেলাম লেট নাইট পার্টির দিকে।
কাঁনে বাঁজছে সেই টাইটেনিক মুভির গান, সবাই যে যার মত ডান্স করছে,,,,,,
“Every night in my dreams
I see you, I hear you
That is how I know you go on
Far across the distance”।

কি যে ভালো লাগছে পাশে আবার আমার স্বপ্নের নায়ক ‘চে গুয়েভারা’। তার সাথে আমি নাচছি,এই অনুভূতির কথা কাউকে বলে বোঝাতে পারব না।

আঁচমকা জোঁড়ে  বিকট এক ধরনের  শব্দ হল,আশেপাশের সব রং বেরঙ্গের বাঁতিগুলো  নিভে গেল,চারপাশটা অন্ধকার হয়ে গেল,চে গুয়েভারার হাতটা আমার হাত থেকে সরে গেল।

কি হল ! কোনকিছু  বোঝার আগেই দেখি,, আমার হাতে অদ্ভুত দেখতে এক ভূতের হাত যার চোখগুলো লালচে আর দাতঁগুলো মারবেলের মত,ঠোটে বিচ্ছিরি হাসি নিয়ে বিস্ফোরক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।আমি ভয়ে বাকিদের খুঁজতে লাগলাম।আরে,একি দেখছি !
আশেপাশে সোনেলার ব্লগাররা নাঁচছে না, যারা নাঁচছে তারা হল মুন্ডহীন ভূত,মাথা কাটা লাশ,পিশাচ বুড়ি,গেছো ভূত,ন্যাঁড়া ভূত ট্যারা ভূত,ডাইনী শাখচুন্নি । এই নামগুলো আমি তাদের বুকে লাগানো নেমপ্লেট দেখে বুঝলাম। ভঁয়ে গা ছমছম করছে। আগের বাঁজানো গানটাও চেঞ্জ হয়ে যে গানটা শুরু হল,,,,,,

ঝালাক দেখে লাজা,একবার আজা আজা,
আজা আজা,তোরে খাইয়া ফেলামু আর করমু ভাঁজা ভাঁজা “।।

এসব কি হচ্ছে, ভূতেরা মাদূলী,শাড়ী, আলখাল্লা, বাঁশের গহনা, তেতুলের বিচির মালাসহ হরেকরকম সেঁজেছে। ভূতের রাজা আমাকে বলল,তুই প্লানচেটের মাধ্যমে এত বিখ্যাত মানুষদের আনতে চেয়েছিস। আমরা কি দোষ করেছি। এবার তোকে শাস্তি পেতে হবে হে হে হে। আরে,,,,”স্বপ্ন” এবার আমরা  তোকে দেখাবো,হা হা হা হা,,,, বলেই আমাকে এক তুরিতে শুন্যে উঠিয়ে নিচে ফেলে দিল। প্রচন্ড ব্যাথায় কাঁতরাতে কাঁতরাতে চোখ মেলে দেখলাম বিছানা থেকে মেঝেতে পরে গেছি।
কিছুক্ষন  ভয়ে নিস্তব্ধ ,,,,,,,,,,  তারপর ‘স্বপ্নের ‘ভালোলাগাগুলো মনে করতে লাগলাম,,,,,,।

আহারে আমার’ চে গুয়েভারা ‘! কত সুন্দর স্বপ্নটি দেখছিলাম ।ধ্যাৎ তেরি !  এটা কোন কথা ! ভালোইতো স্বপ্ন দেখছিলাম, কি সুন্দর !’ স্বপ্ন ‘বইটার মোড়ক উন্মোচন ও হল না। কোথা থেকে ভূতেরা এসে সব গন্ডগোল করে দিল ভেবেই বিরক্ত লাগছে।
আমি আবার আমার চিন্তার  জগতে হারিয়ে গেলাম,কিন্তু হঠাৎ আমার চোখ পড়ল,আমার বেডের  পাশের সাইড টেবিলটায় দাদু ভাইয়ের একটা ছবি পড়ে আছে,আর তার পাশে আমার সেই ডায়েরী।
এবার সবকিছু আমার কাছে জলের মত পরিস্কার হয়ে গেল।
তারমানে,আমি কাল রাতে
দাদুভাইকে নিয়ে ডায়েরীতে লিখেই তার ছবিটা পাশে নিয়ে ঘুমিয়েছিলাম।

আসলে পাঠকবৃন্দ, আপনারা হয়ত জানেন,মানুষ যা নিয়ে কল্পনা করে তাই সে ‘স্বপ্নে ‘দেখে।
আমার ক্ষেত্রে ও তার ব্যতিক্রম হয় নি। স্বপ্নে যে চিরকুট টা দেখেছিলাম সেটা ছিল এই ডায়েরীর পাতায় লেখা চিরকুট।

আমি আমার আলমারি থেকে আমার লাল টকটকে তোয়ালেটা বের করে সোজা চলে গেলাম ওয়াশরুমে ফ্রেশ হওয়ার জন্য। দাদু ভাইয়ের কথা মনে পড়ে বুকের ভিতর চাপা কষ্ট মনে অক্টোপাশের মত আমাকে বিঁধছে।
আমার জীবনের প্রিয় ব্যক্তিদের তালিকায় প্রথম নামটাই আমার দাদু ভাই। আমার দাদু ভাই আমাদের ছেড়ে ৮ বছর আগে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন। খুব কাঁন্না পাচ্ছে দাদু ভাই।আজ আর কেউ আমাকে দিপু মনি বলে ঐভাবে ডাকে না,আর কেউ তোমার স্বরচিত কবিতা শোনায় না,কেউ আর সেই গানটি গায় না,,,।

“তুমি কি দেখেছ কভু
জীবনের পরাজয়?
দুঃখের দহনে,
করুন রোদনে,
তিলে তিলে তার ক্ষয়
জীবনের পরাজয়?”
আল্লাহ তোমাকে জান্নাত নসিব করুক দাদু ভাই ।

আমার যখন খুব কষ্ট হয় তখন আমি আয়োজন করে কাঁদি, তারপর আমার সেই টকটকে লাল তোয়ালে টা দিয়ে চোখ, মুখ মুছে বাইরে আবার সেই মেকি হাসি নিয়ে ঘুরে বেড়াই, যাতে কেউ আমাকে দেখে বুঝতেই পারে না যে আমি একটু আগে শিশুর মত কেদেছিঁ ! ব্যাপারটি অনেকের কাছে হাস্যকর মনে হলেও এটা আমার নিজস্বতা।
আজও  তার ব্যাতিক্রম করলাম না।

আমি বাথরুমের ঝর্নাটা জোরে ছেড়ে দিলাম,তার পাশাপাশি কলটাও ছাড়লাম, বাথরুমের মেঝেতে বসে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম। বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছিল,ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল ।আমার কান্নার সুরে সুরে আকাশের বৃষ্টির কান্নার শব্দ এত জোরে হচ্ছিল যে, সেই শব্দে আমার কান্নার শব্দ ম্লান হয়ে যাচ্ছিল।

এভাবেই শুরু হল, আমার  আরেক ভাবনার নতুন সকাল।

স্বপ্ন || ১৫ (ব্লগারদের সম্মিলিত গল্প)

৫৫৬জন ৫৬জন
0 Shares

৬৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য