স্বজন দ্বিষৎ

শফিক নহোর ২১ অক্টোবর ২০১৯, সোমবার, ০৫:১৫:২৫অপরাহ্ন গল্প ১০ মন্তব্য

 

 

 

 

আমি তখন মাল্টি-প্লানে ওয়েস্টার্ন আইটিতে কর্মরত, প্রতিদিন শত-শত কাস্টমার, পরিচিত অপরিচিত লোকজন আসছে; প্রোডাক্ট কিনছে, কথা বলছে, সমাধান করা হচ্ছে কাস্টমারদের সমস্যা । তবুও কেউ-কেউ অখুশি। পৃথিবীতে সবাইকে খুশি রাখা সম্ভব না । একজন নয়ন-অভিমুখে অকস্মাৎ বলে ওঠলো, – ভাই কেমন আছেন ?’

মুখে একটু মেকি হাসি এনে বললাম, – জ্বি ! ভালো আছি।

এটা আছে, সেটা আছে, এটা দেন । কিবোর্ডটা দেন, মনিটর নষ্ট হইছে; ওয়ারেন্টি ছিল, দিচ্ছেন না কেন ওয়ারেন্টি?’ নানা রকম কথা বলতে হয় কাস্টমারদের সঙ্গে । আপনি তো দেয়ার আগে কত সুন্দর করে বলেছিলেন; – এটা একবছরের ওয়ারেন্টি, নষ্ট হলে নিয়ে আসবেন । -ভাই এক বছরের ক’য়েক দিন পার হয়েছে; দেখেন কোন সিস্টেম করে কোন কিছু করা যায় কি—না । কত রকমের আবদার যে থাকে মানুষের । বিল পেপারে সবকিছু লেখা আছে । তবু একের পর এক প্রশ্ন করে যাবে, একই জিনিস বারবার বলবে, ” একটা কথা আছে কাস্টমার অলওয়েজ রাইট “সেই মোতাবেক আমাদেরকে চাকরি করতে হয় সেলস-ম্যান হিসেবে ।

আমি কাস্টমারকে বিদায় দেয়ার সঙ্গে-সঙ্গে একজন অপরূপা সুন্দরী দোকানে প্রবেশ করল, -এক্সকিউজ মি ম্যাডাম, আই ক্যান হেল্প ইউ ?’

মেয়েটি মুসকি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে রইল, কোন জবাব দিল না । আমি একটু লজ্জা পেয়ে গেলাম; আমি মাথা নিচু করে অন্য কিছু খোঁজার ভান ধরলাম । মেয়েটি খবরের কাগজ উল্টো করে ধরে পড়ার চেষ্টা করছে, আমি তা দেখে ব্যঙ্গময় হাসি হেসে ঠোঁটের কার্নিশে ধরে রাখলাম কষ্ট করে । আমাকে লক্ষ্য করে বলল, – ওয়্যারলেস মাউস হবে কি ?’

– আমি মাথা নেড়ে তাকে সম্মতি জানালাম যে -হ্যাঁ হবে।

– প্লিজ ! ওয়ান পিস । – হাউ মাচ প্রাইস ?’

– নাইন হান্ড্রেড ফিফটি টাকা অনলি ফর ইউ ম্যাডাম ।

কাস্টমারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম উনি বাংলাদেশে নতুন এসেছেন; কম্পিউটারের আনুষঙ্গিক কোন বিষয় প্রয়োজন হলেই উনি আমাদের দোকানে আসতেন । একটা সময় ওনার সঙ্গে আন্তরিকতা গভীর হয়, বিশ্বাস বাড়ে বন্ধুত্ব সম্পর্ক গাঢ় হয় । আমার ফেসবুকের সঙ্গে যুক্ত হয় । মাঝে—মধ্যে বেয়ারা কথা হতো, আমার বিভিন্ন ছবিতে তার মন্তব্য থাকতো, আমি তাকে মন্তব্য করতাম ।কী আশ্চর্য একটি নাম, ইলিজা টাউন।

অফিস থেকে বাসায় আসতে অনেক রাত হত, বউ রেগে থাকতো প্রতিদিন, আমি অসহায় মানুষের মত সবকিছু সহজে মনে নিতাম । ছেলেমেয়ে, সংসারের কাজ রুপা, একাই সামাল দেয় । মেয়ের সিপি রোগ, তিন-বেলা থেরাপি দেওয়া, ছেলেকে স্কুলে নেয়া আসা । সংসারের অভাব অনটন । রুপা, ট্রেলাসের কাজ কর, কিছু টাকা আসে প্রতিমাসে যা রুপার হাত খরচের টাকাপয়সা আর এক্সট্রা লাগে না তেমন তবুও আমি কখনো কখনো দুই চার বিশ-টাকা রেখে দেই ওর ভ্যানিটি ব্যাগে ।চেহারার দিকে তাকালে বড্ড মায়া হয় । ছেলেটি আজ ক’দিন গরুর মাংস খেতে চেয়েছে; হাতের যে অবস্থা । ছেলেকে নয় ছয় বুঝ দিয়ে বললাম, -বাজান, আমি বেতন পেলে তোমার জন্য গরুর মাংসের তোহারি নিয়ে আসব । এখন লক্ষ্মী ছেলের মত মায়ের কাছে একটু পড়তে বসো ।

কোনমতে ছেলেকে বুঝিয়ে, পাশের রুমে একটা বই নিয়ে পড়তে বসলাম । আজকাল এত ব্যস্ত হয়ে গেছি; বই নিয়ে বসবার সময় একদম নেই । বউ মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকবে! সারাদিন টিপাটিপি কথা বলতে গেলেই, -তোমার সংসারের কোন কাজ ফেলে-তো আমি মোবাইল চালাচ্ছি না । সংসারের কোন কাজটা তোমার দিয়ে হয় শুনি?’

কথার পরে কথা বলতে গেলেই বাসায় অশান্তি শুরু হয়ে যাবে। আমি চুপচাপ ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে অনেক অন্যায় আবদার মেনে নেই । আমি নিজেই ভাবি, সংসারের জন্য ছোট চাকরি করে কি করতে পারলাম । ঠিকমত সংসার চারাতে পারছি না, প্রতিমাসে বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে । মনে হচ্ছে দেশে এখন দুর্ভিক্ষ চলছে; কোরবানির ঈদ ছাড়া ঘরে গরুর মাংস উঠে—না । বউয়ের পছন্দ মত কোনদিন বাজার করতে পারলাম না । বউয়ের প্রতি আমার সত্যিকার অর্থে কোন অভিযোগ নেই । অভিভাবক বিহীন একটি সমাজ, ধীরে ধীরে অতল গভীরে তলিয়ে যাবে সংসারের মত । সচরাচর মোবাইল ফোনের লক খোলা থাকে রুপা, সেদিন হুট করে আমার মোবাইলের বার্তা বিভাগে ঢুকে গিয়েছে, আমার কাছে দৃষ্টিকটু মনে হচ্ছিলো । হঠাৎ এরকম মনে হল আমি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম । কেমন যেন অস্বস্তি বোধ গ্রাস করছে আমাকে । মানসিকভাবে দিন-দিন অসুস্থ হয়ে পড়ছি; নাকি আমার কোন ডাক্তার দেখানো উচিত ।

নয় ছয় ভাবতে ভাবতেই হাত থেকে কাঁচের-গ্লাস পড়ে গেল , -রুপা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলল , -সারাদিন বাল করে , সংসার ঠিকমত চালাতে পারে—না । বউ চালাতে পারে না । গ্লাস ভেঙে সংসার উদ্ধার করছে শায়াকাঠি! আজ ক’দিন ধরে বলছি, মাথার চুল গুলো উসকোখুসকো হয়ে আছে , বাসায় আসবোর সময় নারকেলের একটা তেল নিয়ে এসো ।কথা বলতে গেলেই আমি খারাপ, ছোটলোক ।কত রকমের যে বাহানা দেখাবে । -কি হলো কিছু বলছো না যে, তোমার মোবাইলের ইনবক্স দেখলে ঘৃণা হয়, চরিত্র এত নিচে নেমেছে তোমার, লজ্জা হয় না । মেয়ে দিনদিন বড় হচ্ছে, ছেলে কদিন পরে তোমার মত মোবাইল চালাতে চাইলে, আমার তো গলায় দড়ি দেওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই । -বাতেন তুমি বলও ত, ইলিজা টাউন কে?’ যে তোমাকে বিভিন্ন অরুচি পূর্ণ বার্তা দিয়ে মোবাইলের গোডাউন ভরে ফেলছে ; তোমার সঙ্গে আমার সংসার করা উচিত না শুধু ছেলেমেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সংসার করছি ; তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি ।

-রুপা সত্যি বলছি, সে আমাদের দোকানের কাস্টমার পাকিস্তানি দূতাবাসে চাকরি করে ।সে একজন পাকিস্তানি মেয়ে ।

রুপা কোন কথাই মানতে নারাজ। আমি পরের দিন ইলিজা টাউনের সঙ্গে দেখা করলাম । অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম, সে ভাল বাংলা বলতে পারে এখন ।

-তুমি আমাকে এত নোংরা বার্তা দিয়েছও কেন ?’ আমার স্ত্রী দেখে আমার সম্পর্কে খুব বাজে ধারণা করছে , এখন তো আমার সংসার টিকে থাকা দায় ।

-বাতেন এত ভয় পাবার কিছু নেই । আমার সম্পর্কে তোমাকে একটু বলি, আমি সরকারি একটা চাকরি করি, এখন তোমাদের দেশে আছি । আমি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশে যেতে পারি । আমার একটা বদভ্যাস আছে । আমি মূলত একজন হ্যাকার । বিভিন্ন মেয়েদের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে ছেলেদেরকে ভয় দেখাই । কি ব্যাপার এত ভয় পেয়ে গেলে কেন?’ আমি ঢাকাতে আসবার পর থেকে প্রায় তিন-হাজার আইডি হ্যাক করেছি; তার সমস্ত তথ্য তোমাকে দেখাবো! তোমাদের দেশের মেয়েরা প্রচুর পরকীয়া সম্পর্ক করে এবং তাদের বয়স পঁয়ত্রিশ থেকে শুরু!

আমি অবাক! -তুমি এসব কি বলছো, আমি কোন ভাবেই ইলিজা টাউনকে বিশ্বাস করতে পারছি না । তথ্য গুলো যখন আমাকে এক এক করে দেখাতে লাগল, আমার গলা শুকিয়ে আসছে, মানুষ কি তাই এত বেহায়া হতে পারে। আমি অনেক কিছু যোগ বিয়োগ করি । দেখতে দেখতে একটি আইডির লিংক চোখে বেধে গেল । ছিঃ রুপা তুমিও?’ চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে, আমি কিছুই দেখতে পারছি না আর । আজ এলিজা টাউন, আজ ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে ।

 

১৮৮জন ১১৮জন
4 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য