স্কারলেট রোজ

রোকসানা খন্দকার রুকু ৬ জানুয়ারী ২০২২, বৃহস্পতিবার, ০৮:১৪:২০অপরাহ্ন গল্প ৭ মন্তব্য

উন্নত দেশের মানুষের নামের ব্যাপারে আমাদের মতো এতো বালাই নেই। জন্মের সময়ের নাম পছন্দ না হলে, তাঁরা চাইলেই নাম পরিবর্তন করতে পারে। আমাদের দেশে নাম পরিবর্তন করলে সেটি নিয়ে রীতিমতো কটাক্ষ বা হাসাহাসি করা হয়। এ দেশে নামের বেলায়ও ব্যক্তিস্বাধীনতা বলে কিছু নেই।

গ্রামের দিকে নাম পরিবর্তনের একটি মজার ব্যাপার থাকে। মানে নামকে বিকৃত করা হয়। আমার এক গ্রাম্য মামা তার নাম আবু বক্কর। অথচ লোকে তাকে ’ব্যাঙ বক্কর’ বলে। কেন তাকে এ নামে ডাকে, তার কারন কারও জানা নেই।

আমার বাবার নাম ফজলুল হক। লোকজন পুরো নামে কখনোই তাঁকে ডাকে না। শুধু ডাকে ‘ফজলু‘ বলে। বাবা ভীষন রেগে যায় কিন্তু লোকজনকে বাবা কিছু বলতে পারেন না। শুধু একা একা বলতে থাকেন, গাধার দল জানে না ‘ফজলু’ মানে শয়তান। আমি কি শয়তান? যতোসব মূর্খের দল।

আমার জন্মের সময় বাবা নাকি মাঠে ছিলেন। ফিরে এসে দ্যাখেন বুড়ো বয়সে তাঁর ফুটফুটে একটি মেয়ে হয়েছে। বাবা আমার নাম রাখলেন ‘স্কারলেট রোজ’! কি সুন্দর নাম।

মুশকিল হয়ে গেলো মাকে নিয়ে। মা চরম বাঁধা দিলেন। মা, বাবার কোন কাজ- কর্মই পছন্দ করেন না। তাঁর জীবনে বাবার মতো একজন অসংসারী, উদাসীন, অপদার্থ লোককে বিয়ে করার মতো বিরাট ভুল আর একটিও নেই।

মূল ঘটনা হলো, মা সহ সবাই ‘স্কারলেট রোজ’ উচ্চারণ করতে পারেন না। তাছাড়া মা অতি ধর্ম- পরায়ন মানুষ। তাঁর ধারনা, কেয়ামতের দিন তো এসব কঠিন, অযথা নামের মানুষকে ডাকাই হবে না। শুধু সুন্দর নামের মানুষদের ডেকে ডেকে বেহেস্তে দেয়া হবে। তাই আমার সুন্দর নামটি বাদ পড়লো।

ভাই-বোন বেশি হওয়ায়, জন্মের পর ঘটা করে নাম রাখার ব্যাপারটি হয়না। বাবার দেয়া সুন্দর নামের বদলে কিছুদিন আমাকে ময়না, সোনা এইসব নামে ডাকাডাকি হলো।

এরপর বড় বোন বা ভাই যে কেউ একজন আমার নাম রাখলেন জেসমিন। জেসমিন ফুলের নাম কিন্তু তবুও নামটাতে কেমন যেন কমন আর গেয়ো টাইপ একটা ব্যাপার আছে। এজন্য আমার নিজের নামের প্রতি ভীষন আক্ষেপ। ঈশ্ যদি নামটা বদলে ফেলা যেত!

অবশেষে আক্ষেপ সুযোগ হয়ে ধরা দিলো ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময়। নামের বানানে ভুল হয়ে, জেসমিন থেকে জেসলিন হয়ে এলো।

আমি পুরোটাই বাবার ফটোকপি, খামখেয়ালীপনাই আমার শৌখিনতা। তাছাড়া এইসব শুধরানো অনেক কঠিন, ঝামেলার এবং টাকাও খরচ হয়। ঝামেলা কোনকালেই আমার পছন্দ না। তাই এতো বড় ব্যাপারটি আমি বেমালুম চেপে গেলাম।

পরিবারে সন্তান বেশি হলে বাবা- মায়ের এতো খোঁজ নেবারও সময় থাকেনা। তাই বাড়িতে আমার নাম পরিবর্তনের ব্যাপারটি কেউ জানতেই পারলেন না। অবশ্য আমার জন্য কষ্ট পাওয়ার মানুষ এক বাবা ছাড়া আর কেউ নেই।

আমি জেসমিন থেকে জেসলিন হয়ে গেলাম। ভাবলাম, যাক ‘জেসলিন স্কারলেট রোজ’ হলে বেশি ভালো ছিলো তবুও এটাই চলুক সমস্যা কি? জেসলিন নামটাতে একটা আনকমন আর নতুনত্বের ছোঁয়া আছে।

ভার্সিটি এডমিশন টেষ্ট এ কেমন করে যেন ভাল সাবজেক্ট পেয়ে গেলাম। ভর্তি হয়েছি সাইকোলোজীতে। স্যার-ম্যাডামরা ক্লাসে শরীর বৃত্তিয় নানা হরমোনের বর্ননা দিতে থাকেন। শুনে সবার কান লাল হলেও আমার কান লাল হয় না। আমার শরীরে বোধহয়, কান লাল হওয়া হরমোনের বড়ই অভাব।

পড়াশুনা চলে অল্প- স্বল্প। বন্ধুরা সবাই যখন লাইব্রেরিতে ঠাসা ঠাসি করে বসে বড় চাকুরীর পড়াশুনায় নাক- মুখ ডুবিয়ে থাকে। আমি তখন বিভিন্ন রাইটারের গল্পের বই আর জানা- অজানায় ফেসবুক নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকি। কারন একটাই, বড় সরকারী পজিশান আর টাকার লোভ আমার নেই। আমি সরকারী চোর হতে চাই না। বেতনের চেয়ে চুরি বেশি জানতে হবে, না হলে সংসার চলবে না।

বন্ধুরা বলে, আমার আইডল তো হলো পাশের বাড়ির ওই জিয়া আল-দ্বীন ভাই। তিনি ঢাকা ভার্সিটি থেকে ফিজিক্স এ পাশ করেও চাকরী- বাকরী কিছুই করেন নি।

অথচ ইতিহাস আর বাংলার মতো সাধারন সাবজেক্ট নিয়ে পড়ুয়ারা জীবনের সমস্ত রস- কসের বিনিময়ে একখান করে চাকরী পেয়ে নিজেদের ’আলাদিন’ ভাবে। তাদের গরম আর তাপে পাশে যাওয়াই যায় না।

আমিও হয়তো কোনদিন বিয়ে করবো না। কারন জিয়া ভাই কোন একদিন কাউকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। তিনি হারিয়ে গেছেন বলে আর সংসারও করলেন না। ফেসবুকে সমাজ সংসার উদ্ধার করাই তাঁর কাজ। সেরকম আমাকে দিয়েও কিছুই হবে না।

মেধা আর যোগ্যতা থাকার পরও চেষ্টা আর ইচ্ছের অভাবে হলোও না কিছু। বন্ধুরা সব সরকারী বড় বড় পোষ্ট- পজিশন আঁকড়ে ধরলো। আর আমি তখন হয়ে গেলাম স্বনামধন্য এনজিওর কো- অর্ডিনেটর।

মজার ব্যাপার হলো, কো- অর্ডিনেটরের বেতন, সরকারী বড় কর্মকর্তার থেকেও ভাল। তাছাড়া কোথাও ঘুস দিতে হয় না, ঘুস নিতেও হয় না। সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করতে পারাটা নিজের কাছে কেমন শান্তি শান্তি লাগে।

মন মানসিকতা আর মধ্যবিত্তের অভাবী জীবনাচরনে অভ্যস্ত আমি গ্রামের সাধারণ মানুষের সাথে কাজ করার ক্ষেত্রে পারদর্শী ও অসাধারণ। আমার কাজে অন্যরকম একটা ভালোলাগা। প্রচুর কাজ, প্রচুর ব্যস্ততা। যেন লাইফ অলওয়েজ কুল।

অফিসের বাংলা ডকুমেন্টারীগুলো আমাকেই তৈরি করতে হত। এসবে আমার নাকি দক্ষ হাত। এ ছাড়া  গ্রামে যে শিক্ষনীয় নাটিকা গুলো হয়, সেগুলোও আমি লিখি। গ্রামে গিয়ে লোকজনকে জড়ো করে এসব নাটিকা দেখানোর ফলেই তারা নিজেদের কুফলগুলো বুঝতে পারে। অফিসের অনেকেই আমার এসব লেখার বেশ প্রশংসা করেন।

আমার অলওয়েজ কুল লাইফে শনির দশা হানা দিলো।ফেসবুকে লেখালেখি করতে গিয়ে অনেক সময় ধরে আমার লেখক বন্ধুদের লেখা পড়ি, লাভ রি- এক্ট দেই, কমেন্ট করি। এসব করতে করতে আমার পুরনো সেই খামখেয়ালীপনা আর ফেসবুকিং পুরোদমে ফিরে এলো। কারও নাম ভুলে যাওয়া, ভুল করে ফাইল বাড়িতে ফেলে যাওয়া, দিনে দিনে এসবের পরিমান আরও বাড়তে লাগল।

দেখা গেল, আমার খুবই গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টারী তৈরির কাজ করার কথা। এবং সেটা আজই পাঠাতে হবে। আমি সেটা কিছুতেই করতে পারছি না।

সেটা ফেলে রেখে, গ্রামের রহিমার বিবি বলছে আমার কথাগুলো লিখে ফেল, কেন ওগুলো লিখছো না?

কিংবা অফিসের কাজ ফেলে ফেসবুকে কবিতার কমেন্টের উত্তর দিচ্ছি। অফিসিয়াল কাজের চেয়ে কমেন্টে কে, কি লিখলো তাতেই আমার উৎসাহ বেশি।

বসেরও বস থাকে, তার এ ফাঁকি জুকি কোনটাই বসের চোখ এড়াতে পারলো না।

সরকারী চাকুরে হল হাতি। মরে গেলেও লাখ টাকা। আর বেসরকারী চাকুরে হলো ব্যাঙ! শুধু জীববিজ্ঞানে কাটাকাটি করে, ফেলে দেয়া হয়। তারা সচল ততোক্ষন বয়স ও মেধা যতোক্ষন।

আমাকে এক সকালে বস ডেকে নিলেন। অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কফি খাওয়ালেন। এবং বললেন, আপনি কিছুদিন বিশ্রাম নিন। শরীরের উপর অনেক চাপ গেছে। সেরে উঠলে আমরা আপনাকে আবার ডেকে নিবো।

এটা হলো বেসরকারী চাকুরী যাওয়ার নিয়ম। আমি বুঝে গেলাম, আমার পছন্দের চাকুরীটি কাল থেকে আর নেই।

প্রথম প্রথম ভীষন কষ্ট হতে লাগলো। কারন চাকুরী যাবার কারনে সুন্দর বাসাটি ছাড়তে হলো। কাজের মেয়েটি, যে আমার বন্ধুর মতো তাকে ছুটিতে পাঠাতে হলো। আর সকালবেলার এতোদিনের যে অভ্যাস তা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গিয়ে, কেমন দম বন্ধ হবার যোগার হলো।

তবুও নিজেকে শান্তনা দিলাম। অনেক বিখ্যাত লেখকরা তো লেখালেখির জন্য চাকুরী ছেড়েছিলেন। যেমন- হুমায়ুন আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরী ছেড়েছেন, তসলিমা নাসরিন মেডিকেল কলেজের চাকুরী ছেড়েছেন। আমার না হয় চাকুরী গেছে।

সবাইকে বিলিবাট্টা করে ব্যাংকে কিছু টাকা আছে। তা দিয়ে চলবে কিছুদিন। এই ফাঁকে লেখালেখির জন্য কিছুটা সময় পাওয়া যাবে। আর অফিস আমার মতো যোগ্য মানুষকে নিশ্চয়ই কোন একদিন ডেকে নেবে।

তাছাড়া আমার হাতে যখন প্রচুর টাকা ছিল। আমি আত্নীয়, বন্ধু, প্রতিবেশী সবার প্রয়োজনে পাশে থেকেছি। কাউকে না করিনি। আমার অনেক বন্ধুই টাকা ধার নিয়ে আজও ফেরত দেয়নি। আমার বিশ্বাস অন্তত: তারা নিশ্চয়ই বিপদে আমার পাশে থাকবে। আমার লেখালেখিতে উৎসাহ দেবে।

আমার মতো হাত খোলা মানুষের ব্যাংকের টাকা অল্পদিনেই প্রায় শেষ হয়ে এলো। অফিসও এখনও ডাকেনি। এখন আমার তো কিছু একটা করতে হবে। তাই অনলাইন বিজনেস করার জন্য যাদের কাছে টাকা ধার ছিলো চাইলাম, আবার কারও কারও কাছে টাকাও চাইলাম।

পাওনা টাকা ফেরত, টাকা ধার, ব্যবসা কিংবা লেখায় উৎসাহ এসবের কোনটাতে পাশে থাকা তো দুরের কথা, আমার কফি হাউজের আড্ডা দেয়া বন্ধুরা সব পালিয়ে গেল।

কেউ কেউ ফেসবুকে ব্লক করল। কেউ কেউ ফোন দিলে রিসিভ করে না। অপদার্থ, চাকুরী চলে যাওয়া পাগলের সাথে কে বকর বকর করে এমন একটা ভাব তাদের।

খামখেয়ালী মানুষদের খারাপ সময় বেশি আসে। তখন তাঁদের পাশে কেউ থাকে না বলে, তারা হারে হারে টের পায়। আজ আমার প্রিয়জনরা একে একে সবাই সরে গিয়ে, বাস্তবতা আমার মুখোমুখি বসলো। সবার কাছে আমি মূল্যহীন হয়ে আমার পাগলামীকে সাথে নিয়ে একঘরে হয়ে গেলাম। আমি রইলাম কোন একদিনের আশায়, যেদিন ভালো সময় এসে আবার আমার দরজায় কড়া নাড়বে। বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন আহমেদ স্যার সামনে বসে থাকা কাউকে ধরে এনেও স্টার বানিয়ে দিয়ে গেছেন। অনেকেই স্টার থেকে মন্ত্রীও হয়েছেন। তো, হুমায়ুন স্যার বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ছবি বানাবেন। তাঁর এমন স্বনামধন্য স্টার বন্ধুর কাছে তিনি সিনেমা বানানোর জন্য টাকা চাইলেন। স্টার বন্ধুও সাথে সাথেই বলে দিলেন, টাকাতো এটা কোন সমস্যা না? সময়মতোই পেয়ে যাবেন?

তিনি কোনদিনই তাঁর কাছ থেকে টাকা পাননি, তবে সিনেমা বানিয়েছেন। কেউ না কেউ তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

সময়ই মানুষকে চিনিয়ে দেয়। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ তার নিজ স্বার্থের জন্যই সবকিছু করে। আমাদের সবারই পরোপকার করা উচিত। তবুও পরোপকার করার আগে, নিজের মঙ্গল ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তায় রেখেই করা উচিত!
ছবি- নেটের

১১৩জন ৪জন
0 Shares

৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য