সোনেলা প্রান্তরে, ভ্রমরার গুঞ্জরে

নাজমুল আহসান ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার, ১১:৪৭:৫৬পূর্বাহ্ন সোনেলা বার্তা ৪৭ মন্তব্য

তখন ব্লগিং-এর স্বর্নালী সময় ছিল।

আর বাংলা ব্লগোস্ফিয়ারে মোটামুটি একছত্র আধিপত্য ছিল সামহয়্যারইন ব্লগের। কিন্তু দলাদলি, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি, নাস্তিকতা সহ বহুবিধ কারণে এই ব্লগটাতে কখনো স্থিরতা-প্রশান্তি ছিল না। বেহিসেবি ব্লগার থাকার কারণে মান নিয়ন্ত্রণও সেভাবে হয়নি। কারিগরি সমস্যা ছিল। ব্লগাররা বলতে গেলে বেকায়দাতেই ছিলেন। এই সময়টাতে আমাদের হাতে এল প্রথমআলো ব্লগ।

প্রথমআলো ব্লগ চমৎকার। দেখতে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন। তেমন কারিগরি সমস্যা ছিল না বরং নতুন নতুন ফিচার যোগ করা হয়েছিল। ব্লগারদের কাছে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছিল। সমস্যা দেখা দিল দুইটি। প্রথমত, ব্লগে লেখা জমা দিলে সেটা সাথে সাথে প্রকাশিত হতো না। একজন মোডারেটর সেটা দেখতেন, তারপর মর্জি হলে প্রকাশ করতেন নতুবা লেখাটা মাঠে মারা যেত। এটা নিয়ে একটা অসন্তুষ্টি তো ছিলই। আপনি লেখা জমা দিবেন সকালে, সেই লেখা প্রকাশিত হবে বিকেলে আর আপনি কিছুক্ষণ পরপর এসে দেখে যাবেন -এই বিরক্তি ব্লগাররা নিতে চাইছিলেন না। দ্বিতীয়ত, আর্থিক সংকটের কারণে প্রথমআলো ব্লগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে -এরকম একটা গুজব আমরা শুনতাম। এরকম অশান্ত সময়ে জন্ম হল মুক্তব্লগের।

মুক্তব্লগ ছিমছাম ব্লগ। অল্প কয়েকজন ব্লগার। ছোট পরিবারের মতো। আমরা সবাই সবাইকে চিনি। মাঝে মাঝে সবাই দেখাসাক্ষাৎ করি, আড্ডা দেই। খুবই চমৎকার, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। তারপর একদিন আমাদের ছোট, শান্ত ব্লগটাতেও ঝড় বয়ে গেল। ব্লগের ডেভেলপার সাহেব ব্যক্তিগত লোভ থেকে বেঁকে বসলেন। জানালেন, তাঁকে মোটা অংকের টাকা না দিলে ব্লগের দখল তিনি নিয়ে নিবেন। বাকিরা রাজি না হওয়ায় একদিন সত্যি তিনি সেই কুকর্ম সাধন করলেন। আমরা বেকায়দায় পড়লাম। অনেক কষ্টে ব্যাকআপ থেকে নতুন ডোমেইনে ব্লগ আবার চালু করা হল। কিন্তু যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে, ব্লগের পরিবেশটা নষ্ট হয়ে গেল। আগের সেই আমেজ, সেই উচ্ছ্বাস আর নেই।

এরমধ্যে একদিন সোনালি আপা আমাকে ফোন দিলেন। শারমিন সোনালি। আমরা একসাথে ব্লগিং করতাম। সোনালি আপা জনৈক ব্লগারের কথা বললেন, তিনি নতুন একটা ব্লগ বানাতে চান। আমি শুরুতে মোটামুটি ‘না’ বলে দিয়েছিলাম।

আমি তখন ফ্রিল্যান্সিং করতাম। নিয়মিত অর্থকষ্টে দিন কাটে। হাটে-মাঠে-ঘাটে কাজ খুঁজি। পড়াশুনার চেয়ে রুটিরুজির চিন্তাই বেশি। তারপরও এরকম একটা কাজ হাতে পেয়েও রাজি না হওয়ার কারণ ছিল পুরনো অভিজ্ঞতা। আমি দেখেছি, আমাদের দেশীয় লোকজন ঠিকঠাক পারিশ্রমিক দেন না। গড়িমসি করেন। ছয় টাকার কাজে নয় টাকার ফোন খরচ করতে হয়। দেশের প্রধান একটি রাজনৈতিক দলের কাছে আমার এখনো অনেকগুলো টাকা পাওনা আছে। বিরক্ত হয়ে যোগাযোগ করা বন্ধ করে দিয়েছি। (সোনেলা যে সেই রাজনৈতিক দলের মতো করেনি, সেটা বলাই বাহুল্য! নইলে আমি কি আর আজ এখানে পোস্ট লিখতে আসতাম! হেহে!)

যা-ই হোক। সোনালি আপা আরেকদিন ফোন দিলেন, বেশ জোর দিয়েই বললেন। আমি রাজি হলাম। সেই ব্লগারের সাথে দেখা করলাম। কীভাবে কী করা হবে তার পরিকল্পনা করলাম। মূলত এই ব্লগার এবং তাঁর এক বন্ধু লিখবেন। ব্লগের নামে হবে তাঁদের দুজনের নামে, “শিখরের হাতছানি | অমুক ও তমুকের ব্লগ”।

তারপর এক শুভক্ষণে ব্লগ বানানোর কাজ শুরু করলাম।

আমি খুবই ছোট ডেভেলপার। তখন একেবারেই অনভিজ্ঞ। আস্তে আস্তে কাজ চলতে লাগল। ডোমেইন নেওয়া হল। খুব সম্ভবত ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরের ২৩ তারিখে ব্লগটা চালু হল। সেপ্টেম্বরের ২৪ তারিখে আমি “স্বাগতম” শিরোনামে প্রথম পোস্টটা লিখলাম।

[ব্লগের প্রথম পোস্টের স্ক্রিনশট]

তারপর ধীরে ধীরে ব্লগ ডানা মেলতে লাগল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, অতিথি লেখকদের লিখতে দেওয়া হবে। এরপর পাঠক বাড়ল, লেখক বাড়ল। একদিন ব্লগটাকে সবার জন্যে উন্মুক্ত করে দেওয়া হল। আমিও পেশাদারিত্বের বাইরে কী যেন এক মায়াজালে আটকা পড়ে গেলাম।

ব্লগের নাম পাল্টে ফেলা হল। নতুন নাম হল সোনেলা। আহ! কী চমৎকার নাম! শুনলেই একটা প্রশান্তি চলে আসে মনে।

সোনেলা লক্ষ পাঠকের মন জয় করল। ছোটখাটো ঝড়ঝাপটা সামাল দিয়ে দিব্যি এগিয়ে চলতে লাগল। দেখতে দেখতে পেড়িয়ে গেল সাতটা বছর। ক্যালেন্ডারের হিসেবে প্রায় আড়াই হাজার দিন। খুব কম ব্লগই আছে যারা এতো লম্বা সময় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছে।

প্রতিদিন কত শত পাঠক, লেখক সোনেলার উঠোনে এলেন! তাঁদের পুণ্যস্পর্শে সোনেলা আলোকিত হল। সোনেলা ক্রমশ পরিচ্ছন্ন ব্লগের সমার্থক হয়ে উঠল। মানুষ এখন সোনেলাকে চেনে। এই মান, পরিচয়ের পিছনে যাঁরা অকৃত্রিম শ্রম আর সময় দিয়েছেন, তাঁদেরকে আমি অন্তর থেকে ভালবাসা আর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

আর সোনেলার প্রথম ব্লগার এবং ডেভেলপার হিসেবে আমি তো একটু গর্ব করতেই পারি!

আহা সোনেলা! ভালবাসার সোনেলা! সোনেলা বেঁচে থাকুক হাজার বছর।

নোটঃ
১) ব্লগের প্রথম পোস্টের স্ক্রিনশটটি আসল।
২) পোস্টের শিরোনাম নচিকেতার লেখা, সুরে ও গাওয়া বিখ্যাত “সোনালি প্রান্তরে, ভ্রমরার গুঞ্জরে” গান থেকে ধার করা হয়েছে।

৪০৮জন ১০জন
66 Shares

৪৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ