সোনেলায় আমি// দ্বিতীয়- পর্ব

বন্যা লিপি ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০, বৃহস্পতিবার, ১১:১৮:২০অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৩১ মন্তব্য

১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১। টিএসসি থেকে ফিরলাম আরামবাগের দেড় কামরার বাসায়। দুই দেবর আর শাশুড়ি তখন বাসায়। শাশুড়ি মাঝে মাঝে আসেন বেড়াতে ঢাকায়।  থাকেন প্রায় ৩/৪ মাস। নতুন বউ আমি তখনো।  চেঞ্জ করার আগেই শাশুড়ি কন্ঠ দৃঢ় করে বলে দিলেন , ‘ এহন এইসব সব ছাড়ো। আর কোনো সময় এসব করবা না।’ ——- বুঝলাম : এখানেই সব ইতি টানতে হবে। আর হবেই বা কি এসব লেখালিখি, আবৃত্তি দিয়ে?

পরিবেশ, পরিস্থিতী, সর্বপরি লেখালিখি করা বা  আবৃত্তি করার মতো একটা ফ্রেস মন, পারিপার্শ্বিক, এবং খুব কঠোর মনোভাব রাখা খুব দরকার। যার কোনোটার সাহায্যই তখন আমার প্রতিকুলে ছিলো না। খুব সহজেই সহজ হিসেবে চেষ্টাও আসেনি কখনো আর । শুধু পড়ার নেশাটা ছাড়তে পারছিলাম না কোনোভাবে। যেখানেই বইয়ের সাজানো সেল্ফ দেখছি। লোভাতুর নির্লজ্জভাবে চেয়ে নিয়ে এসেছি। অখণ্ড সময় ছিলো তখনো বই পড়ার। বিরুপ বৈরী পরিবেশে একমাত্র নারী প্রাণীকুলই খুব সম্ভবত মানিয়ে চলার শক্তি যুগিয়ে চলতে পারে।

সময়ের বয়ে চলা স্রোতে সময় বদলেছে একে একে অনেকটা। আরামবাগ ছেড়ে রামপুরাতে চলে এলাম দুই বাচ্চা নিয়ে, বিয়ের পাঁচ বছর পরে। বিয়ের সাত বছরে তিন বাচ্চার মা। সংসারে লোকসংখ্যা বেড়েছে।বেড়েছে ততদিনে একটু আধটু জা’য়ে জা’য়ে মত বিভেদের বৈপরিত্য।  সত্যি কথা বলতে কি, আমি খুব সহজ হিসেবটা বুঝতে চাইতাম সবসময়, বা এখনো ঘোর প্যাঁচ, ক্রিটিসিজম, মারপ্যাঁচ বস্তবিক প্রাত্যহিক জীবনে বুঝে উঠতে পারিনা। ক্রমশঃ মন মানসিকতা বিগড়াতে থাকে। হাত থেকে কবেই ছুটে গেছে বই! বাচ্চার হাতে তুলে দিয়েছি বর্ণমালার বই। ওকে শেখাতে শুরু করেছি তখন। স্কুলে দিতে হবে। প্রথম শিক্ষা মা’র কাছ থেকেই শিখবে। এমনটাই তো প্রচলন! আজ যখন লিখতে বসি সেসব দিনের কথা!  ভাবতে অবাক লাগে নিজের কাছেই। রামপুরার এই যৌথ পরিবারে থাকার পরেও একদিন হঠাৎ মনে হলো আমি লিখব। নিজের মতো করে লিখব নিজের জন্য। মেয়েকে তখন স্কুলে দিয়েছি। আনা নেয়া করতে করতে,  এবং ওকে নিয়ে পড়াতে বসতে গেলেই মনে হতো , আমি হয়ত পারবো আবারো লিখতে।  একটা খাতা কিনেছিলাম রান্নার রেসিপি লেখার জন্য ওখানে লিখেছিলাম–” আবারো লিখতে চাই সেই আগের মত। জানিনা আর পারব কিনা। তবু চেষ্টা করতে ইচ্ছে করছে নিজের মত”….কিন্তু তবুও আর এগোয়নি। বহুবছর পরে সেদিন একটা চিঠি খুঁজে পেয়েছি অনেক জমানো চিঠির মাঝে , যা লিখেছিলেন আমার আব্বা  আমার বিয়ের পর পর তাঁর জামাতাকে। আমি কেঁদেছি সে চিঠি পড়ে। আব্বা কখনো কোনো কাজের প্রশংসা সামনা সামনি কোনোদিন করেন নি। আমার বরকে লেখা চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন আমার লেখার প্রশংসা। যখন লিখছি এ লেখা…. তখনো আমার চোখ ভেজা। হয়ত প্রত্যেক বাবা’ই তাঁর জামাতাকে এমন করেই লেখে- ‘ আমার মেয়েটাকে একটু বুঝিয়ে শুনিয়ে নিও’ – লিখেছেন–

” তোমার কাছে বলা উচিৎ, মেয়েটা আমার বলতে গেলে একেবারেই সরল সোজা, সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ আমারই মত। কবিতাও লেখে, অনেক কবিতা তো আমার চেয়েও ভালো লেখে। সাংসারিক বুদ্ধি সুদ্ধি খুবই কম। জটিলতা বোঝে না। তোমার কাছে অনুরোধ তুমি বুঝিয়ে শুনিয়ে নিও। আমি অবশ্যই তোমাদের উভয়ের সুখ শান্তিময় জীবনের জন্য দোয়া করি ”

 

আমি ভুলে গেছি সেসময় কি লিখেছি না লিখেছি!  অথচ বাবা বললেন, অনেক লেখা তাঁর চেয়ে ভালো লিখতাম। বাবা কোনোদিন কিচ্ছু বলতেন না লেখা বিষয়ে।  এ চিঠি পড়ে অঝরে কেঁদেছি। বাবা বাবা বলে অস্ফুটে চিৎকার করে ডেকেছি বাবা’কে।  পৃথিবীর কোনো প্রান্ত থেকে জবাব আর আসবে না জেনেও…..।

 

যাই হোক, বোঝা যাচ্ছিলো ভেতরটা কাঁদত লেখার জন্য। চেষ্টাও করতাম টুকটাক একান্ত নিজের মত খুব গোপনে। খাতাটা খুঁজে পাইনি। দু একটা লেখা ছিলোও সেখানে।  তুলে ধরা যেত।

 

মগবাজারে ছোট খালার বাসা।  খুব যেতাম একটা সময় পর্যন্ত। খালাত দুই বোন মাঝে মাঝে বেশ তিরস্কার করে কথা বলতো। ” তুমি কি লিপি আপু? ব্যাকডেটেডই রয়ে গেলা। এই ডিজিটাল যুগে তোমার একটা ফেসবুক এ্যাকাউন্ট নাই, এইটা কিছু হইলো? ” ভ্যাবলির মতো তাকায়া থাকতাম। ফেসবুক এ্যাকাউন্ট দিয়ে করে কি?  বুঝুন এবার! কি প্রশ্ন করেছি তিন বছর আগে? ইচ্ছামতো যা খুশি তাই বললো রিংকি, হৃদি।

২০১৭ সাল। খালার প্রয়োজনে আমি মগবাজার। হৃদিকে বললাম -“দে এ্যাকাউন্ট খুলে, দেখি কি হয় ফেসবুকে!”  যথারিতী চট করে খুলে দিলো এ্যাকাউন্ট। কিছু মাস আমি একদমই লহইন করিনা । সাহেবের ফোন দিয়ে মাঝে মাঝে যাই ফেসবুকে। পরিচিত এবং আত্মিয় স্বজন সব এ্যাডেড।  টাইপিং বা মেসেজ লেখা রিপ্লাই করা পুরোপুরি গণ্ডমূর্খ।  এক হারানো বন্ধুকে খুঁজে পেয়ে আমি যারপরনাই আত্মহারা।  কোনোরকম যোগাযোগ ছিলোনা যার সাথে। তাঁকে পেলাম ফেসবুকে।  আমাদের ঝালকাঠির একজন বড় ভাই আছেন, যিনি সাহিত্য জগত এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় সমান সফলতায় বিচরন করছেন, আরিফ হোসেন ভাই। আমার বান্ধবি বললো , “ভাইয়ের ধানসিড়ি পাড়ে একদিন সিরিজে মন্তব্য কর” আরিফ ভাই নেই আমার লিষ্টে। সার্চ দিয়ে রিকোয়েষ্ট পাঠালাম। ভাই এ্যাকসেপ্ট করলেন। ৭৩ তম পোষ্ট থেকে আমি তাঁর লেখা- পড়া  শুরু করলাম। ঝালকাঠির হারানো স্মৃতিচারন মূলক লেখা। তখনকার সময়ে , রাজনিতী, আঞ্চিলক প্রবাদ, আঞ্চলিক আতিথেওতা, মোট কথা অনারম্বর ইতিহাস সম্বলিত সিরিজ। ওখানে লাইক কমেন্টের কারনে একে একে যোগ হতে লাগলো বহু পুরোনো বড় ভাই, বান্ধবির বড় ভাই, ছোট ভাই, বড় দিদি, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একসময় যাদের সাথে প্রোগ্রাম করেছি এরকম বহু মানুষজন। এদের মধ্যে একজনার নাম না নিলেই নয়, মেহেদি মর্তুজা। ছোট ভাইয়ের মত। একদিন মন্তব্য না করলেই বলতো ইনবক্সে, আপু আজ আপনি কিছু লিখলেন না যে!  আপনি ও লিখুন।  প্রায়ই উস্কাতো এই ছেলেটা।  খেয়াল করতে শুরু করলাম ফেসবুকিয় লেখালিখি। কাঁচা হাতে আমিও লিখে ফেললাম একদিন ছোটখাটো এক লেখা। পরিচিত সবাই দেখলাম উৎসাহ দিতে শুরু করলো। আমি বুঝে গেছি কবিতা আর আমাকে দিয়ে হবে না। আমি বিকল্প শব্দ খুঁজতে লাগলাম। আমি জানি আমার প্রচণ্ড প্রতিবন্ধকতা আছে। মনখুলে হাত খুলে লেখা আমি লিখতে পারিনা বা পারবো না। সাধারন কথার দ্রোহ বা ঊষ্মা প্রকাশের হাতিয়ার করে নিলাম বিকল্প ঘোরেল শব্দমালা। কারো ওপরে কোনো কারনে বিরক্ত হচ্ছি তাও আমি লিখছি বিকল্প শব্দে। জীবন বোধ নিয়ে স্পর্শ করে যাচ্ছে আমাকে আমার নিজেরই বোধ! আমি লিখতে সাহস যোগাচ্ছি  একটু একটু করে এই ফেসবুকের পাতায় যখন যেমন যা আমার দেখা বোঝা বোধে নাড়া দিচ্ছে। আমার পরিচিত বন্ধুরা, বড় ভাই আরিফ ভাই, মর্তুজা, সমানে উস্কে দিয়ে যাচ্ছে,  আরিফ ভাই যখন কমেন্ট করেন আমার ভালো লাগে।অমিতা দিদি যখন বলেন -‘বেশ ভালো লেগেছে তোমার লেখা,’ আমি আরো একটু সাহস পাচ্ছি। একদিন লিখে ফেললাম ‘পথচলা’ লিখে বন্ধু হাসি’কে পাঠালাম,-‘দেখতো কেমন হয়েছে?’ হাসি বললো-‘ পোষ্ট দে’ আমার সংকোচ ছিলো। পরে দেব বলতেই খেঁকিয়ে বললো -‘ এক্ষুনি দে’

ওর কথামতো তখনই পোষ্ট দিলাম। এবং যথারিতী মূল্যবান মন্তব্য নিয়ে সবার আগে এলেন আরিফ ভাই। তনি তাঁর মন্তব্যে বললেন’ আমি বুঝিনা,  আমাদের এমন ভালো ভালো কবি থাকতে লিখছে না কেন? নাকি কবিরা বোহেমিয়ান?  লিপি, খুবই ভালো লিখেছো, নিয়মিত লেখক চাই’ আমি বিনয়ের সাথে আমার প্রতিবন্ধকতার কথা জানালাম।  অমিতা দিদি, আলআমিন বাকলাই( কবি), রিনা কর্মকার(এক সময়ের আবৃত্তিকারী,কবি, নারী উন্নয়নের সাংঘটনিক কর্মী, বর্তমানে সিলেট দরগার হাট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা) এরা সবাই আমাকে গঠনমূলক এবং উৎসাহ অনুপ্রেরনায় সাহস বাড়িয়ে দিচ্ছেন প্রতিনিয়তঃ। আমিও আমার মতই লিখতে শুরু করেছি মনের তাগিদে…………।

 

আগামী পর্বে সমাপ্তঃ

২২৪জন ১৬জন
0 Shares

৩১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য