আজ ২৩ সেপ্টেম্বর সোনেলা ব্লগের জন্মদিন। উজ্জ্বল এ নক্ষত্রটি সোনেলা নামে এ দিনই আত্মপ্রকাশ করেছিল বাংলা ব্লগিং জগতের উঠোনে। সোনেলা দীর্ঘ সাতটি বছর পেরিয়ে আজ অষ্টম বর্ষে পদার্পণ করলো। সোনেলা ব্লগের জন্মের ইতিকথা সোনেলার পাঠকগন ইতিমধ্যেই জেনেছেন। আমার দীর্ঘদিনের ইচ্ছে ছিল সোনেলার জন্মদিনে নিজের কিছু অনুভূতি ভাগাভাগি করবো সোনেলার পাঠকদের সাথে। লিখবো লিখছি আজ কিংবা কাল, এ চিন্তা থেকেই যত বারই ডায়েরি কলম নিয়ে লিখতে বসেছি লেখা আর বের হয়না। শব্দেরা ঘূর্ণিপাকে দেহ-মনে মস্তিষ্কে কিন্তু কলম থেমে থাকে ডায়েরির ফাঁকা লাইন গুলিতে। কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে যাই লেখার টেবিল থেকে। বিরক্তিকর বিস্বাদে মন ভরে ওঠে। সোনেলাকে নিয়ে লিখতে বসলেই মনে হয় সবাইতো সবই লিখেছে, আমি কি লিখবো? কিভাবে লিখবো? অধরাই থেকে যায় আমার অলেখা অপ্রকাশিত শব্দগুলি।

সুলেখক এবং সুপাঠক বেষ্টিত সোনেলার সৌন্দর্য লেখায় বর্ণনা করা আমার মত অতি নগন্য লেখকের পক্ষে অত্যন্ত দূরহ আর কঠিন কাজ বলে মনে হয় সবসময়। আর তাই কুঁড়েমিরাও আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে রাখে সবসময়। লেখার আলস্যতায় মাঝেমধ্যে একটি-দুটি কুঁড়েমির দিনকে পিছনে রেখে যাই। ছন্দে গাঁথা কুঁড়েমির কারুকাজে সজ্জিত করি অপ্রকাশিত শব্দগুলিকে। শব্দ ছন্দে-গাঁথার কুঁড়েমির কারুকার্যে খচিত এই যে চলতি মুহূর্ত এটি বর্তমানে আবদ্ধ নয়, নির্দিষ্ট কালের গন্ডিতেও এটি পড়ে না। তাই সোনেলাকে নিয়ে লেখার শব্দগুলি থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। কারণ সোনেলা নিজেই নিজের সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত এবং এটাই চিরন্তন সত্য।

“সেই সোনেলার আজ জন্মদিন”

সোনেলার দিগন্তপথে আমাদের অনেকেরই কত দিন-রাত হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল। কত দুর্গম পথ অতিক্রম করতে হয়েছে আমাদের সেটা আজ বলা বাহুল্য। ফসলের মাঠে ফসল ফলানো কষ্টকর,কিন্তু সে ফসল ঘরে এলেই ভুলে যাই সব কষ্ট আর ঘামঝরা দিনগুলির কথা। একটা সময় ক্লান্তি ও হতাশায় ছেঁয়ে গিয়েছি আমরা। মিথ্যাবাদী প্রবঞ্চকের তকমা গায়ে লেগেছিল। সোনেলার যাত্রীদের মধ্যে দেখা দিয়েছিল ভীষণ অস্থিরতা,তীব্র বিপরীত প্রতিক্রিয়া। আমরা অনুতপ্ত হয়েছি,হতবুদ্ধি হয়েছি। সে সময় কোথায় যাবো,কার কাছে যাবো সে নিশ্চয়তা নেই। ঠিক এমন একটি দিনেই সোনেলার স্বপ্নদ্রষ্টার স্বপ্নে এসেছিলেন শুভ্রকেশী, মিষ্টভাষী, লাবন্যতায় ভরা অমলিন মুখাবয়বের একজন দেবদূত। তিনি আমাদের বলেছিলেন, যারা আমাদের দিকে পিছন থেকে বর্শা ছুঁড়েছে তারা নিপাত যাবে, যার জন্য মনপ্রান উজার করেছি সেই সোনেলাই আমাদের পথ দেখাবে। সোনেলায় সকলের বিচরণের মাঝেই রহিত থাকবে আমাদের উল্লাসিত আকাঙ্ক্ষা প্রাপ্তি। আজকের সোনেলাই হচ্ছে আমার/আমাদের সেই লেখকীয় সঞ্জীবনী। সোনেলার মাঝেই নিহিত রয়েছে সোনেলার লেখকদের মৃত্যুঞ্জয় অমরত্বের পুরস্কৃত উপহার।

সেদিন নবউদ্যমে মরীয়া হয়েছি আমরা, আবারও ঝাঁপিয়ে পড়েছি মনে সাহস নিয়ে। আশা ছিল একটাই- সোনেলা সৃষ্টির দিন থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘদিন কত লেখক সোনেলার মাঠে ফসল বুনেছেন, তাদের সবাইতো আহার-বিহার, পরস্পরের মধ্যে হানাহানিতে মত্ত নয়। কেউতো ভালো ছিল। কালের খেয়ায় পারাপারের জন্য কত চলতি মুহূর্ত উঠে বসেছিল, আজ তারা পার হয়ে গিয়েছে অদৃশ্যে। অতৃপ্ত কৃষকেরা চলে গিয়েছেন কিন্তু সোনেলার ফসলের মাঠ তার জায়গাতেই রয়ে গিয়েছে। সোনেলায় আবার ফসল বুনবেন নতুন কৃষকেরা, এ বিশ্বাস মনে-প্রাণে ধারণ করে কলম হাতে তাই আজও রয়েছি সোনেলার সোনালি মাঠে।

মানুষ চিরকাল চরম আদর্শের অভিযানে চলেছে। সেই চরম আদর্শের শেষ লক্ষ্য এবং প্রাপ্তি হচ্ছে আত্ম স্বরূপ দর্শন লাভ। নিজের অন্তরস্থিত নিত্য-মানবকে উপলব্ধি করা। নিজেদের লেখকীয় আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য আমার কাছে সোনেলার মাঠে বিচরণ করাই উৎকৃষ্ট মনে হয়েছে। আসলে সংসারের নানান অবিলতা ও বীভৎসতার রুদ্ধদৃষ্টি মাঝেও মানুষ আলোকের ইঙ্গিত খোঁজে। আমার কাছে সে আলোকবর্তিকাই হচ্ছে আজকের সোনেলা। সাত বছর আগে যে ছোট্ট চারাটির বীজ বপন করা হয়েছিলো, কালের গর্ভে সেটি আজ বিশাল মহীরূহে পরিনত হয়েছে। এর শাখাপ্রশাখার প্রতিটি পাতায় বিচরণ করছে আমাদের লেখকগন। সেই বৃক্ষের পাতার ফাঁক গলে সূর্যের সোনালি আলোকছটার আভায় আমাদের লেখকজন রচনা করছেন কালজয়ী সব কাব্যকথা।

সোনেলার প্রতিটি লেখক এবং পাঠকগণ আমার কাছে হীরকখণ্ডের চেয়ে কোনও অংশেই কম নয়। আমার দেখা সচেয়ে সুন্দর এই হীরকখণ্ডদের প্রজ্জ্বলতাকে ম্লান হতে দেখতে চাইনা। একসময় আশ্চর্য হবো এটা ভেবে- একদিন আমিও দেখেছিলাম এই সবকিছু। তাইতো সোনেলায় সবার আবেগ, ভালোবাসা, পাওয়া না পাওয়ার বেদনা, আনন্দ অশ্রু, হারিয়ে যাওয়াগুলোকে ধারণ করে চলেছি নিজের মনে- সোনেলার ডায়েরির একান্ত অনুভূতিতে সোনালি বার্তার প্রতিটি লেখায়।

শরতের আকাশে মেঘ-রোদ্দুরের লুকোচুরি আর সোনেলার লেখক-পাঠক সমাবেশের সৌন্দর্য সংগীত সবগুলিই সোনায় পান্নায় ছায়ায় আলোর গাঁথা এক একটি নকশীকাঁথা। আজ আনন্দে বিহ্বল হয়ে সোনেলার মাঠে নিজের রুমাল বিছিয়ে দিয়েছি। মহীরুহের সে সোনালি আলোকছটার মাধুরীকে মনে হয় এই আছে এই নেই। আমার সাথে লুকোচুরি খেলে, সোনেলার আকাশ বীণায় আজ গৌড়-সারঙ্গের আলাপন। তার জন্মদিনে এটাই তো আমার আমাদের পরম প্রাপ্তি।

ইতিহাস সাক্ষী- আত্মজয়ী বিশ্বজয়ী নীরব নির্ঘোবনে লেখকেরা পরাজয়ের গ্লানি মাথায় ভরে কখনতো মাথানত করেনি এবং করবেওনা। সোনেলা আজ ঊর্ধ্বগিরি চূড়ায় বসে আছে তার ভক্তিমান তুষারশুভ্র নিরবতার মধ্যে। সোনেলার আকাশে নক্ষত্ররা নিদ্রাহীন চোখ নিয়ে খোঁজে আলোকের ইঙ্গিত। অকাল ঘনীভূত মেঘ আর নিশাচর পাখির চিৎকার শব্দে সোনেলার অপূর্ণতাগুলি উড়াউড়ি করছে বারংবার। সোনেলা আশ্বস্ত করে বলে – ভয় নেই, তোমরা মহান সত্য প্রকাশ করে পূর্ণ হও! নিশ্চয় প্রত্যক্ষিত হবে আপন আলোতে। শব্দের গান ভাসিয়ে নিয়ে চলো সমুদ্রপথে, যেখানে সোনালি আভায় উদ্ভাসিত ঐ কাশের চামর দোলে নব সূর্যোদয়ের দিকে।

সোনেলার কাছে কিছু চাইবার নেই আমার। কারন সোনেলায় আমার ব্যক্তিগত প্রাপ্তি অনেক বেশী। নিজের যে হৃদপিন্ড  নিয়ে সোনেলায় প্রথম এসেছিলাম সেটি এখন প্রাণ ভোমরায় রুপান্তরিত হয়ে লুকিয়ে আছে সেই মহীরুহের একেবারে মধ্যখানে। সোনেলার মায়ায় সোনেলার সুশীতল ছায়ায় দাঁড়িয়ে সোনালার উদ্দেশ্যে আজ একটি কথাই বলতে চাই- হে সোনেলা, মহাকাল সিংহাসনে সমাসীন মহান লেখকদের বিচারক তুমি। আমায় শক্তি দাও, শব্দের কৃপাণকে খাপ হতে উন্মুক্ত করার অনুমতি দাও। আমি লেখার বজ্রবানী ছড়িয়ে দিতে চাই এ মহাবিশ্বে। শিরা-উপশিরায় স্পন্দিত লজ্জাতুর ঐতিহ্যের হৃদস্পন্দনের রুদ্ধকণ্ঠে ভয়ার্ত এ অশৃঙ্খলিত যুগে যেন আমার শব্দেরা নিঃশব্দে প্রচ্ছন্নিত হয় আমার লেখার চিতার ভস্মতলে। আমায় ভুলে যাও সরে যাও ক্ষতি নেই, কথা বলো না বলো ওগো বন্ধু, ছায়া হয়ে তবু পাশে রইবো।

আজ সোনেলার অষ্টম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমাদের সকল ব্লগার লেখক-পাঠক,শুভাকাঙ্ক্ষী এবং শুভানুধ্যায়ীদের একরাশ শুভেচ্ছা ও প্রাণঢালা অভিনন্দন রইলো।

২৮৩জন ২৬৫জন
33 Shares

৩৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য