বিজয়ের মাস আসে যায়। আমরা যুদ্ধের গান বাজিয়ে, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন ও শোক পালন করি। ভাবি এতেই সব শেষ। নেপথ্যে থাকা শতশত প্রান যেগুলো পিঁপড়ার মত জীবন দিয়েছিল তার ইতিহাস ক’জন ই বা মনে করি! আজকের বিজয় তাদের জন্যই, এমনি এমনি আমাদের বিজয় আসেনি।

কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন তাঁর ট্রাজেডিক “ট্রেন” উপন্যাসে সৈয়দপুরের গোলাহাট বধ্যভূমি ও ট্রেন ট্র্যাজেডির নির্মম বর্ণনা তুলে ধরেছেন। আমরা সে ঘটনা দেখিনি হয়ত, তারপরও লেখিকার উপন্যাসে বর্ননা পড়ে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। কিভাবে মানুষকে কলাগাছের মত রামদা দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আমাদের বিজয়টা শত শত প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া! সকল প্রজন্মের কাছে আমাদের কিছু পাওয়া কিছু হারানোর ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে সামান্য প্রয়াস!

***

১৯৭১ সালের ১৩ জুন, সকাল ১০টা। সৈয়দপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল যে ট্রেনটি, সেটি দেখে বোঝার কোনো উপায় ছিল না। কেউ জানত না একটু পরে সেটি বীভৎস এক হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী হতে চলেছে। অন্তত মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী শ্যামলাল আগরওয়ালা ঘুণাক্ষরেও কিছু আঁচ করতে পারেননি। বরং বেশ কয়েক দিন ধরে অবরুদ্ধ বিহারি-অধ্যুষিত এই শহর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আশায়  তাঁর মন ছিল উতলা।

কদিন ধরে সৈয়দপুর শহরে, পা‌কিস্তা‌নি সেনা‌দের পক্ষ থেকে মাই‌কে একটা  ঘোষণা দেওয়া হচ্ছিল “শহরে যেসব হিন্দু মাড়োয়ারি আটকা পড়ে আছেন, তাঁদের নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়া হবে। এ জন্য একটা বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ট্রেনটি সৈয়দপুর রেলস্টেশন থেকে ভারতের শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে”। যেসব মাড়োয়ারি আটকা পরে আছে বা যেতে চায় তারা যেন এটিতে উঠে পরে। সবাই উৎসুক ও আনন্দিত হয়ে ট্রেনে উঠেছিল।

৪৬ বছর পর শ্যামলাল আগরওয়ালের বর্ণনা মতে, মাইকে ঘোষণা শুনে যুদ্ধে লুটতরাজের হাত থেকে তখনও যা কিছু সম্বল বেঁচে গিয়েছিল, তা-ই গোছাতে শুরু করে দেন মাড়োয়ারিরা। ১৩ জুন সকালে তাঁরা সমবেত হতে থাকেন সৈয়দপুর রেলস্টেশনে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো বিশেষ ট্রেনে, গাদাগাদি করে উঠে বসলেন সবাই। মুখ ভরা হাসি ও মন ভরা আনন্দ নিয়ে।

হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শী তপন কুমার দাসের বর্ণনা মতে, ঠিক সকাল ১০টার দিকে স্টেশন থেকে ছেড়ে যায় ট্রেনটি। চলছিল ধীরে ধীরে। শহর থেকে বেরিয়ে রেলওয়ে কারখানা পেরিয়েই হঠাৎ ট্রেনটি থেমে যায়। জায়গাটা স্টেশন থেকে দুই মাইল দূরে। নাম গোলাহাট। ট্রেন থামার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেন তপন কুমার। বন্ধ জানালা একটু ফাঁক করতেই তাঁর অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে।  বাইরে সারি সারি পাকিস্তানি হানাদার সেনা দাঁড়িয়ে, সঙ্গে তাঁদের দোসর বিহারিরা। সেনা সদস্যদের হাতে সুসজ্জিত গুলিভর্তি রাইফেল। আর বিহারিদের হাতে চকচক করছিল ধারালো রামদা।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী গোবিন্দলাল দাসের বর্ণনা মতে, ‘থেমে থাকা ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে ঢুকেই পাকিস্তানি সেনারা চিৎকার করে উর্দুতে বলতে থাকেন ” তোমরা একজন একজন করে নেমে আসো। আমরা তোমাদের মারতে এসেছি । আমরা বেশি কথাও বলতে চাই না আর পাকিস্তানের দামি গুলিও খরচ করা হবে না। তোমাদের সকলকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হবে।”

সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞ। দরজা দিয়ে নিরীহ মানুষ নামতে থাকে আর তাদের ধারালো রামদা দিয়ে কেটে ফেলা হচ্ছিল গলা, যেন বলি দেওয়া হচ্ছে। এ যেন এক যুদ্ধযজ্ঞ ফিনকি দিয়ে রক্তে রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল স্টেশন। ওই হত্যাযজ্ঞে বৃদ্ধ- বৃদ্ধা, শিশু-নারীরাও রেহাই পাননি। হানাদাররা কারুরই আকুতি শোনেনি। কত মা তার সন্তানকে বুকে নিয়ে ভিক্ষা চেয়েছিল, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা চেয়েছে জীবনের শেষ সময়টুকু তাও শেষ রক্ষা হয়নি।

বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়, ওই ট্রেন হত্যাযজ্ঞে ৪৪৮ জনকে একে একে রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। শুধুমাত্র কিছু যুবক পালিয়ে বেঁচেছিল। স্বাধীনতার জন্য জীবন দানকারী আমাদের সেই মা- বাবা, ভাই- বোনদের জন্য চোখের পানিই আমাদের শেষ সম্বল।

সৈয়দপুরের অভিশপ্ত ট্রেন ট্রাজেডির সেইসকল নিরীহ মানুষের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা🌹🌹

 

সুত্রঃ ট্রেন উপন্যাস ও ইন্টারনেট।

৩৩০জন ২৩০জন
0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য