সে ও তার কথা(অখণ্ড)

আগুন রঙের শিমুল ৩ জুন ২০১৬, শুক্রবার, ০২:০৯:৫৭পূর্বাহ্ন গল্প ১৩ মন্তব্য

betal12
সে ও তার কথা (১ম পর্ব)
“সময়ের ছারখার, অথচ তোমার মুখে আলো।
কালকেউটে এখুনি কামড়ালো কাকে যেন, কাকে?
এবারও কি লখিন্দর পাবে বেহুলাকে? ”
এই লাইন কটা পড়ার পরই প্রতিবার মনে হয় একটা সিগারেট খাওয়া দরকার।
“সে” বইটা উল্টে রেখে একটা সিগারেট হাতে বারান্দায় এসে দাড়াতেই আবার সেই দুরাগত ভুবন চিলের ডাক।
এখন আর চমকায় না “সে” এ ডাক তার একান্ত নিজের, কষ্টের মত, সুখের মত। এবং “ও”র মতো। গোপন।
“সে” সিগারেট ধরিয়ে একটা টান দিয়েই ডুবে যায়। ডুবে যায় অতীতে, কতকাল একা একা নক্ষত্রের পথ ধরে হাঁটাহাঁটি,কতকাল। প্রতিবারই “ও”র সাথে দেখা হয়। ভুল সময়ে, ভুল জায়গায়। শেষ বার তার সাথে দেখা হবার কথা মনে করে চোখ জ্বালা করে ওঠে, “সে” ভাবে, সিগারেটের ধোঁয়া বুঝি।
বরাবরই “সে” পার্শ্ব চরিত্র, অথচ মুল চরিত্র হবার কথা ছিল তারই। “সে” তা খুব ভালো করেই জানে। হয়ে ওঠা হয়না। না হলে শেষ বার, সেই কালসাপ কেমন করে বেছে নিল প্রথম রাত্রিটাই? ভাসানের সময় কি কান্না, কি কান্না। মনে পরলে এখনো হু হু করে ওঠে ভেতর টা। অথবা তার আগের বার, সেই যে, যেবার পার্শ্ব চরিত্র হবে বলেই অমন মরন তৃষ্ণা পেল,আর তাইনা দুজনে পাশাপাশি বসে সেই আরক পান। অথবা, তার আগের বার, ভুল সময় বলেই না “ও” নামল সেই অনন্ত জীবনের আগুনে। তারপর, আগুনের ছ্যাকা লাগে আঙুলে আর “সে” বাস্তবে ফিরে আসে। যাহ্‌ একটা মাত্র টান দিলাম আর সিগারেট শেষ। আবার ভুবন চিলের চিৎকার। “সে” নিজেকেই একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে ভয় নেই, দেখা হবে, হবেই।
তারপর কত জোনাকি, কাঁচপোকা আসে যায়, কেউ আরও উজ্জ্বল হয়ে ফিরে যায়। কেউ বা, পুড়ে ছাই। “সে” ভাবে এইবার বুঝি আর হলোনা দেখা। ভাবতে ভাবতে আর ভুবন চিলের ডাক শুনে শুনে কত চাঁদ ওঠা আর চাঁদ ডুবে যাওয়া পেরিয়ে গেল, কে তার খবর রাখে। একদিন “সে” কলরব শুনে ভাবে, ওখানে অত ভীড় কিসের? ভাবেই শুধু যাওয়া হয়না। কলরব বাড়তেই থাকে। কৌতূহলের জয় হয়। “সে” ভীড় দেখতে গিয়ে ভীড়ের অংশ হয়। “ও” তার দিকে তাকিয়ে একবার নিতান্ত ভদ্রতার হাসি দিয়ে নিজেতে মগ্ন।
আজ এই পর্যন্ত। এই বলে, কথক উঠে দাঁড়ালেন,
বললেন, সাঁঝ হয়ে এল, যাই। বহুদূর যেতে হবে। ফেরার পথে বাকিটুকু শুনিয়ে যাব।
সমবেত শ্রোতাদের মাঝে গুঞ্জন। কথক ততক্ষণে হাটা দিয়েছে, গন্তব্য বহুদূর। একজন বলে ওঠে, না। এ গল্পের শেষ না জানলে আজ আর ঘুম হবেনা। ওহে কথক, শেষটুকু বলে যাও, “সে” কি চিনতে পেরেছিল “ও” কে?
কথক মুচকি, হেসে বলল হয়ত তোমাদের মধ্যেই কেউ এবারের “সে” শেষ টুকু যার টা তাকেই জেনে নিতে হয়। তবে সংগে যদি আস তবে আমার ছায়া মিলানো পর্যন্ত যে টুকু বলতে পারি সে টুকু বলব, এসো।
“ও” কে চিনতে পারার পর অনেক দিন “সে” আর ভুবন চিলের ডাক শোনেনি। শুনল সেদিন, যেদিন “সে” জানল এবারো পার্শ্ব চরিত্র। এবারো দেখা হল ভুল চন্দ্র রাতে। “ও”কে এবার পাহারা দেয় অনেক অনেক গুলো চকচকে চোখ। ভুবন চিল,এবার আড়াল ছেড়ে সামনে আসে, আমন্ত্রণ জানায় তার হৃদয় ঠুকরাতে দিতে। অথবা তার সাথে উড়ে যেতে।
বলেই থামলেন কথক। বললেন ফিরে যাও, ছায়া মিলিয়ে গেছে।
নাছোড় সে শ্রোতা আবারো বলে ওঠে, কথক তুমি কবে ফিরবে তার নেই ঠিক। পুরোটা না হোক শেষ টুকু বলে যাও। “সে”কি ঠুকরাতে দিল তার হৃদয়, নাকি উড়ে গেল ভুবন চিলের সাথে?
কথক বলে, শেষ বলে কিছু নেই। প্রতিটা শেষ হছে আরেকটা শুরু। তবে এ গল্পের শেষে সেই যে “সে” তাকে নিয়ে এক কবি লিখেছিল একটা কবিতা তাই বলে যাই
“কেউ কেউ চলে যেতে চায় ভালবেসে
উৎসর্গে সবটুকু দিয়ে যাবে বলে।
বয়সী তক্ষক না বুঝেই বলে ওঠে ঠিক ঠিক ঠিক…
জেনে রাখো, এইভাবে চলে গেলে
কেউ তারে রাখে না তো মনে
মূলত, এ পৃথিবীটা বড় বেরসিক।”

সে ও তার কথা ( ২য় পর্ব )

সেই যে সে যার কথা বলে চলে গেল কথক…
”সে” অপ্রাপ্তি আর অপূর্ণতার হিসাব নিকেশ দিয়েছে বাদ। এক আকাশের নিচে উড়াউড়ি, ডানার ছন্দে ছন্দ মিলিয়ে ওড়া। তবু মাঝে মাঝে কোথা থেকে উড়ে আসে বিষণ্ণতার ছাই রঙ মেঘ। তার মাঝে বিবর্ণ ফিকে নীল আকাশ। তাকে ঘাসের বুকের শিশির মাঝে মাঝে ডাক পাঠায়, তবু ”সে” যুগল শ্রাবণে ভিজে যাবার স্বপ্ন দেখেনা আর। মনের ভেতরে তার ভাংচুর ভাংচুর।
”ও” ফিরে যেতে যেতে থমকে দাড়ায়, ফিরে যেতে যেতে… তবু কি পথের পাশের ঘাসের অপেক্ষা ফুরায়?
না ফুরালে নাই। রোজকার নিয়মে সূর্য ওঠে, নতুন দিনের। ”ও” অবহেলায় আর অবহেলায় জলশূন্য বিরান দিঘী, যে দীঘিতে হংস মিথুন জলকেলি,আজ ফসল কাটা হাহাকার।
অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটে মাঝে সাঝে, কোথাও কেউ ভেঙেপড়ার শব্দ শুনে একপা আগায়, আর ”ও” ভেঙ্গে যেতে যেতে স্বপ্ন দেখে নতুন ভোরের। নতুন পৃথিবীতে নতুন ঈশ্বরের। অথবা নিজেকে দিয়ে বিচার করতে চাওয়া ত্রুটিপূর্ণ মানুষ ও হঠাৎ আপন উজ্জ্বলতায় জ্বলজ্বলে নক্ষত্রকেও হার মানায়। তার মাঝে দিন গড়ায় সন্ধ্যায়, রাত্রিতে, আবার নতুন ভোর। চারপাশে একি আলো, চিরপুরাতন, চির নতুন।
আর সেই যে ভুবন চিল, যে ডাক পাঠাত একলার নিরজনে, সে এখনো শ্যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে, ফাটল খোঁজে লৌহ বাসরের। অথচ সে জানেনা, নতুন পৃথিবীতে দীর্ঘশ্বাস আর হতাশার ভ্রমর বন্দী করা নেই, তাকে পুড়িয়ে ধূপের সাথে সাঙ্গ হয়েছে নতুন ঈশ্বরের অধিষ্ঠান আরতি।
আজকে কথক ফিরে চলেছে, তার পিছনে নেই আর কৌতূহলী শ্রোতাদের লম্বা লাইন, কারন ততদিনে সবাই জেনে গেছে এ হচ্ছে অন্তহীন গল্প, পোড়া আর পোড়ানোর। তবু কথক হেটে যায় লোকালয় থেকে লোকালয়ে, ক্লান্তিহীন। একেকটা দ্বীপের মত প্রতিটা মানুষ, বিচ্ছিন্ন। অথচ কি দারুন ভাবে একে অপরের অংশ। তাই গল্পের শেষ নেই। শেষ নেই অপেক্ষার। নিরাবেগ চোখে কথক দেখে যায় মানুষের মুখ, নিদারুন নৈর্ব্যক্তিক চোখে।
আর ”সে” নতুন খেলায় নামতে চায়, যে খেলার পুরস্কার জীবন। ব্যর্থতারও পুরস্কার আছে। এফোঁড় ওফোঁড় মৃত লাশ। অথবা পলায়ন। পলাতকের জীবন মৃত লাশের। হঠাৎ হাওয়ার ঝলকানি এসে দুলিয়ে দেয় দেয়ালের ঝোলানো প্রদিপ। আলো কাঁপে, ছায়ারাও।
নিয়মহীন বুনো সে খেলায় নামা হয়না তার। জীবনের আহ্বান, অপার জীবন। ”সে” একবার ফিরে তাকায় ফেলে আসা পথের দিকে, পুরোটা জুড়েই অদ্ভুত আলোছায়ার আঁকিবুঁকি। তারপর, আলোর পথে যাত্রা।
কথকের সাথে দেখা হয়ে যায় একদিন।
একটা সিগারেট ধরিয়ে সে অপাঙ্গে তাকায় ঈশ্বরের মত নির্বিকার। এবং হেঁটে চলে জনারণ্যের ধুলো মাখা পথে।

সে ও তার কথা (শেষ পর্বের শুরু)

কত্থকের সাথে দেখা হয়ে যায়, এলোমেলো ঘোরাঘুরির ফাকে।
কত্থকের বয়স বেড়েছে চোখেও তেমন ভালো দেখেনা, তবু স্মৃতির অদ্ভূত ঘ্রাণ তাকে মনে করায় সব কিছু।
“সে “ও তুমুল যৌবনের মধ্যভাগে প্রায়। তবুও সর্বাঙ্গে তার নিটোল শৈশব, কত্থক শুধায় বৃদ্ধ হবেনা হে? থিতু হবেনা?
“সে ” ধোঁয়া উড়িয়ে বলে –
বার্ধক্য আমারে নাগালে পাবেনা। তার আগেই …..
কত্থক মুচকি হেসে আনমনা উচ্চারে বলে, গড়ানে পাথর।
পাশাপাশি হেটে চলে দুইজনে, গল্পের কত্থক এবং গল্প নিজেই। হাটতে হাটতে, হাটতে হাটতে হঠাৎ একটা এলোকেশী নদী। কত্থক চমকায়, “সে ” নির্বিকার, যেন তার জানা ছিলো এইখানে থাকবে একটা নদী। মৃত জোছনার মতো আবছায়া যার দুই পার, যার জল আকাশের ছায়ার মতো নিরুত্তাপ। জল হেসে ওঠে ….. বলে এই জল নিয়ে কবিতা লিখোনা। এখানে তোমার একার নিমন্ত্রণ নেই। এইকবিতাটি লিখা হয়েছিল কালের আচড়ে, যাও ফিরে এ জল তোমার নয়।

“সে ” পেরিয়ে আসে নদীটি, আর কত্থক স্তব্ধতা ঢাকতে আনমনা হাত বুলায় উদাসী একতারায়।

সুর্যাস্তের দিকে লক্ষ্যস্থির হেটে যেতে যেতে, যেতে যেতে হঠাৎই এক নরবড়ে কাঠের সাকো। ঐ পারের নাম ….. বহুদুর।
বহুদূর থেকে ভেসে আসা গুনগুন শুনে যেই পা বাড়ায়, অমনি কোত্থেকে আসে এক অদৃশ্য শেকল। ছুয়োনা ছুয়োনা, বহুদূরে একলা প্রবেশ নিষিদ্ধ। জল কই, জল?

কত্থক নির্বাক দর্শক।
গল্পের চরিত্র নিজেই গল্প বলে।

সুর্য ডুববার কালে আড়াল সরে যায়, সামনে আসে পুরনো ভুবনচিল। ক্রুদ্ধ চঞ্চুতে ততোধিক শ্লেষ মিশিয়ে বলে “কিহে, ভেবেছিলে এই পথে আর ফিরতে হবেনা? ভেবেছিলে এড়াতে পেরেছ আমাকে? দেখো, পিছু ফিরে দেখ ”

“সে ” পিছু ফিরে দেখে যাকে নতুন পথ ভেবে হেটে এসেছে কত্থকের সাথে, সেই পথ তার যাযাবর জীবনের। কত্থকের মুখপানে চেয়ে অবাক, অবাক ….. গলে যাওয়া মুখোশের পিছনে তার বহুদিনের পুরনো একাকীত্ব, নিজেই নিজেকে শোনালে জীবনের গল্প।

………. আর ভুবনচিলের ডানার বিস্তারে আকাশ আড়াল, পৃথিবী আড়াল

সে ও তার কথা (নিরন্তর…)

শেষ অশ্বারোহী ও চলে গেছে বহুদূর, স্মরণের ওপারে
বহুকাল এই পথ এমনি নৈঃশব্দের চাদরে ঢাকা।
শেষ জলদস্যুটি তার জাহাজের খোল মেরামতের জন্য
সেইযে উঠলো ডাংগায়, তারপর তার রক্তে আর ডাক পাঠায়নি সমুদ্র…….শুধুমাত্র শেষ যাযাবরটি আজো বসে আছে, প্রান্তরের পথের ধারে।
তারপর একদিন ওর সাথে তার দেখা হয়ে যায় …… দুইজন চিরন্তন বেচে থাকে ধারের জীবনে । আর সে কবিতার বই খুলে বসে ……
“সময়ের ছারখার, অথচ তোমার মুখে আলো।
কালকেউটে এখুনি কামড়ালো কাকে যেন, কাকে?
এবারও কি লখিন্দর পাবে বেহুলাকে? ”

সব পাওয়া হয়ে গেলে জীবন নষ্ট।

৪১০জন ৪১০জন
0 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য