শরতের শশীমাখা সে রাতেই শ্রীপদ চাপাতি হাতে রুদ্ধশ্বাসে ছুটে বের হয়ে যায় বাড়ি থেকে। ছুটতে ছুটতে যে জায়গাটায় এসে থামে সে জায়গাটি শুনশান নীরবতা। উঁচু একটা ভিটামাটির মেঝে তিন দিকে তার তিনটি বাঁশের খাম , একটি খাম ভেঙ্গে মাটির সঙ্গে ঠেস দিয়ে পড়ে আছে কৌডুক। পাশেই অকেজো মাটির হেসেল, পুরোনো খোন্তা, পাশে একটা ভাঙ্গা মালসার অংশ বিশেষ। একটা অজানা ভয় থেকে শ্রীপদ পুরোনো খোন্তাটা হাতে নেয়। আরেকটু সামনে গেলে দেখা যায় ভাঙা চারি গো-চোনার উৎকট গন্ধ নাকে আসে, বোঝা যায় এখানে একটা বসতবাড়ি ছিলো গেরস্তের সাথে পরম মমতায় ছিলো গবাদি পশুর আবাস। যমুনা নিকটবর্তী হওয়ায় এখান থেকে মানুষজন বসতি ছেড়ে গেছে দূরে কোথাও। বসতবাড়িটা এখন বিরান। বসতবাড়িটির প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শন স্বরূপ যে প্রাচীন শ্যাঁওলা পড়া আম গাছটি দাঁড়িয়ে আছে শ্রীপদ সেখানে এসে থামে, হাঁপাতে থাকে। শ্রীপদ যেখানটিতে এসে দাঁড়ায় সেটা একটা পারিবারিক কবরস্থান। হঠাৎ তার পা ডেবে যায়। সে ভয়ে চিৎকার করে উঠে। তার ডান পায়ের উরু অবধি ঢুকে গেছে কোনো এক পুরাতন কবরের ভেতর। শ্রীপদ বহু কষ্টে ডান পা টেনে তুলে। তারপর আবার মায়ের কথা মনে হলে সে সামনে আগায়। একটু আগালেই দেখা যায় একটা নতুন কবর। কবরের বুকে গাড়া তরতাজা খেজুরের শাখা আর কাঁচা বাঁশের গন্ধ নাকে আসা মাত্রই তা নিশ্চিত হওয়া যায়। কিন্তু সদ্য অভাবে-অনটনে মুসলমান হয়ে যাওয়া বৃদ্ধ জামাল ডোমের মুসলিম সংস্কারের কথা ভেবে অনিশ্চিত হয়ে যায় শ্রীপদ।

মুসলমান হওয়ার আগে জামালের নাম ছিলো দীলিপ ডোম। ছোট জাতের কলঙ্ক ঘোঁচানোর জন্য সে ধর্মান্তরিত হয়েছিলো। ধর্মান্তরিত হবার আগে মুসলমানদের উদারতা এবং জীবিকার জন্য অন্যকোনো ব্যবস্থা করে দেবার আশ্বাস থাকলেও ধর্ম পল্টানোয় তার স্ব-জাতীয় মুসলমান ভাইগণ দিলীপ ডোমের প্রতি নিস্পৃহ হয়ে পড়ে। ডোমদের জাত থেকে বের হয়ে আবার জাতে ফেরার উদার সুযোগ রয়েছে। তাদের পঞ্চায়েত বা সমাজের কাছে ক্ষমা চেয়ে কিছু দক্ষিণা দিলেই আবার জাতের অন্তর্ভূক্ত হওয়া যায়। জামাল যে স্বজাতে ফিরে যাবার ভাবনা ভাবেনি তা নয়। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি হয়ে গেছে অনেক আগেই। সুন্নতে খতনা করার ফলে দিলীপ ডোমের নিজ জাতে ফিরে যাবার দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায়। কারণ হিন্দুর একমাত্র চিহ্ন খতনাবিহীন শিশ্ন। হায়, শিশ্ন নিয়ে জাতে জাতে কতো বিভেদ! মুসলমান অভিভাবকহীন দিলীপ ডোম হয়ে পড়ে একা। ডোম পাড়ার মানুষেরা তাকে বয়কট করায় সে ডোমপাড়া থেকে দূরে বিচ্ছিন্ন একটা জায়গায় বসবাস করতে থাকে। ফলে দীলিপ ডোম ধর্ম পাল্টে ফেলে মোহাম্মদ জামাল হলেও জীবিকার কারণে জামাল পেশাগতভাবে ডোমই থেকে যায়। সেই মুসলমান জামাল ডোম একদিন বলেছিলো, কবরের মরা পূণ্যাত্মা হলে তার কবরের উপর গেড়ে দেওয়া খেজুর গাছের শাখা তরতাজা হয়ে বড় গাছ হয়।  তবে কি কবরটি পুরনো? নানান সংশয়ের মাঝেও শ্রীপদ অভুক্ত মা চারুবালা আর ছোট বোন রাম্বার কথা ভেবে কবরটি যে নতুন সে পক্ষেই রায় দেয়।

শরৎ পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় কবরের মাটি করছে ঝক্ ঝক্। শ্রীপদ কি যেনো ভাবে তারপর খুন্তি দিয়ে নতুন কবরের মাটি খুঁড়তে থাকে। খটুড়তে খুঁড়তে লাশের সাক্ষাৎ মেলে। সে লাশের লোবানের গন্ধ এখনও যায়নি। নাভির কাছে ফুটে গিয়ে নাভিমূল, নাড়ি-ভূড়ি সব বের হয়ে গেছে লাশটার। নাড়ি-ভূড়ি আর লোবানের গন্ধ মিশ্রিত হয়ে এক বিচিত্র উৎকট গন্ধের সৃষ্টি হয়েছে। শ্রীপদের বমি পায়। শ্রীপদ কোমড় থেকে চাপাতি বের করে মাথাটা কাটতে গেলে ঝট্ করে একটা ঠাণ্ডা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায় হিম্ হিম্…। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে তার। তারপর আবার মনস্থির করে কোপ দিতে গেলে সে কার যেনো বিলাপ শুনতে পায়। নিশুতি এমন রাতে শ্রীপদের গা ঘেমে ভিজে যায়। নিজেকেও ক্ষণেকের জন্য লাশ মনে হয় তার। মায়ের কথা মনে হতেই শ্রীপদের মন আবার পাথরের মতো দৃঢ় হয়ে যায়। তারপর সে এক কোপে মাথাটা কেটে নিয়ে কবর থেকে উঠে সোজা হাঁটা দেয়। পেছনের কবর থেকে ‘হায়, হায়, হায়…’ রব ওঠে। শ্রীপদ শ্মশান কিংবা কবরস্থানের প্রচলিত সংস্কার কথা ভেবে আর পেছনে তাকায় না। শরতের পূর্ডুমায় নদীর ধার দিয়ে নরমুণ্ডু হাতে দ্রুত হেঁটে চলে। হাঁটতে হাঁটতে হাতের নরমুণ্ডুটা যেনো হঠাৎ কথা বলে ওঠে, ‘ইস খুব চোট লাগবায়। খালি মাথা কা কাটেবারে পুরা দেঠো উঠাছে লিয়াইছে হকোত!’ শ্রীপদ আনমনেই বলে ওঠে, ‘কা করবো বল। হামার তো উপায় না রাহা!’ হঠাৎ মাথার উপড় দিয়ে উড়ে যাওয়া একটা বাদুরের কুহক চিৎকারে শ্রীপদের সম্বিত ভাঙ্গে। সে ভয় পেয়ে ছোটবেলা ডোমদের ব্রাহ্মণ সতীনাথের কাছ থেকে শেখা ভূত তাড়ানোর মন্ত্র পড়তে থাকে।

ওঁ ভূ ভবঃস্ব তৎ
সর্বিতু বরেন্যং ভাগেই
দেবস্য ধীমহি
ধীয়ো য়োন
প্রচোদয়াৎ ওঁ ॥

 

(……………….চলবে)

আগের পর্বের লিংকগুলো:

১. http://www.sonelablog.com/archives/12440

২. http://www.sonelablog.com/archives/12475

৩. http://www.sonelablog.com/archives/12531

 

১৭৪জন ১৭৪জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য