সূর্যাইয়ের প্রেমে রাম্বার প্রথম পরাজয় 
জাতের বৈষম্যের কারণে ডোমদের শারদীয় দূর্গা পূজার মতো অন্যান্য ব্রাহ্মণ শ্রেণীর পূজায় অংশগ্রহণের সামাজিক অধিকার না থাকায় নিম্নবর্গের হিন্দু ডোমেরা স্বরস্বতি পূজা কিংবা শেঁতলার পূজা অথবা গণেশ পূজাকে খুব ধুমধামের সাথে পালন করে। স্বরস্বতি পূজার কয়দিন আগের এক  রাতে শ্রীপদ, রামু ও কৃষ্ণা বসে মদ্য পান করতে বসে।

শ্রীপদ: হে রামু!
রামু: হা মালিক!
শ্রীপদ: হাম বহুত চিন্তামে বানি, সামনে এগো স্বরস্বতি মাইকে পূজাবার লেকিন হাতমে এগা রূপিয়া পয়সা নেইখে। খুব চিন্তামেবানি। ওই বাঙালি লোককে কঙ্কাল দেলি লেকিন রূপিয়া পয়সা না দিয়েছ।
কৃষ্ণ: শালা বাঙাল খুব খারাপ লোক আর বহুত বেঈমান!
রামু: মালিক,রোরে যদি মন্নে কিছু না লেব তাহলে এগো বাত বোলে সাকলি?
শ্রীপদ: বোল, বোল!
রামু: মালিক! হারিস মন্ডলকা গরুয়াকে বিষ খিয়াকে মারদেব, আর চামড়াওয়া বেচিশন। কেইশনস হোগা?
শ্রীপদ: বারে বা তোর বাত শুনকে কেলে জাওয়া জুরাগা!

হঠাৎ বাবুলালের আগমন ঘটে। বাবুলাল জাতে বাগদী, নিম্নবর্ণের অচ্ছ্যুত হিন্দু। ডোমপাড়ার মানুষদের সাথে কাজকর্মের সম্পৃক্ততা হেতু সে ডোমদের মাতৃভাষা ডোমাই ভাষায় কথা বলা শিখে ফেলেছে। এখন সে ডোমপাড়ার ডোমদের সাথে কথা বলতে গেলে ডোমাই ভাষাতেই ওদের সাথে বাতচিৎ করে। বাবুলালের এই ভাষা শেখার আরেকটি গূঢ় কারণ হলো, ডোমরা তাদের ভাষায় বাঙালিদের সম্পর্কে অনেক ইঙ্গিতাত্মক গালমন্দ করে থাকে। যেমন, বাঙালি মুসলমানদের ওরা বলে ‘ঝাঙ্গোট’। বাবুলালকে যেনো ওরা এভাবে গোপনে অপমানজনক কিছু না বলতে পারে এজন্য সে রামুকে টানা এক বছর গাঁজা খাওয়ার টাকা সম্মানী হিসেবে দিয়ে তার কাছ থেকে সে ডোমাই ভাষা রপ্ত করে নিয়েছিলো। বাইরে থেকে বাবুলাল ডাকে…।

বাবুলাল: শ্রীপদ ঘরে বারো?
শ্রীপদ:  কে হকে?
বাবুলাল: হাম বাবুলাল হোলি!
শ্রীপদ: আয়ো আয়ো ঘরকে ভিতরে আয়ো!
বাবুলাল: শ্রীপদ বাঙালিয়া বাবু কঙ্কালকা রূপিয়া পাঠালেবা।
শ্রীপদ: বাহ্ বাহ্ সাংঘাতিক খবর লেকে আনবারে! দেও দেও রূপিয়া দেও!
বাবুলাল: কোন তু হামরেকে আপনে কারকে বলবো।
শ্রীপদ: কাহে তুকা বাঙালি বাবু হকে বারো? তে তো হামরিকে এইসন ছোটকা জাত হোলে রে বাবুলাল। শালা বাগদী।
বাবুলাল: খবরদার তুই তোকারি না করবে। এই খাতির তুন্নিকে এইসন ছোটকা জাতকে কাছে ভিড়ে না মাঙলি। খালি বাবু পাঠায় বায়ে এই খাতির। আচ্ছা হাম যাতিহি।
শ্রীপদ: ঠিক বায় যো যো। থুক্কু যা যা।

বাবুলাল নীচু জাতকে ঘৃণা করে। সে নিজের অবস্থানের পরিবর্তন চায়। তাই তার বিপুল আগ্রহ আর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে বটে কিন্তু ছোটজাত বলে তার কোনো চাকুরি হয়নি। তাই সে এখন কোনো এক বাঙালি বাবুর পিয়ন হিসেবে নানান কাজ করে বেড়ায়। কখনো পোস্ট অফিসে চিঠি পোস্ট, কখনো বাবুর ছেলের জন্য ঘুড়ি বানানো, কখনো বাবুর ব্যবসায়িক কাগজপত্তর এদিক সেদিক পৌঁছে দেয়া, কখোনো বাবুর মদ খেতে ইচ্ছে হলে বোতলের ব্যবস্থা করে দেওয়া ইত্যকার নানান কাজে সে ব্যবহৃত হয়। গোল ফাঁটা গ্লাসের চশমা চোখে রাগে গজগজ করতে করতে বাবুলাল হেলতে দুলতে চলে যায়।

রামু: মালিক হারিস মন্ডলকে গরু মারবকা?
শ্রীপদ: আরি মারবিই তো বিষ দেখে মার!
শ্রীপদ: লে তু দশ রূপিয়া লে, এ কৃষ্ণা তেহু লে দশ রূপিয়া।
কৃষ্ণা: সব তোহার কৃপা।
শ্রীপদ: যো যো আপন কামমে যো!
রামু: গোর লাগতিহে!

পরদিন শ্রীপদ ডোম সকালের রোদে উঠানে বসে গায়ে তেল মাখছে। নাভিতে, নাকের ফুটোয়, কানের ফুটোয় তেল দিচ্ছে। দীর্ঘদেহী একাহাড়া শরীর সূর্যাই আসে।

সূর্যাই: মালিক!
শ্রীপদ: কে হ সূর্যাই! আও ভেতরে আও।
সূর্যাই: গোর লাগতিহে!
শ্রীপদ: কাখাতির আনবারে সূর্যাই?
সূর্যাই: মালিক শুয়ার বাচ্চা দিয়াবায়!
শ্রীপদ: বাহ্ সাকাল বেলা আচ্ছা খবর লেকে আনবারে। এ রাম্বা, রাম্বা, এ রাম্বা… শুন শুন সূর্যাই কা বোলেতে…।
রাম্বা: কা বাত হ ভাইয়া?
শ্রীপদ: ও বোলেতে হামনিকে শুয়োর নাকা বাচ্চা দিয়াবায়। কারে বোলনা বোল।
রাম্বা: সাচ্চা!
সূর্যাই: হা সাচ্চা!
শ্রীপদ: রাম্বা হামার কাপড়ালাত্তা লেকে আও, হাম নেহায়েব।
রাম্বা: ঠিকবে ভাইয়া হাম লেকে আতিহি।
শ্রীপদ: কারে সূর্য খাড়াবারে কেহে কিছু বোলবে?
সূর্যাই: মালিক সামনে স্বরস্বতি পূজা বায়…।
শ্রীপদ: ও তোর তানখা দরকার। দেখ হামার হাত একবারে খালিবায় তোর মাহিনাবায় ২০ রূপিয়া কিন্তু ১৫ রূপিয়াক বেশি দিয়ানা শখব।

রাম্বা শ্রীপদের গোসলের কাপড় চোপড় নিয়ে আসতে গিয়ে হঠাৎ থামে। লুকিয়ে শ্রীপদ-সূর্যাইয়ের কথোপকথন শুনতে থাকে।

সূর্যাই: মালিক হামারা পেহনেখাতির কিছু নেইখে। এবার পূজামে লুঙ্গি কিনক বোলকে খুব আশা করেরিহা। কিন্তু হামার মাপকে লুঙ্গি বাজারমে মিলতনেইখে, এই খাতির রূপিয়া দরকার মালিক!
রাম্বা: ভাইয়া!
শ্রীপদ: রাম্বা, লে আও কাপড়লাত্তা ইহা রাখদে। এ সূর্য কা করব বোল এ গোয় বেশি রূপিয়া দিয়ানা সাখো! তে আপন কামমে চালা যাও!
সূর্যাই: গোর লাগতিহে ! হাম যাতিহে।

শ্রীপদ অন্দর মহলে চলে যায়। রাম্বা ইচ্ছে করে একটু দেরী করে। সূর্যাই চলে যাবার সময় পেছন থেকে ডাকে রাম্বা।

রাম্বা: সূর্যাই!
সূর্যাই: জ্বী, ছোটা মালকিন!
রাম্বা: তু বাঁশি কাহে না বাজাওল!?
সূর্যাই: রোরে মানা কারলেহেনা!
রাম্বা: বাঁশি বাজায়া খাতির মানা করেরিহে বদজেব মনে কোকে কিন্তু বাঁশি না শুনকেই মনে হয় মরজায়া।
সূর্যাই: জ্বী!
রাম্বা: তু হামকে জ্বী নাৎ বোলো তু বোলো। তোহার বাঁশি বাজায়ছে হাম বাঁচক, তোহারকে বাঁচয়েব। হে ল তোহার ২০ রূপিয়া আর পেহনেকে নতুন লুঙ্গি। ল ল, লনাহ স্বরস্বতী পূজাকে ইনাম দেহেলি।
সূর্যাই: জ্বী!
রাম্বা: জ্বী নাৎ বোলো, বোলে খালি রাম্বা! বোলো রাম্বা তোর খাতিরে খালি বাঁশি বাজায়েব… বোলনা বোল!
সূর্যাই: ঠিকবায় রাম্বা তোর খাতিরেই হাম বাঁশি বাজাইব, তোর খাতিরেই হাম বাঁশি বাজাইব!

(……………………………………………চলবে)

 

আগের পর্বগুলো:

১. http://www.sonelablog.com/archives/12440

২. http://www.sonelablog.com/archives/12475

৩. http://www.sonelablog.com/archives/12531

৪. http://www.sonelablog.com/archives/12788

৫. http://www.sonelablog.com/archives/12859

৬. http://www.sonelablog.com/archives/12944

৭. http://www.sonelablog.com/archives/13003

৮. http://www.sonelablog.com/archives/13126

৯. http://www.sonelablog.com/archives/13269

১০. http://www.sonelablog.com/archives/13617

১১. http://www.sonelablog.com/archives/14926

১২. http://www.sonelablog.com/archives/17125

১৩. http://www.sonelablog.com/archives/17164

১৪. http://www.sonelablog.com/archives/17210

১৫. http://www.sonelablog.com/archives/17308

১৬. http://www.sonelablog.com/archives/17837       

১৭. http://www.sonelablog.com/archives/17968

৩২৩জন ৩২৩জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ