কোনো এক রাতে শিয়ালের আক্রমণে সূর্যাইয়ের শুয়োর রাজা বনে যাওয়া 
এই শীতে সেদিন অমবস্যার রাত। দারুণ নিঃশব্দে শ্বেত কুয়াশার নিয়র  নেমেছে অদৃশ্য মিহি হিম চাদরে। নদীর জলো হাওয়ার ডানায় উড়ে আসা উত্তরের কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস চাবুক হানে শিরায় শিরায়। চামড়া, মাংস ভেদ করে শরীরের গহীন ভেতর অস্থিতলের মজ্জাকে নাড়া দিয়ে যায়-শির শির! লাউয়ের পাতার মতো নরম কানের লতিকা, উত্তুঙ্গু নাকের শীর্ষ চূড়া হয়ে থাকে অসাড় হিমায়িত লাশের মতো। সেখানে যমুনার চরে ছোট্ট দোচালা পাতার ঘর। মৃদু আলোর হারিকেন বাঁধা আছে খামের সাথে। হারিকেনের জ্বলন্ত সলতে মাঝে মাঝে কাঁপছে থর থর। নদী থেকে আসা পাষণ্ড ঠাণ্ডা হাওয়ায় নড়ছে ছাউনীর পাতা। কিঞ্চিৎ দূরে খোয়াড়ের মতো বেষ্ঠনীর মধ্যে একপাল শুয়োর গিজ গিজ করছে, অন্ধকারে তাল পাকানো দলা। শীতের সেই কৃষ্ণপক্ষ রাতেও আঁধার কালো আর শুয়োর কালোর বৈসাদৃশ্যকে আলাদা করা যায়। জোনাক জ্বলা নিঝুম কৃষ্ণ রাতের সাগরে ছোট্ট তরণীর ন্যায় আলো-আঁধারিতে টঙের উপড় ছেড়া কাঁথায় গুঁটিশুঁটি মেরে বসে তামুক বাছে সূর্যাই। এই তামুক যে গাছ থেকে আহরিত সে গাছের শরীরজুড়ে পার্থিবতাকে ভুলে থাকার অচেতন একটি টান আছে। পৃথিবীর সকল গাছ দহনে ধূয়ার উৎপত্তি কিন্তু সকল ধূয়াই পার্থিবতাকে ভুলিয়ে দেবার সক্ষমতা অর্জন করেনি। তাছাড়া ধূয়া আদতে মানুষের শরীর এবং মনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় খাবার নয়, প্রাণের খাবার। এই আদিম পারস্পরিক হত্যাযজ্ঞে জেগে থাকে সভ্যতা, বেঁচে থাকে জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক ভারসাম্য। সে কারণেই বোধকরি মানব সমাজে তামুক জনসম্মুখে সেবনের বৈধতা পায়নি। সৌখিন তামুক সেবিদের তামুক প্রস্তুত প্রক্রিয়া অতি যতনে সম্পাদিত হয়। নিজেকে ভুলিয়ে রাখা এই গাছ তামুক প্রেমিদের কারো কারো কাছে আরাধনার বস্তু। তাই তাকে তারা ভক্তি ও শ্রদ্ধায় আদরের নামে ডাকে সিদ্ধি। এই সিদ্ধি খেয়ে কি সিদ্ধি লাভ হয় তা তামুক সেবিই জানে।

সূর্যাই পরম যত্নে তামুক বাছাই করে ছোট্ট একটা ধারালো বাটালি দিয়ে একটা কাঠের টুকরার উপর রেখে কুচি কুচি করে কাটে। সে কর্তন এতটাই সূক্ষ্ম যে, মানব সভ্যতার কল্যানার্থে হলে তা নিপূণ শিল্প সুষমায় নিজের গৌরবময় অবস্থান সুদৃঢ় করে নিতো। মিহি করে তামুক কাটার পর নারিকেলের শুকনো ছোবা দিয়ে নিপূণ হাতে বুনন করে মিষ্টি। সে মিষ্টি দেখতে ক্ষুদ্র রাজমুকুট সুদৃশ্য। সে রাজমুকুট সংশ্লেষ করেই সুর্যাই হয়তো শাসন করবে, লুট করবে, ধ্বংস করবে জাগতিক সব অপ্রাপ্তি কিংবা বিস্মৃত হবে সব। মেলা থেকে কেনা কারুকার্যশোভিত মাটির কল্কিতে তামুক ভরে ছোট তেনা ভেজায় মাটির সানকিতে রাখা জলতে। তারপর ম্যাচ বাক্স থেকে একটি কাঠি জ্বালিয়ে কুপি ধরায়। কুপির শিখা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। শিখার কালো ধোয়া ক্রমশ কমে গিয়ে শিখার চিকন অগ্রভাগ সাপের  জিহ্বার মতো ঊর্ধ্বমুখী লকলক করে। কুপি শিখার শরীরজুড়ে পরিদৃশ্যমান হয় লাল, সবুজ, হলুদ, ইন্দ্রনীল ইত্যকার রঙের আভাস। শিখার নিম্নবর্তী স্থানের চারিদিকে ফোটে বৃন্ত সুদৃশ্য আগুনের স্বর্ণঝুরি ফুল। চিকন সাইকেলের স্পোকের মাথায় আটকিয়ে মিষ্টি কুপির আগুনের তীক্ষ্ম লকলকে জিহ্বায় ধরা মাত্র লাল-কমলা আগুনের মুকুট হয়ে যায়। তারপর সূর্যাই লাল-কমলা আগুনের মিষ্টি মুকুট পরিয়ে দেয় তামাক ভর্তি কল্কির মাথায়। কল্কির নীচের ক্রমশ সরু হয়ে যাওয়া প্রান্তদেশের ফুটোতে ভেজা কাপড়ের তেনা জড়িয়ে দু’হাত জোর করে কপালে ঠেকিয়ে শিব বন্দনা করে, ফু দিয়ে কুপি নিভিয়ে দেয়। তারপর দেয় টান কল্কিতে। কল্কির লাভা মুখে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে দহন, ফুটতে থাকে তামুকের বিচি। ছলকে ছলকে উঠে আগুনের ফুলকি। কল্কির মুখে দগদগে লাল আলো আর হারিকেনের হলুদ ম্রিয়মাণ আলোয় সূর্যাইকে আদিভৌতিক মনে হয়।

হঠাৎ সূর্যাই দেখতে পায় মার্বেল সুদৃশ্য দু’টি আলোক বল নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে পাশাপাশি জ্বলছে। এক পলক সমান বিরাম নিয়ে আবার জ্বলছে। সে ভাবে তামুকটা বোধহয় খাসা। বিষয়টি নিজের মনেই নিজে এড়িয়ে যায়। সে আবার কল্কি টানতে তাকে। ঘোর ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বগামী হয় কিন্তু নিশুতি চরের নিশ্চিম শূন্যতায় সূর্যাইয়ের মনে এক ধরনের ভীতি ভর করে। সে কেনো যেনো আবার নেশাতুর চোখ মেলে। মার্বেল আলোর ক্ষুদ্রাকৃতি বলগুলো হঠাৎ বেড়ে গেছে, হয়েছে নিকটবর্তী। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে সূর্যাইয়ের। শরীরে কেমন যেনো একটা হিম বয়ে যায়। সে এবার দেখায় মনোযোগী হলে শুয়োরের পালের ভেতরে কয়েক জোড়া আলোকবৃত্ত পরিদৃশ্যমান হয়। সূর্যাইয়ের বুঝতে ভুল হয় না শিয়ালের পাল আক্রমণ করেছে শুকোরের খোয়ার। সূর্যাই লাঠি হাতে হুঙ্কার দিয়ে শুয়োরের পালে মধ্যে গিয়ে গিয়ে পড়ে। এলোপাথারি লাঠি ঘুরাতে। যে শুয়োরগুলো দিনের আলোতে বেয়ারা, বেপরোয়া, কথা শোনো না, সেগুলোই মিহি গলায় আওয়াজ করতে করতে সূর্যাইয়ের পেছনে দল বেঁধে জড়ো হয়। তারা যেনো আশ্রয় প্রার্থনা করে সূর্যাইয়ের কাছে। একদিকে শ্রীপদ ডোমের ভায়াল রূপ অন্যদিকে শুয়োরদের বশ্যতায় একটা অযাচিত দায়িত্ববোধ তারে কাঁধে খড়গের মতো দুলতে থাকে। ত্রাণকর্তার মুকুট মাথায় নিয়ে সূর্যাই হয়ে ওঠে শুয়োরের দেবতা।

প্রাণান্তকর লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে সূর্যাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তথাপি বৃত্তাকার আলোক বলগুলো থমকে দাঁড়ায় না কিম্বা পশ্চাৎমুখী হয় না। ধীরে ধীরে বৃত্তাকারে সম্মুখবর্তী হতে থাকে। হিংস্র, মাংসাসি শেয়ালের দল শব্দ করে ধীরে ধীরে বৃত্ত ছোট করতে থাকে। লাঠি খেলার যাবতীয় কসরত প্রয়োগ করেও শুয়োরের দেবতা সে বৃত্ত ভাঙতে পারে না। বৃত্ত ক্রমশ লঘিষ্ঠ থেকে লঘিষ্ঠতর হতে থাকে। সবচেয়ে নিকটতর এক নরখাদক শিয়ালের মাথায় আঘাত করে সূর্যাই বৃত্ত থেকে বের হয়ে যায়। দৌড়ে গিয়ে টঙ্গের উপর উঠে সূর্যাই। দেবতা লীন হবার সাথে সাথেই শিয়াল এক মাদি শুয়োরের ঠ্যাং কামড়ে ধরে। মাদি শুয়োরটা আর্তনাদ করে ওঠে। শুয়োরের এই আর্তনাদে পলাতক সূর্যাই নিজেকে পরাজিত মনে করে। পরাজিত হবার লজ্জা তার টুটি চেপে ধরে, দম বন্ধ হয়ে আসে তার। সে আবার প্রত্যয়ী হয়। পাটাতনের নীচে রাখা দু’টি মশাল জ্বালায় সূর্যাই। মশালের লালচে আলোয় সূর্যাইয়ের চোখে মুখে সাহসের বলি রেখার প্রজ্জ্বলন দেখা যায়। সে হুঙ্কার দিয়ে শিয়ালের বৃত্তে অনুপ্রবেশ করে। জন্তুকূল আগুনের ব্যবহার জানে না, জানে না নিয়ন্ত্রণ, শুধু জানে এর প্রলয়ঙ্করী রূপ, তাই আগুনকে ওদের বড় ভয়। শিয়ালের বৃত্ত ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। শেয়ালরাও যেনো প্রতিজ্ঞা করেছে আত্মসম্মান বিকিয়ে ওরা ফিরে যাবে না। সূর্যাই দু’হাতে জ্বলন্ত মশাল নিয়ে লাঠির মতো ঘুরাতে থাকে। যেদিকে আগুনের শিখা কম থাকে সেদিক দিয়েই শিয়ালরা আক্রমণে সচেষ্ট হয়। আগুনের ঝাপটায় আবার সরে যায়। এভাবে শিয়ালের পাল আর শুয়োরের দেবতার যুদ্ধ চলতে থাকে রাত্রি দ্বি-প্রহর পর্যন্ত। সূর্যাইয়ের দেহে ইতিমধ্যে ক্লান্তি নেমেছে, মশালের উদ্ধত যৌবন হয়েছে ক্ষয়িঞ্চু। তবু থামে না সূর্যাই। অকস্মাৎ একটা বৃদ্ধ শেয়াল বৃত্ত থেকে বের হয়ে নিকটবর্তী স্থানে আকাশের দিকে মুখ করে আর্তনাদ করতে থাকে। রণে ভঙ্গ দেয়, বৃদ্ধ শিয়াল। বৃদ্ধ শেয়ালের আর্তনাদে শেয়ালের বৃত্ত থেকে সৈনিক শেয়ালরা একে একে ছত্রভঙ্গ হতে থাকে। সূর্যাই উন্মাদের মতো মশাল নৃত্য করতে থাকে। একসময় শিয়ালের দল বৃত্ত ভেঙ্গে বৃদ্ধ শিয়ালকে অনুসরণ করে দৌড়ে পালিয়ে যায় অন্ধকারে।
সূর্যাই টঙ্গের কাছে এসে হাত থেকে মশালটা ফেলে দেয়। মশাল তখন প্রজ্জ্বলন ক্ষমতারোহিত। টঙ্গের ওপড় চার হাত-পা চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ধপ করে শুয়ে পড়ে। ক্ষণিকের মধ্যেই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যায় সূর্যাই।

(……………………………………..চলবে)

আগের পর্বগুলোর লিংক:

১. http://www.sonelablog.com/archives/12440

২. http://www.sonelablog.com/archives/12475

৩. http://www.sonelablog.com/archives/12531

৪. http://www.sonelablog.com/archives/12788

৫. http://www.sonelablog.com/archives/12859

৬. http://www.sonelablog.com/archives/12944

৭. http://www.sonelablog.com/archives/13003

৮. http://www.sonelablog.com/archives/13126

৯. http://www.sonelablog.com/archives/13269

১০. http://www.sonelablog.com/archives/13617

১১. http://www.sonelablog.com/archives/14926

১২. http://www.sonelablog.com/archives/17125

১৩. http://www.sonelablog.com/archives/17164

১৪. http://www.sonelablog.com/archives/17210

১৫. http://www.sonelablog.com/archives/17308

৩৪৮জন ৩৪৮জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ