কুতুবপুর থানা, বদিউজ্জামানের ফাঁদে হরিলাল 
কুতুবপুর ইউনিয়নের বাজারটা স্বাভাবিক ভূমি স্তরের চাইতে অনেক উঁচু। পুরো বাজারজুড়ে বিস্তৃত বহু প্রাচীন বট আর পাকুড় গাছ ছেয়ে থাকে, ছায়া করে রাখে সারাবেলা। সে প্রাচীন বট আর পাকুড়’কে বৃক্ষ না বলে গাছ বললে ভাবগত ভাবের সন্নিকটবর্তী হওয়া যায়। শনি এবং মঙ্গলবার হাটবার। দুপুর গড়ালে সুর্যের সোনাঝরা আলোয় যখন ঝাঁ ঝাঁ করে চারিদিক। যখন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকতা কিংবা ধানী বরণ ধান, কৃষ্ণ-রক্তিম শুকনা মরিচ, পিয়াজ-আলুর বস্তা থেকে বুননের ক্ষয়ে উড়ে যাওয়া পাটের আশ সূর্যের অনুবীক্ষণ আলোতে ধরা পড়ে, তখন আশেপাশের দূর-দূরান্ত গ্রাম থেকে নানা বর্ণের, নানা আকারের, তাজা, শুষ্ক, বিশুষ্ক পণ্য-সামগ্রী নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসে ভীন গাঁয়ের মানুষেরা। সেই হাটের পাশেই পোস্ট অফিস। আর পোস্ট অফিসের অনতিদূরে কুতুবপুর থানা। সে থানার জাদরেল দারোগা বিশ্বজিৎ ঘোষ। যার ভয়ে এলাকার ষণ্ডা প্রকৃতির ছেলেরা মুরুব্বিদের দেখলেই আদবের সাথে বারবার সালাম ঠুকে।

থানার সেলের মধ্যে বড় দারোগা বিশ্বজিৎ এক সিঁধেল চোরকে পেটাচ্ছে। চোরের নাম নকুল। সিধেঁল চোর মাগো, বাবাগো বলে চিৎকার করছে…।

বিশ্বজিৎ: শুয়োরের বাচ্চা। বড় লোকের টাকা চুরি করেছিস ভালো, কিন্তু ধরা পড়লি ক্যান?
চোর: স্যার আমারে মাফ কইরা দেন ইহজনমে আর কোনোদিন ধরা পড়মু না।

বিশ্বজিৎ চোরটিকে বুট দিয়ে মারে এক লাত্থি। সিধেঁল চোর নকুল কঁকিয়ে উঠে।

চোর: ও মাগো বাবাগো। স্যার গো আমারে মাফ কইরা দেন।
বিশ্বজিৎ: শালার কথা শোনো। বলে কিনা ইহজনমে আর ধরা পড়বে না। তবু বলে না আর কোনোদিন চুরি করবে না। সেন্ট্রি! সেন্ট্রি!

সাঁড়াশি নিয়ে আসো শালার নখ উপড়ে ফেলবো।

চোর: স্যার আপনে আমার ধর্মের বাপ। জীবনে আর কোনোদিন চুরি করমু না। মাফ কইরা দেন স্যার।
বিশ্বজিৎ: সেন্ট্রি! সেন্ট্রি!

সেন্ট্রি এসে লম্বা এক স্যালুট ঠুকে দেয়-‘স্যার!’

বিশ্বজিৎ: কোথায় থাকো তোমরা? ডাকলে খুঁজে পাওয়া যায় না।
সেন্ট্রি: স্যার! স্যার নিখিলচন্দ্র হাইস্কুলের হেডমাস্টার সাহেব আসছেন। মাথায় চোট লেগেছে। আপনার সাথে দেখা করতে চায়।
বিশ্বজিৎ: সেকি! যাও যাও স্যারকে তাড়াতাড়ি ভেতরে নিয়ে আসো।
সেন্ট্রি: স্যার!

সেন্ট্রি আবার লম্বা স্যালুট ঠুকে প্রস্থান করে।

বিশ্বজিৎ: আমার স্কুল জীবনের স্যার আসছেন বলে বেঁচে গেলি। নইলে এতক্ষণে তোর হাত পায়ের একটা নখও থাকতো না।

সেল থেকে বের হতেই কেদারনাথ হেডমাস্টার বদিউজ্জামানকে ধরে বিশ্বজিতের কক্ষে প্রবেশ করে পেছনে হরি গুঁটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকে।

বিশ্বজিৎ: স্যার! আপনার মাথা ফাটালো কে, কার এতো বড় সাহস?
হেডস্যার: আর বলিস না বিশ্ব। সব বলতেছি এক গ্লাস জল খাবো।
বিশ্বজিৎ: অবশ্যই স্যার।

বিশ্বজিৎ হরিকে লক্ষ করে, এই তুই ডোমপাড়ায় থাকিস না? এখানে দাঁড়িয়ে কেনো? যা বাইরে যা। শালা চোর ছ্যাচ্ছর সব।

হেডস্যার: না না ও থাক। ও আমার সাক্ষী।
বিশ্বজিৎ: ও! যা ওই কোনায় গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাক যা।
বিশ্বজিৎ: সেন্ট্রি সেন্ট্রি!
সেন্ট্রি: স্যার!
বিশ্বজিৎ: স্যারের জন্য ছানার সন্দেশ আর জল নিয়ে আসো।
সেন্ট্রি: স্যার।
বিশ্বজিৎ: জ্বী স্যার এবার বলেন।
হেডস্যার: ওই ডোমপাড়ার রামদাস। বুঝলে বিশ্বজিৎ।
বিশ্বজিৎ: জ্বী স্যার আপনি বলে যান আমি ডাইরি লিখছি।
হেডস্যার: ওই ডোমপাড়ার রামদাস এর ছেলে পার্থ আমার স্কুলে পড়ে। অতিশয় বেয়াড়া আর বেদ্দপ। আমি ওকে স্কুল থেকে বের করে দিয়েছি।
বিশ্বজিৎ: তারপর।
কেদারনাথ: ওই ডোমপাড়ার রামদাস দলবল নিয়ে স্কুলে এসে আমাদের উপর হঠাৎ আক্রমণ করলো।
বিশ্বজিৎ: এই তুমি কথা বলছো কেনো? তোমাকে বলতে বলেছি?
কেদারনাথ: সরি স্যার।
বিশ্বজিৎ: বলেন স্যার।
হেডস্যার: ওরা মেরে আমার মাথাটা একেবারে ফাটিয়ে দিলোরে বিশ্ব… আহ্… উহহু রে… আহ্। এই কেদারনাথ আর হরি সাক্ষী। এই হরি আমার স্কুলে সুইপারের চাকরি করে। বেচারা আমাকে বাঁচানোর বহুত চেষ্টা করছে, পারে নাই। আমাকে বাঁচাতে গিয়ে ও উল্টা মাইর খাইছে রামদাসগো হাতে। উহু…আহ্…।
বিশ্বজিৎ: এত্তোবড় সাহস হারামজাদাদের। স্কুলে গিয়ে বিদ্রোহ করে! একজন শিক্ষকের মাথা ফাঁটিয়ে দেয়! কিরে হরি, স্যার যা বললেন সত্য?

হরি কোনো কথা বলেনা।

বিশ্ব: কিরে কথা বলছিস না কেনো?
কেদারনাথ: আপনেরে দেইখা ভয়ে বোবা হইয়া গেছে স্যার। হেঃ হেঃ হেঃ। এই বল না হেডস্যার যা বললো সত্য কিনা?
হরি: সত্য!
বিশ্বজিৎ: হরি কাগজের এই জায়গাটায় স্বাক্ষর কর।
হরি: স্যার আমি লেখাপড়া জানি না।
বিশ্বজিৎ: ও। কেদারনাথ এখানে স্বাক্ষর কর।
কেদারনাথ: জ্বী স্যার।

কেদারনাথ সাক্ষী হিসেবে কাগজে স্বাক্ষর করে। এরই মধ্যে সেন্ট্রি একটা ট্রে তে করে সন্দেশ আর এক গ্লাস জল নিয়ে হাজির হয়।

সেন্ট্রি: স্যার!
বিশ্বজিৎ: স্যার খান। সেন্ট্রি হরির কাছ থেকে এই কাগজের এইখানে একটা টিপসই নিয়ে নাও। বাকীটুকু আমি ঠিকঠাক করে নিবো। কালই সব শালাদের কোমড়ে দড়ি বেঁধে থানায় নিয়ে আসবো।

হরি টিপসই দিতে গিয়ে হু  হু করে কেঁদে উঠে।

কেদারনাথ: আরে এই হরি কাঁদছিস কেনো? সোজা-সরল মানুষ স্যার। কোনোদিন থানায় আসেনি জীবনে এই প্রথম। শুধু স্যারের অপমান সহ্য করতে না পেরে সাক্ষী দিতে থানায় এসেছে। হেঃ হেঃ হেঃ।

হেডস্যার বদিউজ্জামান গলা খাকাড়ি দেয়।

কেদারনাথ: দে টিপসইটা দিয়ে দে। ওসি স্যার তোর গায়ে হাত তোলার মজাটা টের পাওয়াইয়া দিবো রামদাসগো। দে দে টিপসইটা দে।

হরি স্বপ্নে বোবা ধরার মতো, কিংবা স্বপ্নে আকাশ থেকে পড়ে যাওয়ার মতো বিপাকে পড়ে যায়। হরি স্বজাতীর অনিষ্ট করার জন্য ডুঁকরে কাঁদে, কিন্তু সে কান্না কারো কানে পৌঁছায় না। হরি টিপসই দিয়ে দেয়।

বিশ্বজিৎ: স্যার আপনি বাড়ি চলে যান। বিশ্রাম করুন। আর যাবার সময় থানা হাসপাতাল থেকে একটা মেডিকেল সার্টিফিকেট নিয়ে যাবেন।
হেডস্যার: এটডা তো আরেক ঝামেলায় ফেললি বিশ্ব!
বিশ্বজিৎ: ঝামেলার কিছু না স্যার। মেডিকেল রিপোর্টটা লাগবে। আমি আমার বন্ধু ডাক্তার উত্তম ঘোষালকে ফোন করে দিচ্ছি। আপনি শুধু গেলেই হবে। যা যা করার ও নিজেই করে দিবে। সেন্ট্রি!
সেন্ট্রি: স্যার!
বিশ্বজিৎ: স্যারের সাথে যাও। আমার বন্ধু, থানা হাসপাতালের ডাক্তার উত্তমের কাছে স্যারকে নিয়ে যাবে। আর স্যারের মেডিকেল রির্পোটটা নিয়ে সোজা চলে থানায় আসবে।
সেন্ট্রি: স্যার!
বিশ্বজিৎ: তাহলে স্যার আপনি সেন্ট্রির সাথে যান। ও আপনার সব কাজ করে দিবে। আর কোনো চিন্তা করবেন না স্যার। আগামীকাল আমি নিজেই ফোর্স নিয়ে যাচ্ছি ওদের এ্যারেস্ট করতে। বাড়ি যান বিশ্রাম করুন।
হেডস্যার: তুই আমার জন্য অনেক করলি রে বিশ্ব, অনেক করলি।
বিশ্বজিৎ: কি যে বলেন স্যার। আপনি আমার শিক্ষক ছিলেন। আপনার জন্য এইটুকু করতে পেরে মনে খুব শান্তি পাচ্ছি স্যার।
হেডস্যার: আসি রে বিশ্ব। ভালো থাকিস।

হেডমাস্টার বদিউজ্জামান থানা থেকে বের হয়ে যান। পেছনে কেদারনাথ, ক্রন্দনরত হরি আর কন্সটেবল নায়েব আলী।

(………………………………….চলবে)

 

আগের পর্বগুলোর লিংক:

১. http://www.sonelablog.com/archives/12440

২. http://www.sonelablog.com/archives/12475

৩. http://www.sonelablog.com/archives/12531

৪. http://www.sonelablog.com/archives/12788

৫. http://www.sonelablog.com/archives/12859

৬. http://www.sonelablog.com/archives/12944

৭. http://www.sonelablog.com/archives/13003

৮. http://www.sonelablog.com/archives/13126

৯. http://www.sonelablog.com/archives/13269

২৩২জন ২৩২জন
0 Shares

২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

️️ 🍂️️ 💝 ️️ 🌟 🌺 💐 💥 🌻 🍄 🌹 💐 ⭐️ 🎉 🎊