সুশাসনের সন্ধানে

আজিজুল ইসলাম ২৯ এপ্রিল ২০১৪, মঙ্গলবার, ০৭:১৭:৪১অপরাহ্ন বিবিধ ৯ মন্তব্য

 

 

দেশ সম্পর্কে আমার ভাবনা সবসময়ই ছিল এবং আছে । অর্থাৎ কিভাবে দেশের উন্নতি হবে , সুশাসন এবং সকলক্ষেত্রে, সকলসময় কিভাবে ন্যায্যতা বজায় রাখা সম্ভব হবে , সে-চিন্তা আমার থাকে । আমি মনে করি , এদেশে দুটি দল-ই ক্ষমতায় থাকবে সবসময় । এটা  পারিবারিক  একটা ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে এই উপমহাদেশে । তাই মনে করার কারণ আছে যে , আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এই দুটি দলের মধ্যেই যেকোন একটি ক্ষমতায় থাকবে, কমপক্ষে আরও ২/১ দশক । কিন্তু যেহেতু দল দুটির কোনটি-ই সুশাসন, নায্যতা প্রতিষ্ঠার কোন চেষ্টা কোনদিন  করেনি  এবং করবেওনা, তাই  সবসময় ক্ষমতাসীন সরকারকে সকল ভালো কাজ করতে বাধ্য  করানোর  একটা প্রক্রিয়া সবসময়-ই থাকা উচিত । ক্ষমতাসীন সরকারকে বাধ্য করানো ছাড়া এগুলি  প্রতিষ্ঠা  করা  মোটেই সম্ভব হবেনা বলে আমি মনে করি । আমাদের  অনেক আন্তরিক জ্ঞানী-গুনী  ব্যাক্তিত্ব আছেন; তাঁরা বলেন ভালো, চিন্তা স্বচ্ছ এবং তাঁদের সর্বোচ্চটাই বলেন । এঁরা অধিকাংশই রাজধানীবাসী এবং একত্র হয়ে কিছু বলেন না। অবশ্য তাঁরা একত্র হয়ে আওয়াজ উঠালেও সহায়ক কোন শক্তি ছাড়া তা সরকারকে বাধ্য করানোর জন্য মোটেই যথেষ্ট হবেনা । তাই তাঁদের কথামতো কিছুই হচ্ছেনা ।

প্রতিকারকল্পে, তাই আমাদেরকে প্রেশারগ্রুপ বা অন্য কোন নামের সারাদেশব্যাপী একটি সংগঠন, যা হবে অরাজনৈতিক, গড়ে তুলতে হবে । সরকারের  অনায্যতা, দুঃশাসনের  প্রধান  প্রধান উদাহরন গুলি হোল– (ক) তাঁরা মনে করেন সংসদ সদস্যগনের কোন দোষ থাকতে পারেনা ; তাঁরা মহান এবং সব সমালোচনার উর্ধ্বে ; তাঁরা কোন দুর্নীতি করতে পারেন না ; তাঁদের দুর্নীতি সম্পর্কে কেউ কোন কথা বলা তো দূরের কথা, সন্দেহও প্রকাশ করতে পারেনা ; (খ) টেন্ডারবাজী ; (গ) চাঁদাবাজী ; (ঘ) দখলবাজী ; (ঙ) থানা দখল করে বসে থাকা এবং থানা প্রশাসনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দেওয়া, হস্তক্ষেপ করা ; চ) অর্থনীতির  প্রধান একটা উৎস , গার্মেন্ট শিল্পকে রক্ষা করার কোন পদক্ষেপ না নেয়া ; ছ) দুর্নীতিবাজ সরকারী কর্মকর্তাগনের দুর্নীতি উদ্ঘাটনে ও বিচারে অনীহা এবং প্রকারান্তরে উৎসাহিত করা ; জ) সরকারী চাকূরীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগবাজী । এ-রকম আরো অনেক ক্ষেত্র উলে¬খ করা যেতে পারে ।

এই ক্ষেত্রগুলি কিভাবে প্রতিহত করা হবে, কোন ধরনের আন্দোলনের মাধ্যমে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চলবে, তা সংগঠন বসে সিদ্ধান্ত নিবে । তবে এখানে আমরা সংগঠনটির রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করতে পারি । প্রথমেই বলতে হয়, সংগঠনটি হবে সম্পুর্ন অরাজনৈতিক ; এর কোন ক্ষমতালিপ্সুতা কেন , ক্ষমতা গ্রহণেরও কোন পদক্ষেপ থাকবেনা , নির্বাচন করে ক্ষমতায় যাওয়ার কোন লক্ষ্য থাকবেনা এটার । এই সংগঠন সরকারকে সব সময় চাপের মধ্যে রাখবে এবং সরকার কোন অনাচার শুরু করলে এই সংগঠনের কাজ হবে উক্ত অনাচার পরিশোধনে সরকারকে পরামর্শ দেয়া এবং সরকার তা না মানলে মানতে বাধ্য করানোর ব্যবস্থা  গ্রহন করা । দেশে অনাচার, অনায্যতা, দূঃশাসনের অবসান হয়ে গেলে এই সংগঠনের আর কোন কাজ থাকতে হবেনা । আবার যদি অনায্যতা, দুঃশাসনের কোন ঘটনার উদ্ভব হয়, তখন আবার এই সংগঠনের কাজ শুরু হবে । সন্দেহাতীতভাবে  গ্রহনীয়  দেশের স্বনামধন্য ব্যক্তিগন, যারা এই দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করতে চান, তাঁরা হবেন এই সংগঠনের  প্রান । তাঁরাই সর্ব বিষয়ে দেশে সংঘটিত অনাচারের, অনায্যতার ঘটনা ঘটার সময় তাৎক্ষনিকভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন কি করা উচিৎ । তদন্ত করতে হতে পারে অনেক ঘটনার । তদন্ত করে পরিশোধনের সুনিদৃষ্ট পরামর্শ সরকারকে দিতে হবে এবং সরকার তা মানতে বাধ্য থাকবে ; সরকারকে বাধ্য করানোর মত জনমত সৃষ্টি করতে হবে এবং তা করতে পারলে এটা সম্ভব হবে অর্থাৎ সরকারকে বাধ্য করা সম্ভব হবে ।

জাতীয় কমিটির শক্তিশালী একটা কাঠামো থাকবে এই সংগঠনটির । সাথে সাথে সারা দেশব্যপী এই সংগঠনের জেলা কমিটি, সম্ভব হোলে উপজেলা কমিটি-ও করা যেতে পারে । এর কারন, জেলায় কোন অন্যায় সংঘটিত হলে সে-অন্যায় পরিশোধনের ব্যাপারে জেলা কমিটির অবশ্যই প্রয়োজন হবে । অন্যায়ের ব্যাপকতা অনূযায়ী পরিশোধনের উপায় অন্বেষন করতে হবে এবং সরকারকে বাধ্য করে তা অবশ্যই পরিশোধন করতে হবে । এটা করতে না পারলে এই সংগঠন  করার  প্রয়োজন নাই । দেশে সুশাসন, নায্যতা  প্রতিষ্ঠার এই পথ ছাড়া আর কোন পথ আছে বলে মনে হয়না । সরকারকে বাধ্য করার একমাত্র পথ  জনমত সৃষ্টি করা এবং তা সম্ভব যদি সংগঠনটির সদস্য যারা হবেন, তাঁরা ভালো ভাব-মুর্তির অধিকারী হন । এজন্য দুর্নীতিগ্রস্থ, এবং এমনকি গণমানূষের কাছে দুর্নীতির ক্ষেত্রের সন্দেহজনক কোন  মানূষ এই  সংগঠনের সদস্য হতে পারবেন না । সংগঠনটির সকল কমিটি গঠনে এটা মানতে হবে । নতুবা  আন্দোলন, সংগ্রাম সফলতা পাবেনা এবং টিকবেনা এই সংগঠন ।

যখন কোন অঘটন ঘটবে, যে-রকম একটা টেন্ডারবাজীর কথা ধরা যাক । যে স্থানে টেন্ডারবাজী ঘটবে, সেখানকার  এই  সংগঠনের কমিটি  ঘটনাটার তদন্ত করবে, এবং তদন্ত  প্রতিবেদন পাঠাবে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে । কেন্দ্রীয় কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন সঠিক মনে করলে, তা পরিশোধনের জন্য, হতে পারে টেন্ডারটি বাতিলের অথবা তা বজায় রাখার এবং দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করার সুনিদ্দৃষ্ঠভাবে পরামর্শ দিবে সরকারের কাছে । কেন্দ্রীয় কমিটি যদি মনে করে, আরও তদন্ত করতে হবে, তবে তা করে একই ভাবে সুপারিশ করবে এবং এই সুপারিশ মানতে সরকারকে বাধ্য করবে । আবার যদি দেখা যায়, কোন খুন হোল এবং সরকার তা এড়িয়ে যাচ্ছে  দলীয় কাউকে বাঁচাতে বা অন্য কোন কারনে, অথবা মানবতা  লংঘিত হওযার কোন ঘটনা ঘটলো । এবিষয়ে  কেন্দ্রীয় কমিটির সংশ্লিষ্ট উপ-কমিটি (যে কমিটিতে থাকবেন এ-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগন) পুংখানপুংখভাবে তদন্ত করে সুপারিশ সরকারকে দিবে এবং সরকারকে তা মানতে বাধ্য করবে ।

শেয়ার বাজার কেলেংকারীর সময় একটা তদন্ত কমিটি হয়েছিলো এবং কমিটি কিছু সুপারিশ করেছিলো , যা মানা হয়নি অর্থাৎ সোজাসাপ্টাভাবে বললে, সরকার এ-কেলেংকারীতে জড়িত তার  দলীয়  লোকদের সাজা না দেওয়ার জন্য সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি । গত কিছুদিনের মধ্যে   ব্যাংক-সংক্রান্ত  যে কেলেংকারীগুলি হোল, তাতেও সরকারের দলীয় লোকজন জড়িত থাকার কারনে সরকার সামান্য কিছু  লোক-দেখানো  তদন্ত করলেও এ-গুলির টাকা উদ্ধারের কোন ব্যাবস্থা-ই  গ্রহন করেনি । দলীয় লোকজন জড়িত না থাকলে টাকাও উদ্ধার হোত এবং অপরাধীগণও সাজা পেত । আওয়ামী লীগ বা বিএনপি  যে দল-ই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, দলীয় লোকজনের প্রতি এ-রকম সহযোগিতা এবং বিচারহীনতা, প্রকারান্তরে,  দেশ শাসনে যা চরম অদক্ষতা, অনায্যতা, এগুলি আমরা মানবো আর কতোকাল ?

বিএনপি আমলেও এ-রকম অনেক অনায্যতা, অদক্ষতা হয়েছিলো । দশ  ট্রাক অস্ত্র খালাস করা হয়েছিলো, লোক-দেখানো তদন্ত করা হয়েছিলো । দলীয় লোকজনদেরকে অবৈধ অনেক, অনেক সুযোগ তখনও দেয়া হয়েছিলো, একুশে  আগস্ট  সৃষ্টি  করা হয়েছিলো, আওয়ামী লীগ নেতাদেরকে নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়েছিলো, টেন্ডারবাজী  করা  হয়েছিলো ভূরি ভূরি । তখনও থানা ঘিরে বসে থাকতো বিএনপি দলীয় লোকজন এবং তাদের কথামত , এক কথায়  দলীয় লোকজন-ই তখনও থানা প্রশাসন চালাতো । এ-আমলের মত তখনও দুর্নীতি, লুটপাট সব-ই চলেছে । সে-আমলে মানূষ বিদ্যুৎ পায়নি, অন্ধকারে থেকেছে । এখন অন্ধকার কিছুটা কেটেছে, তবে রেন্টাল-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানে ও  বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিস্তর দুর্নীতি হয়েছে । প্রবাসীগন প্রেরিত বৈদেশিক মূদ্রা না আসলে এবং সর্বংসহা ধরীত্রির মতো গার্মেন্ট  শ্রমিকরা সব কিছু  সয়ে  শ্রম বিক্রি না করলে দেশ কোন খাদে গিয়ে পড়ত তা বলা সম্ভব নয় । পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে, কেবলমাত্র ২/১ জন মানূষের দূর্নীতির  আকাঙ্ক্ষার জন্য  সেতুটা হোলনা বৈদেশিক অর্থায়নে । অথচ শক্তিশালী প্রেশারগ্রুপ বা অন্য কোন নামীয় সংগঠন সারাদেশব্যপী সংগঠিতভাবে বিস্তৃত থাকলে সরকার তখন ঐ ২/১ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হোত এবং বৈদেশিক সহায়তায় সেতুও হোত । (আগামী পর্বে সমাপ্ত)

0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ