সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

সুর ও সঙ্গীত

রিতু জাহান ৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, রবিবার, ০৮:৩৩:১৭পূর্বাহ্ন সঙ্গীত ৫ মন্তব্য

প্রবন্ধঃ সুর ও সঙ্গীত

সুর ও সুসংবদ্ধ ধ্বনির সমন্বয়ে সৃষ্ট শ্রবণযোগ্য কলাই সঙ্গীত।

সঙ্গীত অতীত বা বর্তমান সব সংস্কৃতিতেই পাওয়া যায়, যদিও সময় ও স্থানভেদে এর পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। বিশ্বের সকল জনগণের মধ্যে, এমনকি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া উপজাতি গোষ্ঠীগুলোরও এক ধরনের সঙ্গীত আছে। সঙ্গীত সব সময় সকলের মধ্যেই জাগরূক ছিলো ও আছে। মানুষ যখন খাদ্যে ও বাসস্থানের জন্য পৃথিবীব্যাপী এক যায়গা থেকে অন্য যায়গা ছড়িয়ে পড়তো, তখনও তাদের মধ্যে সঙ্গীতের সুর ছিলো। শিশুর হাসি, নদীর বয়ে যাওয়ার মিষ্টি ছন্দ, সকাল-বিকালে প্রাণখুলে গল্প করতে থাকা পাখ-পাখালির কিচির-মিচির, পাহাড়ের বুকে ঝর্নার কলরব, শিশিরের টুপটাপ, বৃষ্টির রিমঝিম, পৃথিবীর কোথায় নেই সুর? মানব ইতিহাসের পরতে পরতে আদর মেখে স্রষ্টা সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছেন সুরকে। জন্মলগ্ন থেকেই তাই নিত্য-নতুন সুরের প্রতি এক স্বাভাবিক টান রয়েছে মানুষের। শিশু থেকে বুড়ো- কেউই সুরের এই মায়া ভরা রহস্যময় হাতছানির বাইরে নেই। সৃষ্টির কাল থেকে এখনো মানুষের দেহ- মনের সাথে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে জুড়ে আছে সুর। বিভিন্নভাবে মানবদেহকে প্রভাবিত করে সুর। শুধু মানবদেহকে কেনো, সুর প্রভাবিত করে পশুপাখিকেও। মোট কথা সুর প্রভাবিত করে পুরো প্রকৃতিকেই।

তাই তো কথিত আছে, তানসেনের সুরের মূর্ছনায় আকাশ থেকে বৃষ্টি নেমে এসে ভিজিয়ে দিত শাহী দরবার। দিনের যেকোনও সময়ে মনখারাপ বা একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দিতে ওষুধের মত কাজ করে সুরের আবহ। সুরের ব্যবহার করে বহুদিন ধরেই রোগীদের চিকিৎসা করার পদ্ধতির চল হয়েছে। যদিও এর সাফল্যের মাত্রা কম। সাফল্যের মাত্রা কম হলেও, অসুস্থতার কঠিন সে মুহূর্তগুলোতে মানুষ সুরের এক অন্য স্বর্গীয় ধারা অনুভব করতে পারে।

এর কারন হলো সঙ্গীতের সুর ও কথামালা মানুষের মস্তিষ্কে এমন এক ধরনের হরমোনের নিঃস্বরণ ঘটায় যা কিছু সময় মানুষের অন্য সকল অনুভূতির তীব্রতা কমিয়ে দিতে পারে।

এবং এটা সত্য। মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে। মানবদেহের বেশকিছু অঙ্গকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে সুর। সুর মানব মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্থানকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। এক মিনিটের একটা ছোট্ট সুর মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণকে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম। যার প্রভাব পড়ে মানুষের মুখভঙ্গীতে। সুরের সাথে সম্পর্কিত দুই ধরনের অনুভূতি রয়েছে।

সেগুলো হল- ১.গৃহীত অনুভূতি

২.অনুভব করা অনুভূতি ( লাইফহ্যাকার )। এর অর্থ, মাঝে মাঝেই কোন সুরের অনুভূতির সাথে পরিচিত না হয়েই আমরা সেটার কষ্ট বা আনন্দকে অনুভব করতে পারি।

সুর বলতে কিছু মনছোঁয়া শব্দের এক চমৎকার গাঁথামালা। আর তাই সুর শরীরের নানারকম ব্যাথা দুর করতে সাহায্য করে। করে রোগ প্রতিরোধও। অনেকটা টিকা হিসেবে কাজ করে তখন এটি। সুরের চিকিৎসা নামে আলাদা এক ধরনের চিকিৎসাও রয়েছে। সুর মানুষের মানসিক চিন্তা ও শারিরীক কষ্টের অনুভূতি দুটোকেই কমিয়ে দেয়। লন্ডনের এক গবেষনা অনুসারে সুর নানারকম ব্যাথা, যেমন- অস্টিওআর্থ্রিটিস এবং রিহিউমেটোয়েড আর্থ্রিটিসের যন্ত্রণা ২১ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে। কিছু হাসপাতালে জ্ঞাননাশক অষুধের পরিবর্তে ব্যাথা কমাতে ব্যবহার করা হয় সুরকে। বিশেষত, শিশু জন্মদানের সময়ে মাকে শোনানো হয় নানা রকমের সুর।

প্রিয় কিছু সুর ও গানের কথা মানুষের মস্তিষ্কের চতুর্থ ধাপে এন্ডোরফিন হরমোন উৎপাদনে সাহায্য করে এবং এর ফলে মানসিক পরিবর্তন ঘটায় এবং তাৎক্ষনিক ব্যাথা-বেদনা থেকে দূরে থাকতে পারে। নিঃশ্বাস নেওয়ার দ্রুততা কমিয়ে ও হৃদপিণ্ডেকে সহজ অবস্থায় নিয়ে গিয়ে সুর ব্যাথা কমতে সাহায্য করে। হঠাৎ মানসিক গঠন পরিবর্তন ঘটাতে পারে সুর।

এছাড়াও প্রতিদিন সকালের খানিকটা সময়ে শোনা সামান্য একটু সুর অনেকটা সাহায্য করে উচ্চরক্তচাপ কমাতে। নিও অরলিন্সে অনুষ্ঠিত আমেরিকান সোসাইটির অব হাইপারটেনশনের এক সম্মেলনে জানানো হয় যে প্রতিদিন সকালে শোনা ৩০ মিনিটের রাগা বা ক্ল্যাসিকাল সুর উচ্চরক্তচাপ কমিয়ে দেয় খুব ভালোভাবেই। এছাড়াও মাইগ্রেন ও স্ট্রোক পরবর্তী আরোগ্যের জন্যেও সুর বেশ উপকারী।

পাকিস্তানের ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা সঙ্গীতকে থেরাপি হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন। ক্যানসারের গবেষণা ও চিকিৎসার জন্য এমনিতেই করাচির ইন্দুস হাসপাতালের বেশ সুনাম রয়েছে। পাকিস্তানে তারাই প্রথম ক্যানসার চিকিৎসায় রোগীদের মানসিক সমর্থন দিতে ও মনোবল চাঙা করতে সঙ্গীত আর শিল্পকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

গানের প্রতি মানুষের টান চিরন্তন। পপ, র‌্যাপ পশ্চিমা সঙ্গীত কিংবা ধ্রুপদী গান বা ধর্মীয়সঙ্গীত যাই  হোক না কেন, আকর্ষণ থেকেই মানুষের নিয়মিত গান শোনা। গান কখনো হতে পারে স্রেফ বিনোদন কখনো তা হতে পারে মনের ক্লান্তি দূর করার মহৌষধ। শারীরিক সুস্থতার মানসিক প্রশান্তিতে কত কিছুই না মানুষ করে। কত অর্থই না খরচ করে। অথচ ভালোলাগার কিছু গান মানুষকে দিতে পারে সেই টনিক। শুধু তাই নয়, ক্যানসার রোগীদের জন্য এখন সঙ্গীতও অপরিহার্য। এমন কথাই বলছেন করাচীর ইন্দুস হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক সাইকো সোম্যার অনকোলজি বিভাগের প্রধান ইরাম গাজী।

ডা. ইরাম গাজী বলেন, ‘ক্যানসার আক্রান্ত শিশু বা বয়স্ক ব্যক্তিদের গান শুনিয়ে ও সৃজনশীল কোনো কিছু দেখিয়ে তাদের যন্ত্রণা  স্নায়ুরোগ বা নিরাময় অযোগ্য কোনো সমস্যা থেকে কিছুটা মুক্তি দিতে সহায়তা করতে পারে।

তিনি ঔষধের বিকল্প পদ্ধতির ওপর ডিপ্লোমা করেছেন। এটাই তার এখন প্রধান কাজের ক্ষেত্রে। তিনি বলেন, ‘কঠিন রোগের কারণে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া রোগীদের গান শোনালে বা অন্য কোনো সৃজনশীল কিছু দেখালে সত্যি সত্যিই তাদের ভেতরে আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়।

শিশুদের নিয়ে সাধারণ কিছু ভুল ধারণাও ভেঙ্গে দিয়েছেন ডা. ইরাম গাজী। তিনি বলেন, ‘অনেকের ধারণা যে বড়দের চেয়ে শিশুরা সহজেই মনের কথা দুঃখ-কষ্টের কথা প্রকাশ করে। এটা ভুল ধারণা। এ ব্যাপারে শিশুদের যতটা অবোধ ভাবা হয় আসলে তা নয়। বরং বড়রা সহজেই দুঃখ-কষ্টের কথা পরিবারের কথা চিন্তা করে প্রকাশ করে দেয়। তাদের  এই কাজটাকে আরো সহজ করে দেয় মিউজিক খেরাপি বা সঙ্গীত ও শিল্পকলার চিকিৎসা কৌশল । এটা যখন ধরে ঔষধ বা অন্য কোনো চিকিৎসার চেয়ে বেশ ভালো কাজে দেয়।’

বিভিন্ন দেশে এখন অনেক সার্জন সঙ্গীত শুনে শুনে রোগীর অপারেশন করেন। ডা. কলরাড বলেন, ‘তিনি যখন সঙ্গীত শোনেন তখন তার কাজ অনেক ভালো হয়।’

ডা. কনরাড তার নিজের গবেষণা ও অন্যদের গবেষণা উল্লেখ করে বলেন, ‘সঙ্গীত রোগীদের জন্য ভালো দেহ মন শিথিল করে রক্তচাপ হৃদকম্পন হার ট্রেস হরমোনের মান, ব্যথা, ব্যথার ঔষধের চাহিদা সবই হ্রাস করে।’

সঙ্গীত নিরাময়ী কিন্তু তা করে কীভাবে? এর যে শারীরবৃত্তিক পথ তা অস্পষ্ট। এর উত্তরে বলতে চেয়েছেন ডা. কনরাড সঙ্গীতের নিরাময় ও প্রশান্তিদায়ক ফলাফলের পিছনে রয়েছে গ্রোথ হরমোনের উদ্দীপনা।

এক্ষেত্রে দুইটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে: বহু আগে পেরুর আন্দিজ পর্বতমালা আরোহণের সময় বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটে। পর্বতারোহী জো সিম্পসন ছিলেন সেই অভিযাত্রীদের একজন।

দুর্ঘটনায় তার সঙ্গীরা মারা গেলেও, ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। এবং নিজেকে জীবিত রাখতে তাকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে।

ভাঙা পা নিয়ে ভীষণ ঠাণ্ডার মধ্যে তাকে কেউ উদ্ধার করবে, এমন সম্ভাবনা ছিল ক্ষীণ। নিরুপায় আর হতাশ হয়ে পড়েছিলেন মিস্টার সিম্পসন।

এক পর্যায়ে তার চেতনা ওলট পালট কাজ করতে থাকে। কখনও তিনি সচেতন ছিলেন, কখনো বা অচেতন।

সে সময় তার মাথায় ১৯৭০ দশকের একটা বিরক্তিকর সুর ঘুরপাক খেতে থাকে। সেটা হল জার্মান ব্যান্ড বনি এমের গান, “ব্রাউন গার্ল ইন রিং” গানটি। তবে এ কারণেই কষ্ট তুলনামূলক কম হয়েছিল বলে তার ধারণা।

মিস্টার সিম্পসন সেইদিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন,

“এটা মাথার ভেতরে চলতেই থাকে। কয়েক ঘণ্টা ধরে মাথার ভেতর বাজছিল গানটি। আমি খুব বিরক্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমি ভাবছিলাম, ধুচ্ছাই শেষমেশ কিনা বনি এমের গান শুনে মরতে হবে!’”

কিন্তু মিস্টার সিম্পসন সেই যাত্রায় বেঁচে ফিরেছেন।

সেক্ষেত্রে অনেকটা সাহায্য করেছে তার এই কানের পোকা। কেননা এই বিরক্তিকর পোকাই তাকে জেগে থাকতে, এক কথায় বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছে।

আর একটি উদাহরণ যেমনঃ ভারতের কন্নড় রাগ দরবারির সুর কোমা থেকে ফিরিয়ে আনল সঙ্গীতা দাসকে। কলকাতার এসএসকে এম হাসপাতালে এই চমত্‍কার ঘটনাটি ঘটে।

গত বছরের অক্টোবরের ২৮ তারিখ থেকেই ডেঙ্গুতে ভুগছিলেন সঙ্গীতা। সাংঘাতিক জ্বরের মধ্যে অক্টোবরের ৩০ তারিখে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় নৈহাটির সরকারি হাসপাতালে। তাঁর বাবা শিবপ্রসাদ দাস নৈহাটির সরকারি হাসপাতালেরই অ্যাম্বুলেন্স চালক। কিন্তু সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে নভেম্বরের ৩ তারিখে তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে পাঠানো হয় তাঁকে। ডেঙ্গু নেক্রোটিক হেমোরেজিক মেনিনগো এনকেফেলাইটিসের রোগী সঙ্গীতার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে হতে ক্রমশ তিনি কোমায় চলে যান।

এসএসকেএম হাসপাতালের কার্ডিওভাসকুলার অ্যানাস্থেসিস্ট ও একজন ভায়োলিন বাদক সন্দীপ কুমার করের পরামর্শে নভেম্বরের ১৫ তারিখ থেকে সঙ্গীতাকে মিউজিক থেরাপি দেওয়া শুরু হয় বলে জানিয়েছেন অ্যানাস্থেসিওলজির সহযোগী অধ্যাপক রজত চৌধুরী। সঙ্গীতার ক্ষেত্রে বিখ্যাত ভায়োলিন বাদক এন রজমের বাজানো সুর ব্যবহার করা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় দিনে ১ বার ও পরে দিনে ৩ বার সঙ্গীতাকে এই সুর শোনানো হয়। এই থেরাপি চলাকালীন ডাক্তারেরা তাঁর অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিকে সচল করার প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন।

সুরের এ মূর্ছনায় এক পর্যায়ে প্রথমে সঙ্গীতার চোখে জল আসতে দেখা যায়। বোঝা যায় থেরাপিতে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। ক্রমশ সঙ্গীতা জড়িয়ে জড়িয়ে কিছু অস্পষ্ট শব্দ উচ্চারণ করতে থাকেন। পরের ৭ দিনে তিনি তাঁর মায়ের নাম ধরে ডাকেন। এইভাবে ধীরে ধীরে নিজের কথা বলার শক্তি ফিরে পান তিনি। কোমা থেকে বেরিয়ে আসেন।

সঙ্গীতার কাকা বিজয় দাস জানিয়েছেন যে তাঁরা ভাবতেই পারেননি আর কোনওদিন সঙ্গীতাকে ফিরে পাবেন তাঁরা। কিন্তু মিউজিক থেরাপির কল্যাণে ও ডাক্তারদের সহায়তায় কোমা থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পেরেছেন সঙ্গীতা। সুরের এই অসামান্য শক্তির কাছে কৃতজ্ঞ তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা।

প্রত্যেকের জীবনে প্রায়শই এমনটা হয় যে, তারা হয়তো কোন গান শুনেছেন, আর সারাদিন সেটা তাদের কানে বাজছে। সারাদিন নিজের অজান্তেই আপনি সেই গানটা গুনগুন করে গাইতেই থাকেন। সেটা আর মগজ থেকে বেরোতে চায় না।

এমন ঘটনা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রেই হয়। কোন একটি গান হয়তো শোনার সাথে সাথেই সেটা স্মৃতিতে গেঁথে যায়।

এই গানের ধুন বা সুর এতোটাই আকর্ষণীয় যে কখন ওই গানটা মুখে ফুটে বেরিয়ে আসে সেটা আপনি খেয়ালও করেন না।

কয়েক-ঘণ্টা অবধি, আবার অনেকের ক্ষেত্রে সারাদিন জুড়ে ওই গানটি মাথায় বাজতেই থাকে। বারবার ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেও যেন লাভ হয় না।

এর মানে, আপনি কানের পোকার শিকার হয়েছেন। এই পোকা বলতে কোন পরজীবী কে বোঝায়-নি, বরং ইঙ্গিত করেছে সেইসব আকর্ষণীয় গান বা সুরকে, যেগুলো একবার শুনতেই মগজে গেঁথে যায়।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিষয়ক মনরোগ বিশেষজ্ঞ লরেন স্টুয়ার্ট এমনই কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।

যেসব গানের মেলোডি বা সুরের গঠন খুব সহজ-সরল, অর্থাৎ যে গানগুলোর তাল-লয় অথবা সুরের উত্থান-পতনের একটি সাধারণ প্যাটার্ন থাকে, সেগুলো আমাদের মস্তিষ্ক সহজেই গেঁথে নেয়।

এই বিষয়টিকে সংগীতের ভাষায় বলা হয় “মেলোডিক আর্কস”। অর্থাৎ একটা সুরের বৃত্তে বাঁধা পড়া। যেমন শিশুরা খুব সহজে সহজ ম্যালোডি বা সুর মুখস্ত করে ফেলতে পারে এক দুইবার শুনেই।

সঙ্গীতের শুরু এবং পর্যায়ক্রমে সিনেমা যুগঃ

সম্ভবত প্রথম সঙ্গীতের অস্তিত্ব অন্তত ৫৫,০০০ বছর আগে আবিষ্কৃত হয়েছিল আফ্রিকায়। তখন থেকেই নানা বিবর্তন ঘটতে ঘটতে এটা একটা মৌলিক নিয়োজক হয়ে ক্রমেই মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

যে কোনো সংস্কৃতির সংগীত সমাজের অন্যান্য সংস্কৃতির দৃষ্টিভঙ্গি, যেমন, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সংস্থা ও অভিজ্ঞতা, আবহাওয়া, এবং কারিগরির ব্যবহার, এই সমস্ত বিষয়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়। সংগীত যে আবেগ ও ধারণা পরিব্যক্ত করে, যে পরিস্থিতিগুলোতে সংগীত গাওয়া এবং শোনা হয়, এবং যে ভঙ্গিমায় সংগীতশিল্পী ও সংগীতকাররা উপস্থাপন করেন, তার সবটাই অঞ্চল এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারতম্য ঘটায়।

ভারতবর্ষের মূলকেন্দ্র বলতে উত্তর প্রদেশকেই বোঝায়। উত্তর প্রদেশের ও আশেপাশের আর্যদের প্রথম বসতি গড়তে দেখা যায়। আর্যরা হিন্দু ধর্মের মূলত প্রধান অনুসারী। হিন্দু ধর্মে দেবদেবীর সন্তুষ্টির জন্য নৃত্য কলার প্রচলন হয় যা সাধারণত অন্য ধর্মে পাওয়া যায় না। তাদের অন্যতম প্রধান ধর্ম গ্রন্থ বেদ শ্লোক আকারে প্রকাশিত হয়। বৈদিক যুগে যদিও লেখার প্রচলন ছিলো না।

কিন্তু মানুষের মুখে মুখে বংশ পরম্পরায় চর্চা ছিলো। যা সুরের মাধ্যমে প্রকাশ পেতো। সেই ধারাবাহিকতায় এই উপমহাদেশের সিনেমাতে গানের প্রচলন শুরু হয় বিভিন্ন কাহিনী অবলম্বনে।

হিন্দু ধর্মে ধর্মীয় ভাবেই কীর্তন আছে, যা তারা সুরের আকারেই দেবদেবীর নাম কীর্তন করে। হিন্দু ধর্মমতে দেবদেবীরাও যজ্ঞ ও মহাযজ্ঞ করতো। সেই মহাযজ্ঞেও দেবদেবীরা সুরের আকারে তাদের ভাব প্রকাশ করতো। এভাবে এই উপমহাদেশে লোকদের মদ্যে মজ্জ্বাগতভাবে সঙ্গীত বিষয়টি গেঁথে যায়। বর্তমান ভাষায় যা অনেকটা জিনগতভাবে চলে আসছে। বাইবেলে যা আমরা একেবারেই দেখি না। আর তাই আমরা সঙ্গীতটাকে পশ্চিমাদের চেয়ে সিনেমাতে প্রাধান্য দেই বেশি।

প্রাচীনযুগ থেকে এই আধুনিক যুগ পর্যন্ত জীনগতভাবে কেমন করে এখনো সঙ্গীত আমাদের সবখানে বিরাজ করে আছে তার একটা সংক্ষিপ্ত আলোচনা প্রয়োজন। ভারত উপমহাদেশের সঙ্গীত সাধারণত কাহিনীর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

আমরা জানি, বাংলা ভাষা ও সঙ্গীতের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ। ১৯০৭ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজগ্রন্থাগার থেকে এর পুথিআবিষ্কার করেন। আবিষ্কৃত পুথিটির নাম চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়। এটি মূলত প্রাপ্ত ৪৭টি গানের সংকলন। খ্রিষ্টীয় নবম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে গানগুলি রচিত। চর্যাগীতির পর বিকশিত হয়েছে রাজা মানিকচন্দ্র, রাণী ময়নামতী এবং পুত্র গোপীচন্দ্রকে নিয়ে। গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস গ্রহণ এই ধারার মুখ্য কাহিনী, যা মানিকচন্দ্র রাজার গান, ময়নামতীর গান, গোপীচন্দ্রের গান প্রভৃতি নামে পরিচিত।

এরপর সঙ্গীতশৈলীর অন্যতম নিদর্শন জয়দেবের গীতগোবিন্দ। জয়দেবের গীতগোবিন্দম দ্বাদশ শতাব্দীর।

বাংলা সঙ্গীতকলার উৎকৃষ্ট নিদর্শন বড়ু চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। গ্রন্থটি কাব্যসঙ্গীত এবং গীতিনাট্য উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে নৃত্যেরও পরিকল্পনা ছিল বলে মনে করা হয়। দুটি গ্রাম্য গোপ বালক-বালিকার প্রণয়কাহিনী অবলম্বনে এটি রচিত। এতে গ্রামের পথঘাট, বনাঞ্চল এবং গ্রাম্যজীবনের এক স্বাভাবিক চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনটি চরিত্র রাধা, কৃষ্ণ ও বড়াইর ছন্দোবদ্ধ উক্তি-প্রত্যুক্তির মধ্য দিয়ে কাহিনীটি বর্ণিত হয়েছে। অনেকের ধারণা, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের মধ্যে বাংলার ঝুমুর গান ও লোকযাত্রার বীজ নিহিত।

বাংলা সঙ্গীতের ক্ষেত্রে বিদ্যাপতির দান অপরিসীম। বৈষ্ণবপদাবলি তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা। তাঁর পদাবলিতে যেমন আছে ভক্তিরস, তেমনি আছে মানবিক প্রেম। পরবর্তীকালের গীতিকবিরা তাঁকেই অনুসরণ করেছেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাপতির ভক্ত ছিলেন। তিনি বিদ্যাপতির অনেক পদ সুরসংযোগে গাইতেন। বিদ্যাপতি রচিত ‘ভরা বাদর মাহ বাদর’ পদটিতে রবীন্দ্রনাথ সুরারোপ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ গোবিন্দ দাসেরও ভক্ত ছিলেন। গোবিন্দ দাস রচিত ‘সুন্দরী রাধে আওয়ে বনি’ পদটিতে রবীন্দ্রনাথ সুরারোপ করে ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলীতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। বিদ্যাপতির পদগুলি শব্দমাধুর্য ও সুরলালিত্যে অপূর্ব।

সামগ্রিকভাবে বাংলার ধর্ম, সমাজ, সংস্কার ও মননে বৈষ্ণবপদাবলির প্রভাব অপরিসীম। এর প্রভাবে বাঙালির মানবতাবোধ উজ্জীবিত হয়। বৈষ্ণব মতবাদের প্রভাবে  সহজিয়া ও বাউল মতবাদ পরিপুষ্ট হয়। প্রেমানুভূতি এবং ভাবের সূক্ষ্ম ও বিচিত্র অভিব্যক্তির কারণে বৈষ্ণবপদাবলি বিশ্বসাহিত্যের মর্যাদা লাভ করে। মূলত রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়লীলাকে অবলম্বন করেই বৈষ্ণবপদাবলির উদ্ভব। এর শুরু প্রাকচৈতন্য যুগে। চৈতন্যদেবের অনুপ্রেরণায় অসংখ্য বৈষ্ণবকবি রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়ভিত্তিক পদ রচনা করেন এবং তা সারা বাংলায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ পদগুলি কীর্তন নামেও খ্যাত। বাংলা সঙ্গীতজগতের এক অমূল্য সম্পদ এই কীর্তন গান। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়: ‘কীর্তনে আমরা যে আনন্দ পাই সেতো অবিমিশ্র সঙ্গীতের আনন্দ নয়, তার সঙ্গে কাব্যরসের আনন্দ একাত্ম হয়ে মিলিত।’

বাংলাদেশে যাত্রাগানের উদ্ভব হয় ষোড়শ শতকে। ‘যাত্রা‘ শব্দটির প্রকৃত অর্থ পূজা-পার্বণ ও বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে শোভাযাত্রা এবং বিশেষ এক ধরনের মন্ডপে সমবেত হয়ে দেবমাহাত্ম্যমূলক সঙ্গীত, নৃত্য ও নাট্য প্রদর্শন করা। প্রাচীনকালে যাত্রায় কথোপকথন থাকলেও গানের অংশ বেশি থাকতো বলে একে ‘যাত্রাগান’ বলা হতো। জয়দেবের গীতগোবিন্দম্ল  অনেকটা যাত্রাগানের আকারেই রচিত, কেননা এর পদগুলি এমনভাবে সাজানো যে, সেগুলি অভিনয়ের মাধ্যমে গীত হলে যাত্রাগানে রূপ নেয়।

ইংরেজ রাজত্বের সময় থেকেই দেবমাহাত্ম্যের পরিবর্তে সামাজিক কাহিনী নিয়ে যাত্রাপালা রচিত ও অভিনীত হতে শুরু করে। ভারতচন্দ্রের চন্ডীযাত্রা ও বিদ্যাসুন্দর, মনসার ভাসান ইত্যাদি এই শ্রেণীর উল্লেখযোগ্য যাত্রাপালা। মনসার ভাসান  মনসামঙ্গল ভেঙ্গে রচিত। সর্প ভয় নিবারণার্থে এই যাত্রাপালা অভিনীত হতো। আর যাত্রাপালা ধীরে ধীরে আধুনিকায়নে রূপ নেয় আধুনিক বাংলা সিনেমা।

সুরের আবেদন সর্বজনীন হলেও বাংলা ও উর্দু ও হিন্দি গানের ক্ষেত্রে কথার গুরুত্ব অপরিসীম।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একাধারে গীতিকার ও সুরকার। তাই তাঁর গানে কথা ও সুর মিলেমিশে এক সুসংহত রূপ নিয়েছে। সমকালীন ও পরবর্তীকালীন গীতিকবিরা এই আদর্শ অনুসরণ করলেও এই পঞ্চ গীতিকারদের গান স্বতন্ত্র মহিমায় প্রোজ্জ্বল। শ্রোতার বুঝতে অসুবিধা হয় না কোনটি কার গান। এই পঞ্চ গীতিকার বাংলাসঙ্গীতে রাগসঙ্গীত, লোকসঙ্গীত ও পাশ্চাত্য সঙ্গীতের মিলন ঘটিয়েছেন।

বাংলা সঙ্গীতের ক্ষেত্রে আর কবি নজরুলের অন্যতম প্রধান অবদান উৎকৃষ্ট মানের গজল। নর-নারীর প্রণয়ভিত্তিক গজল রচনা করে তিনি আধুনিক বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করেছেন। অতুলপ্রসাদও বাংলা গজলের রূপ নির্মাণ করেছেন, কিন্তু তার সার্থক রূপকার নজরুল। বাংলা গানে প্রেম, প্রকৃতি, চাঁদ, ফুল, মালা, সমাধি ইত্যাদির অনুষঙ্গ নজরুলই প্রথম প্রয়োগ করেন, যা পরবর্তী গীতিকারগণ অনুসরণ করেছেন এবং এখনও তারই অনুরণন লক্ষ করা যায় বর্তমান আধুনিক বাংলা গানে। নজরুল কর্তৃক বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর স্বচ্ছন্দ ব্যবহার, লোকসুরের প্রয়োগ এবং আরবি-ফার্সি শব্দের যথার্থ ব্যবহার বাংলা গানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নজরুল প্রধানত গান রচনা করেছেন গ্রামোফোন কোম্পানি এবং চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে।নজরুলসঙ্গীত এর ভাব-ভাষা-সুরে এমন এক অসাধারণত্ব আছে যার প্রভাবে বিংশ শতাব্দীর তিরিশ-চল্লিশ দশকে তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে। প্রখ্যাত শিল্পীদের কণ্ঠে ধারণকৃত রেকর্ড এবং চলচ্চিত্র এই জনপ্রিয়তা অর্জনে সহায়তা করে।

নজরুলের সময় থেকে আধুনিক বাংলা গানে এক মৌলিক পরিবর্তন সূচিত হয়। এ সময় নজরুলের গানের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্র ও গ্রামোফোন কোম্পানির সৌজন্যে বাংলা গান জনমনে বিপুল সাড়া জাগায়। তখন রেকর্ডের গান শোনার জন্য এক নতুন শ্রোতমন্ডলী গড়ে ওঠে। ফলে আধুনিক বাংলা গানের বিকাশ ও সম্ভাবনা বেড়ে যায়। শ্রোতৃমন্ডলীর চাহিদা অনুযায়ী রেকর্ড কোম্পানি নতুন নতুন গান প্রকাশ করে।

সচরাচর চলচ্চিত্রের গান অথবা ফিল্মি গান নামে পরিচিত। এই গানগুলো সাধারণত বলিউড চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়। পাশ্চাত্য চলচ্চিত্রের “গান এবং নাচ” ধারণা থেকে এই ধারণা এসেছে। বলিউড, টালিউড, ঢালিউডের গান এবং এর সাথে চলচ্চিত্রের অন্যতম আনুসাঙ্গিক অংশ হয়ে উঠেছে, যা এঁকে দিয়েছে জনপ্রিয়তা এবং সাংস্কৃতিক মর্যাদা। ভারতবর্ষের পপ সঙ্গীত, ক্লাসিকাল ও আধুনিক ধারার সম্মেলনে সৃষ্ট । এটাই হিন্দি, বাংলা, উর্দু চলচ্চিত্রের সঙ্গীত হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। হিন্দি ও বাংলা চলচ্চিত্রের গানগুলোতে এখানকার সংস্কৃতির বিভিন্ন আচার আরচরণ ও বিভিন্ন ঘটনাকে তুলে ধরে। যদিও ভারতীয় চলচ্চিত্রে নিয়মিতভাবে গান ও নাচ পরিবেশিত হয়, তবে পাশ্চাত্য মঞ্চায়নের ধারণামতে এই সঙ্গীত-নৃত্য মিউজিকাল হিসেবে মেনে নেয় না। পাশ্চাত্য সঙ্গীত সিনেমা নির্ভর নয়। তবু সে সব সিনেমা যে মানুষের মনে দাগ কাটে না তা কিন্তু নয়। সে সব সিনেমার রেশ থেকে যায় অনেকটা সময় জুড়ে।

সিনেমা ছাড়া পশ্চিমা সঙ্গতে এক অনন্য নাম মাইকেল জেকসনকে দেখতে পাই।

ভাষাগত দিক দিয়ে এ উপমহাদেশের সিনেমাগুলোর সঙ্গীতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার্য হিন্দি, উর্দূ ও বাংলার কথ্যরূপ ব্যবহার করা হয়। যা তাদের মজ্জ্বাগত। একজন চিত্র পরিচালক তার দর্শকের মন বুঝেই সিনেমায় সঙ্গীতের ব্যবহার করে৷ যেহেতু এ উপমহাদেশের সিনেমা দর্শক ঘটনাবহুল সঙ্গীতপ্রেমী তাই তারা সিনেমায় সঙ্গীতকে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মনে করে। এতে সংগীতের কথা হিন্দি, উর্দূ ও বাংলা বুঝতে সক্ষম উভয় ধরনের মানুষের কাছেই বোধগম্য হয়। অবশ্য আধুনিক সিনেমার সঙ্গীতে এসব ভাষায় ইংরেজির মিশ্রণে হিংলিশ অতিমাত্রায় ব্যবহার হয়। তবে এখনো উর্দূ কবিতা বলিউডের সঙ্গীতের কথার ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। উর্দূ কবিতা এবং গজল এক্ষেত্রে ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে। যা শতাব্দী থেকে শতাব্দী এখনো মানুষের মনকে নাড়া দেয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গজল শিল্পীরা যেমনঃ গোলাম আলী, মেহেদী হাসান, নুসরাত ফাতে আলী খান, জগজিৎ সিং।

বাংলা চলচ্চিত্রে রুনা লায়লা থেকে শুরু করে কালজয়ী শিল্পীদের গান বেজেই চলেছে বয়সভেদে।

একটি চলচ্চিত্রে সঙ্গীতের সাথে নৃত্য পরিবেশন করা হয়। আর এই পরিবেশনা একাধিক কারণে হয়ে থাকে। কখনো “ঘটনার গভীরতা বোঝাতে, ভাব বোঝাতে, কোন কর্মের প্রতি মন্তব্য করতে, আশ্রয় বা সাহায্য প্রদানে এবং চলচ্চিত্রের ভেতরের মনোলগ তৈরিতে” সঙ্গীত ব্যবহৃত হয়।

শব্দের মিল বন্ধনে যেমন পরিপূর্ণতা পায় কবিতা, তেমনি ছবি দিয়ে শব্দ তৈরি করে ফিল্ম। পাঠক যেন শব্দের বুনটে আঁকা দৃশ্যটিকে প্রায় ছুঁতে পারছে এমনভাবে শব্দ দিয়ে পাঠকের সামনে ঠিক ঠিক দৃশ্যকল্প উপস্থাপন করাই একজন কবির সার্থকতা ও যোগ্যতা। আর শুরুর দিকে সিনেমাতে ছবি পরম্পরার মধ্য দিয়েই কেবল দর্শকের সামনে এর বার্তা তুলে ধরা হতো।

‘ব্যটলশিপ পটেমকিন বা গোল্ডরাশ’— এমনই দুটি চলচিত্রের নাম। কিন্তু শুরুর অল্প কিছু দিনের মধ্যে এধরনের সিনেমার কথা পুরোপুরি ভুলে যেতে হয়। এসময় সংলাপসহ ধীরে ধীরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় শিল্পর আরো চৌশট্টিটি কলা। শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয় কাহিনী, সংবাদ, সংগীত, নৃত্যকলা, চিত্রকলা, সাহিত্য, নাটকের নাটকীয়তা, ক্যামেরার বিভিন্ন কারসাজি, রঙের খেলা, আলো-ছায়ার ব্যবহার ও এডিটিং-এর নানা কলাকৌশল, বিজ্ঞানের নানান জটিল আবিষ্কার। মোটকথা চৌষট্টি কলার সকল কলার সংমিশ্রণে তৈরী হয় সম্পূর্ণ নতুন ও অসম্ভব শক্তিশালী একটি ভাষা। আর তা সিনেমা। আর সিনেমায় গান বা সঙ্গীত একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সিনেমার কাহিনী হারিয়ে যায়। কিন্তু যুগ থেকে যুগে রয়ে যায় তার সুর ও সুরের কথামালা। যা মানুষের ভাবের জগতে নিয়ে যায়। মানুষকে সকল যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি দিতে সুর ও সঙ্গীতের কোনো বিকল্প নেই।

গবেষনায় পাওয়া গেছে, মাঝারী উচ্চতার সুর মানুষের স্বাভাবিক ভাবনাকে খানিকটা প্রতিহত করে। ফলে মানুষ তখন নিজের স্বাভাবিকতাকে খানিকটা নতুন উপায়ে ব্যবহার করে। এভাবেই তৈরি হয় নতুন সব সৃষ্টির। কোন মানুষের ব্যাক্তিত্ব কেমন হবে সেটাও অনেকটাসময় সুরই নির্ধারণ করে। কার কোন সুর পছন্দ সেটাই বলে দেয় সে আসলে ঠিক কেমন, কেমন তার মস্তিষ্কের গঠন।

এমনকি কোরআনের আয়াতও পড়া হয় সুর করে। গীতাও পড়া হয় সুর করে। একমাত্র বাইবেলই মনে হয় সুর করে পড়া হয় না। আর তাই হয়তো পশ্চিমা সিনেমার কাহিনীগুলোতে সঙ্গীতের ব্যবহার খুবই কম। তবে পশ্চিমা সঙ্গীত বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।বিভিন্ন পপ গান বা পুরনো কোন ক্লাসিক্যাল গান এই মেলোডিক আর্কসের বৈশিষ্ট্যযুক্ত হতে পারে।

লিঁওর বাঁশির সুরে আমার চোখে পানি চলে আসে। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার বাঁশি শুনি। কিছু গজল আমি চোখ বন্ধ করে শুনি। সত্যিই আমি চলে যাই অন্যভূবনে।

২১ জুন পালিত হয় বিশ্ব সঙ্গীত দিবস। ‘গান হতে হবে মুক্ত সংশয়হীন’-এই স্লোগানকে সামনে রেখে বিশ্বের ১১০টি দেশ এই আন্দোলনে যোগ দেয়। ১৯৮২ সালে এটি ‘ফেস্টিভাল ওয়ার্ল্ড মিউজিক ডে’-তে রূপ নেয়। ১৯৮২ সালে ফরাসি মন্ত্রী জ্যাক ল্যাং সর্বপ্রথম বিশ্ব সঙ্গীত দিবস পালনের প্রস্তাব করেন। ১৯৮৫ সালের ২১ জুন প্রথম গোটা ইউরোপ এবং পরে সারাবিশ্বে এই সঙ্গীত দিবস পালন করে। এরপর থেকে দিনটি বিশ্ব দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে।

আমার বেডরুমের এক কোনে তাকে ছাড়া আমার চলে না। গান আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সকালে মৃদু সুরে গান, বেলকনি বা আমার লাইব্রেরি রুম সব মিলিয়ে আমি।

,,,রিতু জাহান,, রংপুর।

তথ্যসূত্রঃ এনসাইক্লোপিডিয়া, বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল।

ছবি আমার নিজের।

১৩৫জন ৩৯জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য