“সুন্দরবন” ও “রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র” “বাঁচাতে হবে সুন্দর বন”—১
http://www.sonelablog.com/archives/5990

“সুন্দরবন” ও “রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র” “বাঁচাতে হবে সুন্দর বন”—2

>> আমাদের দেশের ভূভাগকে মরু অঞ্চলে পরিণত হওয়ার হাত থেকে রক্ষার পিছনে সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকার সবুজ বেষ্টনীর অবদান অনেক বেশি।
>> সুন্দরবন ধূলি বালি ও দুর্গন্ধ দূরীকরণে ( গবেষণায় জানা যায় যে, একটি বড় গাছ কেবল গ্রীষ্মেই ১০ পাঊণ্ড বা ৪.৫ কেজি ধূলি আটকিয়ে রাখে। এ ছাড়াও প্রতিটি গাছ এক ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য তৈরি করে এবং তা বাতাসে ছেড়ে দেয়। কোন কোন গাছের ফুল এবং রাসায়নিক দ্রব্য খুব সুগন্ধি হয়। সুন্দরবন সহ উপকূলীয় বন আমাদের তাদের ফুলের মাধ্যমে দুর্গন্ধ শুষে নেয় এবং আমাদের সুন্দর ভাবে বাঁচতে সহায়তা করে) কাজ করে।
>> সুন্দরবন পশু পাখির ( UNDP ও FAO এর জরিপে দেখা গেছে শুধু সুন্দরবনে বাস করে ৪২০ টি বাঘ, ১লাখ ২০ হাজার হরিণ, ৪০ হাজার বানর, ৪৩ হাজার বন্য শুকুর, ৩ হাজার বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। এ ছাড়া ভাল্লুক, সাপ , কুমির, কাঠবিড়াল, বিলুপ্ত প্রায় গুই সাপ ও হাজার রকমের কীটপতঙ্গের বসবাস এই সুন্দরবনে। এ ছাড়া মিঠে পানির ডলফিন এর অভ্যরন্য সুন্দরবনের বেশ কয়টি নদী।) আশ্রয়স্থল।
>> আমাদের এই সুন্দরবন জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণের বড় একটি জায়গা। লক্ষ লক্ষ উদ্ভিদ ও প্রাণী অণুজীব ও এদের দেহের জিন সমষ্টি এবং জটিল পরিবেশ জীব-বৈচিত্র্য গড়ে তোলে। আর যে কোন এলাকার জীব-বৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে বনভূমির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । বন ধ্বংস করার ফলে নানা ধরনের উদ্ভিদ পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে যায়। ফলে বস্তুতান্ত্রিক খাদ্যশৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে জীবের বা প্রাণীর বিলুপ্তির আশঙ্কা দেখা দেয়।
>> বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুন্দরবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বন দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ । তেল, গ্যাস, কয়লা যে কোন সময় শেষ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু বনজ সম্পদ কোন কালেয় ফুরাবেনা যদি এর সুরক্ষা ও পরিচর্যা বিঙ্গান সম্মত হয়। আর এই জন্যই বনকে বলা হয় নবায়ন যোগ্য সম্পদের অফুরন্ত উৎস।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুন্দরবনের বনজ সম্পদের গুরুত্ব নিচে তুলে ধরা হল:
১। জ্বালানি কাঠ সরবরাহ।
২। গৃহনির্মাণ ও আসবাবপত্রের উপকরণ সরবরাহ।
৩। মানুষের খাদ্য সরবরাহ।
৪। শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ: দিয়াশলাই, প্লাইউড, কাগজ, ইট, নৌকা ও জলযান, শীতলপাটি, বাঁশ জাত সামগ্রী, বেতজাত সামগ্রী, রেশম ও তামাক, বনজ উদ্ভিদ বীজ হতে তৈল ইত্যাদি।
>> সুন্দরবন ভেষজ ঔষধের বড় একটি যোগান দাতা। আয়ুর্বেদী, ইউনানি , হোমিওপ্যাথি ও এলোপ্যাথি চকিৎসা শাস্ত্রে ঔষধ উৎপাদনের মুখ্য উপকরণ হল ভেষজ মুল, পাতা, বাকল, শিকড়, ফুল, বীজ। আর এ কাজে প্রায় ৭০০ উদ্ভিদ ব্যবহার হচ্ছে। আর এই সব উদ্ভিদের অন্যতম যোগান আসে সুন্দরবন থেকে।
সুতরাং দেখছেনই তো সুন্দরবন কত ভাবে কত সুন্দর করে আমাদের প্রয়োজনে কাজে লাগছে। তাই এই সুন্দরীকে রক্ষা করা আমাদের জন্য আমাদের প্রয়োজনেই দরকার। অথচ আমাদের এই সরকার সুন্দরবনের নিরাপত্তা কে পাত্তা না দিয়ে সুন্দর বনের বুকের ভিতরেই রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে যাচ্ছে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করছি। দরকার হলে রাস্তায় নামতেও কুণ্ঠাবোধ করব না। তাই আসুন প্রতিবাদ করি … সুন্দরবনে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চাই না চাই না।
@@ ও এক নজরে সুন্দরবনের ক্ষতি আর দেখুন কিকি হারাচ্ছেন আপনারা: আসুন একটু চোখ বুলাই অধিগ্রহণ করা ১৮৩৪ একর জমি থেকে বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে আমরা বছরে কি কি হারাচ্ছি।
• বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১০ ব্যাসার্ধের মধ্যে বছরে ৬২,৩৫৩ টন এবং প্রকল্প এলাকায় ১২৮৫ টন ধান উৎপাদিত হয়।
• ধান ছাড়াও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১০ ব্যাসার্ধের মধ্যে বছরে ১,৪০,৪৬১ টন অন্যান্য শস্য উৎপাদিত হয়।
• প্রতি বাড়িতে গড়ে ৩৪টি গরু, ২৩ টি মহিষ, ৪টি ছাগল, ১টি ভেড়া, ৫টি হাঁস, ৬-৭ টি করে মুরগী পালন করা হয়।ম্যানগ্রোভ বনের সাথে এলাকার নদী ও খালের সংযোগ থাকায় এলাকাটি স্বাদু ও লোনা পানির মাছের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খাল ও নদীর নেটওয়ার্ক জৈব বৈচিত্র্য ও ভারসাম্য রক্ষা করে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১০ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে বছরে৫২১৮৬৬ মেট্রিক টন এবং প্রকল্প এলাকায় ১৮৩৪ একর জমিতে (৫৬৯৪১ মেট্রিক টন) মাছ উৎপাদিত হয়।
EIA রিপোর্টে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রকল্প এলাকায় (১৮৩৪ একর) ধান, মাছ, গৃহপালিত পশুপাখি ইত্যাদির উৎপাদন ধ্বংস হবে স্বীকার করে আশাবাদ প্রকাশ করা হয়েছে, সঠিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা হলে এর বাইরের ১০ কিমি এলাকার মধ্যে কোন ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না(!)। যদিও বিভিন্ন ধরণের নির্মাণ কাজ, ড্রেসিং, বিভিন্ন ধরণের রাসায়নিক ও তৈল নি:সরণ ইত্যাদির ফলে পশুর ও মাইদ্বারা নদী, সংযোগ খাল, জোয়ার-ভাটার প্লাবন ভূমি ইত্যাদি এলাকার মৎস্য আবাস, মৎস্য চলাচল ও বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশংকাও প্রকাশ করা হয়েছে।

তার পরও কথা আছেঃ
কাঁচামাল আমাদের, জমি/ভূমি আমাদের, দ্বিগুণ পরিমাণ তেল আমরা সাপ্লাই দিব, আমাদেরই কৃষিজমি-বসত ভিটা-জল-জঙ্গল-জীবন ও অর্থনীতি ধবংস করে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হবে- তারপরও মাত্র ১৫% বিনিয়োগ করে আর দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণের ব্যবস্থা করে (এই ঋণ আমাদেরই পরিশোধ করতে হবে) অন্যায়ভাবে ৮৫% মালিকানা তুলে দেয়া হল ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসির হাতে আর সেই এনটিপিসি নিজের ইচ্ছামত চড়া দামে উৎপাদিত বিদ্যুৎ আমাদের কাছেই বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা মুনাফা লুটবে। এই সব কিছুই ভয়াবহ ভারতীয় লুণ্ঠনের পথ প্রশস্ত করে দিবে যে লুণ্ঠন ঔপনিবেশিক আমলের অবাধ লুণ্ঠনের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। খোদ ভারতের মাটিতে বিনিয়োগ করেও এতো মুনাফা লুটতে পারবে না কোন ভারতীয় কোম্পানি। কিন্তু ভারতীয় লুণ্ঠন আর আধিপত্যবাদের কাছে জাতীয় স্বার্থকে বিকিয়ে দেয়ার এটাই শেষ পদক্ষেপ না, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করে যে পরিমাণ মুনাফা করবে ভারতীয় কোম্পানি তার পুরোটাই যেন ভারতে নিয়ে যেতে পারে তার জন্য কোম্পানিকে ১০ বছরের কররেয়াত সুবিধা দিয়ে দিল সরকার। এই কররেয়াত সুবিধা দিয়ে বাংলাদেশের কোটি কোটি টাকা লোকসান মেনে নিয়ে সরকার ভয়াবহ ভারতীয় লুণ্ঠনের পথ প্রশস্ত করে দিচ্ছে। এ ধরনের অন্যায্য, অসম চুক্তি যা সম্পূর্ণভাবেই বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো হয়েছে কিনা আমাদের জানা নেই। এ ধরনের অসম চুক্তি স্বাক্ষরের মানে হচ্ছে ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির অধীনস্ততা মেনে নেয়া। এই অন্যায্য চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী ভারতের নয়া-উপনিবেশবাদী শোষণ-নিপীড়নকেই তরান্বিত করা হবে।
@@ সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলনকে বেগবান করতে আপনিও এগিয়ে আসুন। আপনার ছোট্ট একটি আওয়াজ বন্ধ করে দিতে পারে দেশ বিরোধী এই চুক্তি, যোগ করবে নতুন মাত্রা। আমাদের দেশ রক্ষা, আমাদের বন রক্ষার এই আন্দোলনে বসে না থেকে আপনার ফেসবুকে মাত্র ১০ জন বন্ধুকে এই আন্দোলনের পক্ষে বলুন। তাদের শেয়ার করুন রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভয়াভয়তা

২১৯জন ২১৯জন
0 Shares

৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ