মাহবুবুল আলম //

এপার ওপার দুই বাংলা তথা বিশ্বের তাবৎ বাংলাভাষাভাষি লেখক-পাঠকের কাছে তুমুল জনপ্রিয় কবি কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের মাঝে নেই কথাটি ভাবতে গেলে হৃদয়বিদীর্ণ এক দীর্ঘশ্বাসে ভরে ওঠে হৃদয়ের গভীর উথান। বাংলাসাহিত্যের কিংবদন্তি লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ২৩ অক্টোবর ২০১২ সোমবার রাত ২ টায় ম্যাসিভ হার্ট এ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বৎসর। বয়সের ভার তাকে কিছুটা কাবু করতে পারলেও তারুণ্যদীপ্ত প্রাণের জোরে আরো কিছু দিন অর্থাৎ শতায়ু হয়ে বাংলাসাহিত্যকে আরো উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধিতর করে তোলবেন এমনই আশা ছিল আমাদের সকলের। কিন্তু আমাদের সে আশা-আকাঙ্খা হঠাৎ করেই ধূলোয় মিশে গেল তার মৃত্যুর খবরে। এখন এটাই নির্মম সত্য বাংলাসাহিত্যের কিংবদন্তি লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের মাঝে নেই, তিনি চলে গেছেন একেবারে না ফেরার দেশে; যেখানে গেলে কেউ আর কখনো ফিরে আসতে পারে না। ২৪ অক্টোবর সকালে ঘুম থেকে উঠে টেলিভিশনের রিমোট চাপতেই স্ক্রলে ভেসে ওঠলো বাংলাসাহিত্যের প্রবাদপুরুষ কবি-কথাশিল্পী ও সাংবাদিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুর খবরটি। এই একটিমাত্র খবরে হঠাৎ করেই যেনো আমার সকল চেতনা স্তব্দ করে দিল। তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না তাঁর মৃত্যুর খবরটি। তাই রিমোটে একটার পর একটা চ্যানেলের বোতাম টিপতে থাকলাম। না ঠিকই সব চ্যানেলের স্ক্রলেই সুনীলদার মৃত্যুর খবরটি ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে দেখাচ্ছে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুর খবরটি যখন আমার সমস্ত চেতনার দখলদারিত্ব নিয়ে বসে আছে তখন তাঁকে নিয়ে ও তাঁর সাথে কিছু স্মৃতি আমার চোখের সামনে বার বার রিওয়াইন্ড-ফরোয়ার্ড হতে থাকলো। সবচেয়ে জলজ্যান্ত স্মৃতিটি ছিল ২০১২ সালের ৭ জানুয়ারি ‘প্রথমআলো বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ কবিতা উৎসব’-এর স্মৃতিময় দৃশ্যটি। সেটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল কলকাতা রাজবাড়ি কমিউনিটি হল ২১ গড়িয়া ফ্রাষ্ট লেনে। ‘প্রথমআলো বাংলাদেশ-পশ্চিবঙ্গ কবিতা উৎসব’ কমিটির সভাপতি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সাধারণ সম্পাদক বীথি চট্টোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ থেকে সব্যসাচি লেখক সৈয়দ শামসুল হক, কবি বেলাল চৌধুরী, কবি নুরুল হুদা, কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজি, কবি মুহাম্মদ সামাদ, কবি রবিউল হুসাইন, ছড়াকার ও কবি আসলাম সানী, কবি আয়াত আলী পাটোয়ারি, সৈয়দ আল ফারুক ও আমি। ৭ ও ৮ জানুয়ারি দুই দিনে অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা থাকলেও দবিশ্ব কবিতা উৎসব’-এর কারণে ৮ জানুয়ারির অনুষ্ঠানটি ছাঁটাই করে ৭ জানুয়ারি এক দিনেই সকাল-সন্ধ্যার দুইটি অধিবেশনে অনুষ্ঠানটি শেষ করা হয়েছিল। সকাল ১০টার দিকে আমরা অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হলে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও বীথি চট্টোপাধ্যায় আমাদের অভ্যর্থনা জানায়। শুরুতেই পুস্পমাল্য ও উত্তরীয় পড়ানোর পরপরই শুরু হলো অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানটির পুরহিত্য করছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজেই। সেই অনুষ্ঠানে বাংলাসাহিত্যের অন্যতম সম্মানীয় কবি শঙ্খঘোষসহ অনেক কবি-সাহিত্যিকদের উপস্থিতিতে মিলনমেলায় পরিনত হয়ে ওঠেছিল অনুষ্ঠানটি। সুনীলদা এক একজন কবি তাঁর নাম অঞ্চল ও দেশের পরিচয় তুলে ধরে কবিতা পড়ার জন্যে যখন মঞ্চে আমন্ত্রণ জানাচ্ছিলেন তখন আমি বেশ রোমাঞ্চিত ছিলাম। এখানে বলা রাখা ভাল মঞ্চে আসন গ্রহণ করার জন্য শুধুমাত্র বাংলাদেশের কবিদেরই আমন্ত্রণ জানানো হয়। কবি শঙ্খঘোষকে মঞ্চে আসন গ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি মঞ্চে না ওঠে সবিনয়ে সুনীলদাকে তাঁকে মঞ্চে আহ্বানের জন্য ধন্যবাদ জানান। দুই দেশের প্রথম শ্রেণীর কবিদের সাথে আমন্ত্রিত হয়ে একই মঞ্চে বসে কবিতা পড়ার বিষয়টি যুগপৎ রোমাঞ্চকর ও উপভোগ্য হয়ে ওঠেছিল। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, সুনীলদা ঘোষণা করলেন যে, ‘ইন্ডিয়ার কবিদের অনুরোধ করবো তারা যেন একটার বেশি কবিতা পড়ার চেষ্টা না করেন। তবে বাংলাদেশের কবিরা দুইটা করে কবিতা পড়বেন’। সে মোতাবেক আমরা দুইটি করে কবিতা পড়লাম। আমি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম যতজন কবি সেখানে কবিতা পড়েছেন, সুনীলদা কবির দিকে থাকিয়ে থেকে মনযোগের সাথে কবিতা শুনেছেন। কখনো অন্যমনস্ক হননি। লাঞ্চের আগ পর্যন্ত একটানা কবিতা পাঠ চললো। সেখানেই বুফে লাঞ্চের ব্যবস্থা ছিল। লাঞ্চ সেরে আমরা চলে গেলাম পশ্চিম বাংলা বাঙলা আকাদেমি’র ‘ষষ্ঠ বিশ্ব কবিতা উৎসবে’। সেখানে যাওয়ার আগে সুনীলদা বললেন, আমরা যেন অবশ্য অবশ্যই বিকেলের অধিবেশনে উপস্থিত থাকি। সেখানে আমাদেরকে ‘টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের’ পক্ষ থেকে উপহারসামমগ্রী তুলে দেয়া হবে।’ বিশ্ব কবিতা উৎসবের বৈকালিক সেশন শেষ করে, সুনীলদার কথা মতো আমরা সন্ধ্যায় ফিরে এলাম আবার ‘বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ কবিতা উৎসবে’। আমরা সবাই আবার সেখানে কবিতা পড়লাম। শেষে বাংলাদেশের কবিদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দেয়া হলো ‘টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের’ বিশাল উপহারের প্যাকেট। সবার সাথে ভাববিনিময় ও মতবিনিময়ের পর জাম্পেশ ডিনারের মাধ্যমে শেষ হয়েছিল ‘প্রথমআলো বালাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ কবিতা উৎসব-২০১২’এর জাকজঁমকপূর্ণ অনুষ্ঠানটি।

তেমনতো বেশি দিন নয়, মাত্র কয়েকমাসের ব্যবধান। কিন্তু হঠাৎ করে তাঁর মহাপ্রয়াণ তাঁর ও আমাদের মাঝে ব্যবধানের এমন এক বিশাল অনতিক্রম্য পাহাড় গড়ে দিল; যে পাগাড় ডিঙ্গিয়ে কখনো তাঁর কাছে পৌঁছা যাবে না। সুনীলদাকে নিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় কবিতা পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত ‘জাতীয় কবিতা উৎসব’ কেন্দ্রীক  অনেক স্মৃতি  থাকলেও আলোচিত ‘প্রথমআলো বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ কবিতা উৎসব’-এর সেই স্মৃতি আমার মনে সবচেয়ে জ্বলজ্বলে। তাঁকে নিয়ে আরো অনেক স্মৃতির কথা বলতে গেলে লেখার কলেবর বেড়ে যাবে তাই এ প্রসঙ্গ মুলতবি রেখে আমি কিছুটা আলোকপাত করতে চাই বাংলাসাহিত্যের অন্যতম কারিগর কবি-কথাসাহিত্যিক ও বহুমাত্রিক লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবন ও ভাবনা নিয়ে। কেননা, তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে নিবন্ধের এই ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনা করা মোটেই সম্ভব নয়।

বাংলাসাহিত্যের কিংবদন্তি কবি-কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক ও কলামিস্ট সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৩৪ সালে বাংলাদেশ তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা বর্তমান মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার মাইজপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি কবিতা পত্রিকা ‘কৃত্তিবাস’ সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। যা সমসাময়িক কবি ও কবিতানুরাগীর মুখপত্র হয়ে ওঠে। ১৯৫৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন এই কীর্তিমান পুরুষ। ছাত্রাবস্থায় অর্থাৎ যৌবনে কবিতার মাধ্যমে সাহিত্যাঙ্গনে প্রবেশ করলেও পরিনত বয়সে তিনি গদ্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। গদ্য লেখার মাধ্যমেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। গদ্য বলতে কথাসাহিত্য রচনা করে তিনি যশ, খ্যাতি ও সমৃদ্ধি লাভ করলেও তাঁর প্রথম প্রেম ছিল কবিতা।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি তাঁর পরিবারের সাথে কলকাতায় চলে যান। এর দীর্ঘদিন পর একবার একা ও একবার স্ত্রী সাথী চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে পিতৃনিবাসে বেড়াতে এলেও আমাদের জাতীয় কবিতা উৎসবের বেশ ক’টি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন তিনি। সেই সুবাদে তাঁর সাথে বাংলাদেশের কবি ও লেখকদের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি হয়েছিল। গড়ে ওঠেছিল আত্মীক এক গভীর সম্পর্ক। তিনি অনেকবার অনেক সাক্ষাতকারে বলেছেন,‘বাংলাদেশই আমার প্রথম পরিচয়, এখানের মানুষ, ফুল, পাখি, নদী ও প্রকৃতির সাথে রয়েছে আমার নাড়ির সম্পর্ক। যে সম্পর্ক কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে রোধ করা যায় না কখনো। সেই কারণেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন, বর্বরতা ও হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ঘুরে ঘুরে কলম চালিয়েছেন বিপন্ন, আর্ত ও আশ্রয়হীন মানুষ ও আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে।

১৯৫৮ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এর প্রায় ৮ বৎসর পর ১৯৬৬ সালে তিনি তাঁর পাঠকদের উপহার দেন প্রথম উপন্যাস ‘আত্ম প্রকাশ’। এর পর তাঁকে আর পিছু তাকাতে হয়নি, যা তিনি ‘রাঙ’ ভেবে ধরেছেন তা ই ‘সোনা’ হয়ে ধরা দিয়েছে তাঁর হাতে। তিনি সনামে লেখার পাশাপাশি ‘নীললোহিত’ ‘সনাতন পাঠক’ নীলউপাধ্যায় বিভিন্ন ছদ্মনামে লিখেছেন, অনেক গল্প, ভ্রমনকাহিনী, শিশুসাহিত্য ও গোয়েন্দা কাহিনী। তাঁর লেখার প্রতি পাঠকদের এত ঝোঁকের কারণ কি এ প্রসঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজের জবানীতেই বলেছেন এভাবে-‘আমি জীব থেকে গল্প খুঁজে নিতে চাই, কিন্তু গল্পের মতো জীবন কাটাতে চাই না।’ এ কারণেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস-‘আমি কিভাবে যে বেঁচে আছি’ ‘পূর্ব-পশ্চিম’ ‘প্রথমআলো’ ‘যুগলবন্দি’ ‘সেই সময়’ ‘অর্ধেক জীবন’ ‘নীরার জন্য’ মানুষ ও মানুষের নানাবিধ গল্পের হাত ধরে পৌঁছে যাবে মহাকালে। সেই কারণেই অস্কারজয়ী সত্যজিৎ রায় সুনীল গঙ্গোপধ্যায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ও ‘প্রতিদ্ধন্ধি’ উপন্যাসকে চলচিত্রে রূপ দিয়েছিলেন। আর তাঁর ‘মনের মানুষ’ অবলম্বনে দুইবাংলার যৌথ প্রযোজনায় ও গৌতম ঘোষের পরিচালনায় নির্মিত হয়েছে লালন ফকিরের জীবনধর্মী চলচিত্র। যা দুই বাংলায় যথেষ্ঠ দর্শকনন্দিত হয়েছে। লেখক হিসেবে নয়, সুনীলদা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা। ভারতের অসম্ভব জনপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিক ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। সাংবাদিকতা পেশায়ও তিনি ছিলেন বেশ সফল। আর সাংগঠনিক ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতাগুণে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন ভারতের জাতীয় সাহিত্য প্রতিষ্ঠান সাহিত্য আকাদেমি ও পশ্চিমবঙ্গ শিশু-কিশোর আকাদেমির সভাপতি পদেও। দুই শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অনেক সন্মানজনক পুরস্কার ও সন্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

আগেই বলেছি তাঁর সুবিশাল সাহিত্যকর্ম নিয়ে আমার আজকের এ আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। তবু আমি এখানে একটিমাত্র উদাহরণ দিতে চাই; এ একটি উদাহরণেই প্রদ্যোত হয়ে ওঠে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মাসনগত অতৃপ্তি বা ক্ষোভ যা ই বলিনা কেন। এ লেখার ভেতর দিয়ে প্রকাশ পায় তাঁর অন্তর্গত বিষয় আসয়। তিনি যতটা না ছিলেন প্রকৃতি ও প্রেমের কবি এর চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিলেন না মানবিকতা, সমাজ ও রাষ্ট্রজ ভাবনার কবি। তাঁর লেখায় যেমন মূর্ত হয়ে ওঠে প্রিয় ভারতের কথা, আরো বেশি মর্মবেদী হয়ে ওঠে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ধনিক ও শাসক শ্রেণী তথা বিচ্ছিন্নতাবাদীর আস্ফালন ও সন্ত্রাবাদের কথা। তাঁর মর্মবেদনার কারণ হয়েছে এসব বিষয় যা পরিস্কার বোঝা যায় ‘আনন্দ বাজার’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বন্ধু বলেছিলেন, ভারত নাকি অহিংসার দেশ’ শিরোনামের নিবন্ধে। সেই নিবন্ধটিই ২৫ অক্টোবর২০১২ পুনঃমুদ্রন করেছে ‘জনকন্ঠ’। সেই প্রবন্ধে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিভিন্ন মর্মযাতনার কথা ফুটে ওঠেছে। সেখান থেকেই অংশবিশেষ উদ্ধৃত করছি এখানে:

তিনি এ নিবন্ধের আখ্যানভাগে বলেছেন,‘নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব! তিনি জেনে গেলেন কিনা জানি না স্বাধীনতা এসে গিয়েছিল তার পাঁচ সাত বছর পরেই, কিন্তু রক্তের ¯্রােত থামেনি, বেড়েই চলেছে।’ মানুষে মানুষে হানাহানি রক্তারক্তি সুনীলদার কবি মানসকে দুর্দমনীয় ক্রোধে আক্রান্ত করেছিল। আর রাজনীতির ষড়যন্ত্রের হোলিখেলায় রাষ্ট্র পিতার হত্যাকান্ড তাঁর ভেতর শ্লাঘা ও ক্ষোভ আরো তীব্রতর হয়ে ওঠেছে তাঁর লেখনিতে। এমনই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাই এখানে-“আমি লেখালেখির জগতে প্রবেশ করার পর পোল্যান্ডের এক লেখিকার সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তিনি বেশ খ্যাতিময়ী নোবেল পুস্কোরের জন্যও কয়েকবার তাঁর নাম ওঠেছিল। তিনি একদিন কথায় কথায় বলছিলেন, পৃথিবীর মধ্যে তিনি সব চেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করেন ভারতকে। কারণ কখনও ভারত অন্য কোন দেশ আক্রমন করেনি। স¤্রাজ্য বিস্তারেরও চেষ্টা করেনি। ভারত হচ্ছে অহিংসা ও শান্তির দেশ” এ কথা শুনে সুনীলদা কি করে তার মনের ক্ষোভ ও লজ্জাকে চাপা দিয়েছিলেন তা ওঠে এসেছে তাঁর লেখায়-‘আমি লজ্জায় অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়েছিলাম। এতবড় প্রশংসা ভারতের প্রাপ্য নয়, ইতিহাস সম্মতও নয়’ গান্ধীজি ও খুন হয়েছিলেন এ দেশেরই মানুষের হাতে। অবিরত বর্বরতা কামরূপ ও অসমে।…ভারত অন্য কোন দেশ আক্রমন করেনি তার মূলকারণ ভারতের সে রকম ক্ষমতাই ছিল না। এতবড় দেশে কোনো বিশাল ও মজবুত সেনাবাহিনী গড়ে ওঠেনি।

একজন রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি হিসেবে তিনি মেনে নিতে পারেননি রাজ্যে রাজ্যে মহানগর মহানগরে অসম উন্নয়নের বিষয়টি। অসম উন্নয়নের ক্ষোভ তাঁর লেখায় ফুটে ওঠেছে-‘এক সময় শোনা যেত যে ভারতের তিনটি বড় বড় শহরের মধ্যে এক একটাতে  এক একটা পরিচয় দেগে দেওয়া হয়েছে। যেমন- দিল্লিতো অবশ্যই  রাজনৈতিক রাজধানী। বম্বে অর্থাৎ অধুনা মুম্বাই হচ্ছে ব্যবসাবাণিজ্যের রাজধানী আর কলকাতা হচ্ছে শিল্প ও সাহিত্যের রাজধানী।  কে রটিয়েছে তা জানিনা। হয়তো বাঙালীরাই। বাঙালীরা ব্যবসাবাণিজ্য করতে জানে না রাজনীতিতেও তেমন উঁচু জায়গায় পৌঁছতে পারে না। তাই তাদের দেয়া হয়েছে শিল্পসংস্কৃতির তকমা। যদিও এটা অর্থহীন। বাঙালীদের মধ্যে ¯্রষ্টার অভূতপূর্ব উত্থান হয়েছে যেমন- রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরতচন্দ্র, সত্যজিৎ রায়, মৃনাল সেন, যামিনী রায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। কিন্তু তাঁদের প্রভাব কতখানী? একটা ছোট গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ।’ আর নিচের বক্তব্যের মধ্যেই কবি-কথাশিল্পী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মানবদরদী হৃদয়ের পরিচয় দীপ্ত হয়ে ওঠে। তিনি যখন বলেন,‘যখন কোন সাংঘাতিক ঘৃণ্য ব্যাপার ঘটতে থাকে, যার প্রতিকার করার ক্ষমতা আমার নেই, শুধু শুধু মর্মযাতনা ভোগ করতে হয় তখন আমি কোন প্রিয় কবির কবিতার বই খুলে পড়তে শুরু করি। প্রথমে কয়েক মিনিট মন বসাতে পারি না, তারপর আস্তে আস্তে নিমজ্জিত হই কবিতার রসে। হ্যা কবিতার সেই শক্তি আছে। বাস্তবের নগ্ন দিকটা সে ভুলিয়ে দিতে পারে।’

লেখক হিসেবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যেমন সুলেখক তেমনি ব্যক্তি জীবনেও তিনি ছিলেন একজন নিরহংকারী, কোমল হৃদয় ও আবেগপ্রবণ মানুষ। তিনি ছিলেন উদার ও মুক্তমনা। মানুষের দুঃখ-কষ্ট যেমন তাঁকে ব্যথিত করতো তেমনি তাদের আনন্দও তাঁকে স্পর্শ করতো। গরীব দুঃখীদের জন্য তাঁর হৃদয়ের গভীরে ছিল মমতাময় একটি আসন। প্রচার চাননি কখনো তাই গোপনে তিনি কতজনকে যে সাহায্য করেছেন তার খবর জানেনা বন্ধু-বান্ধবদের কেউ। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক ভদ্র ন¤্র একজন ভাল মানুষ, যা অনেকের মধ্যে দেখা যায় না। আমাদের দেশের এমন দু’একজন সিনিয়র কবি বা লেখক আছেন যারা নবীনদের দেখলেই সহ্য করতে পারেন না, নাক ছিটকান; ‘ওরা আবার কবি হলো কবে, কবিতার নামে ওরা যা কিছু লিখে তাতো ছাইপাঁশ ছাড়া কিছুই নয়।’ তাঁরা কিছুতেই নতুনদের স্থান করে দিতে চাননা। টিভি ক্যামেরা দেখলে অসৌজন্যমূলকভাবে নতুন কাউকে সরিয়ে দিয়ে জিরাফের মতো গলা তোলে দাঁড়ান। কিন্তু এত বড় মাপের মানুষ হয়েও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একেবারেই ছিলেন এর ব্যতিক্রম। নতুনদের কবিতা বা লেখা তিনি মনযোগ দিয়ে শুনতেন এবং আরো ভাল লেখার জন্য উৎসাহ দিতেন। নতুনদের জায়গা করে দিতেন সব সময়ই। সেই কারণেই নবীন লেখক ও পাঠকদের কাছে তিনি ছিলেন খুবই কাছের মানুষ। আর যে কারণে পাঠকরা তাঁর, গল্প, উপন্যাস কবিতায় আগ্রহী ছিল তার প্রধানতম কারণ হচ্ছে লেখার শব্দচয়ন ও বিষয়বস্তু নির্বাচনে তিনি ছিলেন খুব সাবধানী। সুন্দর ঝরঝরে গতিময় ভাষায় তাঁর যে কোনো লেখা একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে থামার উপায় ছিল না। তাঁর লেখার অন্যতম আকর্ষণ ছিল সব বয়সের পাঠকদের কথা মাথায় রেখে সহজ-সরল ও প্রাঞ্জলভাষায় তিনি লিখতেন। এই জন্যেই বাংলাদেশের যেসব প্রথম সারির জাতীয় পত্রিকা ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করে এদের সবার মধ্যে দেখেছি একটা অলিখিত প্রতিযোগিতা কি করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা সংগ্রহ করে ছাপানো যায়। আর পাঠকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতেও ছিল সুনীল দা। তাঁর লেখা থাকলেই সেই ঈদ সংখ্যার কাটতি হতো বিপুল। তাছাড়া তিনি ছিলেন বাংলাদেশের একজন অকৃত্তিম বন্ধু। আগেই বলা হয়েছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কথা। মুক্তিযুদ্ধের পর তাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও বাংলাদেশের লেখক ও পাঠকদের মধ্যে একটা আত্মীক ও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁর লেখার প্রতি বাংলাদেশের লেখক পাঠকদের যেমন আগ্রহ  তেমনি বাংলাদেশের নবীন-প্রবীণ লেখকদের সৃষ্টিকর্মেরও বিশেষ অনুরাগী ছিলেন তিনি।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কতটা সহজ-সরল ও সংগ্রামী জীবনের অধিকারী ছিলেন তা জানা যায় তাঁর ‘অর্ধেক জীবন’ উপন্যাসটি পড়লেই। এই উপন্যাস পড়েই জানা যাবে লেখকের জীবনের অজানা অধ্যায়, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার বিচিত্র সব গল্প। টিউশনী দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও চাকুরী হিসেবে বেছে নেন সাংবাদিকতা পেশা। এক সময় গদ্য রচনাই হয়ে ওঠলেন তিনি অধিক মনযোগী। এ কথাটি তাঁর অনেক লেখায়ই ওঠে এসেছে। তিনি অনেকটা খেয়ালী ও ভাবুক মানুষ ছিলেন। কথা বলতে বলতে হঠাৎ করেই কোথায় যেন হারিয়ে যেতেন। সে কি নতুন কোন গল্প বা উপন্যাসের চরিত্রের খোঁজে নাকি কোন কবিতার চরণ অন্বেষণে তা বোঝা যেত না সহজে।

কবির সারল্যতার প্রমান পাওয়া যায় তাঁর ‘অর্ধেক জীবন’ উপন্যাসে; উপন্যাসে সহজভাবে তাঁর ও স্বাতী চট্টোপাধ্যায়ের বিয়ের প্রসঙ্গটাও আসে এভাবে-‘হঠাৎ একদিন একজন নারী ফোন করে দেখা করতে চাইলেন। দেখা করতে করতে রাজি হয়ে গেলাম। সেই নারী তার জামাইবাবুকে নিয়ে দেখা করলেন এবং সরাসরি বিয়ের ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। কি করি-চালচুলো নেই। স্থায়ী কোন চাকুরী নেই আছে শুধু লেখার হাত। রিস্ক নিলাম উভয়ে, হয়ে গেল বিয়ে…। কি সরল স্বীকারোক্তি! কি সহজ বর্ণনা।

পরিশেষে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘যদি নির্বাসন দাও’ কবিতার দুটি পঙ্ক্তির মাধ্যমে শেখ করবো আজকের লেখা-

যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো

আমি বিষপান করে মরে যাবো।

বিষন্ন আলোয় এ বাংলাদেশে

নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ

প্রান্তরে দিগন্ত নির্নিমেষ

এ আমার সাড়ে তিন হাত ভূমি।

 

…ধানক্ষেতে চাপ চাপ রক্ত

এইখানে ঝরেছিল মানুষের ঘাম

এখনো স্নানের আগে কেউ কেউ

করে থাকে নদীকে প্রণাম।…

উপসংহারে শুধু এটুকুই বলবো, তিনি চলে গেছেন মহাপ্রয়াণে, রেখে গেছেন বিপুল সাহিত্যকর্ম তাঁর এই চলে যাওয়ায় বাংলাসাহিত্যের যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো তা সহজেই পূরণ হবরার নয়। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অসামান্য অবদানের জন্য বাংলা ভাষাভাষি মানুষের হৃদয়ে তিনি চির জাগরুক থাকবেন এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

২৩৮জন ৪৯জন
0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ