সিডিউস-পর্ব ১

রেজওয়ানা কবির ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২, সোমবার, ০৩:৩৬:৩০অপরাহ্ন গল্প ১০ মন্তব্য

কলেজের বারান্দায় সকালের বৃষ্টির টিপটাপ আওয়াজের দিকে তাঁকিয়ে শব্দকে শুষে নেয়ার অভ্যাস আলোর ছোটবেলা থেকেই। পত্রিকায় আজ পাতায় পাতায় ভড়ে গেছে ঢাকা ভার্সিটির পোশাক নিয়ে আন্দোলনকে ঘিরে নানা ধরনের ট্রল। সেদিকেই চোখ বুলাতে বুলাতেই কখন যে রং চা ঠান্ডা হয়ে পানি হয়ে গেছে সেদিকে খেয়ালই নেই আলোর!

“সিডিউস” শব্দটি দেখেই রাগে, ক্ষোভে আলোর মেজাজ আরও বিগড়ে গেল। সমাজ আর সমাজের মানুষ যাদের জন্যই আজকের এই আলো কলেজের একটা পুরনো, অন্ধকার,দম বন্ধ ঘরে একা একা নির্বাসনে অবসরে সময় কাটায় যেখানে শুধু আলো, প্রতিদিনের পত্রিকা,আর তার মোবাইল সঙ্গী হিসাবে থাকে। শুধু ক্লাস নেয়া আর অবসরে সামান্য সময় আলোর এই বদ্ধ পুরনো ঘরেই কাটে।।।।

আলো বয়স আনুমানিক ২৮/২৯ বছর হবে, দেখতে শ্যামলা,পাঁচ ফিট ৩ ইঞ্চি,চুলগুলো সিল্কি আর ছড়ানো,একেবারে যাকে দেখে খুব সুন্দরী না বললেও কিউট,মিষ্টি, বা ইনোসেন্ট বলা  যেতে পারে। তাছাড়া তার এক ধরনের বিশেষ গুন সে নিজেকে সবসময় গুছিয়ে,পরিপাটি করে রাখে যা দেখে  একেবারে খুব সুন্দরী না লাগলেও বেশ স্মার্ট লাগে। বলা চলে আলোর পোশাক, ডিজাইন,ম্যাচিং করা,কথা বলার স্টাইল আর গুছিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টায়ই আলো হয়ে ওঠেছে আরও  স্মার্ট।

ছোটবেলা থেকেই আলো নিজেকে এভাবেই পরিপাটি করে রাখে,স্টাইল পছন্দ করে। আলো আসলে স্বাধীনচেতা,স্বনির্ভর আর প্রতিবাদী মেয়ে। অন্ধকারের কুপে থাকার মত আলো নয়। তবে কেন আলো এখন বদ্ধ কুপে নিজেকে আবদ্ধ করে রেখেছে? জানতে হলে  যেতে হবে আলোর পিছনের গল্পে,,,,,

আলোর জন্ম রংপুর সদরের একটা গ্রামে হলেও আলোর পরিবার অভিজাত,আধুনিক,শিক্ষিত আর,সাংস্কৃতিকমনা। তাই বলে তারা যে ধার্মিক নয় তা কিন্তু নয় ?  আলোর দাদার বাবা,মা,দাদীসহ অনেকেই সেইসময়ের হজ্জ করা বলা চলে তারা ধার্মিক ও আধুনিক দুটোটেই মিশ্রিত। তার বড় দাদু সেইসময়ের লন্ডনের পি এইচ ডি করা ডঃ তছলিমুদ্দিন। আলোর পরিবারের অধিকাংশই লন্ডনে থাকে, বাকিরা কিছু ঢাকায় কিছু রংপুরে তবে সবাই চাকুরীজিবী। আলোরা আসলে বংশগতভাবেই বড়লোক। এলাকায় সবাই তাদের পরিবারকে এক নামেই চেনে!

যাইহোক ছোটবেলা থেকেই আলো হাসিখুশি, চঞ্চল, দুরন্তপনা আর মেধাবী।  সে তার এই উড়নচন্ডিপনায় সবসময় মাতিয়ে রাখত পরিবারের সবাইকে।

“সিডিউস” শব্দটির বাংলা যে প্রলুব্ধ করা এইটকুই আলো জানত যখন সে ক্লাস এইটে পড়ে,কিন্তু এই সিডিউসের এতসব ব্যাখ্যা সে শৈশবে জানত না।

আলো ছোটবেলা থেকেই জিন্স,স্কার্ট,ফতুয়া,ফ্রক  অথ্যাৎ স্টাইলিশ টাইপের পোশাক পড়ত। আলো হালকা পাতলা গড়নের তাই যাই পড়ে তাতেই তাকে  ভালো লাগে।

একদিন আলোর বাড়িতে দূর সম্পর্কের এক দাদু পুলিশের ওসি এলেন। তিনি আলোর চাচীর দূর সম্পর্কের আত্নীয়। দাদুরা নাতি নাতনীদের ডেকে মজা করে এটাই স্বাভাবিক। তাই তিনিও আলোকে ডেকে কুশল বিনিময় করে চট করে গল্পের ছলে সবার সামনেই ইনিয়ে বিনিয়ে আলোর গলার চেইনটাতে হাত দিয়ে বাহ!তোমার চেইনটা তো খুব সুন্দর!! বলে বার বার গলায় হাত দিচ্ছিল। ঐ বয়সে আলো গুড টাচ,ব্যাড টাচ ব্যাপারটা ফিল করত ঠিক সেইকারনেই টাচের ধরনেই আলো চরম অস্বস্তিতে নিজেকে ছাড়িয়ে দূরে বসতেই আলোর কাজিন পিচ্চি( বয়স ৪/৫ বছর হবে,দেখতে সুন্দর আর মোটাসোটা আর নাদুসনুদুস) তাকে সেই দাদু কোলে নিয়ে গালে বার বার চুমু দিচ্ছিল আর পিঠে খুব বাজেভাবে হাত দিচ্ছিল। সেই পিচ্চিতো জানত না টাচের ধরন তবুও  কোন কারন ছাড়া নিজেকে সরিয়ে নিতে চাচ্ছিল বিরক্তিতে । এরপর আলো তার মাকে বিষয়টি জানালে তার মা পরবর্তীতে সেই দাদু আসলে এভয়েড করত।

আলোর চেয়ে ৪ বছরের ছোট আরেক কাজিন তখন বাসায় প্রাইভেট পড়ত। শহরের নামকরা স্কুলের স্বনামধন্য এক টিচার প্রতিদিন পড়াতে আসত।

সেরকমভাবেই এক দিন সবাই কাজে বাইরে গেছে,আলো তার কাজিন আর কাজের মেয়ে বাড়ীতে ছিল। টিচার আসার আগেই তার কাজিন আলোকে পাশে বসে থাকতে বলে. টিচার পড়ানোর সময় আলো একটু বাইরে বেড়িয়ে এলে সেই ফাঁকে টিচার তার কাজিনের হাতে হাত নাড়তে থাকে,আর পায়ে পা ঘষতে থাকে,প্রচন্ড অস্বস্তিতে তার কাজিন সেখান থেকে দৌড়েঁ পালিয়ে যায়।

আজকের পত্রিকায় বড় বড় অক্ষরে ছাঁপা হয়েছে

“পোশাকের কারনেই ছেলেরা সিডিউস হয়”

আচ্ছা ! যদি তাই হবে তবে শৈশবে তাদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আর বর্তমানে আলোর এই বদ্ধ জীবনের জন্য ও কি পোশাক দায়ী?? এসব ভাবতে ভাবতেই শব্দ শুনে আলো পিছন ফিরে তাঁকাতেই,,,,

ম্যাডাম আরেক কাপ চা দিবো আপনাকে??

আলো হুম হ্যা করে  তড়িঘড়ি করে পুরনো এলবাম থেকে তাৎক্ষনিক জগতে ফিরে আসে,,,,,,

ম্যাডাম  যে মেয়েরা শুধু ছোট পোশাক পরে,রাতে বাইরে থাকে শুধু  তারাই কি যেকোনো হ্যারাস বা ধর্ষনের শিকার  হয়??

আলো ঃ একেকজন একেকভাবে দেখে। তবে যদি পোশাকই প্রধান কারন হত!!!!(আনমনে বিরবির করতে থাকে আলো, শৈশবের ঘটনাগুলো ও কি পোশাকের জন্য দায়ী????)))) এছাড়া আমার আজকের এই পরিনতির জন্য কি পোশাক দায়ী নাকি মুখোশধারী মানুষ?)))))

কি বললেন ম্যাডাম,বুঝি নাই,,,

আলো ঃ খানিক  ম্লান হেসে ঘন্টা বেঁজে গেছে থাকেন, ক্লাস নিয়ে আসি।।।।। ক্লাস শেষে বাকিটা এসে বলব।।।।

ছবিঃ নেট থেকে।।।

২৭২জন ৭৪জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ