সিগারেট

রুমন আশরাফ ১৪ নভেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ০৪:১৭:৪৪অপরাহ্ন রম্য ১৮ মন্তব্য

অনেকক্ষণ ধরেই কাদের কিসের যেন একটি হিসেব করছে। ঠিক ধরতে পারছি না কিসের হিসেব। ওর পড়ার টেবিলটি আমার টেবিলের ঠিক উল্টো পাশে। আমি ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকালাম ওর দিকে। চেয়ারে বসে টেবিলের দিকে ঝুঁকে আছে সে। কিছুক্ষণ পর মাথাটি উঁচু করে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে রইল। এবার কি কি যেন বলল বিড়বিড় করে। পিছন থেকে আমি তাকিয়ে তাকিয়ে ওর কাণ্ড দেখছি। বিড়বিড় শেষে ঠিক আগের মতই মাথাটি নিচু করে টেবিলের দিকে ঝুঁকে রইল। এবার লক্ষ্য করলাম না সূচক মাথা নাড়ছে। ওর এমন কাণ্ডকারখানা দেখে আমি কিছুটা ভড়কে গেলাম। পাগল টাগল হয়ে যাচ্ছে নাতো! সকাল থেকেই কেমন যেন চিন্তিত দেখাচ্ছিল ওকে।

 

আমি চেয়ার ছেড়ে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালাম। ধীরেধীরে এগিয়ে ঠিক ওর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। এমুহূর্তের আমার অবস্থানটি ও মোটেও টের পেল না। মনে হচ্ছে খুব জটিল কোনও হিসেবে মগ্ন। সংখ্যাবাচক তথা অঙ্কবাচক কিছু লেখা দেখলাম ওর খাতায়। এর মধ্যে বেশ কিছু জায়গায় কাটাকাটিও করেছে দেখছি। সরল অংক করছে নাকি সুদকষা করছে নাকি চূড়ান্ত হিসেব করছে, কিছুই বুঝা গেল না। আমি সরবে কৃত্রিম একটি কাশি দিলাম। উচ্চস্বরে আকস্মিক এমন কাশির শব্দে ও চমকে উঠলো। ঘুরে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিল। ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেও ওর এই হাসির সাথে আমি মোটেও পরিচিত না।

 

আমরা দুজন এই রুমে আছি প্রায় দুবছর ধরে। মুচকি হাসিরও যে প্রকারভেদ আছে তা ওর হাসি না দেখলে বুঝতে পারতাম না। আমি কিছু বলার আগেই ও বলল, “দোস্ত খুব জটিল একটা হিসাব করতেছি রে, কিন্তু হিসাব আর মিলে না। চিন্তা করি একটা আর খাতায় লেখি আরেকটা। এদিকে বাস্তবে হয় আরেকটা”। কৌতূহলী হয়ে আমি আমার চেয়ারটি টেনে নিয়ে ওর পাশে বসলাম। ভ্রু কুঁচকে হতাশা কণ্ঠে বললাম, “কি কইলি পাগলের মত কিছুই বুঝলাম না”। কাদের আমার কথায় সামান্য একটু আহত হল বলে মনে হল। বিরক্ত আর চিন্তিত মিশ্রিত একটি ভাব নিয়ে বলল, “আমি বহুত চেষ্টা করতেছি সিগারেট খাওয়া কমাইতে অথবা ছাড়তে। কোনটাই করতে পারতেছি না। প্রতিদিন ভাবি আজকে দুইটা সিগারেট কম খামু। কিন্তু একদিন কম খাইলে পরেরদিন একটা বেশি খাই। ভাবছিলাম আস্তে আস্তে কমাইয়া তারপর ফাইনালি ছাইড়া দিমু আর টাকা সাশ্রয় করমু। গত মাসে অনেক কম খাইসিলাম। কিন্তু এইমাসে একটু বেশি খাইছি। চিন্তা করতাছি সামনের মাসে প্রতিদিন দুইটা কইরা খামু তারপর তার পরের মাস থেকে একদম বন্ধ। সন্ধ্যা থেকে এগুলা চিন্তা করতে করতে মাথা পুরা আউলাইয়া গেছে রে”।

কথাগুলো বলতে বলতেই প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট বের করে নিজের ঠোঁটে গুঁজে দিল। টেবিল হাতড়ে ম্যাচ খুঁজতে লাগলো। আমি ওর বিচলিত অবস্থা দেখে ওর দিকে ব্যথিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। মনে মনে ভাবছি এহেন অভ্যাস মানুষকে কতটা অস্থির করে তোলে।

১৫৭জন ৬৭জন
11 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য