আমি একটা পয়সা। স্বাধীন বাংলাদেশে আমার জন্ম হয়েছিল। পয়সা মানে জানেনতো?  টাকার ভগ্নাংশ রুপকে পয়সা বলা হয়। আরেকটু সহজ করে বলি, প্রতিটি দেশেই বিনিময় মুদ্রা থাকে। একেকে দেশের ভাষা অনুযায়ী তাদের প্রচলিত মুদ্রার বিভিন্ন নাম দেওয়া হয়। যেমন আমেরিকায় ডলার, সৌদিতে রিয়েল, কুয়েতে দীনার, ভারতে রুপি, ইত্যাদি ইত্যাদি, তেমনি বাংলাদেশী মুদ্রার নাম দেওয়া হয়েছে “টাকা”।

১৯৭১ এর দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তান নামক দেশটি স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যে দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে নিজের স্থান করে নিয়েছিলো।

সেই থেকে শুরু, স্বাধীন বাংলাদেশে সরকার গঠন, পাশাপাশি পুর্বের সব কিছু পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রয়োজন হয়েছিল নিজেদের জন্য  নিজস্ব মুদ্রার প্রচলন ব্যবস্থার, মুদ্রা তৈরী করা। সর্বজনের নিকট বাংলাদেশী টাকার প্রচলন শুরু হয়েছিল ১৯৭২ এর ৪ঠা মার্চ থেকে। দেশে পঁচিশ পয়সার প্রচলন শুরু হয় ১৯৭৩ সাল থেকে।

টাকা কাগজের তৈরী, আমি তার ভগ্নাংশ, তাই বলে আমি কিন্তু কাগজের তৈরী নই! শুধু আমি কেন! এক থেকে পঞ্চাশ পয়সার কেউই আমরা কাগুজে নোট হয়ে জন্মাইনি। আমাদের এমনিতে পয়সা বলা হলেও সংখ্যা অনুসারে আমাদের কিছু আদুরে নাম দেওয়া হয়েছে। যেমন একদম ছোটকে বলা হয় এক আনা, পঁচিশ পয়সায় চার আনা/সিকি, পঞ্চাশের নাম আট আনা/আধুলি!
সেই হাল ধরে রাখতে আমি পঁচিশ পয়সার চারআনা, আদুরে নাম পেয়েছি সিকি।

একটা কথা ভাবতেই আমার বুক গর্বে ভরে উঠে। যদিও অনেকেই জানে, তবুও বলি.. আমার জন্ম বাংলাদেশ সরকারের টাকশালে, ১৯৭৩ এ। আমি আমার ভাইবোনদের মধ্যে ৪র্থ। আমার বোনদেরকে (এক / পাঁচ/ দশ পয়সাকে) এ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরী করা হলেও আমাকে তৈরী করা হয়েছে ইস্পাত দিয়ে। এরপর অবশ্য আধুলি ভাইয়াকেও ইস্পাত দিয়ে বানানো হয়েছে, কিন্তু তাতে কি! আমি-ই তো সরকারের তৈরী প্রথম স্টিলের পয়সা! বাংলাদেশ সরকারের টাকশালে তৈরী স্টিলবডির প্রথম মুদ্রা হিসেবে আমার নামই ইতিহাসে লেখা আছে/থাকবেও। আমার সর্বশেষ সংস্করণ করা হয়েছিল ১৯৯৪ তে। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত অবিকৃত অবস্থানেই আছি। এখন বলুন, এমন রেকর্ড ধারণ করার পর গর্বিত না হয়ে কি থাকা যায়!

আমার সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার আগ্রহ হলে এখানে ক্লিক করতে পারেন।

টাকশাল
হাট-বাজার
অফিস ফেরতা কেরানী
বৃদ্ধ দাদার লুঙ্গির গিঠ
শিশুদের চঞ্চল মুঠো
খেলার মাঠ
লুডুর ছঁক
গৃহিণীর মাটির ব্যাংক
দাদীমার জর্দার কৌটা
মুদির দোকান
খেয়া পাড়ের মাঝি
ভিখিরির টিনের বাটি

কোথায় ছিলাম না আমি!
আমি জন্মের পর হতেই গতিশীল ছিলাম। একটা সময়ে হাতে-হাতে ঘুরে ফিরেছি জীবনের পথে। প্রয়োজনে, আয়োজনে সবখানেই আমার বিচরণ ছিলো। কিন্তু সময়ের সাথে, আলোর গতির সাথে অথবা নদীর স্রোতের সাথে পাল্লা দেয়ার সাধ্য কি কারো থাকে? আমারও ছিলো না। একটা সময় আমাকে থেমে যেতে হয়েছে। এই প্রজন্মেরা হয়তো জানেও না আমি আমার প্রজন্মে কত্ত সমাদৃত ছিলাম!

দুঃখে অন্তর পুড়ে যায়। কত কথা মনে চেপে রেখেছি। আজ যদি একটা গ্যাজেট হতাম, তাহলে হয়তো অনেকেই আমায় নিয়ে গবেষণা করতো।
যদি পয়সা না হয়ে একটা বই হতাম তাহলে আমার ভেতরে কত-কি পড়া যেতো।
আমার মাঝেও অনেক জানা/অজানা ইতিহাস আছে। গল্প আছে থরে থরে সাজানো।

নিজের কথা নিজে নিজে আর কত বলা যায়! একটা গল্প বলতে ইচ্ছে করছে, আবার ভীষণ  ঘুম পাচ্ছে! ইদানীং আমি সারাক্ষণ ঘুমিয়েই থাকি। ছোট্ট একটা বাক্সে ভীষণ নরম তুলতুলে একটা বিছানা পেয়েছি। মাঝে মাঝে জেগে উঠি এক আলতো হাতের ছোঁয়ায়। এখানে আসার পর মনে হচ্ছে এতদিনে আমি আমার সঠিক জায়গায় এসে গেছি। হুম গল্প টা বলেই ঘুমাচ্ছি, আবার কখন জাগবো কে জানে!

এক রাজ্যে ছিলো এক সৈনিক । সৈনিকের রক্তে ছিলো সমুদ্র জয়ের নেশা। জীবন যুদ্ধের যেকোনো অবসর মিলতেই সে ছুটে যেতো সমুদ্রের কাছে। দিগন্তের এপাড় থেকে ওপাড়ে গাঙচিল হয়ে উড়ে বেড়াতো দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে। তার বর্ণনা দিবো এমন শব্দ কই!

তার গতি বৈশাখী ঝড়ের মতো,
কণ্ঠে আষাঢ়-মেঘের গাম্ভীর্য,
দৃষ্টি জোড়ায় খেলা করে শরৎ আকাশের স্নিগ্ধ উজ্জ্বলতা,
হেমন্তের সোনালী ধানের মতো গায়ের রঙ,
তার কপালের ঘাম শীত-ভোরের শিশির বিন্দু,,
আর বাসন্তী রঙে রাঙানো এক সুবিশাল মনোহরি মন!

আমি মানুষের সৌন্দর্য-বর্ননার ভাষা জানি না, শুধু জানি এই সৈনিক আমার দেখা সুন্দর মানুষের মাঝে সর্বোত্তম। সেই সৈনিক একদিন ভালোবেসে ফেললো তার বিপরীত একজনকে।

প্রেমিকা সৈনিক ছিলো না, গাঙচিলের মতো উড়তে পারবে এমন একজোড়া ডানাও তার ছিলো না।
তার হাতের তালুতে গোলাপ ছিলো,
হৃদয়-সমুদ্রে অস্পষ্ট কিছু স্বপ্ন ছিলো,

সৈনিক সেই অস্পষ্ট স্বপ্ন গুলো স্পর্শ করতে চাইলো। বিনিময়ে মেয়েটির একটাই চাওয়া ছিলো। একটা সিকি পয়সা!!
সৈনিকের সওদাগর হতে মাত্র দুই বছর লেগেছে।….

সিকি পয়সাটি এখন ঘুমিয়ে আছে শ্বাশত এক প্রেমের গল্পে।

 

 

* তথ্যসূত্র- Wikipedia and Google
* ছবি- আমার 🙂

৬৫৮জন ১৭৩জন
0 Shares

২৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য