(১)

মাদ্রাসায় মাওলানা সাহেব পিটিয়েছেন তো কি হয়েছে ব্যাপার বলে মনে করি না। উনারা যদি আরবি শিক্ষা পিটিয়েই করাতে হয় ভাবেন তাও ঠিক আছে। কারণ উনারা তো রাষ্টীয় কোন সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা করেন না। আর রাষ্ট্রতো মাদ্রাসা বিভাগ গুলোর জন্য আলাদা কোন আইন তৈরি করেননি। কোন ছাত্রকে পেটানো যাবে না–এ আইন আছে কি আদৌ? যদিও বলা আছে পেটানো যাবে না তা স্কুলের জন্য প্রযোজ্য। মাদ্রাসার জন্য হয়নি।

 

কিছু শিক্ষক আগে ছিলেন পেটাতেন। তবে কখনওই এত ছোট ছাত্রকে এমনভাবে মারতে দেখিনি।

 

মনে পড়ে বাবার বি আর ডিবি তে চাকুরীর সুবাদে  নারায়ণগঞ্জ ধামগর ইউনিয়নের বুনিয়াদি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম। পড়াশুনার জন্য কখনওই কুটনা বা পিটনা কখনোই খাইনি। রোল নাম্বার ১ ছিলো। ছিলাম ক্লাস ক্যাপ্টেন।  সে ক্লাস ফোরের কথা। পরিসংখ্যানে আয়তনে খুব ছোট কিউট ছিলাম।। খুব দুষ্ট ছিলাম,বাড়ির গাছের পেয়ারা ও বাড়ির গাছের বড়ই পেড়ে না খেলে সেদিন শরীর কিসমিস করতো। তো একদিন এক বড়ই গাছে ঢিল ছুড়েছিলাম। সে ঢিল গিয়ে লেগেছিল আমারই সহপাঠী ও বাড়ির কন্যা কল্পনার  গায়ে। রক্তারক্তি কাণ্ড। পালিয়ে বাঁচতে পারিনি। পাশের বিলে বটগাছে ঘুমিয়ে ছিলাম।আজিজ স্যার আমাকে সেই বিলের মধ্যে বটগাছ থেকে ধরে চার ঘা বেত মেরেছিলেন। দুদিন স্কুলে আসিনি। বাড়িতেও বলিনি। প্রধান শিক্ষক স্যার খোঁজ নিতে বাড়ি গিয়েছিলেন। আম্মা তখন রাধছিলেন। তিনি আমাকে আম্মার কাছ থেকে নিয়ে আমাকে কাঁধে চড়িয়ে স্কুলে নিয়ে গেছিলেন।

 

আজিজ স্যার আমাকে মারলেও সেদিন আমাকে তার বাড়ি নিয়ে গিয়ে আদর করেছিলেন। ভুলতে পারিনি আজোও।

 

এ মার অবশ্য মাঝে মাঝে ভালোবাসায় পরিণত হয়।

 

এখন আমি আর না হোক শিক্ষিত হতে পেরেছি। মানুষ হতে পেরেছি। সেদিন যদি আদর না করতেন সে মার আমার জীবনে দাগ কেটে যেতে পারতো।

 

আমার শিক্ষকরা প্রত্যেকে এখনও আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসেন। কেন তা জানি না।

 

মেরেছেন ভালো কথা।  আদর দিন। স্নেহ করুন। মেরে শিক্ষা করানো জরুরী নয়। চাপিয়ে দেয়া শিক্ষা ক্ষতিকর।

 

প্রত্যেক শিক্ষককে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তা স্কুলের হোক বা মাদ্রাসারই হোক। মহানবী (সা) কে তায়েফে যেভাবে কাফেররা মেরেছিলো তাতে তিনি তাদের উপর বিন্দু মাত্র রাগ বা ক্ষোভ প্রকাশ করেন নি। রাগ প্রকাশ ইসলাম সমর্থন করে না। মাননীয় হুজুর যেভাবে মেরেছেন তা যদি বেজায়গায় লাগতো ছেলেটি মারা যেতে পারতো। উনার রাগ দেখে মনে হলো উনি ইসলামের প্রকৃত শিক্ষাটা নিতে পারেননি।  সে শিক্ষাটা আল কুরআনেই আছে। এজন্য আল কুর আনের পাশাপাশি অন্য শিক্ষা,নীতি আদর্শ শিক্ষা জরুরী। উপদেশ দেবার দৃষ্টতা আমার নেই।

 

শুধু বলা–

শিশুরা ফুল,সুগন্ধ ছড়ায়

শিশুরা মাটি আদরে সবদিকে নেয়া যায়

শিশুরা মেমরি কার্ড সব জমা রাখতে পারে

শিশুরা সিপিইউ, মনিটর, সব প্রকাশ করতে পারে।

আপনি যা দিবেন,যেভাবে দিবেন সে নেবে। আদর দেবেন সবচেয়ে ভালোটাই দেবে। আমার ছেলেটা খুব ভোরে ঊঠে মক্তবে যায়,কুরআন শেখে। লক্ষ্য করে দেখেছি হুজুরের সাথে তার বেশ খাতির। প্রথমে যেতে চাইত না। এখন এমনিতেই যায়। বলতে হয় না। শুধু ঘুম থেকে তোলে দিতে হয়।

 

 

পুরান কথায় যাই,সেই কপাল ফাটা কল্পনার সাথে পরে আমার বেশ খাতির হয়েছিল। স্কুলে যাবার পথে আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতো। আমরা গলাগলি ধরে যেতাম। এখনও চোখবন্ধ করে শৈশব নিয়ে ভাবলে তার অমল ধবল মুখখানি মনে পড়ে। সে বই হাতে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায়। জানি না তাহার আমি ঠিকানা।

 

(২)

 

মাদ্রাসা বন্ধ চান? কয়টা ভিন্ন এতিমখানা খুলেছেন যেখানে এতিম শিশুরা সাধারণ শিক্ষা নেবে? এতিমখানা কি শুধু আরবি শিক্ষার জন্যই খোলা হবে কিন্তু সাধারণ শিক্ষার জন্য কেন খোলা হবে না বলতে পারবেন কি?

 

আমি চাই আরবি শিক্ষার জন্য এতিম খানা থাকলে সাধারণ শিক্ষার জন্যও থাকতে হবে। থাকা উচিতও। তা না করে মাদ্রাসা বন্ধ চান? বেশতো। আপনার বুদ্ধির তারিফ করতে হয়।

 

আপনি মুখে বলবেন, ইসলামী শিক্ষা চাই না। কিন্তু বন্ধ করার বিকল্প চিন্তা করছেন না? বন্ধ করতে পারছেন না ওয়াজ মাহফিলের সেই বিখ্যাত কথা,আমহের একটা পুতেরে হাফেজ বানায়ালাইন!!!!

 

হাফেজ বানাইবেন যেভাবে স্বভাব চরিত্রও তেমনই হবে। আপনি যদি হাফেজিয়া এতিম খানায় কষ্ট করাইতে করাইতে বানান তাইলে তার চরিত্র কেমন হবে ভাবুন। আর যদি বলেন, দান দক্ষিণা  না খাওয়াইয়া নিজের সম্পত্তি বিক্রি কইরা ইসলামের স্বার্থে একটা হাফেজ বানাবেন তাইলে এক কথা।

 

একটা গল্প বলি,আমি যখন ইন্টার পড়াশুনা করতাম,আমাদের এক বন্ধু ছিলো বাবা ছিলেন গ্রাম পুলিশ। ছেলেটি মেধাবী দেখে আমরা সবাই সাহায্য তো করতামই স্কুল কলেজ থেকেও সে ফ্রি অনেক সুবিধা পাইতো। ছেলেটি পাশ টাস করে এক কলেজে চাকুরী নিলো। কিছুদিন পরে শুনলাম সে টাকার বিনিময়ে প্রক্সি চাকুরী পরীক্ষা দিতে গিয়ে জেল খাটে। বাবা মাকে সে পরে আর দেখেনি। সে জীবনের প্রথম থেকেই পাচ ওয়াক্ত নামাজ –চিল্লা-নেসাবে যেতো।

 

কিন্তু কি হলো? অংক কি মিলল? না মেলেনি। তার সাথের আমরা এমন হতে পারিনি।

তো পুতেরে  যে দান দক্ষিণায়  হাফেজ বানাইবেন,গোষ্ঠীর চৌদ্দজন যে  বেহেশতে নিয়া যাবে,তার ফজিলত কতটুকু পাবেন ভেবে দেখুন।

 

আজ পত্রিকায় দেখলাম জনৈক পীর সাহেব বলেছেন মানুষকে পরকালমুখী হতে হবে। তো আপনি কোন মুখী? বাৎসরিক নজরানা যে নিচ্ছেন তা কতটুকু যায়েজ? প্রিয় নবী (সা) কি নজরানা নিতেন? হযরত বড় পীর (র) কি নজরানা নিতেন?

 

দুনিয়াতে এই যে ১০০০ কোটি মানুষ তার জন্য আপনি যদি কিছু না করেন,তারা কি আল্লাহু তায়ালার পথে আসবে? না আসলে আল্লাহ আপনাকে কি করবেন? ভেবেছেন? আমরা ৩০০কোটি মুসলমানেরা আল্লাহর দাওয়াত প্রত্যেকের কানে পৌছাতে পেরেছি? এত সোজা নয় বেহেশতে যাওয়া। তিল পরিমান হারাম,তিল পরিমান হিংসা রাগ যদি মনে থাকে ত্যাগ করতে হবে? আপনি খোদার বাগানে ঘুরবেন, তাঁর গাছগাছড়া মাটিতে পানি দেবেন না,আগাছা বাছবেন না, তিনি আপনাকে ছেড়ে দেবেন ভাবলেন কি করে?

 

তিনি যদি জিজ্ঞাসা করেন তুমি তোমার পৃথিবী ও বংশধরদের জন্য কি করেছো, তখন কি বলবেন? আল্লাহ এই পৃথিবী বানিয়েছেন আমাদের জন্য পরিচর্যা যদি আমরা না করি,আমার বিশ্বাস তিনি আমাদের ছাড়বেন না। পৃথিবীর পরিচর্যাও করতে হবে আল্লাহর পায়ে সেজদাও দিতে হবে। পৃথিবীর নিশ্বাস নিয়ে বেঁচে তার জন্য কিছু না করে পরকালে যাবেন,একদম মরে যাবেন। পৃথিবী হাততোলে যখন আল্লাহর কাছে বলবে, আল্লাহ তোমার বান্দা আমার সাথে বেঈমানি করেছে আপনি কি বেঁচে যাবেন?

 

সুতারাং ভাইলোক,যাই করেন,প্রাকৃতিক বেঈমান হইয়েন না। মানুষের সাথে বেঈমানি করলে যদি আলাহর কাছে হিসাব দিতে হয়,পৃথিবীর সাথে করলেও দিতে হবে।

 

তাই বলি আরবি লাইনের মাদ্রাসা, এতিমখানার পাশাপাশি সাধারণ এতিমখানাও করতে হবে।  সংখ্যা বাড়াতে হবে,বিকল্প ভাবতে হবে।

যা আছে থাক। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এই যে কোটি কোটি হাফেজ বানাইছেন তারা যাবে কোথায়? এই শিক্ষাতো পরকালের শিক্ষা,তারা তা নিয়া খাবে কী? তাদের কি কোন কাজে লাগাইতে পেরেছেন?

দেশের বিশাল একটা শ্রেণি আকামা, সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতরা দেশের জন্য গাধার খাটুনি খাটে, স্রেফ নামাজ রোজা ছাড়া আল্লাহ বিল্লার সময় পায় না,তারা মাস শেষে আল্লাহর পথে দান করে কিছু পূন্যের জন্য। আর তাহারা কেমন গর্জাইয়া গর্জাইয়া চলে,ভাবতে অবাক লাগে।

জীবন চালানোর জন্য হাফেজিয়া শিক্ষা নয়,আল্লাহর পবিত্রবাণীকে পৃথিবীতে যুগযুগান্তর বাঁচিয়ে রাখার জন্য কুর আনে হাফেজ হওয়া বা হইতে হবে।

জীবন ও পৃথিবীকে রক্ষার জন্য অন্য শিক্ষা যা হতে হবে বিজ্ঞান সমৃদ্ধ।

আল্লাহ এই মহা বিশ্বের মালিক। এক পৃথিবী নিয়া তিনি চিন্তা করেন না,তিনি যে পরিশ্রম করেন তা আপনি আমি ভাবতেও পারবো না।

শুধু এটুকু ভাবুন,একটা মনুষ্য তৈরি কম্পিউটার চালাইতে শেখা থেকে চালনা পর্যন্ত কী পরিশ্রম করতে হয়। কত কোটি লোকবল লাগে?

আর তিনি এই মহাবিশ্বের চিন্তায় মশগুল। আপনাকে বানিয়ে তাঁর বিপদই হয়েছে। আপনি আমি যে গন্ডগোল করি তাতে তিনি এতটাই বিরক্ত যে চার চারটি গ্রন্থ সহ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল কুরআন লিখে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিতে হয়েছে। তবুও তা বুঝে পড়ছেন না। সেটিকে তার কাজে না লাগিয়ে নিজের বাঁচার অবলম্বন হিসেবে নিচ্ছেন। সাধুবাদ আপনাকে!!!

আসুন সময় আছে গতানুগতিক চিন্তা না করে একটু ব্যাতিক্রম চিন্তা করি। তারজন্য নাস্তিক হবার প্রয়োজন নেই। দিব্যচিন্তার চক্ষু খোলে উঁকি দিয়ে দেখুন। দেখবেন,যা করছেন তাতে অনেক অনেক ভুল আছে। শুদ্ধতা আনুন। জীবন আরো সুন্দর হবে।

২১৪জন ৯৭জন
12 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ