সাদা-কোমরের পাখি (পর্ব-৫)

শামীম চৌধুরী ১ ডিসেম্বর ২০২০, মঙ্গলবার, ০৬:১২:৩৮অপরাহ্ন পরিবেশ ১৭ মন্তব্য

আগের পর্বের লিঙ্কঃ চাঁদির মতন ঠোঁট (পর্ব-৪)

পর্ব- ৫

বার্ড ফটোগ্রাফীর শুরু থেকেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাখির ছবির জন্য যেতে হয়েছে। যেখানেই নতুন পাখির তথ্য পেয়েছি সেখানেই একা বা কাউকে সঙ্গী করে ছুটে গিয়েছি। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি পাখির ছবি তোলার জন্য। সত্যিকার অর্থে ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফী খুবই ব্যায়বহুল একটি শিল্প। দামী ক্যামেরা ও লেন্স না হলে পশু-পাখির ছবি তোলা সম্ভব না। কারন পাখি মানুষের মতন কথা শুনে না। তারা আমাদের হাতের কাছে এসে বসে থাকে না। বরঞ্চ প্রতিটি ফটোগ্রাফারকে পাখির পিছনে ছুটতে হয়। কাজটি যেমন পরিশ্রমের তেমন আনন্দের।
 
এই মুনিয়া প্রজাতির শুধুমাত্র এই পখিটির ছবি তোলার জন্য আমার খরচ হয়েছিল ১৬০০০/-টাকা। ২০১৬ সালের আগষ্ট মাসে গিয়েছিলাম কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে। সেখান থেকে বড়ছড়ায় পায়ের গিরা সমেত পানিতে হেঁটে প্রায় ১০ কিলোমিটার যাই। ছড়ার দুই পাশে পাহাড় ও উচু গাছ ছাড়া নজরে কিছুই আসে না। আর বণ্য হাতির উপদ্রবতো আছেই। আমার কাছে তথ্য ছিলো এই ছড়াতে পাখিটির দেখা পাওয়া যায়। কষ্ট করে যেয়েও তখন পাখিটির ছবি তুলতে পারি নি। সেইবার মনে কষ্ট নিয়ে ঢাকা ফেরত আসলাম। সেই বছরেরই সেপ্টেম্বর মাসে অনুজ ফটোগ্রাফার ডাঃ শামীম রেজওয়ান ফোনে জানালো কাপ্তাইয়ের ব্যাঙ ছড়ায় পাখিটি দেখা গিয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে শামীমকে বললাম আজ রাতেই কাপ্তাই যাবো। তুমি প্রস্তুত হও। কথার বলার সঙ্গে সঙ্গে শামীম রেজওয়ান বাসের টিকিট ক্রয় করে আমাকে জানালো। আমরা রাতের বাসে রওনা হলাম। ভোরে কাপ্তাই পৌছে ব্যাঙছড়ায় গেলাম। সারাদিন ঘুরে ঠিক সন্ধ্যার আগ মুহুর্তে দেখা পেলাম। দুবারে মোট ষোল হাজার টাকা খরচ হলেও White-rumped Munia বা সাদা-কোমর মুনিয়ার পাখিটির ছবি তুলতে পারায় সব কষ্ট ও অর্থের শোক ভুলে গেলাম।
 
White-rumped Munia বা সাদা-কোমর মুনিয়া Estrildidae (ইস্ট্রিল্ডিডি) গোত্র বা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত Lonchura (লঙ্কুরা) গণের অন্তর্গত এক প্রজাতির ছোট তৃণচর পাখি। এদের মুখ ও ঘাড় বাদে পিঠ মধ্যম বাদামি, দেহতল হালকা খয়েরি। সাদা-কোমর মুনিয়ার কোমর সাদা ও কালো লেজবিশিষ্ট ছোট আকারের পাখি। এর দৈর্ঘ্য কমবেশি ১০ সেমি, ডানা ৫.২ সেমি, ঠোঁট ১.২ সেমি, পা ১.৫ সেমি, লেজ ২.৭ সেমি ও ওজন ১২ গ্রাম। গায়ের রঙে গাঢ় কালচে বাদামি ও সাদার প্রাধান্য। হঠাৎ দেখলে সাদা-কালোই মনে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির পুরো পিঠ কালচে বাদামি, কোমর সাদা। দেহের পেছনে সূক্ষ্ম ফিকে শরযুক্ত লম্বা দাগ রয়েছে। লেজ-উপরি ঢাকনি ও ডানা-ঢাকনি কালো। লেজ সূচালো ও কালো। বুকে সূক্ষ্ম ফিকে আঁশের দাগ রয়েছে। পেট হালকা পিত-সাদা। পেটে কিছু লম্বালম্বি কালচে দাগ রয়েছে। বুক কালচে-বাদামি ও অবসারণী কালচে। এর ঠোঁট দুই রঙের। উপরের ঠোঁট কালো এবং নিচের ঠোঁট স্পষ্ট নীলচে ধূসর। চোখ লালচে বাদামি। পা ও পায়ের পাতা কালচে ধূসর। স্ত্রী ও পুরুষ পাখির চেহারা একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির কোমর হালকা রঙের এবং দেহতলে নানান বাদামি ছোপ থাকে।
 
সাদা-কোমর মুনিয়া মাঝারি ঝোপ, বনের ভেতরের পরিষ্কার জায়গা, তৃণভূমি ও ক্ষুদ্র ঝোপে বিচরণ করে। সচরাচর ১০-১৫টি পাখির ঝাঁকে থাকে। মাটিতে লাফিয়ে লাফিয়ে বা ঘাসের মধ্যে এরা খাবার খুঁজে বেড়ায়। খাদ্যতালিকায় রয়েছে ঘাসবীজ ও বাঁশবীজ, তবে ছানারা পোকা খায়। এরা সচরাচর করুণ কণ্ঠে ডাকে ট্রি-ট্রি-ট্রি…প্রিট… অথবা ব্রিট…। মে-আগস্ট প্রজননকাল। ছোট ছোট গাছের উঁচু শাখায় বড় আকারের ঘাস বা বাঁশপাতা দিয়ে ছোট্ট গোল বাসা বানায়। বাসায় ঢোকার পথ সরু নলের মতো। ঘাসফুল দিয়ে পথের ভেতরটা মুড়ে নেয়। বাসার ভেতরেও থাকে ঘাসফুলের গদি। স্ত্রী মুনিয়া ৩-৮টি ধবধবে সাদা ডিম পাড়ে। ডিমের মাপ ১.৫ × ১.০ সেমি। ডিম ফোটে ১৩-১৪ দিনে। বাবা-মা বাচ্চাদের পোকামাকড় খাইয়ে বড় করে তোলে।
 
এরা মূলতঃ পাহাড়ি অঞ্চলের পাখি। সচারচর লোকালয়ে দেখা যায় না। মাঝে মাঝে খাবারের অভাব হলে লোকালয়ে চলে আসে। রাজশাহীতে কয়েকবার দেখা গিয়েছিলো। বাংলাদেশে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি বনাঞ্চল দেখা যায়। ইহাছাড়াও মায়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায়, দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলঙ্কায় দেখা পাওয়া যায়।
 
এরা আমাদের দেশীয় আবাসিক পাখি। বাংলাদেশের বণ্যপ্রাণী আইনে এরা সংরক্ষিত। বিনা কারনে এদের শিকার বা বংশবিস্তারে বাঁধা দিলে জেল জরিমানা উভয় দন্ড দেবার কঠিন আইন আছে।
 
বাংলা নামঃ সাদা-কোমর মুনিয়া
ইংরেজী নামঃ White-rumped Munia
বৈজ্ঞানিক নামঃ Lonchura striata

 

৩০২জন ১৮১জন
0 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ