সম্বোধনে আপনি-তুমি-তুই//

বন্যা লিপি ৬ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার, ১১:০৯:১৫অপরাহ্ন বিবিধ ২৯ মন্তব্য

ছোটোবেলা থেকে আমি কিছু কিছু ব্যাপারে ভীষণ গোঁয়ার। বিনা কারনেই হোক আর যুক্তিহীন কারনেই হোক। মায়া’দির বাবা খাবার পানি সরবরাহ করেন বাসায়।আমাদের অঞ্চলে বলে ভাড়ওয়ালা।টিনের জারে করে দূরবর্তী টিউবওয়েল থেকে খাবার পানি আর রান্না করার জন্য পুকুর থেকে পানি সরবরাহ করতেন। মাসিক রোজকার টাকা রোজ পরিষোধ হতো। আম্মা রান্নাঘর থেকে একটা ডাক দিলেন, মায়া’দির বাবা আমার নাম ধরে ডেকে বললেন, ‘এ লিপি তোরে তোর আম্মায় ডাকে ‘ তখনি মাথায় রাগ ঝটকা মারলো হাইভোল্টেজে! সে কেন আমাকে তুই করে বলবে? মায়া’দির মা সাহায্যকারী হিসেবে আম্মা’র কাজে সাহায্য করেন, দেখে আসছি সেই ছোটোবেলা থেকে। তিনিও আমাকে কখনো তুই করে সম্বোধন করেন না। ওই বয়সে বোঝার জ্ঞান হয়নি যে, কার কাছ থেকে সৌজন্য আচরন আশা করছি। খুব ছোটোবেলা থেকে তাঁরা আমাকে বেড়ে উঠতে দেখছেন! ভালবাসা, আদরের আতিশয্যে তুই করে বলতেই পারেন! এতটুকু বোঝার মতো জ্ঞান তখন ছিলো না। বেড়ে উঠেছি এরকম নানারকম সম্বোধনের টানাপোড়েনের ধাক্কাধাকিতে।

সম্বোধনের বিষয় নিয়ে কেন লিখছি? বর্তমান সময়ে আমাদের সৌজন্যবোধ গুলো কেমন যেন ক্রমশঃ সংকীর্ণ হয়ে আসতে আসতে একটা বিদঘুটে পরিস্থিতীর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমার আব্বার ভাই,বোনের সংখ্যা সারা শহর জুড়ে ছড়ানো।বাপ চাচারা ৮ ভাই তিনবোনের বিশাল পরিবার। বাবা আমার পেশায় শিক্ষক, সাংবাদিক,সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব। কলিগ,সহকর্মী,ছাত্র/ছাত্রী যেমন অসংখ্য। তেমনি চাচা’দের বন্ধু বান্ধবের তো কোনো হিসেবই নেই। বাবার বড় এবং দাদা’র বড় প্রথম সন্তান/নাতনী হবার সুবাদে সবার আমি ভাতিঝি /নাতীন। সম্পর্কগুলো এমনই। শুধু রক্ত বা আত্মীয়তার বন্ধনে নয়,এমনি এমনি গড়ে গ্যাছে মুখে মুখে। অমুক চাচার বন্ধু অমুক কাকা। ফুপুর বান্ধবী ফুপু। কখনো মনে হয়নি এরা আত্মীয় নয় কোনো রকম ভাবে। তাই তাঁদের সব সম্বোধনে কখনো মেজাজের পারদ ওঠানামা করেনি।
মজার ঘটনা বলি দু’একটা।
নতুন বিয়ে হয়েছে। একদিন সাহেবের একজন বন্ধু’র বাসায় নিমন্ত্রনে গিয়েছি। বন্ধুর শ্যালিকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রী। পরিচয়পর্বের পালা শেষ। বন্ধুপত্নী এবং বন্ধুর কোনোরকম অসুবিধা হলোনা ভাবী আপনি বলে সম্বোধন করতে। কিছুক্ষন বাদে শ্যালীকা ভেতর থেকে এসে পাশের সোফায় এসে শুরু করলেন চাঞ্চল্য ভরা আলাপ।প্রশংসার তুবড়ির কথা আর নাইবা উল্লেখ করলাম! একফাঁকে ঠাস্ করে বলে বসলেন, তোমার বয়স তো অনেক কম! আমার থেকেও ছোটই হবে! আমি তোমাকে *তুমি*করে বলি?”
ভ্যাবাচেকা খেয়ে ফেললাম, খেতে না চাইলেও! মাত্র কয়েকঘন্টার জন্যই হয়তো আমাদের এই পরিচয়! এরপরে আর হয়তো আমাদের দেখাও হবেনা। দুলাভাইয়ের বন্ধুপত্নীকে আপনি সম্বোধনে তাঁর কি পরিমান কষ্ট হবে বা হচ্ছে? প্রশ্নটা করতে চেয়েও দমিয়ে রাখলাম কোনোরকম ইতিবাচক উত্তর না দিয়ে।

ঘটনা–২

তখন দুই বাচ্চার মা। মেয়েটার বয়স সাড়ে তিন বছর।ছেলটার বয়স মাত্র কয়েকমাস।
ঝালকাঠিতেই আছি অনেকদিন। বান্ধবীর সাথে মেয়েকে নিয়ে পার্কে বেড়াতে গেছি।বান্ধবী বললো তাঁর একজন বন্ধু জুটেছে কিছুদিন হলো। তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। পার্কের পাশেই তাঁর বাড়ি।ঝর্না চাইছে আমার সাথে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিতে।যেন আমি সেই বন্ধু,যার নাম আনন্দ,তাঁকে দু’কথা শোনাই। কারন সেই আনন্দ সাহেব আমার বান্ধবির প্রেমে পড়েছেন। যদিও বান্ধবির স্বামী আছেন। স্বামী দেশের বাইরে থাকেন। এক জন্মদিনের পার্টিতে দেখা তাহাদের দুইজনের। কিছুতেই মানতে চাইছেন না যে বান্ধবি বিবাহিত। ঝর্না আমার সাহায্য চাইছে। যথারিতী তিনি এলেন। ভদ্রতার নমুনা দেখে আমার পিত্তিজ্বলা শুরু হয়ে গেছে। এসেই খুব ওভারস্মার্টের সাথে আমাদের সামনে সিগারেট ধরালেন। এবং কথা বলা শুরুই করলেন তিনি আমার মাথায় বারুদের ঘসা দিয়ে… অর্থাৎ তুমি সম্বোধন করে। দাঁত কামড়ে সহ্য করছি।
কিন্তু মেনে নিচ্ছিনা। চাতুরী’র আশ্রয় নিতে হবে মনে মনে ঠিক করে নিলাম।
আনন্দবাবু তখনও ক্লিয়ার না যে আমিও বিবাহিত এবং দুই বাচ্চার মা, সাথে আমার মেয়ে। ঝর্না ইন্ট্রো দেবার পরও আনন্দ বাবু যথাবিহিত অবিশ্বাসের তকমায় স্মার্টনেস দেখিয়ে যাচ্ছেন। ঝর্না বললো, এইটা (আমার মেয়েকে দেখিয়ে) ওর মেয়ে, ” আনন্দ বাবু মনে হলো আমাকে চোর ডাকাতের চেয়েও অপরাধী ভাবলেন!
ডানে বামে মাথা প্রবল ভাবে ঝাঁকিয়ে বলে বসলেন ” অসম্ভব! হতেই পারেনা।”
লাজলজ্জার মাথা খেয়ে আমিও তাঁকে বোঝালাম একটা মেয়ের যদি একুশ/২২ বছর বয়সে মা হওয়াটা মোটেই অসম্ভব কোনো ব্যাপার না। আর মেয়েটা এই, ছেলেটা এখন নানির কাছে। আনন্দ বাবু চোখ কপালে রাখবেন না আকাশের ঠিকানা খুঁজবেন? ভেবে না পেয়ে ঘন ঘন সিগারেট ফুঁকতে আরম্ভ করলেন। কিন্তু দমলেন বলে মনে হলো না।
জানতে চাইলাম এস এস সি’র সন কতো? এবার ধরা!টেনেটুনে যা বললেন, তাতেও দু’বছরের জুনিয়র। আমিও সুযোগ না দিয়েই বলে বসলাম। “ওওও তাই? তুমিতো আমাদের দু’বছরের জুনিয়র, তো তোমাকে তুমি করেই বলা যায়। কিন্তু তুমি কেন আমাদের ‘তুমি’করে বলছো?
বেহায়া আনন্দ বাবু জবাব দেবার তাগিদ অনুভব করলেন না।

ঘটনা–৩

সেবারও ওই একই পার্কে চাচাতো বোনদের আর আমার দুই ছেলে মেয়ে’কে নিয়ে বিকেলে ঘুরতে গেছি।পার্কের ভেতরে বিশাল পুকুর।পুকুরের মাঝবরাবর কাঠের পাটাতন বেছানো ভাসমান মঞ্চ।ওখান থেকে পুকুরের মাছেদের খাবার ছুঁড়ে মারলে মাছগুলো পানির অ-গভীরে উঠে আসে।আমার বাচ্চারা মজা পাচ্ছিলো। মেয়ে বায়না ধরলো ওই পুকুরে নৌভ্রমন করবে। রঙিন দুটো নৌকা রাখা আছে বিনোদনের জন্য।কিন্তু চালক নেই।মেয়েকে বোঝাচ্ছি, “আম্মু কিভাবে নৌকায় চড়বে, আমি তো আর নৌকা চালাতে জানিনা”, খেয়াল করলাম হাত দু’য়েক দূরেই কয়েকটা বড়জোড় স্কুল অথবা কলেজ পড়ুয়া মেয়ে আমার কথার নকল করছে। আমি এখানেও হতবাক!
এই পিচ্চি পিচ্চি মেয়েগুলোর মধ্যে কোনো জড়তা নেই, সংকোচ নেই, অপরিচিত কাউকে এভাবে ভ্যাঙাচ্ছে?
সেধে কথা বললাম,পরিচয় দিলাম। মনে হলো না তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া হলো।
ওখান থেকে চলে এসে শহিদ মিনারের সিঁড়িতে বসেছি। বাচ্চারা খেলছে। বোনেরা মিলে গল্প করছি। মেয়ে গুলো ওখানেও চলে এলো। এবং আমাকে রাগিয়ে দিয়ে বলে উঠলো প্রথমবারের মতো,”এখানে কোথাও একটা চেইন খুঁজে পেয়েছো”?
আমি টাস্কি! এই পুঁচকে মেয়ে আমাকে “তুমি”করে বলছে? গলা চড়িয়ে বললাম, দেখো! তিন বাচ্চা’র মা হয়ে যাবার পরে তোমার মতো কলেজ পড়ুয়া মেয়ের তুমি ডাক শুনতে ভালো লাগছে না।আমি তোমার কোনো আত্মীয় বা বান্ধবী কেউ না” আমাকে এবং আমার চাচাতো বোনদের আরো একধাপ রাগিয়ে দিয়ে মেয়েটা বলে উঠলো….. “তুমি বললা আর আমি বিশ্বাস করলাম যে তুমি তিন বাচ্চার মা? এ মেয়ে কয়কি? আমি মেয়ে ছেলেকে এগিয়ে দিলাম। আমার মেয়েকে প্রশ্ন করে বসলো “বাবুমনি বলোতো এইটা তোমার খালামনি তাইনা!”

বোঝা গেলো মেয়েটা আমাকে কম বয়সি অথবা তাঁর নিজের সমবয়সী ভেবেছে বলেই হয়তো তুমি করে বলতে ইচ্ছে হয়েছে। কিন্তু এখনো ভদ্রতা বলে যে ব্যাপার গুলো আমরা সামলে চলার যথষ্ঠ চেষ্টা করি, সেখান থেকে বলা যেতে পারে আমরা সহজেই কাউকে তুমি বলে ডাকাডাকি করে বসতে পারিনা। কয়েকমাস আগেই সোনেলা গ্রুপে একজন এরকম আচরন করেছবলেন একজন নারী ব্লগারের সাথে কমেন্টে। তখনই কিন্তু প্রতিবাদ করেছিলেন অন্য ব্লগাররাও।কিভাবে কেউ একজন সহজেই অপরিচিত কাউকে তুমি বলে সম্বোধন করেন। এটা ভদ্রতার আওতায় পরেনা।এই লেখাটা আমি তখনই লিখতে চেয়েছিলাম।যে কোনো কারনেই হোক, লেখাটা লিখতে দেরি হলো।

শেষ করবো সাম্প্রতিক আরেকটা ঘটনা দিয়ে। মাত্র কয়েকদিন আগে একজন সাংবাদিকের রিকোঃ আসছে। দুদিন পর এ্যাক্সেপ্ট করেছি। এ্যাক্সেপ্ট করার কিছুক্ষনের মধ্যে ইনবক্সে নক্।
–ধন্যবাদ।
আমিঃ স্বাগতম
–কি নামে ডাকবো? বন্যা ইসলাম না বন্যা লিপি?
কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলাম মেসেজটার দিকে।আমি বন্যা লিপি নাম ব্লগে ব্যাবহার করি এ ব্যাটা জানলো কিভাবে,যে আমি ব্লগার বন্যা লিপি? যাই হোক…….

আমিঃ যেটা ইচ্ছা।
–আপনি/তুমি/তুই কোনটা বলে সম্বোধন করবো?

একবার ভাবুনতো পাঠকবৃন্দ! ব্যাটা আমাকে কি প্রশ্ন করছে? আর আমার চান্দি কোন পর্যায়ে থাকার কথা?

আমিঃ আপনি কি আমার পরিচিত? তুই তুমি করে ডাকার কারন কি?
—-ওকে আপনি ডান।

সিরিয়াসলি?? ভাবা যায়?

১৯৫জন ৭জন
10 Shares

২৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য