প্রিয় আকাশ,

আশা করি তুমি ভালো আছো, ভালো থাকবে তোমার একমাত্র ভালোবাসা ‘তন্বী’ কে নিয়ে। আমি পারিনি তোমাকে সুখী করতে , পারিনি তোমার ঔরসজাত সন্তান আমার জরায়ুতে ধারণ করতে, তোমাকে ‘বাবা’ ডাক উপহার দিতে। আমাকে ক্ষমা করো প্লিজ। তোমার ভালোবাসা আজ তোমার হাতের মুঠোয়, হয়তো এখানে ঈশ্বরের সমর্থন আছে বলেই এমনটি ঘটলো এতবছর পর। আমি সবদিক ভেবেচিন্তেই এমন সিদ্ধান্ত নিলাম। তোমার থেকে দূরে গিয়ে এ পৃথিবীর কোথাও শান্তি খুঁজে পেতাম না, কারণ এ জীবন, এ নিঃশ্বাস সবকিছু তে তুমি। তাই ভাবলাম আমি থাকলে তোমার তন্বীও তোমার হতে পারবেনা। সে তোমাকে হয়তো তোমার একজন উত্তরসূরী উপহার দিতে পারবে। আত্মহত্যা ‘মহাপাপ’ জেনেও তোমার আমার সুখের জন্য, তন্বীর প্রাপ্য টুকু ফিরিয়ে দিতে , তার প্রতি তোমার অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করার একটা মোক্ষম সুযোগ দিতে-তাই আমার এই চলে যাওয়া। আমাকে ক্ষমা করো। আর আমার মৃত্যুর জন্য কারো কোনো দায় নেই। এ দায় থেকে তোমাকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে গেলাম। সব স্ত্রী-রাই চায় তার স্বামীর সুখ, উত্তরাধিকার উপহার দিতে কিন্তু সেটা দিতে আমি ব্যর্থ। আমি চাই তুমি তন্বীকে স্বীকৃতি দাও তাতে আমার আত্নাও শান্তি পাবে জেনে রেখো। তোমরা সুখী হও , সংসার করো এটাই তোমার কাছে আমার অন্তিম চাওয়া।

‘ইতি তোমার এতো দিনের জীবন সঙ্গী দীনা’

চিঠিটা বিছানায় রাখা ছিলো পেপার ওয়েট এর নিচে। আকাশ স্তম্ভিত হয়ে আছে আর দীনাকে দেখছে দুচোখ ভরে যেন আজ তার মৃত্যু হলো দীনার সাথে সাথে। সে এমনটা কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। তার জীবনটা যেন এক নিমিষে তাসের ঘর করে দিলো বিধাতা। মনে হলো সে দু’দুটো জীবন একহাতে শেষ করে দিলো তার লোভের কারনে, তার পাপের কারনে। দীনা চলে গিয়ে তার পাপের বোঝা টা আরো অনেক খানি বাড়িয়ে দিলো। হঠাৎ সেলফোনে অফিসের নাম্বার থেকে ফোন আসলো। সে কলটা রিসিভ করে তাদের কে জানালো তার স্ত্রীর মৃত্যুর কথা। অফিসে মুহূর্তেই এ কথা ছড়িয়ে গেলো। মোটামুটি সবাই আসলো দেখতে শুধু একজন আসলো না । সে ইস্তফাপত্র জমা দিয়ে ভোরেই চলে গেছে ওখান থেকে। আকাশ দীনার চলে যাওয়াতে এতোটাই বিপর্যস্ত হয়ে রইলো যে জানতেই পারলো না তন্বীর চলে যাওয়া চাকরি ছেড়ে দিয়ে।

সপ্তাহখানেক পর সে অফিসে গেলো। কাজ করতে করতে হঠাৎ তন্বীর ডেস্কটা খেয়াল হলো । দেখলো ডেস্কটা পরিপাটি করে সাজানো আছে আর চেয়ারটা শূণ্য পড়ে আছে। আকাশ পিয়নকে ডেকে ম্যাডামের কথা জানতে চাইলো। পিয়ন বললো,’ স্যার, আপনি জানেন না- ম্যাডাম তো চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন?’ আকাশের তন্বীর কথা এতো দিন একবার ও মনে হয়নি। হঠাৎ করে ওর পায়ের তলার মাটি দু’ভাগ হয়ে গেলো, সমস্ত আকাশটা ভেঙে পড়লো যেন ওর মাথার উপর। তন্বীর চলে যাওয়াটা আকাশকে আরো বড় অপরাধী করে দিলো। ভেবেছিলো তন্বীর কাছে ক্ষমা চাইবে কিন্তু বিধাতা সেখান থেকে ও বিমুখ করলো। আকাশ আজ কার কাছে যাবে, কোথায় যাবে ? তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত বুঝি আর এ জীবনে শেষ হলোনা!

তন্বী বাড়িতে আসায় ওর বাবা-মায়ের খুব আনন্দ হলো। ওরা মেয়েকে এবার বিয়ে দিয়েই ছাড়বে। কিন্তু পাত্র তো আর সহজে মেলে না। ওদিকে ওর সেই দূরসম্পর্কের ভাই এখনো ওকে পাবার জন্য অপেক্ষায় আছে। তন্বী বাবা-মাকে বললো সে ঐ ভাইকেই বিয়ে করবে যদি তাদের আপত্তি না থাকে। তন্বী ভেবে দেখলো এছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই তার জন্য। আর কিছু না হোক আর্থিকভাবে সচ্ছল থাকবে, বাবা- মাকে না খেয়ে মরতে হবে না। তমাল কে সে পাবেনা, এদিকে তার জন্য আকাশ-দীনার সংসার টাও এলোমেলো হয়ে যাবে সবকিছু মিলিয়ে সে ঐ লম্পটটার হাতেই নিজেকে সঁপে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। তাতে করে সবদিক রক্ষা হয় নিজের মনটা হয়তো মরে গেলো কিন্তু বাকী সব মোটামুটি স্বাভাবিক থাকবে। তমাল কে সব জানালো। তমাল তন্বীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানালো। তন্বী জানতেও পারলো না আকাশের করুন অবস্থার কথা।

কিন্তু তন্বী তমালকে ভুলতে পারছিলো না একমূহূর্তের জন্য ও। তন্বীর জীবনটা কেন এমন হলো? প্রথম জীবনের ভালবাসা ব্যর্থ হলো, আজ এই মুহূর্তে একজন মনের মতো কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিবে তাও ব্যর্থ হলো, তমাল কে বিনা স্বার্থে ভালোবাসলেও তমাল তার ভালোবাসাকে মর্যাদা দিতে, মেনে নিতে নারাজ। সে তাই বাধ্য হলো লম্পট, চরিত্রহীন আত্নীয় কে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে। সে আর এ জীবনে সুখী হতে বা ভালোবাসার মানুষকে আপন করে পেতে পারলো না । ওদিকে জানলো তমাল চাকরি ছেড়ে দিয়েছে, ব্যবসা করবে । বাড়িতে থাকবে, বৌ-বাচ্চাকে সময় দিবে। তমাল বাড়িতে চলে গেলো, তন্বীর সাথে যোগাযোগ করলো না। তন্বীর বিয়ে হয়ে গেলো। বাবা-মায়ের নামে ব্যাংকে কিছু টাকা ফিক্সড করে রাখলো আর বিদেশে গিয়ে মাসে মাসে হাতখরচা পাঠাবে বলে দিল। বাবা-মায়ের দেখাশোনা করার জন্য সার্বক্ষণিক একজন লোক ঠিক করে রাখলো। বিয়ের মাসখানেক পরে তন্বী বরের সাথে বিদেশে চলে গেলো।

১৯৮জন ৫৪জন
3 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য