সমীকরণ

রোবায়দা নাসরীন ১৩ জুলাই ২০১৯, শনিবার, ১০:২৭:৪৭পূর্বাহ্ন গল্প ১৬ মন্তব্য

দীপ খুব সন্তুষ্টির সাথে রাইনার প্রশংসা করছে মুগ্ধ হয়ে আমরা অতিথিরা তার আত্মতৃপ্তির ভাষ্য শুনছি দীপ রগরগে গলায় বলেই চলেছে ,

রাইনা আমাকে সবটুকু বোঝে আমার মুখ দেখলেই বলে দিতে পারে আমার মনের অবস্হা আমার প্রতিটি

পছন্দ অপছন্দ জানে। সেভাবেই চলে সে।

আছিরে দোস্তরা , বেশ ভালোই আছি আমি !!

তৃপ্ত দীপের এই কথাটা কেমন যেনো দাম্ভিক লাগলো আমার কাছে। কেনো বললোভালো আছি আমি !!

ভালো আছি আমরা “, বললে কত মধুর শুনাতো !আমার দুষ্ট মনটাকে কষে ধমক দিলাম

দীপরাইনা আমার কমন বন্ধু একই সাথে লেখা পড়া করেছি আমরা রাইনা ছিলো আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী দারুন উচ্ছল আর মেধাবী মেয়ে রাইনা   দীপ ছিলো উজ্জ্বল ছাত্র পেশা জীবনেও বেশ সফল সে

না কোনো প্রেম না , পারিবারিক ভাবেই বিয়ে হয় ওদের আমরা সব বন্ধুরা খুব মজা করে ছিলাম ওদের বিয়েতে রাইনা খুশি ছিলো বিয়েতে ! প্রেম না হোক ছেলেটা তো চেনা জানা ভদ্র শান্ত মেয়েদের সম্মান করতে জানে খুব ভালো লেগেছিলো ওর কথা গুলো

ওদের বিয়ের আজ ১২ বছর হলো তাইতো সবার নিমন্ত্রণ কত লোক চারিদিকে দীপ রাইনা সফল জুটি হাসি মুখে সবার খোঁজ খবর করছে আতিথেয়তায় কোনো কমতি নেই আমরা বন্ধুরাও খুশি, ওদের উপলক্ষে আজ কত কত বছর পর সবাই এক সাথে হলাম!!

দীপের মুখে রাইনার প্রশংসা চলছেই অন্য বন্ধু রা কি মনে মনে হাহুতাস করছে নাকি !!! রাইনা কেনো তাদের হয় নি অথবা নিজের ঘরের বউটাকে রাইনার সাথে তুলনা !!

এই হলো আমার সমস্যা ।। মানুষের ভিতরটা আর বাহিরটা তুলনা করা !! চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করা !!

            

দীপের প্রথম কথাটাই কেমন স্বার্থপর লাগলো !!

নিজেকে কষে দুটি বকা দিয়ে আবার খোশ গল্পে মেতে উঠলাম।

দীপ ঠিক আমার পাশেই দাড়ানো, খুব টেনে টেনে জানতে চাইলো  ,কেমন আছো রুম্পা ? সাথে তার সন্ধানী চোখ আমার সাজ সজ্জায় খুঁজে নিতে চাইছে  আমার প্রাচুর্যের পরিমান। সেখানে সে আমার সাদামাটা জীবনের দেখাই হয়তো পেলো আমার স্বামী সংসারের খোঁজ নিয়ে বেশ খুশিই হলো মনে হয়। আমার প্রাচুর্যহীন জীবন কি ওকে খুশি করলো !!!

একটা সম্পর্কে পা রাখতে গিয়ে আমি সেদিন থমকে গিয়েছিলাম। বাবা,  মা আর ছোট বোনটার কথা ভেবে থেমে গিয়েছিলাম প্রথমেই। বেশ আহত অথবা অপমানিত হয়েছিল দীপ সেদিন। আজ আমার দারিদ্র আর ওর প্রাচুর্য সামনা সামনি দাড়িয়ে

আচ্ছা আমি কি ভুল করেছিলাম!!!

মাসের ২০ তারিখের পরই যখন খরচের টাকাগুলো অমূল্য মনে হয় , তখন মাঝে মাঝে ক্লান্ত লাগে সত্যি।

মন দিয়ে রাইনাকে দেখি আমি কি সুন্দর শাড়ি ওর শরীরে!! গয়না গুলো আধুনিক। প্রাচুর্য্র ঝলকানিতে আমার চোখ নেমে আসে নিম্ন পানে।

রাইনা , খুব গোছানো মেয়ে। প্রতিটি টেবিলে ঘুরে ঘুরে খোঁজ নিচ্ছে সবার। ওর মার্জিত হাসি , কথার মাধুর্য , সব কিছুই সুন্দর দীপ আছে তার পাশে পাশে।

আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি দুজন কে।

হঠাৎ পাশের টেবিলের ছোট বাচ্চাটাকে কোক ঢেলে দিতে যেয়ে তারাহুরায় কোকটা গ্লাস উপচে টেবিল গড়িয়ে ভিজিয়ে দিলো রাইনার শাড়ির সামনের দিকটা। প্রচন্ড আতংকে কেপে উঠল রাইনা। ওর চোখে জমাট ভয় , দৃষ্টি এড়ালো না আমার।দীপ তীব্র কটাক্ষে চাপা গর্জে উঠল রাইনার উপর।সামান্য কোক ঢালতে শেখো নি!! শাড়িটার দাম জানো !!” মূহুর্তে ফ্যাকাসে হয়ে গেলো রাইনার মুখ। ঝড়ের  গতিতে রাইনা যেনো পালিয়ে গেলো দীপের সামনে থেকে।

আমি দীপের চোখে মুখে যে তাচ্ছিল্য আর ক্রোধ দেখলাম , তাতে নিজের উত্তর নিজেই পেয়ে গেলাম। সত্যি দীপ সুখে আছে আর রাইনা তার ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে বেঁচে আছে।

মূহুর্তে দীপের সমস্ত চাকচিক্য বড্ড ম্লান মনে হয় আমার কাছে। খুব সংকীর্ণ লাগে দীপের তৃপ্ত জীবন। নিজেকে রায়নার স্হানে কল্পনা করে চমকে উঠি আমি। আমার দারিদ্র আমার কাছে অহংকার মনে হতে থাকে।

নিজের ঘরের ছোট কামড়া দুটি তখন আমার চোখে স্বপ্নিল আচড় কাটে। সেখানে বাহারি প্রশংসা নেই , তবে স্নিগ্ধ সম্মান বোধ আছে। নিজেকে খুব সুখি লাগে তখন নিজের কাছে।মাসের শেষে আর্থিক টানাটানিতে স্বামী স্ত্রীর যুগোল   সমস্যাও বেশ মধুর লাগে নিজের কাছে

৩৪৩জন ২০৬জন
10 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য