সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

বন ঘেঁষা এক কাঠুরিয়ার বাড়ি। বাঁশ-খুঁটিতে দাঁড় কারানো ছনের ছাউনি ঘরটা ছাড়া কাঠুরিয়ার আর কিছুই নেই। জীবিকার একমাত্র উপায় ছিলো, গহীন বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করা। কাঠুরিয়ার ছেলেমেয়ে নেই। জায়গাজমিও নেই। বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করে তা নিকটস্থ বাজারে বিক্রি করা কাঠুরিয়ার নিত্যদিনের কাজ। তা না হলে কাঠুরিয়ার ঘরে থাকা প্রাণপ্রিয় স্ত্রী-সহ দুজনেই না খেয়ে থাকতে হয়। তাই পেটে ক্ষুধা মেটাতে রোজ সকালে দুমুঠো পান্তাভাত গিলে কাঠ সংগ্রহের জন্য বনে  চলে যায়। এভাবে দিন, মাস বছরের পর বছর গড়াতে গড়াতেই আবিষ্কার হয় “সব কষ্ট দূর হয় কিন্তু মনোকষ্ট দূর হয় না” কথাটি।

একদিন কাঠুরিয়া রোজকার মতো সকালবেলা পান্তাভাত খেয়ে কাঠ সংগ্রহের জন্য বনে চলে যায়। বনের বেশি ভেতরে না ঢুকে বনের সামনেই কাঠ খুঁজতে থাকে। কিন্তু তেমন একটা সুবিশাল করতে না পেরে কাঠ খুঁজতে খুঁজতে বনের গহীনে ঢুকে পড়ে। বনের গহীনে যাবার পর সেখানে অনেক বড় একটা মরা গাছ সে দেখতে পেলো। তা দেখে কাঠুরিয়া মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে দুহাত তুলে ফরিয়াদ করে বললো, “হে বিধাতা, আপনি সত্যিই মহান। আপনার দয়ার বরকতে আজ আমি এই গহীন বনে এসে সারা বছর চলার উপার্জন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। আপনি আমার সহায় থাকুন।”

এই বলেই কাঠুরিয়া হাতে থাকা ধারালো কুড়াল কামড়ে বেঁধে মরা গাছের উপরে উঠে গেলো। গাছের উপরে উঠে গাছের মরা ডাল-পালা কেটে নিচে ফেলতে লাগলো।

এরমধ্যে সাত দিনের অনাহারী এক ক্ষুধার্ত বাঘ ওই গাছে নিচে এসে ক্লান্ত শরীরটা মরা গাছের সাথে লেলিয়ে দিলো।  এমন সময় গাছের উপর থেকে বড় মোটা একটা ডালা নিচে পড়লো। ক্ষুধার্ত বাঘ বিরক্ত হয়ে গাছের উপরে তাকালো। দেখতে পেলো একটা মানুষ গাছের উপরে বসে আছে। ক্ষুধার্ত বাঘ গাছের উপরে মানুষ দেখতে পেয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে ফরিয়াদ করে বলতে লাগলো, “হে দয়াময়, আপনি মহান, সত্যিই মহান। আপনি কাউকে না খেয়ে মরতে দেন না। সাতদিন পর হলেও আপনি সবাইকে আশা জোগাড় করে দেন। আজ যেমনটা আমাকে জোগাড় করে দিলেন। আপনার দরবারে লাখ-লাখ শুকরিয়া।”

এদিকে ক্ষুধার্ত বাঘ যে গাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছে, তা আর কাঠুরিয়ার দৃষ্টিগোচর হলো না। কাঠুরিয়া মনের আনন্দে গাছের ডাল-পালা কাটতেই লাগলো। হঠাৎ কাঠুরিয়ার চোখ পড়লো বাঘের পর। এখন তো কাঠুরিয়ার প্রাণপাখি উড়ে যায় যায় অবস্থ। কিন্তু গাছের নিচে থাকা ক্ষুধার্ত বাঘ  হাক-ডাক না দিয়ে চুপ করেই বসে আছে।

গাছের নিচে বসে ক্ষুধার্ত বাঘ মনে মনে বলছে, “যাক, গাছের উপরে থাকা মানুষটা খেয়েই সাত দিনের পেটের ক্ষুধা মেটানো যাবে। তবে হাক-ডাক না দিয়ে চুপ করেই বসে থাকি, যতক্ষণ না পর্যন্ত মানুষটি গাছের উপর থেকে না নামে।” এই বলেই ক্ষুধার্ত বাঘ আরও একটু টাইট করে বসে থাকলো।

এদিকে গাছের উপরে কাঠুরিয়া ভয়ে আর কাঠ কাটতে পারছে না, নামতেও পারছে না। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে লাগলো, ক্ষুধার্ত বাঘও গাছের নিচ থেকে সরছে না। কাঠুরিয়াও আর বেশিক্ষণ গাছের উপরে বসে থাকতে পারছে না। এদিকে  ক্ষুধার্ত বাঘও এখন তার শরীরে জেদ সামলাতে পারছে না। হাউ-মাউ করে গর্জন করতে শুরু করলো।

ক্ষুধার্ত বাঘের গর্জন শুনে কাঠুরিয়া গাছের উপর থেকে বলতো লাগলো, “বাঘ ভাই, তুমি আমাকে খেয়ো না। আমি জানি তুমি খুব ক্ষুধার্ত! আমাকে খেয়ে তুমি হয়তো তোমার একদিনের পেটের ক্ষুধা মেটাতে পারবে। আর আমাকে না খেলে আমি তোমাকে প্রতিদিন খাওয়াতে পারবো।”

ক্ষুধার্ত বাঘের এখন জবান খুলে গেলো। বাঘ বললো, “আমি তোমার কোনও কথাই শুনবো না। আগে তুমি গাছের উপর থেকে নিচে নামো।”

কাঠুরিয়া বললো, “বাঘ ভাই, আমি নিচে নামলেই তো তুমি আমাকে ধরে খেয়ে ফেলবে। তার আগে তুমি দয়া করে আমার কথা শুনো। আমি তোমার পেটের ক্ষুধা মেটানোর জন্য আমার বাড়ি থেকে অন্তত দুটো ছাগল এনে দিবো। সেগুলো তুমি আরামে বসে বসে খাবে। তবে হ্যাঁ, কথা দিচ্ছি তোমাকে শুধু একদিনের জন্যই নয়, প্রতিদিন একটা করে ছাগল এনে দিবো। তাহলে খাবারের জন্য তোমার আর এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না।”

কাঠুরিয়ার কথা শুনে ক্ষুধার্ত বাঘ শান্ত হয়ে বললো, “শুনো কাঠুরিয়া, তোমার কথা আর কাজে যদি ঠিক থাকে, তাহলে আমিও কথা দিচ্ছি, তোমাকে আমি খাবো না। তুমি গাছের উপর থেকে নির্ভয়ে নামতে পারো।”

ক্ষুধার্ত বাঘের কথা শুনে কাঠুরিয়া ভয়ভয় মনে আস্তে আস্তে গাছের উপর থেকে নিচে নামতে লাগলো। কিন্তু তবুও কাঠুরিয়া ঠিকমতো নামতে পারছে না, মনের ভয়ে। কাঠুরিয়া নামতে দেরি দেখে ক্ষুধার্ত বাঘ জোরে গর্জন করে বলতে লাগলো, “এই কাঠুরিয়া, তুমি কাঁপতে কাঁপতে আস্তেধীরে নামছ কেন? আমিতো তোমাকে কথা দিয়েছি, তোমাকে খাবো না। আমি আবারও বলছি, তুমি নির্ভয়ে তাড়াতাড়ি নামো। আমার বড্ড ক্ষিদে পেয়েছে। আমি অন্তত সাতদিন যাবত কিছুই খাইনি। পেটের ক্ষুধায় আমার এখন জীবন যায়। তুমি তাড়াতাড়ি গাছ থেকে নেমে তোমার বাড়ি থেকে দু’একটা ছাগল আমার জন্য নিয়ে এসো।”

ক্ষুধার্ত বাঘের আকুতি-মিনতি শুনে কাঠুরিয়া তড়িঘড়ি করে গাছ থেকে নিচে নামলো। কিন্তু মনের ভয় তখনো যাচ্ছিল না, যদি ক্ষুধার্ত বাঘ পেটের ক্ষুধায় ধপ করে তাকে ধরে ফেলে, তাই। তবুও মনে ভয় নিয়ে কাঠুরিয়া গাছ থেকে নেমে বাঘের সামনে হাতজোড় করে দাড়ালো।

কাঠুরিয়ার হাতজোড় করা দেখে ক্ষুধার্ত বাঘ শান্ত গলায় বললো, “এখনো তোমার ভয় দূর হয়নি? আমিতো যা বলেছিল, তা সত্যি সত্যি বলেছি। এখনো বলছি, তোমাকে আমি খাবো না। আমি আরও সাতদিন না খেয়ে থাকলেও না। এখন তুমি নির্ভয়ে তোমার বাড়ি গিয়ে আমার জন্য দু’একটা ছাগল নিয়ে আসো। আমি কিন্তু আমার কথা রেখেছি। এখন তুমি তোমার কথা রাখার চেষ্টা করো এবং  খুব তাড়াতাড়ি করো। পেটের ক্ষুধায় আমার জীবন যায়।”

বাঘে কথা শুনে কাঠুরিয়া বললো, “ঠিক আছে বাঘ ভাই, তুমি একটুখানি এখানে অপেক্ষা করো। আমি বাড়ি গিয়ে তোমার জন্য ছাগল নিয়ে আসছি।”

কাঠুরিয়া এই বলে বাঘের সম্মুখ থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো। ক্ষুধার্ত বাঘ গাছ থেকে কাটা কাঠুরিয়ার শুকনো গাছের ডালগুলোর সামনে বসে রইলো। অনেক্ক্ষণ পর কাঠুরিয়া তার বাড়ি থেকে একটু বড়সড় সাইজের দুইটা ছাগল টানে-হেঁচড়ে বাঘের সামনে এনে দিলো।

বাঘ ছাগল দুটো দেখে খুশি হয়ে বললো, “আজ থেকে তুমি আমার বন্ধু। এই বনের যত গহীনেই তুমি যাও-না-কেন, তোমার কোনও ভয় নেই। আমি এবং আমার বংশধর যারা আছে সকলেই তোমাকে পাহারা দিয়ে রাখবে। এখন তুমি তোমার সংগ্রহ করা গাছের ডালগুলো নিয়ে বাড়ি চলে যাও। আগামীকাল আবার আসবে।”

বাঘের কথা শেষে কাঠুরিয়া তার সংগ্রহ করা গাছের  শুকনো ডালগুলো বেঁধে মাথায় করে বাড়ি ফিরে গেলো। ক্ষুধার্ত বাঘ মনের আনন্দে কাঠুরিয়ার দেয়া ছাগল দুটো খেতে শুরু করলো।

পরদিন সকালবেলা কাঠুরিয়া কুড়াল হাতে করে বনের সামনে আসলো। কিন্তু আজও মনের ভেতরে কেমন যেন ভয়! কাঠুরিয়ার চিন্তা, বনের হিংস্র পশু বাঘ। বাঘের কথার কি আর বিশ্বাস আছে? সারা বন ঘুরে খাবার না পেলে শেষাবধি পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্য আমাকেই একসময় খেয়ে ফেলবে। এরকম চিন্তা করতে করতে একসময় বনের ভেতরে ঢুকে পড়লো। একটু যেতেই কাঠুরিয়া দেখলো, তার সামনে অনেকগুলো গাছের শুকনো ডাল-পালা পড়ে আছে। কাঠুরিয়া কিছু চিন্তাভাবনা না করতেই গতকালের সেই ক্ষুধার্ত বাঘ কাঠুরিয়ার সামনে আসলো। কাঠুরিয়া বাঘকে দেখে আবার ভয়ে কাঁপতে শুরু করলো। কাঠুরিয়ার মনের আর শরীরের কাঁপুনি বাঘ খেয়াল করলো।

তারপর বাঘ কাঠুরিয়াকে বললো, “বন্ধু তুমি এভাবে কাঁপছ কেন? আমিতো তোমার বন্ধু। তোমার সামনে গাছের যেই ডালগুলো দেখতে পাচ্ছ, এগুলো আমি আমার সাথের আরও বাঘকে নিয়ে সারা বন ঘুরে ঘুরে তোমার জন্য সংগ্রহ করে রেখেছি। যাতে শুকনো ডাল-পালার জন্য তোমার আর কোনও কষ্ট করতে না হয়। এখন তুমি এগুলো বেঁধে তোমার বাড়িতে নিয়ে যাও। বাড়িতে এগুলো রেখে আমার জন্য কিছু খাদ্য নিয়ে আসো।”

কাঠুরিয়া বাঘের কথামতো ঠিক তা-ই করলো। বাড়ি গিয়ে গাছে ডালাগুলো রেখে দুটো ছাগল এনে বাঘকে দিলো।

এভাবে কিছুদিন যেতে-না-যেতেই কাঠুরিয়ার খামারের সব ছাগল শেষ হয়ে গেলো। কাঠুরিয়া পড়ে গেলো ভীষণ চিন্তায়! চিন্তা শুধু বাঘে খাবার। বাঘকে খাবার না দিলে বনে যাওয়া ঠিক হবে না। এই ভেবে কাঠুরিয়া আর বনেও  যায় না। বনে না গেলেও কাঠুরিয়ার মন চিন্তামুক্ত হচ্ছে না। চিন্তা শুধ একটাই। তা হলো বাঘ! বাঘ যদি খাবারের জন্য বাড়িতে এসে হানা দেয়? সেই চিন্তায় কাঠুরিয়া একসময় অসুস্থ হয়ে পড়লো। কাঠুরিয়ার স্ত্রী গ্রাম্য ডাক্তার কবিরাজের কাছ থেকে ঔষধাদি এনে সেবন কারানোর পরও কাঠুরিয়া সুস্থ হচ্ছে না। দিনদিন শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে যাচ্ছিলো। কাঠুরিয়ার শরীরে প্রচুর জ্বর। জ্বরও থামছিল না।

এদিকে বনের সেই বন্ধু ক্ষুধার্ত বাঘ দীর্ঘদিন কাঠুরিয়াকে না দেখে প্রায় পাগলের মতো হয়ে গেলো। সাথের ববংশধর যারা আছে, তাদের জিজ্ঞেস করলো। কেউ কাঠুরিয়ার খবর দিতে পারলো না। বন্ধু বাঘ মনের ক্ষোভে সাথের বাঘগুলোকে দোষারোপ করতে লাগলো। এ-ও বলছিল, “হয়তো তোরাই আমার প্রিয় বন্ধুকে হজম করেছিস। তা না হলে আমার বন্ধুর কোনও খোঁজখবর নেই কেন? তোদের দ্বারা যদি আমার বন্ধুর কোনও ক্ষতি না হয়, তাহলে ধরে নিলাম আমার প্রিয় বন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে। আর তা যদি হয়, তাহলে তোরা যে যেখানেই থাকিস-না-কেন, আগামীকাল সকালে এখানে এসে হাজির থাকবি। তারপর সবাই মিলে আমি আমার বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে যাবো। আর হ্যাঁ, যাবার সময় আমার বন্ধুর জন্য গাছের শুকনো ডাল-পালা মুখে করে নিয়ে যাবো। যাতে সেগুলো বিক্রি করে আমার বন্ধু দীর্ঘদিন চলতে পারে। আর বন্ধুর বাড়ি যাবার সময় গ্রামের কোনও গরু-ছাগলের উপর নজর দেয়া যাবে না। আমরা শান্তভাবে যাবো, আবার শান্তভাবে ফিরে আসবো।”

যেই কথা, সেই কাজ। পরদিন সকাল হতে-না-হতেই বনের সব বাঘ নির্ধারিত স্থানে জড়ো হলো। সবার মুখে ছিলো গাছের শুকনো একটা ডাল। তা দেখে কাঠুরিয়ার বন্ধু বাঘ খুবই খুশি হলো। তারপর সব বাঘ একসাথে লাইন ধরে হাঁটতে শুরু করলো। গন্তব্য, কাঠুরিয়ার বাড়ি।

বাঘের দল বন থেকে বের হয়ে যখন গ্রামের ফসলী জমির আইল ধরে কাঠুরিয়ার বাড়ি যাচ্ছিল, তখন গ্রামের লোকজন বাঘের ভয়ে ছোটাছুটি করতে লাগলো। কিন্তু বাঘগুলো কারোর দিকে ফিরেও চাচ্ছিল না, লাইন ধরে বাঘের দল শুধু সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলো। গ্রামের মানুষের হৈ-হুল্লোড়ে এক কান, দুই কান হতে হতে শেষমেশ বাঘ আসার কথা অসুস্থ কাঠুরিয়ার কানে পৌঁছালো। বাঘ আসার খবর শুনে কাঠুরিয়া অসুস্থ থেকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে গেলো। কাঠুরিয়ার এখন আগের মতো হুঁশ-জ্ঞান বলতে কিছুই রইলো না।

এদিকে বাঘেরা গ্রামের মানুষের হৈ-হুল্লোড় উপেক্ষা করে একসময় বাঘের বন্ধু কাঠুরিয়ার বাড়ি পৌঁছে গেলো। বাঘেরা মুখে করে কামড়ে আনা গাছের শুকনো ডালগুলো  কাঠুরিয়ার বাড়ির উঠানে রাখে সব বাঘ উঠোন জুড়ে বসলো।

কিন্তু বাড়ি নির্জন নিঃশব্দ দেখে কাঠুরিয়ার বন্ধু বাঘ জোরে একটা গর্জন করে বললো, “বন্ধু তুমি ঘর থেকে বের হও। দেখো আমরা তোমার জন্য কতো ডাল(লাড়কি) এনেছি। আমি জানি তোমরা ভয় পেয়েছ। ভয়ের কোনও কারণ নেই। আমরা শুধু তোমাকে দেখতে এসেছি, বন্ধু। তোমাকে এক নজর দেখে আবার আমরা শান্তভাবে বনে ফিরে যাবো। তুমি বের হও।”

কিন্তু বাঘের ভয়ে কাঠুরিয়ার স্ত্রী এর আগেই ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে রেখেছিল। দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরের ভেতরে বসে মহান সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে লাগছিল। এখন বাঘের মুখের কথা শুনে কাঠুরিয়ার স্ত্রী কাঠুরিয়াকে বলছে, “ওগো শুনছো, বাঘেরা নাকি তোমাকে দেখতে এসেছে। আসার সময় অনেক ডাল-পালা মুখে করে নিয়ে এসেছে। এতো ডাল-পালা এনেছে যে, বাড়ির উঠোন ভরে গেছে। তুমি ওঠো! বাঘেদের সাথে দেখা করো। তা না হলে ওরা হয়তো ক্ষিপ্ত হয়ে ঘরের দরজা-জানালা ভেঙে ফেলবে।”

কাঠুরিয়া তার স্ত্রীর কথা শুনে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বের হলো। ঘর থেকে বের হয়ে দেখে বাড়ির উঠোন ভর্তি গাছের শুকনো ডাল-পালা। তা দেখে কাঠুরিয়া মনে মনে খুব খুশি হলো। কাঠুরিয়াকে অনেকদিন পর দেখে বনের সেই ক্ষুধার্ত বাঘটাও মনের আনন্দে জোরে গর্জন করলো। বন্ধু বাঘের গর্জনের সাথে সাথে সব বাঘেরাই মনের আনন্দে গর্জে উঠল।

এরপর আস্তে আস্তে কাঠুরিয়া বাঘের সামনে এসে বললো, “বন্ধু আজ কয়েকদিন যাবত আমার শরীর ভালো নেই। শরীরের খুব জ্বর! হাঁটতে পারি না। খেতেও পারছি না। তাই আর বনে গিয়ে তোমার সাথে দেখা করতে পারিনি। এতে তুমি মনখারাপ করো না বন্ধু।”

কাঠুরিয়ার কথা শুনে বাঘের ভীষণ মায়া হলো। তারপর বাঘ কাঠুরিয়াকে বললো, “বন্ধু তুমি এখানে এসে সোজা হয়ে শুয়ে পড়ো। আমি তোমার সমস্ত শরীর চেটে দেই। তাহলেই তুমি মুহূর্তেই ভালো হয়ে যাবে, বন্ধু। তুমি ভয় পেও না। আমি তোমার কোনও ক্ষতি করবো না। তুমি তাড়াতাড়ি আমার সামনে এসে শুয়ে পড়ো।”

বাঘের কথা শুনে কাঠুরিয়া ভয় ভয় মনে নিরুপায় হয়ে বাঘের সামনে সোজা হয়ে বাড়ি উঠোনে শুয়ে পড়লো। তারপর বন্ধু বাঘটা কাঠুরিয়ার সমস্ত শরীর জিভ দিয়ে চাটতে শুরু করলো। বাঘ যখন হা করে মুখের জিভ ভের করে চাটতে লাগলো, কাঠুরিয়া তখন বাঘের মুখের গন্ধে তার নাক চেপে ধরে রাখলো। কাঠুরিয়া যে বাঘের মুখের গন্ধে তার নাক চেপে ধরে রাখছে, তা দেখে বনের বাঘ  মনে মনে খুবই কষ্ট পেলো। কিন্তু মনের কষ্ট কাউকে বুঝতে না দিয়ে কাঠুরিয়ার শরীর চাটতেই লাগলো। চাটতে চাটতে একসময় কাঠুরিয়া সত্যি অনেকটা সুস্থ হয়ে গেলো।

তারপর বাঘ কাঠুরিয়াকে জিজ্ঞেস করলো, “বন্ধু সত্যি করে বলতো এখন তোমার কেমন লাগছে?”

কাঠুরিয়া বললো, “সত্যি বলছি, বন্ধু। এখন আমার শরীরটা খুবই ভালো লাগছে। আমি মনে হয় সুস্থ হয়ে গেছি।”

কাঠুরিয়ার কথা শুনে বনের বাঘটা দুঃখ ভরা মনে আনন্দের অভিনয় করে জোরে একটা গর্জন করলো। সাথে সাথে সব বাঘেরা গর্জে উঠল। তারপর বন্ধু বাঘ কাঠুরিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সব বাঘ লাইন ধরে আবার বনে ফিরে গেলো।

তারপর চার-পাচ দিন পর কাঠুরিয়া কাঠ কাটার কুড়াল হাতে নিয়ে বনের দিকে রওনা দিলো। হাঁটতে হাঁটতে একসময় বনের সামনে পৌঁছাল। একটু সামনেই কাঠুরিয়া দেখতে পেলো, সেই বন্ধু বাঘটা অধীর আগ্রহে বসে আছে। তা দেখে কাঠুরিয়া ভাবলো, বন্ধু বাঘটা হয়তো আমার অপেক্ষায় বসে আছে।

কাঠুরিয়া বাঘের সামনে গিয়ে বললো, “কী ব্যাপার বন্ধু, মনখারাপ করে বসে আছো যে? এইতো আমি সুস্থ হয়ে আবার বনে এসেছি। সত্যি বন্ধু, তুমি যদি সেদিন আমার বাড়িতে গিয়ে আমার শরীর চেটে না দিতে, তাহলে হয়তো আমি মরেই যেতাম। সত্যিই তুমি আমাদের মানবজাতির ডাক্তারের চেয়েও ভালো ডাক্তার।”

কাঠুরিয়ার কথা শেষ হতেই বনের বাঘ জোরে একটা গর্জন করে বললো, “চুপ করো বন্ধু। এসব বলতে নেই। আমার কোনও গুণও নেই। আমি আমার মনের ধারণা থেকেই সেদিন মহান সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে তোমার পুরো শরীর চেটেছিলাম। তুমি সুস্থ হয়েছ, মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপায়। এতে আমার কোনও অবদান নেই। তবে তুমি এখন পুরোপুরি সুস্থ, এতেই আমি খুশি। কারণ আমিতো তোমাকে বন্ধু বলে বারণ করেছিলাম, তাই। তো বন্ধু আজ তোমাকে আমার একটা কথা রাখতে হবে। যদি কথার বরখেলাপ করো, তাহলে আমি তোমাকে টেনেহিঁচড়ে খেয়ে ফেলবো।”

বাঘের কথা শুনে কাঠুরিয়া ভয়ে কাঁপতে শুরু করলো। কাঠুরিয়া কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করলো, “বলো বন্ধু, আমাকে কী করতে হবে!”

বাঘ তখন বললো, “তোমার হাতের কুড়াল দিয়ে আমার মাথায় একটা কোপ দিতে  হবে। এতে আমি বাঁচি বা মরি, তাতে তোমার কিছুই যায় আসবে না। তুমি দেরি না করে আমার মথায় আঘাত করো।”

এই কথা শুনে কাঠুরিয়া মনে মনে ভাবলো, তাহলে তো ভালোই হয়! কুড়াল দিয়ে খুব জোরে আঘাত করলে তো বাঘ মেরেই যাবে। আর মরে গেলে প্রতিদিন বনের এই হিংস্র পশু বাঘের কাছে ধরনা দিতে হবে না। এমনকি বাড়ির খামারের ছাগলও দিতে হবে না। আমি আবার নিজের স্বাধীনভাবে বনে এসে কাঠ সংগ্রহ করে নিতে পারবো।”

কাঠুরিয়ার ভাবনা চিন্তার মাঝেই বাঘ গর্জন করে বললো, “কী ব্যাপার? তুমি থমকে আছো যে? তুমি আমার কথার বরখেলাপ করলে সত্যিই আমি তোমাকে খেয়ে ফেলবো।”

বাঘের কথা শেষ হতে-না-হতেই কাঠুরিয়া বললো, “ঠিক আছে বন্ধু। আমি তোমার কথার বরখেলাপ করবো না।”

এই বলেই হাতে কুড়াল দিয়ে বাঘের মাথায় খুব জোরে একটা কোপ দিলো। সাথে সাথে বাঘ মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। তা দেখে কাঠুরিয়া বন থেকে দৌড়ে তার নিজের বাড়িতে চলে গেলো।

বেশ কয়েকদিন পর কাঠুরিয়া মনের আনন্দে কুড়াল নিয়ে বনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। কাঠুরিয়া যাচ্ছে আর মনে বলছে, এতদিনে হয়তো বাঘ মরে কঙ্কাল হয়ে গেছে। আমি বরং বনে গিয়েই আগে বাঘের কঙ্কালটা দেখবো। তারপর নিজের কাজ করবো। এই বলেই গ্রামের ফসলী জমির আইল ধরে হেলেদুলে বনের সামনে যেতে লাগলো। বনের খুব সামনে যেতেই দেখে সেই ক্ষুধার্ত বাঘটা তারই অপেক্ষায় বসে আছে। বাঘকে দেখে কাঠুরিয়া যখন পেছনে ফিরে দৌড় দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন বাঘ লাফিয়ে এসে কাঠুরিয়ার সামনে দাঁড়ালো। তখন কাঠুরিয়ার তো জীবন যায় যায় অবস্থা।

কিন্তু বাঘ শান্ত স্বরে বললো, “এই কাঠুরিয়া, শুনো! আমি তোমাকে আজও কিছুই করবো না। তোমার কোনও ভয় নেই। তবে তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। কাজটা হলো, সেদিন তুমি যে তোমার হাতের কুড়াল দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করেছিলে, সেই আঘাতটা কোথায় করেছো  তা দেখতে হবে।”

এই বলেই বাঘ তার নিজের মাথাটা কাঠুরিয়ার সামনে এগিয়ে দিয়ে বললো, “দেখ তো, সেদিনের সেই আঘাতের চিহ্নটা আছে কিনা? ভালো করে দেখে আমাকে বলো।”

কাঠুরিয়া ভয়ে ভয়ে বাঘের মাথায় হাত দিয়ে দেখে বললো, “বন্ধু, সেদিনের কুড়ালের আঘাত সেরে গেছে। কিন্তু সামান্য একটু দাগ এখনো আছে।”

বাঘ তখন শান্ত স্বরে বললো, “এই সামান্য দাগও একদিন-না-একদিন আমার শরীরের চামড়ার সাথে মিশে যাবে। সামান্য চিহ্নও থাকবে না। এখন বুজে কতবড় আঘাত আমি সইতে পারি।

“কিন্তু আমি যেদিন তোমার বাড়ি গিয়ে তোমার অসুস্থ শরীরটা চাটছিলাম, সেসময় আমার মুখের সামান্য গন্ধ টুকু তুমি সইতে পারনি। সেদিন আমি খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম। আজ তুমি নিজেই দেখলে, তোমার করা কুড়ালের আঘাতের চিহ্ন আস্তে আস্তে মিশে যাচ্ছে। কিন্তু সেদিনের সেই মনোকষ্ট কোনদিন মিশে যাবে না। তাই তোমার সাথে আজ থেকে আমার বন্ধুত্ব শেষ! তুমি এখন যেতে পারো। আর হ্যাঁ, একটা কথা শুনে যাও! জীবনে কাউকে মনে কষ্ট দিও না। তোমার কারণে যদি কেউ মনে কষ্ট পেয়ে থাকে, তাহলে সেই কষ্ট সেই ব্যক্তির মনে চিরস্থায়ী হয়ে লেগে থাকে। তা জীবন থাকতে কোনদিন মন থেকে দূর হয় না। জীবন চলার মাঝে অনেক দুঃখ-কষ্টের শেষেও অনেকে সুখের নাগাল পায়। কিন্তু কেউ কারো দ্বারা মনে কষ্ট পেলে সেই কষ্ট শেষ হয় না। তার মানে, “সব কষ্ট দূর হয় কিন্তু মনোকষ্ট দূর হয় না।” 

এই বলেই বাঘ কাঠুরিয়ার কাছ থেকে বনের ভেতরে চলে গেলো। কাঠুরিয়াও লজ্জিত মনে তার নিজের বাড়ি ফিরে গেলো। সমাপ্ত:

২২১জন ৯৩জন
16 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য