সতীনের সং-সার

বন্যা লিপি ১৪ এপ্রিল ২০২২, বৃহস্পতিবার, ০৯:২৩:১৮অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৫ মন্তব্য

গত কয়েক বছর ধরে শীতলি করন যন্ত্র (ফ্রিজ বলে পরিচিত যা) আমার সাথে সতীনের আচরন করে যাচ্ছে নির্বিকারে। একে একে অনেকগুলো বছর আমি ঝগড়া,চেঁচামেচি,  যাচ্ছেতাই মেজাজের বারোটা/তেরোটা বাজিয়ে বাজিয়ে সেই সতীন নিয়াই ওপার বাংলা’র সিনেমার সন্ধ্যা রানী অথবা আমাদের দেশিয় সিনেমার শাবানা ম্যাডামের মত মহা ধৈর্যের সাথে সংসার করে যাচ্ছি। রমজান মাস এলেই আমার সতীনের মেজাজে ঠাডা ( বজ্রপাত)  পরে। আর তিনি শীতলতা ভুলে গিয়ে বরফ টরফ ছাইড়া দ্যায় যেন এতদিন ঠান্ডা পোহাইতে তার বড় কষ্ট হয়ে গিয়েছে। এবার তিনি রসায়নে তৃপ্ত হতে গা হাত পা এলিয়ে ঢং-এ বসেছেন, নয়ত এলিয়ে দিয়েছেন শরীর ক্লান্ত হয়ে। শরীরটাতে একটা মাথা বলে যে যন্ত্র পাতি আছে! তাতে যদি চুল জাতীয় কিছু থাকত তো বেশ হত,,, বেশ হত বলি কি করে? চিরায়ত বাংলার সতীন রূপে আমি তার চুলের মুঠি ধরে তো বলতে পারতাম….

তোর এত ঢং সওয়ার আমার ঠ্যাকা পড়ছে? চৌকাঠের ওপারে ছেড়ে দিয়ে বলতাম – যা এইবার বিদেয় হ,,,, দরকারে সাহেবের হাত পা ধইরা আরেকটা সতীন নিয়ে আসব যথা সময়ে।

হা — কপাল!!! যথা সময় আর আসে না আমার – ‘এ পোড়া ভালে’

এবার আবার রমজান শুরু হতে না হতে বিগড়ে বসেছে সতীন ম্যাডাম। আমি বরং এবার যথাযথ রকম শীতল হয়ে যাই… কী আর করার আছে আমার?

 

আজ আমিও ঠান্ডা মাথায় মাছ মুরগি সব একবারে রেঁধে সাবাড় করে ফেলব, যা হয় হবে। রোজা রেখে এত খাটনি আর কাঁহাতক সয়?

আজ বেগুনীর ক্লোন রূপ কুমরানী,  পিঁয়াজু, আলুর চপ, ছোলা সেদ্ধ বাগাড় -ফাগার, ২/৩ রকম ফল-টলের জুস -ফুস সব বাদ দিয়া বেল ভাঙুম শরবত বানাইতে। এক ফালি তরমুজ, একটা বাঙ্গির অর্ধেকটা, কয়েকটা আঙুর,, একটা মালটা, আখের গুড় আর গন্ধরাজ লেবুর শরবত ব্যস্,,,এরপর?

দুইটা মুরগি, আর তিনটা মাঝারি সাইজের ইলিশ সতীনের কোলে গত সপ্তাহ ধইরা বেশ অস্বস্তিতে দিন কাটাইতেছিলো,,ওগুলোরে আইজকা সৎকার করা উচিত।

ধুরো…. রানতে গিয়া দেখি পিঁয়াজ কাটা নাই,,,মাছ,মুরগি,পিঁয়াজ কাটতে কাটতে বড় পোলা ফোলা টন্সিল দেহাইতে আইসা কয়,,,আম্মু, কষ্ট হইতাছে, কি করব? আমি কইলাম-” আল্লাহ্ ভরসা,,, আল্লাহ্ বান্দারে সহ্যের অতিরিক্ত কষ্ট দেন না।” বান্দা তো সাধারন রক্ত মাংসের শরীর মন নিয়া দুনিয়াতে কষ্ট কষ্ট কইরা গলা চিড়্যা ফাইরা আসমান জমিন ফাটাইয়া ফালায়। পোলা পানি গিললো কষ্ট কইরা। এহন তো মাথায় আরেক চিন্তা!!!  পোলা তো রোজা দিয়া অবসর নিছে,  এহন ওরে তো কিছু খাবার জোগাড় কইরা দিতে হয়!! মাইয়াডা জামাইর লগে শপিংএ গেছে শাশুড়ীর বোরকা বদলাইতে। ছোট পোলা গেছে টিউশনিতে। সাহেবে কোন সকালে কই গেছে বইলাও যায়নাই। সাহায্য কারী ওয়াহিদারে জিগাইছিলাম…” তুমি কি তোমার  খালুরে দেখছো ঘরে ঢোকার পরে?” হেয় কয়– না, খালা…তয় আমি লিফটে ওডার আগে দেখছি খালুরে বাইরে রিকসায় ওঠতে।

– লুঙ্গি পরা না….!!!!

–  না না… খালা,,,অফিসে যাওয়ার প্যান্ট স্যুট পরা দেখছি। ক্যা!! আমনেরে কইয়া যায়নাই কই যাইব?

আমি আর কিছু কইলাম না ওয়াহিদারে। ওয়াহিদা নতুন কাজে যোগ দিছে। অয় তো আর জানে না ওর খালুর স্বভাব!!!  আমারে ঘুমে দেখলে আমার সাইবে  কোনোদিন ডাক দিয়া উঠাইয়া কইয়া যাইব না। বড় পোলাও জিগাইলো- আব্বুর আজকেও অফিসে কাজ?   আমি আবার সতীনের কাছে গেলাম,,,, সবজি কী আছে দেখতে!

আচ্ছা!! কন তো মেজাজটা কেমন লাগে?

এই রোজা-রমজানের দিনে কেউ করল্লা কেনে? সতীনে শীতলতা ছাইড়া দেবার পর করল্লাও ঠান্ডা মস্তিষ্কে নিজের চরিত্র ছাইড়া পইচা গেছে। যে পেঁপে ফুরায়না মোটে সতীনের কোল থেইক্কা! সেও যাই যাই করার তালে উঠছে। কয়েকগাছি বরবটি বেগমও শুটকি হওয়ার তালে নাচতাছে মনে হইল। গাজরের কথা আর কি কব!!! উহারা কয়েকজনে এহনো অস্তিত্ব নিয়া চোখ পাকাইয়া আমার দিকে উঁকি মারতাছে। ৩০ টাকা দামের ক্যাপসিকাম সাহেব কাগজের প্যাকেটে এহনো তরতাজা আছে বইলা আমারে ওয়ার্নিং দিতাছে — অতি শীঘ্র আমার বিধিবদ্ধ সৎকারের ব্যবস্থা করো, নইলে মাইয়া তোমারে কটুক্তি, অপচয় কারিনী বইলা তিরস্কার করতে ছারব না। নাহ্….আজকে ক্যাপসিকাম সাহেবের ব্যাবহার করা সম্ভব না। আইজকা বাংলা খিচুরি হইব। খিচুড়ি হইব এইসব টোকানী ফোকানি সবজি সহযোগে। এবং তাও করতে হইব ঝটপট।

চাইল ডাইল ধুইয়া ভিজাইয়া রাইখা, সবজি কাটতে লইছি। আলু,পেঁপে,গাজর,বরবটি, ওহহো…. উনি(সাহেব) ২৫০ টাকা কেজি দরের কয়েকটা কাঁচা আম আনছিলো কাঁচা আমের জুস খাইব বইলা,, তিনটা তো আগেই সাবাড়! একটা মইরা গেছে, বাকি আছে একটা…. যাহ্…ওইটারেও সৎকারে দিয়া দেই।

মশলা কষানীর ঢং এহন করন যাইত না।

 

একে একে সব অতি চাপাচাপির হাড়ি ( প্রেসার কুকার) তে ঢাইল্যা, মশলা পাতি সব একবারে দিয়া দিলাম চাপাইয়া……২০ মিনিটে খিচুড়ি’র কেল্লাফতে।

ইলিশও ভাজা শেষ, মুরগিও রেডি হাড়িতে ওঠার জন্য। কলিংবেলের আওয়াজে দরজায় গিয়া দেখি সাহেব কামিং। – তুমি, কই গেছিলা আইজকার দিনেও? – মিরপুর ফ্যাক্টরিতে ইন্সপেকশন ছিলো।

ইফতারির টেবিলে আমি আর তিনি ছাড়া পোলা মাইয়া একটাও নাই। তিনি জিজ্ঞেস করিলেন অনুসন্ধিৎসু চোখে- ভাজা পোড়া নাই?

চক্ষু মটকাইয়া কইলাম- না… নাই,,, শরবত আর ফল খাইয়া খিচুড়ি খাও।

উনি ততোধিক গোয়ার্তুমি কইরা বলিলেন— নাহ্….  পরে খাব ….

অর্থাৎ,, যত যাইই করিনা কেন… ভাজা পোড়া ছাড়া সাহেবের ইফতার- ইফতার মনেই হয়না….

 

 

১০১জন ৪৮জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য