সঙ্কট-বৃষ্টি //

বন্যা লিপি ২৫ নভেম্বর ২০২০, বুধবার, ০১:০৬:২৪পূর্বাহ্ন ছোটগল্প ২৩ মন্তব্য

দাঁতগুলো ঝকঝকে। নিমের ডাল কেটে মেসোয়াক বানিয়ে রোজ দাঁত মাজে খলিল। হালকা কোঁকড়া চুলগুলো বিশেষ একধরনের চিরুনি দিয়ে আধাঘন্টা ধরে পড়ার টেবিলে সাজিয়ে রাখা অন্যান্য প্রসাধনী, যেমন, সুগন্ধী পাউডার, সস্তা দামের পারফিউমের শিশি, চিরুনি, সস্তা দামের একটা গোল আয়না,  আর ক্লাশ টেনের সব বইপত্রের সাথেই রাখা। সেই আয়নাটার মুখ দেখে দেখে সময় নিয়ে বড় পরিপাটি করে নিত্য নিজেকে সাজায়। মায়ের সাথে থাকে একা। বাবাকে চোখে দেখার আগেই বাবা পরলোকে পাড়ি জমিয়েছেন খলিল ছাড়াও আরো দুটো বোন রেখে। মায়ের একমাত্র ছেলে হবার সুবাদে সুবিধাদি যেমন পেয়ে থাকে গণ্ডমূর্খ গ্রাম্য মায়েদের কাছ থেকে ! খলিলও তেমনভাবেই বেড়ে উঠছে। বেশির ভাগ সময় মা ঘরে থাকেনা। মফস্বল শহরের পুরোনো বনেদি সব বাসায় খলিলের মায়ের বেশ যাতায়াত আছে। আছে ভালো সুনাম। সবাই তাঁকে পছন্দ করে, ভালবাসে বেশ। স্পষ্টবাদিতার কারনে সবাই সমীহও করে। ছোট শহরের আধা সরকারি একটা স্কুলে পড়ে খলিল। ছেলেটাকে মানুষ করার চিন্তাটা আছে খলিলের মায়ের । নিজে শাসন করতে পারেনা বলে স্কুলের রাগী শিক্ষকের কাছে একদিন নালিশ দিয়েছিলো, কথা শোনেনা, ঠিক মত পড়েনা, সন্ধ্যায় ঘরে আসেনা সময়মতো । শিক্ষক একদিন বাগে পেয়ে বেদম প্রহার করলেন ক্লাশের পড়া না পারার সুযোগে। একটানা এক সপ্তাহ আর বিছানা থেকে উঠতে পারেনি প্রচন্ড জ্বরের কারনে। জোড়া বেতের দাগগুলো দুমাসেও শরীর থেকে ঘোচেনি। তারপর থেকে কিছুটা অনুশাসনে চলে এসেছে খলিল। তবুও খলিলের চোখগুলো যেন কেমন। তেমনই দাঁতগুলো! যেন একটু বেশিই ঝকঝক করে আর গজদন্ত বলে যে দুটো আছে উপরের পাটির চারটে দাঁতের মাঝখানে! দেখলেই মনে হয় হরর মুভির রক্তচোষা মানুষ রুপি ড্রাকুলা।

মিনি’দের বাসায় সবসময় আসা যাওয়া আছে খলিল এবং খলিলের মায়ের। মিনি খুব ছোট বলে ভীষণ আদর করে খলিলের মা। মিনিও খলিলের মাকে দাদীর মতো মনে করে। প্রায়ই মিনির মা খলিলের মাকে দুপুরে খেয়ে যেতে বলেন। মিনিও খলিলের মার সাথে বসে খায়। খাওয়ার ছলে নানারকম গল্প বলেন। মিনির ভালো লাগে। মাঝে মাঝে এটা সেটা নিয়ে আসেন মিনির জন্য। এক পাড়ায় দাদা চাচাদের ঘরগুলো মিনিদের সব ঘরেই খলিল আর তার মায়ের সমান বিচরন। সমান গ্রহনযোগ্যতা। একদিনের ছোট্ট ঘটনায় মিনি খলিলকে দুচোখে বিষময় দেখতে শুরু করলো।

গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে সকাল থেকেই। আজ স্কুলে একা ই যেতে হবে। মিনি এখন ক্লাস সিক্সে পড়ে। ফ্রক পড়ে এখনো। স্কুলের ইউনিফরম পড়েনি আজ। অত কড়াকড়ি নেই বলে অনায়াসে আন-ইউনিফরমে কোনো অসুবিধা নেই। লাল সার্টিনের ফ্রকটা চাচি বানিয়ে দিয়েছিলো গেলো ঈদে। বুকের কাছে বই খাতা চেপে একটু দ্রুত পা চালাচ্ছে মিনি। বাসার গেট দিয়ে বেরিয়ে ডান দিকে মোড়। তারপর সোজা রাস্তা চলে গেছে শহরের ভেতর দিকে। পথে যেতে যেতে সব পরিচিত বাড়ি একে একে পেছনে ফেলে এগোচ্ছে মিনি। সোহাগদের বাসা, খুশি আপাদের বাসা…….তারপরেই ব্যাংক অফিসার সোহরাব সাহেবের বাসা। মেইন রাস্তার পাশেই ঢেউটিনের সীমানা প্রাচীর দেয়া বাড়ি।  গেট দিয়ে ঢুকলে সামনে অনেকটা খালি জায়গা। সবুজ ঘাস পেরিয়ে কিছুটা দূর যেতে যেতে হাতের ডানে একটা বিশাল বড় বরই (কুল) গাছ। তার পাশেই পরিত্যাক্ত এক পাতকুয়ার উঁচু হয়ে থাকা পাঁচিলটুকু এখনো অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। সোহরাব সাহেব এ বাড়িতে ভাড়া থাকেন। মইনুদ্দিন সাহেব এ বাড়ির মূল মালিক। সোহরাব সাহেব, স্ত্রী আইরিন আর তাঁদের আড়াই বছরের কন্যা ইভাকে নিয়ে এখানে এসেছেন দুবছরের মত হলো। ইতিমধ্যে সবার সাথেই ভালো সখ্যতা গড়ে নিয়েছেন অমায়িক, আন্তরিক ব্যবহারে। মিনির মা চাচির সাথেও ভালো আন্তরিকতা আছে। মিনি ২/১বার এসেছে এ বাড়িতে। এ বাড়ির সীমানা গেট দিয়ে ঢুকেই ডান পাশে দু’চালা একখানা ঘর আছে। একটাই থাকার ঘর। মইনুদ্দিন সাহেব ঘরখানা বানিয়েছিলেন নিজের চেম্বার করার জন্য। পরবর্তীতে খলিলের মা’কে বিনা ভাড়ায় থাকতে দিয়েছেন ছেলেকে নিয়ে।

খুশি আপাদের বাসা ছাড়িয়ে এগোতেই বৃষ্টির গতি হঠাৎই বেড়ে গেলো। মিনি হতভম্ব হয়ে দৌঁড় দিলো খলিলদের ঘরটার ঠিক টিনের চালের নিচে। খুব রাগ লাগছে মিনির। কেন যে ছাতা না নিয়েই বেরোতে গেলো!! কতক্ষনে এ বৃষ্টি থামবে কে জানে?  মুকুল স্যারের পিরিয়ডে সময়মতো পৌঁছুতে না পারলে নির্ঘাত আজ ক্লাসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখবেন পুরো ক্লাস টাইম। বৃষ্টির ছাঁট এসে পায়ের দিকটা ভিজিয়ে দিচ্ছে। মিনি এখনো সালোয়ার পড়া শুরু করেনি। মাকে বলতে হবে এ সপ্তাহের মধ্যেই যেন দুটো সালোয়ার বানিয়ে দেয়। এভাবে আর হাফ প্যান্ট পরতে ভালো লাগেনা। হাঁটুর নীচটা কেমন খালি খালি লাগে।  কিছুদিন ধরে এই বোধটুকু যখন তখন মাথায় উঁকি দিচ্ছে। পা দুটোকে কেমন ন্যাংটো ন্যাংটো লাগে। লজ্জা আর সংকোচে মিনি স্বাভাবিক হতে পারেনা স্কুল, পাড়ায় খেলার মাঠে যখন খেলতে বেরোয় বিকেলে!  ইদানীং ওড়না পড়তেও ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে। ২/২টা ঝালড় দেয়া জামা বানিয়ে দিয়েছেন মা সেলাই মেশিনে। ওই ফ্রক পড়লে তখন আর ওড়নার কথা মনে পড়েনা। ঝালড় ছাড়া ফ্রক পড়লেই কেবল মনে হয় ওড়না দরকার এখন। জাপটে ধরে আছে বই খাতাগুলো দুইহাতে বুকের কাছে। কোনো এক অজানা কারনে বৃষ্টির প্রতি বহুগুণ রাগান্বিত মিনি মনে মনে জপ করছে……বৃষ্টি থেমে যা…..বৃষ্টি থেমে যা,– আরে! মিনি!! তুই এখানে দাঁড়িয়ে? ভিজে যাচ্ছিস তো! আয় ভেতরে আয় শীগগির! ঘাড় ঘুরিয়ে মিনি দেখলো খলিল কাকা তাঁদের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে। মিনি কিছুক্ষণ গো ধরে দাঁড়িয়েই রইলো , আবারো জোড়ে ঝাড়ি দিয়ে উঠলো খলিল কাকা : আয় জলদি ভেতরে ! অবশেষে পা বাড়িয়ে দরজায় পা রাখলো মিনি। খলিল গামছা টেনে নামালো রশি থেকে। মাথা মোছাতে হাত বাড়ালো…. মিনি বাঁধা দিলো….মাথা ভেজেনিতো!  : তাইত! আচ্ছা… বলেই বসে পড়লো পায়ের কাছে,  দে তোর পা মুছে দেই, বলেই গামছা দিয়ে পা মুছতে গেলো। মিনি অদ্ভুত মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় কাঠ হয়ে গেলো। কি করবে, কি না করবে ভাবছিলো। খলিলের হাতে এখন গামছা সরে গেছে। টেবিলের দিকে নজর চলে গেলো মিনির। একটা খোলা পাতলা রঙিন ম্যাগাজিনের মত। দুপাশের দুই পৃষ্ঠায় স্বল্প বসনা দুটো নারীর ছবি। লজ্জায় চোখ ফিরিয়ে নিতেই টের পেলো আপত্তিকর স্থানে হাত চলে গ্যাছে খলিলের। এক ঝটকায় পা ঝাড়া দিলো মিনি। খলিল চেপে ধরার চেষ্টা করলো। দুই হাত দিয়ে সর্বশক্তি প্রয়োগে ঝটকা দিলো। খলিল ভারসাম্যে টালমাটাল হয়ে চিৎ হয়ে পড়ে গেলো মাটির মেঝেতে। বই খাতা সামলে বৃষ্টি মাথা বেরোতে চাইতেই পা ধরে বসলো আবার খলিল। মিনি এবার গলায় জোড় টেনে বললো…. “পা ছাড় নইলে চিৎকার করে রাস্তার মানুষ ডাকব।  শকুনের মতো চোখ দুটো হঠাৎ যেন ছোটো আর ভয়ার্ত হয়ে গেলো। : মিনি তোর পা ধরি কাউকে কিছু বলিস না, আমি আর এমন কিছু করব না এই জীবনে। হাতজোড় করছি, ভাই ভাবিকেও কিছু বলিসনা। মিনি কোনো কথার ভ্রুক্ষেপ না করেই ছুটে বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে। আচমকা সম্পূর্ণ অচেনা এরকম একটা পরিস্থিতি মিনিকে প্রচণ্ডরকম ভয়ে কাতর করে ফেললো। মাথার ভেতরটা কেমন ফাঁকা শূন্য হয়ে গ্যাছে। সর্ব শরীর থরথর করে কাঁপছে। চলার গতি ধীর হয়ে গেছে। বাকি পথও একেবারে কম নয়। তবু মনে হচ্ছে ক্লাসে পৌঁছুতে সারাদিন লেগে যাবে।

মিনি আসলেই কাউকে কিছু বলেনি কোনোদিন। কোনোদিন ক্ষমাও করেনি খলিলকে। আজন্ম কালের এক ঘৃণা নিয়েই মিনি বড় হয়ে গেছে সময়ের দিনলিপি গুণতে গুণতে।

নোটঃ সমাজে খলিলের মত কাছের, বিশ্বস্ত এবং আপনজন দ্বারাই কন্যা শিশুরা সবচে আগে অনাকাঙ্খিত এরকম পাশবিক নির্যাতনের স্বীকার হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। যুগ যুগ ধরেই চলে আসছে কন্যা শিশু থেকে পরিনত মেয়ে, নারী’র প্রতি লালসার নজর আর তার প্রয়োগ। নারীর পোষাক নিয়ে, যথেষ্ঠ শালীনতা নিয়ে, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পর্দাপ্রথা নিয়ে সবসময়ই এক শ্রেণী বিতর্কের সৃষ্টি করে আসছেন।  বিতর্কের বিষয়গুলো যদি মেনেও নেই। তবুও কি প্রশ্ন এবং বিতর্ক সমাপ্ত হবে? হবে না। ইসলাম ধর্ম নারী পুরুষ সবার জন্যই বিধান রেখেছে সংযত হয়ে জীবন বিধানের। সেখানে তর্কের জায়গা নেই। আছে বিধান না জেনে বুঝে অপপ্রয়োগ করার মানসিকতা। যা ভয়ানক রুপ ধারন করছে দিন দিন।

শুভ কামনা সকলের প্রতি🌹🌹

২৯৭জন ১২০জন
0 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য