শ্রাবনে ভূতুরে প্রেম

রোকসানা খন্দকার রুকু ২৯ জুলাই ২০২১, বৃহস্পতিবার, ০৯:১৯:১৭অপরাহ্ন গল্প ১৮ মন্তব্য

দুপুরে খাবারের পর দু একজন ছাড়া ব্যাংকের সবাই মিষ্টি পান খায়।মেয়েদের ঠোঁট লাল হয়ে থাকে, দেখে মনে হয় এইমাত্র কেউ চুমু দিয়ে ঠোঁট লাল করে রেখে গেলো। বাসায় মামীমাও পান খান, এতো সব দেখে আমারও পান ভক্তি এসে গেছে। সবসময় খাওয়া হয় না, শুধু দুপুরে খাই। নিজের মধ্যে কেমন সুখী সুখী ভাব আসে। আমার ধারনা, যারা সবসময় পান খায় তারা অনেক সুখী হয়। আমার পান খাওয়া দেখে মেয়ে কলিগরা বলেন ‘রুপা’ তোমাকে পান খাওয়ার সময়টাতে অন্তত: বদরাগী নয়, বেশ রোমান্টিক লাগে।

আমিও খেয়াল করেছি দুটেবিল পরের আতিক সাহেব এ সময় কেমন লুকিয়ে লুকিয়ে দ্যাখেন। সম্ভবত তিনি আমাকে পছন্দ করেন, ভয়ে বলতে সাহস পান না। চাকুরী হবার পরেই বাসায় বিয়ের প্রচন্ড চাপ কিন্তু আমার মনে হয় বিয়েটা প্রেমের হওয়া দরকার। কিছু না থাক অন্তত বোঝাপরাটা ভালো থাকে। একজন বদরাগী মেয়ের জন্য ডাকসাইটে ছেলে দরকার। কারন আমার হঠাৎ হঠাৎ রেগে যাওয়ার জন্য এমন একজন দরকার যে মিনমিন করে পালিয়ে না গিয়ে এ সময় দুটো চড় বসিয়ে দেবে। মুহূর্তই রাগ বেলুনের মতো উধাও। এমন ছেলে তো আজকাল পাওয়াও দুস্কর।

ব্যাংকে দুএকজন আছেন কেমন মিনমিনে টাইপ। আর আমার অতি রাগী স্বভাবের কারনে ছেলেরা কাছে ঘেসতেও ভয় পায়। তবে ভার্সিটির ম্যাথমেটিকস এর সিনিয়র রাশেদ ব্যাংকের সামনে সন্ধ্যে অবধি দাঁড়িয়ে থাকে।

রাশেদকে কতোবার করে বলেছি, ‘ আপনার সাথে আমার যায় না। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন না? লোকে কি ভাববে?  তবুও দাঁড়িয়ে থাকে। মন চায় কষে দুটো থাপ্পর লাগিয়ে দেই কিন্তু দেয়া হয় না। সারাদিন ট্যাক্স অফিসে বসে জটিল হিসেব করার পর দাঁড়িয়ে থাকে দেখতে খারাপ লাগে, আমারই কষ্ট হয়!

রাশেদ মানুষ হিসেবে ভালো কিন্তু একটু ব্যক্তিত্ব কম। সারাজীবন তাকেই আমার বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে। এটা আমার ভালো লাগে না। তবে খুব বোকা নয়; অনেকটা বোকা সেজে থাকার ভান করে কিংবা মেধাবী মানুষরা কথা কম বলে এমনও হতে পারে। কম কথা বলাটাও আমার অসহ্য। ঝগড়ার সময় চুপ করে থাকবে, তখন আমার আরও রাগ লাগবে।দুজনে তুমুল ঝগড়া না হলে কি জমে?

আজ সন্ধ্যায় কি মনে করে পান চিবোতে চিবোতে অফিস থেকে ফিরলাম। বসার ঘরে লোকজন বলে মনে হলো। ঘটনা না জানতেই মামীমা বললেন, ‘ দুজন বষস্ক মানুষ এসেছেন তোমার সাথে কথা বলবেন। যাও একটু ফ্রেশ হয়ে কথা বলে আসো। কথা বললেই তো বিয়ে হয়ে যায় না।’ না করতে পারি না কিন্তু অদ্যবদি একজনকেও আমার পছন্দ হয়নি। আমি অনিচ্ছায় জিন্সের উপর একটা ঢিলে-ঢালা কামিজ আর ওড়না গলিয়ে গেলাম।

-ও মাই গড, রাশেদ? আপনি কোন সাহসে। কতোবার বলেছি আপনার সাথে আমার যায় না। তবুও কেন বাড়াবাড়ি করছেন? আমার চিৎকারে ভয়ে সে সোফার এক কোনায় ঢুকে গেলো। তার বাবা আর চাচা হতভম্ব।

আমি উঠে এসে সাফ জানিয়ে দিলাম- ‘ এ ছেলে আমার পছন্দ না , আমার সাথে যায় না। আমি একে বিয়ে করবো না।’

বাসার সবার অতি পছন্দ। বিশেষ করে মায়ের এতো পছন্দ যে তিনি এই ছেলেকে জামাই বানাতে না পারলে সুইসাইড করবেন! অবশেষে সবার চাপাচাপি আর ব্রেইন ওয়াশে রাজী হয়ে গেলাম তাও তখুনি বিয়ে করতে হবে। কারন রাশেদ দুদিন বাদে ছ’ মাসের ট্রেনিং এ যাবে। তাছাড়া সবাই জানে আমি যে কোন সময় মত বদলাতে পারি।

আমার কতো স্বপ্ন ছিলো বিয়েতে ডিজে থাকবে। বন্ধুরা থাকবে, আমি নাচবো কিছুই হলো না। সবার কাছ থেকে গয়না ধার করে মামীমার বিয়ের শাডিতে বিয়ে হয়ে গেলো।

বাসর ঘর বলতে ফুলহীন বিছানা। একটু আগের সোফায় লুকানো রাশেদ আবেগে কেমন ঝলমল করছে। দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলতে লাগলো, ‘  কিছুক্ষন আগের জিন্স পরা বউ শাড়িতে অসাধারন! কারন আমার ফিগার চমৎকার। আর বাসার সবাইকে সে আগেই ম্যানেজ করেছিলো। সবাই মিলে আমার অগোচরে বুদ্ধি করেই এসব করেছে। সে ভীষন খুশি। এখন তার কোন ভয় নেই! এখন যেহেতু আমি তার বউ তাই আমাকে সে চুমু খেতেই পারে।এবং বোকার মতো চুমু খেতে এগিয়ে এলো।’

এসব শুনে আমার মেজাজ সেই লেভেলে খারাপ।কোনভাবেই নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে তাকে কষে মাত্র দুটো চড় লাগালাম। বেটা, আমার সকল আয়োজন মাটি করে দিয়ে আবার তোর চুমুও এখুনি লাগবে। দরজার কোনায় যারা রোমান্স দেখার জন্য লুকিয়ে ছিলো মুহূর্তেই সব উধাও। আর রাশেদ ভেউ ভেউ করে কেঁদে বলতে লাগলো, “ কাল চলে যাবো আর কোনদিন আসবো না।”

বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলেও আমি কিছুই বলতে পারলাম না। কিন্তু সারারাত জেগে রইলাম। কারন আমি মানুষ যেমনই হই এ জীবনে কারও গায়ে হাত তুলিনি।

রাশেদ সকালবেলা আবার হাসিখুশি, আমার সাথে কথাও বলছে। তার নাকি কলের ঠান্ডা পানিতে গোসল করা অভ্যাস। আমি কলপার দেখিয়ে নাস্তা বানাতে হেল্প করছি, বাসায় বুয়া নেই। রাশেদ অর্ধ গোসলে কাঁপতে কাঁপতে এলো। কাপড়-চোপর গুছিয়ে বলছে এই বাসায় আর এক মুহূর্তও থাকবে না। সবাইকে অবাক করে কিছুক্ষনের মধ্যেই সে চলে গেলো। সবাই ভাবলো আমি নিশ্চয়ই আবার কিছু করেছি।

দুপুরে শাশুরী মায়ের ফোন। তার ছেলে কেঁদে কেটে অস্থির। কি হয়েছে; অবশেষে জানা গেলো।

আমাদের কলের একটা পাম্প লাইন থেকে দুটো কল চলে। তো পাশের কলে যখন কেউ পানির জন্য চাপ দেয় অটোমেটিক অন্যটিতেও পানি পরে। রাশেদ যখন গোসল করছিলো হঠাৎ কলের মুখ দিয়ে একা একা পানি পরায় সে ভেবেছে এ ভূতের কাজ। আমি খুব হাসলাম। মানুষ এতো বোকা হয়। এ সায়েন্স এ কিভাবে পড়লো আর বিসিএস করে এখন ট্যাক্স সামলাবে কি করে?

ছ’ মাস রাশেদের ট্রেনিং। ফোন দিলেই ব্যস্ততার অজুহাতে একদমই কথা বলে না। রাগ কিংবা ভয় এখনও শেষ হয়নি। আমার খারাপ লাগে, কথা বলতে মন চায়। আবার বারবার ফোন দিতেও ইগোতে লাগে। এখন কি রকম চুপচাপ থাকতে ভালো লাগে। আর তার পুরোনো স্মৃতি ভেবে হাসি। আমি কি রাশেদের প্রেমে পড়েছি? হয়তো তাই কারন সারাক্ষন তার কথাই ভাবি। অফিসের পর রুমে গিয়ে অপেক্ষা করি; সে যদি ফোন দেয়। রাশেদ ফোন দেয় না।

একদিন শাশুড়ী মা চুপিচুপি ফোন দিয়ে জানালেন রাশেদ বাসায় আসবে, অসুস্থ। জন্ডিস হয়েছে তবে তার ট্রেনিংও শেষ। আমার অভিমান হওয়া উচিত ছিলো কিন্তু হলো না। ভার্সিটিতে তিনবছর ধরে আমার পেছনে লেগে ছিলো এরপর এতোসব করে বিয়ে করলো। থাপ্পর মেরেছি বলে আমাকে গত ছ’ মাসে কাজের অজুহাতে এডিয়ে গেলো তবুও রাগ, অভিমান কিছুই হলো না।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এবার আমি তাকে চমকে দেবো। আমাদের বিয়ে তখনও উঠিয়ে দেয়নি। তবুও আমি তাকে দেখতে যাবো।

সেদিন তারাতারী অফিস থেকে ফিরে একগোছা ফুল কিনে নিয়ে বাসে চেপে বসলাম। পৌঁছতে সন্ধ্যা সাতটা, আমি কাউকে চিনিও না। এক যুবক ছেলে সাহায্য এগিয়ে এলো। একেবারেই গ্রাম এবং নদী এলাকা, রাস্তা বলতে কিছু নেই। আইলের মতো উঁচু-নিচু কোনরকম হেঁটে যাওয়া যায়।

আমি জুতা খুলে হাতে নিলাম, ছেলেটি ব্যাগ কাঁধে পথ দেখাচ্ছে । কষ্ট হবার বদলে; আমি রীতিমতো শিহরিত। চারিদিকে পানি চাঁদের আলোয় চকচক করছে। শ্রাবণের আকাশ তার সমস্ত চাঁদের আলো ছডিয়ে দিয়ে আমায় বরণ করছে। আমি শশুরবাডি যাচ্ছি পায়ে হেঁটে। হঠাৎই পা পিছলে হুড়মুড় করে পড়ে গেলাম। তাও একদম পাশের ধানক্ষেতে। পুরো গা কাদায় মাখামাখি। অবাক হলেও সত্যি, ফুলগুলো ঠিক অক্ষত!

রাশেদের ইট, টিন মিলিয়ে সামান্য ছাদ সম্বলিত বাড়ি। আমি গেটে দাঁড়িয়ে রাশেদকে ফোন দিলাম। সে রিসিভ করতেই বললাম, “ আপনাদের গেটে দুজন মানুষ অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে আছে, গেট খোলেন না কেন?’

-তুমি জানলে কি করে?

-আমি যে ভুত, তাই!

গেট ধরে দাঁড়িয়ে রাশেদ। আমি তার দিকে ফুল ধরে কিন্তু সে নিচ্ছে না, অপলক তাকিয়ে আছে। একসময় ’ভুত’ বলে মাথা ঘুরে পড়ে গেলো। মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে তবুও সে ভুত, ভুত বলছে।

সবাই নতুন বউ এর হাল দেখে মুখ টিপে হাসছে। আমার গায়ে যে পরিমান কাদা চেনার উপায় নেই; ভুতের মতোই লাগছে। গায়ের কাদা ধুতে আমার অনেক সময় লেগে গেলো। ব্যাগ থেকে নীল কাতান বের করে পড়লাম। শাশুড়ী কপালে চুমু দিয়ে বললেন, ‘ মা তুমি তো অনেক সুন্দর, আমার পাগল ছেলে কিছু মনে করোনা। ছাদে আছে যাও।’

রাশেদ ছাদঘরে ঘুমোচ্ছে। আমি গিয়ে পাশে বসে মাথায় হাত রাখলাম। জোসনায় তখন চারিদিক মাখামাখি, আমার কেন যেন মনে হলো জিজে পার্টি, বন্ধুদের নাচ কিংবা ফুলভরা ফুলশয্যার চেয়ে এই চাঁদের মাখামাখিই বেশি ভালো।

রাশেদ চোখ মেলে আমাকে দেখে অবাক বিস্ময়ে বললো, ‘ তুমি রুপা। আমার বউ।তুমি ভুত নও।’

আমি রাশেদকে জড়িয়ে ধরলাম।গভীর আবেগ, প্রেমে দুজনে হারিয়ে গেলাম। আজ পান না খেয়েই আমার ঠোঁট অনেক বেশি লাল হয়ে গেলো। তারপর,,,,

ছবি- নেটের।

২১৪জন ৫৮জন
0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য