শেখ রাসেলের আত্নকথন

ইসিয়াক ১৪ আগস্ট ২০২০, শুক্রবার, ০৭:০৩:১৮পূর্বাহ্ন খ্যাতনামা ব্যক্তি ১৮ মন্তব্য

[১]
আমি শেখ রিসালউদ্দীন।এটা আমার স্কুলের নাম।
ডাক নাম রাসেল।
আব্বা বার্ট্র্যান্ড রাসেলের খুবই ভক্ত ছিলেন।
তার ফিলোসফির ভক্ত হয়ে মা আমার নাম রাখলেন রাসেল ।
আমার জন্ম সাল ১৯৬৪
অক্টোবরের ১৮তারিখ ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাসায়।
জন্মের সময় মাথাভরা ঘন কালো চুল ছিলো আমার।
তুলতুলে নরম ছিলো গাল।
আর
আমি নাকি দেখতে খুবই সুন্দর ছিলাম।
হাসুপা ছিলো এত দুষ্টু শুধু আমার গাল ছুয়ে আদর করতো ।
আমার জন্মের পর সবার প্রথম হাসুপার কোলে উঠি ।
হাসুপা’টা না সেই রকম ,সাথে সাথে আমার মাথা মুছিয়ে চিরুণী বোলাতে শুরু করে দিলো।
ভারি রাগ হচ্ছিলো তখন কিন্তু আমার…..।
পরবর্তীতে অবশ্য আমার শখ ছিলো বুবুর লম্বা চুলের বেণি ধরে খেলা করা ।
খুব মজা পেতাম।
এরপর দিনে দিনে আমি বড় হতে লাগলাম,
বাসার সামনে ছোট্ট একটা লন।
চকচকে সবুজ ঘাসে ভরা।খুব সুন্দর।
আরো অন্যান্য গাছ তো ছিলোই সেখানে।
আমার মা খুবই যত্ন নিতেন বাগানের।
বিকেলে আমরা সবাই বাগানে বসতাম।সবাই খুব মজা করতো।
সেখানে একটা পাটি পেতে আমাকে খেলতে দেওয়া হতো।
একপাশে একটা ছোট্ট বাঁশ বেঁধে দেওয়া ছিল, সেখানে আমি ধরে ধরে হাঁটতে চেষ্টা করতাম।
তখন কেবল হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছি আর কি।
আমি হাঁটলে কেমন দেখায়, সেটার জন্য বোধহয়
সবাই আমাকে হাত ধরে হাঁটাতে চেষ্টা করতো।
কিন্তু আমি কিছুতেই হাঁটতে চাইতাম না।
কুঁড়েমি করতাম।
রবাবরই আমার স্বাস্থ্য খুব ভালো ছিল।
বেশ নাদুস-নুদুস টাইপের।
ভাইবোন সবাই সময় করে আমাকে হাত ধরে হাঁটাতো।
বড় আপাকে আমি হাসুপা বলে ডাকতাম।
কামাল ভাই ও জামাল ভাইকে বলতাম ভাই,
আর রেহানা আপাকে আপু।
কামাল ভাই ও জামাল ভায়ের নাম ধরে কখনও বলতাম না।
সবাই অনেক চেষ্টা করতো নাম শেখাতে, মিষ্টি হেসে মাথা নেড়ে বলতাম ”ভাই।”
বড়দের কখনো নাম ধরতে আছে নাকি?
দিনের পর দিন সবাই যখন চেষ্টা করে যাচ্ছে- একদিন অনেক অনিচ্ছা সত্ত্বে বলেই ফেললাম,
‘কামমাল’, ‘জামমাল’।
আমি ছিলাম সবার আদরের,
আমার যখন দেড় বছরের কিছু বেশি বয়স |
তখন আমার আব্বার ৬ দফা পেশ করার কারনে
পাকিস্তান সরকার উনাকে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করেন।
আমি ছোট ছিলাম,তেমন কিছু না বুঝলেও
আব্বার অনুপস্থিতি অনুভব করতাম সবসময়।
বোঝা না বোঝার মাঝে অনেক কিছুই আমার হৃদয় স্পর্শ করে যেতো।
একদিন,
আমি প্রথম বারের মতো তখন মায়ের সাথে কারাগারে আব্বাকে দেখতে যাই।
সেদিন ছিলো ৮ ফেব্রুয়ারি
আমি আব্বাকে দেখেই বললাম ,আব্বা বাড়ি চলো।
আব্বা মনে হলো একটু বিব্রত হলেন,ভাবলেন কী উত্তর দেবেন।
আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন।
বললেন, তোমার মার বাড়ি তুমি যাও, আমি আমার বাড়ি থাকি। এটা আমার বাড়ি,
আবার আমাকে দেখতে এসো মাঝেমাঝে তাহলেই হবে।
সেই সব দিনগুলোতে আমার শুধু মনে হতো
আব্বাকে কি করে মুক্ত করে নিয়ে যাবো
আমার এই দুর্বল হাত দিয়ে
এই দয়া মায়াহীন পাষাণ প্রাচীর থেকে,কি করে?
এরপর থেকে,
আব্বার সাথে প্রতি ১৫ দিন পর পর আমরা দেখা করতে যেতাম।
আমি সেখান থেকে কিছুতেই ফিরতে চাইতাম না।
আমার খুব খারাপ লাগতো আব্বার জন্য।
আমাকে বোঝানো হয়েছিল যে আব্বার বাসা জেলখানায়।
আর
আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি।
আমি কিছুতেই বুঝতে চাইতাম নােআব্বা আমাদের থেকে দূরে আছে এ জন্য আমার খুব কষ্ট হতো।
মন মানতো না কিছুতেই।
যদিও তখন পুরোটা বুঝতে না পারলেও আব্বাকে ছেড়ে থাকাতে কষ্ট ঠিকই পেতাম।
সেইসব রাতে আমি আর ঘুমাতে পারতাম না।
বাসায় যখন আব্বার জন্য কান্না করতাম, মা আমাকে আদর করে বোঝাতো,
আমিই তোমার আব্বা।
আমাকেই আব্বা বলে ডাকো, পরে মাকেও আব্বা বলে ডাকতাম,
মনের কষ্ট কমানোর জন্য।
আব্বা যখন ফিরে এলো,
একদিন আমি হাসু আপাকে বললাম, ”হাসু আপা তোমার আব্বাকে একটু আব্বা বলে ডাকি?’”
সবাই অবাক হলো।মজাও পেলো খানিক।
যাহোক
আরেক দিন,
আরেক উত্তাল করা সময়ের ঘটনা।
বাবা বন্দী। আমরা জানিনা বাবাকে কোথায় রাখা হয়েছে।
একদিন মাকে জিজ্ঞেস করি মা আব্বার কাছে যাবে না?
মা কোনো উত্তর দেয় না।
দিবে কি করে তখন যে ছয় মাস ক্যান্টনমেন্টে আটকে রাখা হয়েছিল আব্বাকে।
কেউ কোনো খবরই জানতো না কোথায় আছে আব্বা।
আমাকে স্বান্তনা দিতে বুকে টেনে নিয়ে আদর করলেন মা।
আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম,
-মা আব্বার নাকি ফাঁসি হবে?
-মা ফাঁসি কি?
মা বললেন, ”তোমাকে একথা কে বলেছে।”
আমি উত্তর দিলাম,
-”সেদিন কাকা, দুলাভাই আর কামাল ভাই বলাবলি করছিলো,আমি শুনেছি মা।”
মা কিছু না বললেও আমাকে বুকে টেনে নিলেন।
মায়ের মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না।তার ছলো ছলো চোখ দেখে আমারো কান্না পেয়ে গেলো।
আব্বা যখন জেলে থাকতো আব্বার সঙ্গে দেখা করতে গেলে’জয় বাংলা’ স্লোগান দিতাম।
এমনকি হরতালের দিনগুলোতেও বাসার সামনের লনে দাঁড়িয়ে হরতাল হরতাল বলে স্লোগান দিতাম।
আমি আব্বার সান্নিধ্য বেশি না পেলেও যখন পেতাম তখনই আব্বাকে সবসময় অনুকরণ ও অনুসরণ করতাম।
চলাফেরায় বেশ সাবধানি কিন্তু সাহসী ছিলাম বরাবরই,
কোনও কিছুতে ভয় পেতাম না সহজে ।
একটা ঘটনা বলি,
কালো কালো পিপড়াগুলো আমায় খুব আকর্ষণ করতো,
আমি ওদের দেখা পেলেই ওদের কাছে ছুটে যেতাম।
একদিন একটা বড় পিপড়ার কামড়ে আমায় বেশ রক্তাক্ত করে দিলো।
রাগে রাগে পিঁপড়াকে নাম দিলাম ভুট্টো।

যাহোক,
আমাদের বাসায় কবুতরের ঘর ছিল।
বেশ উঁচুতে ঘরগুলো করা হয়েছিল।
অনেক কবুতর থাকতো সেখানে।
মা খুব ভোরে উঠতেন। আমাকে কোলে নিয়ে নিচে যেতেন এবং নিজের হাতে কবুতরদের খাবার দিতেন।
আমি যখন হাঁটতে শিখি তখন নিজেই কবুতরের পেছনে ছুটতাম,
নিজে হাতে করে তাদের খাবার দিতাম।ওদের জন্য আমার খুব মায়া লাগতো।
কি যে আদুরে আর আহ্লাদী ছিলো ওরা।
আমাদের গ্রামের বাড়িতেও কবুতর ছিল।
কবুতরের মাংস সবাই খেত।
বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন অধিকাংশ জমি পানির নিচে থাকতো তখন সবজি ও মাছের বেশ অভাব দেখা দিত।
তখন প্রায়ই কবুতর খাওয়ার রেওয়াজ ছিল।
সকালের নাস্তার জন্য পরোটা ও কবুতরের মাংস ভুনা সবার প্রিয় ছিল।
তাছাড়া কারও অসুখ হলে কবুতরের মাংসের ঝোল খাওয়ানো হতো।
ছোট ছোট বাচ্চাদের কবুতরের স্যুপ করে খাওয়ালে রক্ত বেশি হবে, শক্তি হবে,
তাই বাচ্চাদের নিয়মিত কবুতরের স্যুপ খাওয়ানো হতো।
আমাকে কবুতর দিলে কোনও দিন খেতাম না।
কিছুতেই না।
খুব মায়া লাগতো কবুতরগুলোর জন্য।
অনেকে অনেকভাবে চেষ্টা করতো খাওয়ানোর জন্য।
আমি মুখ ফিরিয়ে নিতাম।ফিরিয়েই রাখতাম।

১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি
আব্বাকে আগরতলা মামলায় আসামি করে
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে বন্দি করে রাখা হয়।
দীর্ঘ ছয় মাস আব্বার সঙ্গে দেখা হয়নি আমাদের।
আমরা জানতেও পারিনি আব্বা কেমন আছেন, কোথায় আছেন।
আব্বার জন্য নানা ভাবনায় আমার শরীর খারাপ হয়ে গেলো।
খাওয়া-দাওয়া নিয়ে আরও জেদ করতে শুরু করি তখন আমি।
আমার সব সময় অন্য রকমের একটা কষ্ট হতো আব্বার জন্য বুকের ভিতরে।
কী যে কষ্ট! কীযে কষ্ট!
আমার বুকের ভেতরে জ্বলে যেতো কিন্তু কাউকে বোঝাতে পারতাম না।

ওহ! বলতে ভুলে গেছি,
আরেকটু পিছিয়ে যাই
১৯৬৭ সাল,
হাসুপা কলেজ শেষ করে ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো।
মা আব্বার মামলা ও পার্টি নিয়ে ব্যস্ত।
প্রায়ই বাসার বাইরে যেতে হয় তাকে।
মামলার সময় কোর্টে যেতে হয়।
হাসুপা ও অন্যান্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন জোরদার করার জন্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে,
১৯৬৮ সালে ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন নিয়ে সবাই ব্যস্ত।
আন্দোলন সংগ্রাম তখন জোরদার হয়েছে।
কেউ আমাকে তেমন সময় দিতে পারে না।
আমার মন খারাপ।
আম্বিয়ার মা সব সময় আমাকে এই সময়টাতে দেখে রাখতো।
এমনিতে খাবার খেতে চাইতাম না।
কিন্তু রান্নাঘরে যখন সবাই খেত তখন সবার সঙ্গে বসতাম।
পাশের ঘরে বসে লাল ফুল আঁকা থালায় করে পিঁড়ি পেতে বসে কাজের লোকদের সঙ্গে ভাত খেতে পছন্দ করতাম।
ওদের কে নিজের লোক মনে হতো সবসময়।
মনে হতো ওরাও আমার আপনজন।
আমাদের একটা পোষা কুকুর ছিল
ওর নাম ছিলো টমি। টমি নামটা বেশ সুন্দর না?
কে রেখেছিলো তা বলতে পারবো না।
টমির সবার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব ছিল।
আমিও টমিকে নিয়ে খেলতাম।
একদিন খেলতে খেলতে হঠাৎ টমি ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠে,
আমি ভীষণ ভয় পেয়ে যাই।
কাঁদতে কাঁদতে রেহানা আপুর কাছে এসে বললাম,” টমি বকা দিচ্ছে।”
আমার কথা শুনে সবাই বিচ্ছিরিভাবে হাসলো।
বলল, টমি আবার কিভাবে বকা দিল।
ভীষণ রাগ হলো আমার। গম্ভীর হয়ে গেলাম।
কারণ টমিকে আমি খুব ভালোবাসতাম।
হাতে করে তাকে আমার পছন্দের খাবার দিতাম।
সত্যি সত্যি নিজের পছন্দমতো খাবারগুলো টমিকে ভাগ দিতাম ঠিক ঠাক,
তাই ওর বকাতে আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।
১৯৬৯ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি প্রায় তিন বছর পর আব্বা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যখন মুক্তি পান তখন আমার বয়স চার বছর পার হয়েছে।
কিন্তু ভীষণ রোগা হয়ে গিয়েছিলাম বলে আরও ছোট্ট দেখাতো আমাকে।
আব্বা বাড়িতে আসার পর থেকে আমার কিছুক্ষণ পর পর আব্বাকে না দেখলে কেমন যেন খালি খালি লাগতো।
মনে মনে ভয় পেতাম আব্বাকে বুঝি আবার হারায়ে না ফেলি।
আব্বার কাছাকাছি থাকতাম সবসময়।
খেলার ফাঁকে ফাঁকে কিছুক্ষণ পরপরই আব্বাকে দেখে আসতাম।
মনে মনে একধরনের শান্তি পেতাম আব্বাকে দেখে।
আব্বা নিচে অফিস করতেন।
আমরা তখন দোতলায় উঠে গেছি।
আমি সারাদিন নিচে খেলা করতাম আব্বার কাছাকাছি।
আর কিছুক্ষণ পরপর আব্বাকে একটু করে দেখে নিতাম।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে,
তখন বাসার সামনে দিয়ে মিছিল যেত আর মাঝে মধ্যে পুলিশের গাড়ি চলাচল করত।
দোতলায় বারান্দায় আমি খেলা করতাম,
যখনই দেখতাম পুলিশের গাড়ি যাচ্ছে তখনই চিৎকার করে বলতাম,
-‘ও পুলিশ কাল হরতাল’।
যদিও আমার কণ্ঠস্বর পুলিশের কানে পৌঁছত না কিন্তু বলতে খুব ভালো লাগতো।
বারন্দায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ‘হরতাল হরতাল’ বলে চিৎকার করতাম কখনো কখনো ।
স্লোগান দিতাম ‘জয় বাংলা’।
আমরা বাসায় সবাই আন্দোলনের ব্যাপারে আলোচনা করতো,
আমি সেসব শুনতাম আর নিজেই সেকথাগুলো মনে মনে আওড়াতাম।
এর মধ্যে
১৯৭১ সালের পঁচিশ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হামলা চালালে,
আব্বা স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
ছাব্বিশ মার্চ প্রথম প্রহরের পরপরই আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হলো।
পরেরদিন আমাদের বাসা আক্রমণ করা হয়।
আমাকে নিয়ে মা ও জামাল ভাই পাশের বাসায় আশ্রয় নিলেন।
কামাল ভাই আমাদের বাসার পেছনে জাপানি কনস্যুলেটের বাসায় গিয়ে আশ্রয় নিলো।
সুযোগ মতো কামাল ভাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চলে গেলো।
আমার মা সহ আমরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হলাম।
আমাদের ধানমণ্ডির ১৮ নম্বর সড়কে (পুরাতন) একটা একতলা বাসায় বন্দি করে রাখা হলো।
ছোট্ট এই আমিও তখন এই বিরক্তিকর বন্দি জীবনযাপন করতে শুরু করি।
ঠিকমতো খাবার নেই।
কোনো খেলনা নেই, কী কষ্টের দিন যে শুরু হলো আমার জন্য তা বলে বোঝানো যাবেনা।
বন্দিখানায় আছি, আব্বার কোনও খবরই আমরা জানি না।
কোথায় আছেন কেমন আছেন কিছুই জানতে পারি না।
প্রথম প্রথম আমি আব্বার জন্য খুব কান্নাকাটি করতাম।
আমরা বন্দিখানায় সব সময় দুঃশ্চিন্তায় আর অস্বস্তি নিয়ে থাকতাম,
কারণ পাকবাহিনী মাঝে মধ্যেই ঘরে এসে সার্চ করতো।
আমাদের নানা রকমের বাজে কথা বলত।
জামাল ভাইকে বলতো তোমাকে ধরে নিয়ে শিক্ষা দেব।
রেহানা আপুকে নিয়েও খুব চিন্তা করতো সবাই।
এই ডামাডোলের মধ্যে আমাদের বাড়িতে ছোট্ট একটা বাবু এলো।
দারুণ ফুটফুটে।
হাসুপার ছেলে।বাবুটার নাম জয়।
জয় হওয়ার পর আমি খুব খুব আনন্দ পাই।
মনে হলো একটা জীবন্ত পুতুল পেলাম যেন!
সারাক্ষণ জয়ের কাছেই ঘুরঘুর করতাম তখন।
ওর খোঁজ খবর নিতাম।
যখন ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ শুরু হয় তখন আমার জয়কে নিয়েই চিন্তা হতো।
এর কারণ হলো, আমাদের বাসার ছাদে বাংকারে মেশিনগান বসানো ছিল,
দিন-রাতই গোলাগুলি চলত সেখান থেকে।
প্রচণ্ড আওয়াজ হতো।
জয়কে বিছানায় শোয়াতে কষ্ট হতো সে সময়।
এটুকু ছোট্ট বাচ্চা মাত্র চার মাস বয়স,
মেশিনগানের গুলিতে কেঁপে কেঁপে উঠত বারবার।
এরপর শুরু হল এয়ার রেইড।
আক্রমণের সময় সাইরেন বাজত।
আমি এ ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলাম ঠিকঠাক।
যখনই সাইরেন বাজত বা আকাশে মেঘের মতো আওয়াজ হত,
অমনি আমি তুলা নিয়ে এসে জয়ের কানে গুঁজে দিতাম।
সব সময় পকেটে তুলা নিয়ে ঘুরতাম।
সে সময় খাবারের বেশ কষ্টও ছিল,
আরো ছিলো দিনের পর দিন বন্দি থাকার একঘেয়েমি,
কোনো খেলার সাথিও নেই।
ভালো লাগতো না তেমন কিছু।
অসহ্য অবস্থা।
পাকসেনারা যখন তাদের অস্ত্রশস্ত্র পরিস্কার করত।
আমি জানালায় দাঁড়িয়ে গভীর ভাবে সব দেখতাম।কোন কাজ নেই তো কি করবো।
অনেক অস্ত্রের নামও শিখেছিলাম সেইসময়।
যখন এয়ার রেইড হতো তখন পাকসেনারা বাংকারে ঢুকে যেত আর আমরা তখন বারান্দায় বের হওয়ার সুযোগ পেতাম।
আকাশে যুদ্ধবিমানের ‘ডগ ফাইট’ দেখারও সুযোগ হয়েছিল তখন।
প্লেন দেখা গেলেই আমি খুশি হয়ে জোরে জোরে হাতেতালি দিতাম।
ষোল ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল, পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী আত্নসমর্পন করে,
পাকিস্তান যুদ্ধে হেরে যায়, বাংলাদেশ মুক্ত হয়।
আমরা কিন্তু সেদিন মুক্তি পাইনি।
আমরা মুক্তি পাই ১৭ ডিসেম্বর সকালে।
যে মুহূর্তে আমরা মুক্ত হলাম এবং বাসার সৈনিকদের ভারতীয় মিত্রবাহিনী বন্দি করল,
তারপর থেকে আমাদের বাসায় দলে দলে মানুষ আসতে শুরু করল।
এর মধ্যে আমি মাথায় একটা হেলমেট পরে নিলাম,
সাথে টিটোও একটা পরল।
দুইজন হেলমেট পরে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা শুরু করলাম।
আমরা তখন একদিকে মুক্তির আনন্দে উদ্বেলিত আবার
বাড়ির সবাই আব্বা, কামাল ভাই, জামালভাই সহ অগণিত মানুষের জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।
কে বেঁচে আছে কে নেই কিছুই তো জানা যাচ্ছেনা, এমন একটা সময়।
এক অনিশ্চয়তা সবার চোখে মুখে
তার ভিতরেও বিজয়ের উল্লাস মনকে ছুঁয়ে যাচ্ছে স্বাভাবিকভাবে।
আনন্দ অশ্রু মিশ্রিত সেই ক্ষণগুলো ছিল অদ্ভুত এক অনুভূতি মাখা।
বড়দের কান্না দেখলে আমার মন খারাপ খুব হতো।
এর মধ্যে কামাল ভাই ও জামাল ভাই রণাঙ্গন থেকে ফিরে এলো।
খুব আনন্দ পেলাম তবুও তখন আমার দু’চোখ ব্যথায় ভরা, মুখফুটে বেশি কথা বলি না।
আব্বাকে সবসময় মনে মনে খুঁজে বেড়াই।
আব্বাতো এলো না!
আমরা যে বাসায় ছিলাম তার সামনে বাড়িভাড়া নেওয়া হলো।
কারণ এত মানুষ আসছে যে বসার জন্য জায়গা দেওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে আমাদের ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির বাসা লুটপাট করে বাথরুম, দরজা-জানলা সব ভেঙে রেখে গেছে পাকসেনারা।
বিভৎস অবস্থা।
মেরামত না হওয়া পর্যন্ত ভাড়া বাসাতেই থাকতে হবে।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি আব্বা ফিরে এলেন পাকিস্থানী বন্দিখানা থেকে মুক্তি পেয়ে।
আমার দাদা আমাকে নিয়ে এয়ারপোর্ট গেলেন আব্বাকে আনতে।
লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল সেদিন,
মানষ আর মানুষ! নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না।
আব্বা প্রথম গেলেন তার প্রিয় মানুষের কাছে।
তারপর এলেন বাড়িতে।
আমরা সামনের বড় বাড়িটায় উঠলাম।
ছোট যে বাসাটায় বন্দি ছিলাম সে বাসাটা দেশ-বিদেশ থেকে সব সময় সাংবাদিক ফটোগ্রাফার আসত আর ছবি নিত।
মাত্র দুটো কামরা ছিল।
আব্বার থাকার মতো জায়গা ছিল না এবং কোনও ফার্নিচারও ছিল না।
যা হোক, সব কিছু তড়িঘড়ি করে জোগাড় করা হলো।
আমার জন্য ইতোমধ্যে অনেক খেলনাও আনা হয়েছে।
ছোট সাইকেলও এসেছে, কিন্তু কিছুক্ষণ পরপরই আমি আব্বার কাছে চলে যেতাম।
ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা ৩২ নম্বর সড়কে আমাদের বাসায় ফিরে এলাম।বাসাটা মেরামত করা হয়েছে।
এই সময়টাতে আমি খুব আনন্দ নিয়ে আছি, সারা দিন বেশিরভাগ সময় খেলা নিয়েই ব্যস্ততা আমার।
আব্বা প্রতিদিন সকালে অফিসে আসতেন, দুপুরে গণভবনে বিশ্রাম নিতেন,ওখানেই খাবার খেতেন।
বিকেলে হাঁটতেন।
আমি প্রতিদিন বিকেলে গণভবনে যেতাম।
সাথে আমার সাইকেলটাও থাকতো।
আমার আবার মাছ ধরার খুব শখ ছিল।
কিন্তু মাছ ধরে নিতাম না ছেড়ে দিতাম।
মাছ ধরতাম আর ছাড়তাম এটাই আমার খেলা ছিল।
একবার আমরা সবাই মিলে নাটোরে উত্তরা গণভবনে যাই।
সেখানে আমার ব্যস্ততাই ছিলো মাছ ধরা নিয়ে।
এরমধ্যে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুলে ভর্তি হলাম।
তবে স্কুলে যেতে মাঝে মধ্যেই আপত্তি জানাতাম।
কেন আপত্তি জানাতাম তা অবশ্য এখন আর মনে নেই।

যা হোক স্বাধীনতার পরে একজন ভদ্র মহিলাকে আমার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো।
আমাকে পড়ানো খুব সহজ কথা ছিল না অবশ্য।
শিক্ষিকাকে আমার কথাই শুনতেই হতো।
তাহলে খুলে বলি
প্রতিদিন শিক্ষয়িত্রীকে দুটো করে মিষ্টি খেতে দিতাম,উনি খেতে চাইতেন না।
আমিও বায়না করতাম মিষ্টি না খেলে আমি পড়বো না।
খালি পেটে কি পড়াশোনা হয় নাকি।
কাজেই শিক্ষিকাকে খেতেই হতো।
তা ছাড়া সব সময় আমি আমার উনার খুব খেয়াল রাখতাম।
মানুষকে আপ্যায়ন করতে আমার খুব ভালো লাগতো।
আমি যখন গ্রামে যেতাম,
টুঙ্গিপাড়া গ্রামের বাড়িতে আমার অনেক খেলাধূলার সাথী ছিলো।
গ্রামের ছোট ছোট অনেক বাচ্চাদের জড়ো করতাম। হৈচৈ করতাম।
তাদের জন্য ডামি বন্দুক বানিয়ে দিয়েছিলাম। সেই বন্দুক হাতে তাদের প্যারেড করাতাম।
প্রত্যেকের জন্য খাবার কিনে দিতে হতো আমার বাড়ি থেকে।
আমার ক্ষুদে বাহিনীর জন্য জামা-কাপড় ঢাকা থেকেই কিনে দিতে হতো।
মা কাপড়-চোপড় কিনে টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যেতেন।
আমি সেই কাপড় আমার খুদে বাহিনীকে দিতাম।
সব সময় মা কাপড়-চোপড় কিনে আলমারিতে রেখে দিতেন।
আরো মনে আছে,
নাসের কাকা আমাকে এক টাকা নোটের বাণ্ডিল দিতেন।
খুদে বাহিনীকে বিস্কুট লজেন্স কিনে খেতে টাকা দিতাম সেখান থেকে।
এই খুদে বাহিনীকে নিয়ে বাড়ির উঠোনেই খেলা করতাম।
অনেক সময় আমাকে বড়রা অনেক প্রশ্ন করতো,
এই যেমন, বড় হয়ে তুমি কি হবে?
আমি কোন কিছু আগে পিছে না ভেবেই বলতাম আমি আর্মি অফিসার হব।
আমার খুব ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার।
মুক্তিযুদ্ধের চলাকালীন থেকেই আমার ওই ইচ্ছা।
কামাল ভাই ও জামাল ভাই মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর মুক্তিযুদ্ধের কথা বলার জন্য আবদার করতাম।
খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতাম।

আমি আব্বাকে প্রতিটা ছায়ার মতো অনুসরণ করতাম।
আব্বাকে মোটেই ছাড়তে চাইতাম না।
সেই কারণে হয়তো যেখানে যেখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব আব্বা সেখানে আমাকে নিয়ে যেতেন।
মা আমার জন্য প্রিন্স স্যুট বানিয়ে দিয়েছিলেন।
আব্বা প্রিন্স স্যুট যেদিন পরতেন আমিও পরতাম।
কাপড়-চোপড়ের ব্যাপারে ছোটবেলা থেকেই আমার নিজের একটা পছন্দ ছিল।
তবে একবার একটা পছন্দ হলে তা আর ছাড়তে চাইতাম না।
আসলে আমার নিজের পছন্দের ওপর খুব বিশ্বাস ছিল কিনা।
খুব স্বাধীন মত নিয়ে চলতে চাইতাম।
আমার এই চরিত্রিক দৃঢ়তা দেখে অনেকেই অবাক হতো।
এর মধ্যে জাপান থেকে আব্বার রাষ্ট্রীয় সফরের দাওয়াত এলো।
জাপানিরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দেয়।
শরণার্থীদের সাহায্য করে জাপানের শিশুরা তাদের টিফিনের টাকা দেয় আমাদের দেশের শিশুদের জন্য।
সেই জাপান যখন আমন্ত্রণ জানায় তখন গোটা পরিবারকেই আমন্ত্রণ দেয় বিশেষভাবে আমার কথা উল্লেখ করে।
আমি ও রেহানা আপু আব্বার সাথে জাপান পৌছাই।
আমার জন্য বিশেষ কর্মসূচিও রাখে জাপান সরকার।
খুব আনন্দ করেছিলাম সেই সফরে।
তবে মাকে ছেড়ে কোথাও থাকতে সবসময়ই কষ্ট হতো আমার।
আমি যদিও রাতে আব্বার কাছেই ঘুমাতাম তবে তখন মাকে খুব মনে পড়ত।
মার কথা মনে পড়লেই মন খারাপ লাগতো।
আব্বার সঙ্গে দেশেও বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দিতে যেতাম।
একবার আব্বা নেভির কর্মসূচিতে যান।
সমুদ্রে জাহাজ কমিশন করতে গেলে সেখানে আমাকে সাথে নিয়ে যান।
খুব আনন্দ করেছিলাম ,অসাধারণ সেসব স্মৃতি।
ভালো ভালো স্মৃতি সাথে ভয়ঙ্কর স্মৃতিও আছে।
আমার একবার খুব বড় অ্যাকসিডেন্ট হলো।
সে দিনটার কথা এখনও মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে।
আমার একটা ছোট মপেট মোটরসাইকেল ছিল আর একটা সাইকেলও ছিল।
বাসায় কখনও রাস্তায় সাইকেল নিয়ে চলে যেতাম হুটহাট করে।
পাশের বাড়ির আদিল ও ইমরান দুই ভাই এবং আমি একসঙ্গে খেলা করতাম।
একদিন মপেট চালানোর সময় আমি হঠাৎ পড়ে যাই ।
আমার পা বিশ্রিভাবে পা আটকে যায় সাইকেলের পাইপে।
বেশ কষ্ট করে পা বের করা লাগে।মনে হচ্ছিলো বুঝি মরেই যাবো আজ।
হঠাৎ আমার কান্নার আওয়াজ পেয়ে হাসুপা এক ছুটে উত্তর- পশ্চিমের খোলা বারান্দায় চলে এসে, চিৎকার করে সবাইকে ডাকে।
আমাকে বাসায় নেয়া হয়।
পায়ের অনেকখানি জায়গা পুড়ে গেছিলো।
বেশ গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হযেছিলো। ডাক্তার এসে ওষুধ দিলেন।
অনেকদিন পর্যন্ত পায়ের ঘা নিয়ে কষ্ট পেয়েছিলাম।
এর মধ্যে আব্বা অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
আব্বার সাথে রাশিয়া গেলাম।
সেখানে আমার পায়ে চিকিৎসা হয়।
কিন্তু সারতে অনেকটা সময় নেয়।
১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে কামাল ভাই ও জামাল ভায়ের বিয়ে হয়।
হলুদ ও বিয়ের অনুষ্ঠানে আমরা অনেক মজা করি।
বাইরে চাকচিক্য বেশি ছিল না কিন্তু ভেতরে আমরা আত্মীয়-স্বজন মিলে অনেক আনন্দ করি।
বিশেষ করে হলুদের দিন সবাই খুব রং খেলি।
আমার দুই ভাইয়ের বিয়ে খুব কাছাকাছি সময়ে হয়।
কামাল ভায়ের ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই, আর জামাল ভায়ের ১৭ জুলাই বিয়ে হয়।
আমি সব সময় ভাবিদের পাশে ঘুর ঘুর করতাম, আর কী কী লাগবে,সুবিধা অসুবিধা খুব খেয়াল রাখতাম।
ভাবিদের সাথে আমার একটু একটু করে ভাব জমে উঠতে লাগলো।
এর মধ্যে,
৩০ জুলাই হাসুপা জার্মানিতে চলে গেলো।
ওদিনই হাসুপার সাথে আমার শেষ দেখা।
ওরা চলে যাওয়াতে, হাসুপা রেহেনা আপু জয়ের জন্য আমার খুব মন খারাপ হলো লাগলো।
বিশেষ করে জয়ের জন্য।
কারণ আমি বেশির ভাগ সময় জয়ের সাথেই খেলতাম।
সব থেকে মজা হতো যখন আমি জয়ের কাছ থেকে কোনও খেলনা নিতে চাইতাম তখন জয়কে চকলেট দিতাম যাতে ও খেলনাটা আমাকে দেয়।
আর চকলেট পেয়ে জয় হাতের খেলনা দিয়ে দিত, বিশেষ করে গাড়ি।
আমি গাড়ি নিয়ে খেলতাম, জয়ের যেই চকলেট শেষ হয়ে যেত তখন বলত চকলেট শেষ, গাড়ি ফেরত দাও।
তখন আমি বলতাম চকলেট ফেরত দাও, গাড়ি ফেরত দেব।
এই নিয়ে মাঝে মধ্যে দু`জনের মধ্যে ঝগড়া লেগে যেত, কান্নাকাটি শুরু হতো আরকি।
মা সবসময় আবার জয়ের পক্ষ নিতেন।
আমার খুব রাগ লাগতো।
আবার খুব খুব মজাও পেতাম।
হাসুপা তো চলে গেলো।রেহেনা আপুও সাথে,জয়, পুতুল কেউ নেই।
সব ফাঁকা ফাঁকা ।
হাসুপা আমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো কিন্তু আমার হঠাৎ জন্ডিস হলো, শরীর বেশ খারাপ হয়ে পড়লো।
সে কারণে মা আমাকে আর হাসুপার সাথে রাজি হলো না।
কিছুদিন বাদে
অসুখটা কমে আসাতে…….
বাবা বললেন ইমরান ও আদিলের সাথে সাইকেল খেলাটা আবার করতে পারবো ।
ভারি ভালো লাগলো অনেকদিন পর।
হাসু বুবুর সাথে যেতে চেয়েছিলাম……
হাসুপার সাথে যেতে পারলে বেশ হতো ।
হাসুপার হাতের গাল টিপে আদরটা আমার বেশ লাগে।
এবারে ববু চলে যাবার সময় কেন জানি বেশি খারাপ লাগছিলো ।
শরীরের ক্লান্তিতে ঘুমটা আজকাল বেশিই হয় ।
মায়ের গলা জড়িয়ে ঘুমটা ভালোই হয় ।
ঘুমের মধ্যে স্বপ্নটা জড়িয়ে আসে ,মাকে আরো জোরে আঁকড়ে ধরি,
হঠাৎ ঝাকুনি আর কোলাহলে চোখ মেলে চাইলাম..
স্বপ্ন দেখছি কি ? এরকম স্বপ্ন তো আমি দেখি না ..।
মায়ের উদ্ধিগ্ন মুখ …….গোলাগুলির আওয়াজ….।চিৎকার…..।
[২]
তখন ভোর সাড়ে ৫টা।
পুরো অপারেশন শেষ করে ঘাতকদের আগমন ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধুর ৬৭৭ নম্বর বাড়ির গেটে।
ততক্ষণে আবদুর রব সেরনিয়াবাতকে হত্যার খবর পেয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু।
প্রধান গেটেও চলছে হট্টগোল। বঙ্গবন্ধুর ঘরের ঠিক বাইরের বারান্দায় ঘুমিয়ে ছিলেন দুই গৃহকর্মী মোহাম্মদ সেলিম (আবদুল) ও আবদুর রহমান শেখ (রমা)। নিচতলায় ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী এ এফ এম মহিতুল ইসলাম। মহিতুলকে টেলিফোনে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সেরনিয়াবাতের বাসায় দুষ্কৃতকারীরা আক্রমণ করেছে। জলদি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন লাগা…।’কিন্তু পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করে কোনো সাড়াশব্দ পেলেন না মহিতুল।তারপর চেষ্টা করতে থাকেন গণভবন (তৎকালীন রাষ্ট্রপতির কার্যালয়) এক্সচেঞ্জে।

গোলাগুলির শব্দ শুনে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন বঙ্গবন্ধু।কিছুটা চিন্তিত দেখাচ্ছিলো সে সময় তাকে।এর মধ্যে ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন গৃহকর্মী আবদুল আর রমা। বেগম মুজিব রমাকে নিচে পাঠান কি হচ্ছে দেখার জন্য , সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য তখন গুলি করতে করতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে এগোচ্ছে। ভীতসন্ত্রস্ত রমা বাড়ির ভেতরে এসে দেখেন, লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা বঙ্গবন্ধু নিচতলায় নামছেন। রমা তাড়াতাড়ি দোতলায় উঠে গেলেন। দেখলেন, আতঙ্কিত অবস্থায় ছোটাছুটি করছেন বেগম মুজিব তার সারা মুখে দারুণ উদ্বেগের চিহ্ন। রমা এরপর চলে যান তিনতলায়।দ্রুত ঘুম থেকে ডেকে তোলেন বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল ও তার স্ত্রী সুলতানা কামালকে।সবটা শুনে শার্ট-প্যান্ট পরে নিচতলায় নামেন শেখ কামাল।
উদ্বেগ উৎকন্ঠা নিয়ে সুলতানা কামাল শেখ কামালের পেছন পেছন আসেন দোতলা পর্যন্ত। তিনতলা থেকে আবার দোতলায় নেমে আসেন রমা। ঘুম থেকে ডেকে তোলেন শেখ জামাল ও তার স্ত্রীকেও। শেখ জামাল তার স্ত্রীকে নিয়ে দোতলায় বেগম মুজিবের ঘরে যান। বাইরে তখন প্রচন্ড গোলাগুলি। নিচতলার অভ্যর্থনা কক্ষে বঙ্গবন্ধু,চিন্তিত। তার সামনেই বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে থাকেন মহিতুল। পুলিশ কন্ট্রোল রুম ও গণভবন এক্সচেঞ্জে চেষ্টার একপর্যায়ে মহিতুলের কাছ থেকে রিসিভার টেনে নিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন,‘আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব…।’ ব্যস, এ পর্যন্তই। কথা শেষ হলো না তার।

জানালার কাচ ভেঙে একঝাঁক গুলি এসে লাঘলো অফিসের দেয়ালে। এক টুকরো কাচে ডান হাতের কনুই জখম হয় মহিতুলের। টেবিলের পাশে শুয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু।তিনি কাছে টেনে শুইয়ে দেন মহিতুলকেও। এর মধ্যেই আবদুলকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে তার পাঞ্জাবি ও চশমা পাঠিয়ে দেন বেগম মুজিব। কিছুক্ষণ পর গুলির শব্দ থামলে উঠে দাঁড়ান বঙ্গবন্ধু। পাঞ্জাবি ও চশমা পরে নেন। অভ্যর্থনা কক্ষ থেকে বের হয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ান,বুঝতে চেষ্টা করেন ঠিক কি হচ্ছে। পাহারায় থাকা সেনা ও পুলিশ সদস্যদের বলেন, ‘এত গুলি হচ্ছে, তোমরা কী করছ?’ এ কথা বলেই উপরে চলে যান বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধু উপরে উঠতে না উঠতেই নিচে নেমে আসে শেখ কামাল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আর্মি আর পুলিশ ভাইরা, আপনারা আমার সঙ্গে আসেন।’শেখ কামালের পেছনে গিয়ে দাঁড়ান মহিতুল ইসলাম ও পুলিশের ডিভিশনাল সুপারিনটেনডেন্ট (ডিএসপি) নূরুল ইসলাম খান। ঠিক সেই মুহুর্তে সৈন্যদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ঢোকে মেজর নূর, মেজর মুহিউদ্দিন (ল্যান্সার) এবং ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা।
গেটের ভেতর ঢুকেই তারা ‘হ্যান্ডসআপ’বলে চিৎকার করতে থাকে। মহিতুল ইসলামকে টেনে ঘরের ভেতর নিয়ে যান নূরুল ইসলাম খান। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা শেখ কামালের পায়ে গুলি করে বজলুল হুদা। লাফ দিয়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে পড়েন শেখ কামাল। মহিতুলকে বলতে থাকেন, ‘আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল। আপনি ওদেরকে বলেন।’মহিতুল ঘাতকদের বলেন, ‘উনি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল।’আর তখনই বজলুল হুদার হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ঝাঁজরা করে দেয় শেখ কামালের দেহ।ওখানেই প্রাণ হারান তিনি।এরপর একটা গুলি এসে লাগে মহিতুলের হাঁটুতে, আরেকটা নূরুল ইসলামের পায়ে।

নিচতলার বারান্দা তখন রক্ত আর রক্ত।এদিকে বন্ধ ঘরের ভেতর ফোনে ব্যস্ত বঙ্গবন্ধু। ফোনে তার সামরিক সচিব কর্নেল জামিলউদ্দিনকে বললেন, ‘জামিল, তুমি তাড়াতাড়ি আসো। আর্মির লোকেরা আমার বাসা অ্যাটাক করেছে। সফিউল্লাহকে ফোর্স পাঠাতে বলো।’ তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহকে নিজেও ফোন করেন বঙ্গবন্ধু। তাকে বলেন, ‘সফিউল্লাহ, তোমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে। কামালকে (শেখ কামাল) বোধহয় মেরে ফেলেছে। তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও।’ফোনের ওপাশ থেকে সফিউল্লাহ বলেন, ‘আই অ্যাম ডুয়িং সামথিং,ক্যান ইউ গেট আউট?’

বঙ্গবন্ধুর কথা শোনার পর ব্যক্তিগত লালরঙের গাড়িটি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসার উদ্দেশে রওনা দেন কর্নেল জামিল। সঙ্গে ছিলেন নিজের গাড়িচালক আয়েন উদ্দিন মোল্লা। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে পৌঁছা হলো না তার। পথেই সোবহানবাগ মসজিদের কাছে তাঁকে গুলি করে হত্যা করলো ঘাতকরা। পালিয়ে বেঁচে যান গাড়িচালক আয়েন উদ্দিন। তখন বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গেটের সামনে লম্বালম্বি লাইনে দাঁড়ানো মহিতুল,নূরুল ইসলাম, আবদুল মতিন ও পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যসহ বেশ কয়েকজন। ঘাতকদের একজন পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যকে গুলি করে এসময়। তারপর একের পর এক গুলি করতে করতে চলে যায় ওপরে। সেখানে শেখ জামালের ঘরের বাথরুমে আশ্রয় নেওয়া আবদুলকে গুলি করে হত্যা করে। হাতে ও পেটে গুলিবিদ্ধ আবদুল সিঁড়ির পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকেন।
তখন ভোর প্রায় ৫টা ৫০ মিনিট। বঙ্গবন্ধুর ঘরে তিনিসহ বেগম মুজিব, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল। বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ঘাতকরা। ততক্ষণে গোলাগুলি থেমে গেছে কিছু সময়ের জন্য। দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসতেই বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ফেলে ঘাতকের দলটি। নামিয়ে আনতে থাকে নিচে।
সিঁড়ির মুখে মেজর হুদাকে দেখে বঙ্গবন্ধু চিৎকার করে ওঠেন, ‘তোরা কী চাস? তোরা কি আমাকে মারতে চাস?’
মেজর হুদা বলে, ‘আমি আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি?’
বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তুই আমাকে মারতে চাস? কামাল কোথায়? তোরা কামালকে কী করেছিস?’
উত্তরে হুদা বলে, ‘স্যার, কামাল তার জায়গায়ই আছে। আর আপনি তুই তুই করে বলবেন না। আপনি বন্দি। চলুন।’
এবার গর্জে উঠলেন বঙ্গবন্ধু ‘কী, তোদের এত সাহস! পাকিস্তান আর্মিরা আমাকে মারতে পারেনি। আমি বাঙালি জাতিকে ভালোবাসি। বাঙালি আমাকে ভালোবাসে। কেউ আমাকে মারতে পারে না।’

সিঁড়ির মাঝামাঝি এসে দাঁড়াতেই দ্রুত সিঁড়ির নিচে অবস্থান নেয় বজলুল হুদা ও মেজর নূর। নূর কিছু একটা বলতেই সরে দাঁড়ায় মহিউদ্দিন। সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে হুদা ও নূরের হাতের স্টেনগান। আঠারটি গুলি ঝাঁজরা করে বঙ্গবন্ধুর বুক ও পেট। বিশালদেহী মানুষটি ধপাস করে পড়ে যান সিঁড়ির ওপর। বঙ্গবন্ধু তখন মৃত। তার বুকের রক্তে ভেসে যায় সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে সেই রক্তের স্রোত।
কিছুক্ষণ পরই দোতলায় উঠে আসে মেজর আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন। সঙ্গে তার অনুগত সৈন্যরা।প্রচন্ড গোলাগুলি আর ধাক্কায় একসময় দরজা খুলে সামনে দাঁড়ান বেগম মুজিব। সবাইকে একে একে নিচে নেমে আসার নির্দেশ দেয় ঘাতকরা। নিচে নামতে থাকেন বেগম মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমা। সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন বেগম মুজিব। আর্ত চিৎকার দিয়ে বলেন, ‘আমি যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেল।’
শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে যাওয়া হয়। আর ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বেগম মুজিবকে।
তারপর সেই ঘরে আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন একে একে গুলি করে হত্যা করে বেগম মুজিবসহ শেখ জামাল, সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে।
বেগম মুজিবের নিথর দেহটি ঘরের দরজার কাছে পড়ে থাকে। বাঁ-দিকে পড়ে থাকে শেখ জামালের মৃতদেহ। রোজী জামালের মুখে গুলি লাগে। আর রক্তক্ষরণে বিবর্ণ হয়ে আসে সুলতানা কামালের মুখ।
এদিকে নিচে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয় শেখ নাসের, শেখ রাসেল আর রমাকে। শেখ নাসের ঘাতকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি তো রাজনীতি করি না। কোনো রকম ব্যবসা-বাণিজ্য করে খাই। আমাকে কেন মারবে?’ অফিস সংলগ্ন বাথরুমে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। গুলি করা হয় সেখানে। অসহায় নাসেরের গুলিবিদ্ধ দেহ গড়াতে থাকে মেঝেতে। এ সময় ‘পানি… পানি…’ বলে গোঙাতে থাকেন তিনি। পানি নয়, ঘাতকরা আরেকবার গুলিবর্ষণ করে তার ওপর।কিছুক্ষনের মধ্যে তিনিও মারা যান।
রমাদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলও। অসহায় শিশুটি প্রথমে রমাকে ও পরে মহিতুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো?’ কোনো জবাব নেই রমার মুখে।
মহিতুল বলেন, ‘না ভাইয়া, তোমাকে মারবে না।’
একথা শুনে রাসেল বলে, “আমি মায়ের কাছে যাবো।”
কিছুক্ষণ পর একজন লোক রাসেলকে রমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ঘরের বাইরে নিয়ে আসে।
রাসেল চর্তুপাশের নির্মমতা দেখে কান্না শুরু করে। বারবার ঘাতকদের বলতে থাকে, “আল্লাহর দোহাই লাগে, আমাকে মারবেন না। আমার হাসু আপা (শেখ হাসিনা) আর দুলাভাই জার্মানিতে থাকে। আপনারা দয়া করে হাসু আপার কাছে আমাকে পাঠিয়ে দিন”। রাসেলের কান্নায় আবেগতাড়িত হয়ে একজন সৈনিক তাকে বাড়ীর মূল ফটকের দারোয়ানদের ঘরে লুকিয়ে রাখে।
কিন্তু প্রায় আধঘন্টা পর একজন মেজর রাসেলকে সেখানে লুকিয়ে থাকতে দেখে তাকে উপরে মায়ের ঘরে নিয়ে যায়। সেখানে রাসেলের মাথায় রিভলভার দিয়ে গুলি করে হত্যা করে।’ গুলির আঘাতে কোটর থেকে তার চোখ বেরিয়ে আসে। থেঁতলে যায় মাথার পেছনের অংশ। নিথর রক্তমাথা একরত্তি দেহটি পড়ে থাকে সুলতানা কামালের পাশে।

শেষ

তথ্যসূত্রঃ http://www.albd.org/bn/articles/news/32111/
https://www.ekushey-tv.com/
ও বিভিন্নবই ও ইন্টারনের সাহায্য নেয়া হয়েছে।

১৭৬জন ৩৯জন
0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য