শেখার শিক্ষা প্রয়োজন

শাহরিন ২৭ অক্টোবর ২০১৯, রবিবার, ০৯:৪৩:৫৭পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৬৫ মন্তব্য

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড

এই ভাবসম্প্রসারণ স্কুল জীবনে কে না পড়েছে। আর টিভি, পত্রিকা, বই, অনলাইনে, বাস্তব জীবনে সব জায়গাতেই শিক্ষা নিয়ে চর্চা  হয়। জাতির মেরুদণ্ড ঠিক করতে করতে বাবা মায়ের  মেরুদণ্ড ভেংগে চুরমার হয়ে যায় স্কুলে বাচ্চা ভর্তি করানোর সময়। কারণ ওই বিদ্যালয়ে সন্তানের পিতামাতার জন্য শিক্ষা ছাড়াও অপেক্ষা করে বিশাল লম্বা চওড়া একটি ফর্দ।যার ফাঁদ কেউ এড়াতে পারে না।

বয়স ৩ পার হওয়ার সাথে সাথেই অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পরে বাচ্চাদের লেখাপড়া নিয়ে সেটাই স্বাভাবিক। তখন বিভিন্ন বিদ্যালয়ের দ্বারে ঘুরতে হয়। উদ্দেশ্য কিভাবে সন্তানকে একটি ভালো বিদ্যালয়ে ভর্তি করা যায়। সম্প্রতি আমার ব্যাক্তিগত একটা ঘটনা সবার সামনে তুলে ধরছি।

মেয়ের বয়স ৪ বছর হতে ১৫/২০ দিন বাকি। বাংলাদেশের বর্তমানের ভাল স্কুল গুলোর একটি সে স্কুলে ফোন করলাম ভর্তির ব্যাপারে খবর নেয়ার জন্য। ওপাশে থেকে ফোনে ভদ্রলোক জানালেন আগামিকাল দুপুর ১ টার মধ্যে কল দিবেন। পরেরদিন ১২ টার দিকে কল দিলে জানানো হলো  বাচ্চার বয়স যদি ৪ বছরের কম হয় তাহলে ফরম নিতে পারবো।  আরো জানলাম মে মাসের ১০-১৫ তারিখের মধ্যে ফরম ছাড়া হবে। ফরম সংগ্রহ করার পর জমা দেয়ার সময় বাচ্চার জন্মনিবন্ধন সহ জমা দিতে বললো।

ফরমে বাচ্চা আর নিজেদের বিস্তারিত তথ্য ছাড়াও বাচ্চার বাবার মাসিক বেতন আর পদমর্যাদা দিতে হবে। সাথে আর্মি/ নৌ/ বিমান বাহিনীতে চাকরি করে ও কোয়ার্টার-এ থাকতে এমন একজন এর নাম, ঠিকানা ও ফোন নাম্বার দিতে হবে। ফরম পূরণ করে দিলাম তবে   ডিফেন্স এ  চাকরি করে এমন কারো নাম দেইনি। অনেকেই পরিচিত ছিল কিন্তু কেউই আত্বীয় নয়। বাচ্চার বাবা জানালেন আমার নিজের যা আছে তা উল্লেখ করবো কিন্তু ধার করা কিছুই দরকার নেই। আমিও সেটাই মনে করি। সন্তানকে বড় করবো নিজ যোগ্যতায়।

তারা একটি দিন নির্ধারণ করলো রেজাল্ট দেয়ার। প্রথমে মৌখিক/ প্রাথমিক বাছাই, তারপরে লটারি এবং শেষে চুড়ান্ত রেজাল্ট।     প্রাথমিক সে বাছাইয়ের পরে সিলেক্টেড নামের উপর আবার লটারি হবে, লটারি তে নাম আসলে পরে চুড়ান্ত রেজাল্ট দিবে। আল্লাহর রহমতে  মৌখিক পরীক্ষায় সে ভালোভাবে সব প্রশ্নের জবাব দিতে পেরেছে। সেদিনই আমাদের লটারির দিন ও সময় জানাই হয়েছিল । লটারির হওয়ার আগেরদিন আমার বাচ্চার বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। রাতভর হাসপাতালে থেকে সকালে মেয়েকে নিয়ে স্কুলে গেলাম। লটারিতে ওর নাম পাওয়া গিয়েছিল। পরে আবারও স্কুল থেকে জানালো চুড়ান্ত রেজাল্ট আরো ২ দিন পরে জানানো হবে। চূড়ান্ত রেজাল্ট এর পরে দেখলাম আমার মেয়ের নাম ওয়েটিং লিস্টে। স্কুল থেকে কিছুদিনের মধ্যেই জানালেন যে ও ভর্তি হতে পারবে।

মাঝের এই কয়েকদিনে জানতে পারলাম, তাদের স্কুলের সিস্টেম এর কথা।  শুরুতেই  গাড়ি পার্কিং নিয়ে।

১.ডিফেন্স এ যারা আছেন তাদের   গাড়ী পার্কিং শেষে জায়গা থাকলে বাকিরা পার্কিং পাবেন।

২. ডিফেন্স ও সিভিলদের ভর্তি ফি ও মাসিক বেতন  এর পার্থক্য ৫০ ভাগ।

৩. কোন কিছু জিজ্ঞাসা করলে মোটেও ভালোভাবে উত্তর দেয় না।

৪. আমার আত্নীয়ের বাচ্চা ও পড়তো,  তার উপস্থিতি ১০০ ভাগ হলেও তাকে ১০০ ভাল উপস্থিত থাকার পুরস্কারটি দেয়া হতো না সিভিলিয়ান বলে। এমনকি খেলায় প্রথম হওয়ার পরেও নাকি সে পুরস্কার দেয়া হয়নি।

৫. একই অপরাধ করলেও ডিফেন্স ও সিভিলিয়ানদের দুই রকমের শাস্তি দেয়া হয়।

এসব শোনার পরে আমি জানতেও চাইনি যে   আর কি কি ব্যাপার আছে। কিছুতেই বাচ্চাকে এমন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করবো না যেখানে শুরুতেই এতো বৈষম্য শিখবে। ভাবতে অবাক লাগে আমরা বাচ্চাদের কি শিখাচ্ছি। আমি চাই আমার সন্তান তার অধিকার সম্পর্কে জানুক। তার সীমার মধ্যে যা যা তার প্রাপ্য সে পাবে। কিন্তু অন্যায় কখনোই করতে দিব না এবং সহ্য করতেও দিব না।

যেদিন ফরম জমা দিতে যাব সেদিনের ঘটনা-

২/৩ জন অভিভাবক বলাবলি করছে রেফারেন্স নাম নিয়ে, কে কত লোকের কাছে গিয়েছে, কিভাবে নাম, ঠিকানা ম্যানেজ করেছে। একজনের জা এর মামাতো ভাই এর ঠিকানা ও নাম্বার দিয়েছে। অবশ্য ফরম এ লেখা ছিল যে আত্মীয় বা পরিচিত কেউ হলেই হবে।

অন্যদিকে একজন ফোনে কথা বলছে বাৎসরিক আয় বাড়িয়ে লিখছি, ওরা তো আর চেক করতে যাবে না, ওপাশ থেকে কিছু শোনার পর এপাশ থেকে জবাব আসলো আরে বেশী দেখালে চান্স পাওয়ার সম্ভাবনা তো একটু বেশী থাকবে।

আমি এসব কথা শোনার একটি কারণ হলো জানতে চাচ্ছিলাম অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া। কারণ আমার বাচ্চার বাবা বলেছিলেন এতোটুকু বাচ্চার এতো পরীক্ষা যেখানে সেখানে যাওয়ার দরকার নেই। আর আমার ভাবনা ছিল ও নতুন কিছু শিখুক জানুক। আর দ্বিতীয়ত আমার বাচ্চা ইচ্ছা মতো খেলাধুলায় ব্যাস্ত ছিল। তাই আশেপাশের সবার কথা শুনছিলাম।

কত কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে ভালো স্কুলে ভর্তির  জন্য।  অথচ ভালো স্কুল অনৈতিক কাজ করতে উৎসাহিত করছে।

মৌখিক পরীক্ষার দিন-

৩/৩.৫ বছরের বাচ্চাকে মা বুঝিয়ে যাচ্ছে কিভাবে কথা বলতে হবে, কোনটি কি রঙ, কান্না করা যাবে না এসব। আর বাচ্চাটি অসহায় এর মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।

আরেকজন ৩ বছরের বয়সী বাচ্চাকে কোল থেকে নামাতেই পারছে না। বাচ্চা বলছে যাবে না স্কুলে আর অভিভাবক আছে পেরেশানিতে যে এভাবে কান্না করলে তো সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না।

মা আর মেয়ে চুপচাপ বসে আছে।  মেয়েটির মন অনেক খারাপ। সামনে যেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম কি মামনি অনেক টেনশন? সাথে সাথে বাচ্চার মা বলা শুরু করলো ওর কিসের সব চিন্তা তো আমার।  ভালো একটি স্কুলে যদি ভর্তি না হতে পারে তাহলে কি আর ভালো লেখাপড়া হবে!!!

আমার এক নিকট আত্নীয়ের মেয়ের ক্লাশ ফাইভের সমাপনী পরীক্ষার আগে মেয়েকে বলছে, ‘মা আমার সম্মান তোমার হাতে। এ প্লাস না পেলে কিন্তু কাউকে মুখ দেখাতে পারবো না। যত যাই করো আমার এ প্লাস লাগবে’।  আরে ভাই/ বোন এতো বড় একটি মানুষের মান সম্মান অতোটুকুন একটি বাচ্চা মেয়ের উপর চাপিয়ে দিলেন!!! অতো হয়তো মান সম্মানের মানেও ভালো জানে না। একটি শিশুকে পরীক্ষার আগে এসব বললে সে কতোটুকু মানসিক চাপে থাকে তা মনে হয় অভিভাবকদের বড় হওয়ার পরে মনে থাকে না।

আরেকজন এর ছেলে ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছে, সমাপনী তে গোল্ডেন এ প্লাস। ক্লাশ এইটে ও একই রেজাল্ট। এস এস সি তে গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ। সবাই মহা খুশি। হবেই বা না কেন। অতঃপর এইচ এস সি তে সে শুধু জিপিএ ফাইভ পেলো৷ আহারে বেচারা কতো কিছুই শুনতে হলো তাকে। এমন কি দু বাড়ি পরে মামতো ভাইয়ের জন্মদিনে এক পিস কেক খেতে আসার ও অনুমতি নাই!!!

আরে ভাই স্বাভাবিক ভাবে যদি বাচ্চাদের বেড়ে উঠতে না দেন তবে শিখবে কিভাবে!!! গৃহ বন্দী, বা কোন পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে না যেতে দেয়া, বা নিজের মান সম্মানের দোহাই দিয়ে বাচ্চাদের শিক্ষা দেয়া যায় না।

যেদিন আমার মেয়ের স্কুলের লটারির রেজাল্ট দিয়েছিল সেদিন দেখলাম এক ভদ্র লোক তার আসন ছেড়ে পেছনের ফাঁকা জায়গা তে চলে এলো। ফোনে বলছে তাই ওয়াইফ কে ” ইয়ে শোন সবার নামই তো বলছে ওর নামটি কেনো জানি আসেনি। আমি লটারি শেষে আরেকবার খবর নিব। অতো চিন্তা করো না। মন তো খারাপ হবেই কিন্তু কি আর করার “।

আমাদের নিজেদের আগে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। পরেই পারবো সন্তানদের কিছু শেখাতে। একটি স্কুলে চান্স না পেলে জীবন শেষ না। কোন জায়গায় চান্স না পাওয়া মানে এই না যে আমার সন্তান কিছুই জানেনা৷ বাচ্চাদের প্রতি নিয়ত উৎসাহ দিতে হবে লেখাপড়ার বোঝা নয়। নিজের সম্মান নিজে রক্ষা করা উচিৎ। সেটা ছোট্ট একটি বাচ্চার ঘাড়ে না চাপাই। আমরা প্রতিযোগিতায় অবশ্যই সন্তানকে পাঠাবো তবে প্রথম হওয়ার জন্য নয় নতুন কিছু শেখার জন্য।

বুদ্ধিমানেরা কখনো হারে না, তারা জেতে নয়তো শেখে। যেই বলেছেন আমার মতে  কথাটি সঠিক বলেছেন। বাচ্চাদের হারার কষ্ট নয় শেখার আনন্দ অনুভব করা শেখালে তাদের মনটাও বড় হবে। আসলে বাচ্চাদের নিয়ে সবাই জানে বোঝে। সব বাবা মায়েরাই তাদের সন্তানের ভালো চান। আমি এখানে আমার দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখা করতে চেষ্টা করেছি।

ধন্যবাদ।

 

৪৬৪জন ৪৬৪জন
54 Shares

৬৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য