শূন্যতা ভালোবাসাময়

রেহানা বীথি ৯ জুন ২০১৯, রবিবার, ১০:৪২:৪১পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২০ মন্তব্য

শূন্যতা ভালোবাসাময়
———————————–
কেন যে বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো! বাড়িটা আমার নয়, ওই বাড়ির প্রতি কোনো টান জন্ম নেয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই। বিয়ের পর মাঝে মাঝে যাওয়া হয়েছে, এই যা। তবু কেন এই হু হু করে ওঠা? কেন মনে হলো, হঠাৎ করে কিছু শূন্যতা গ্রাস করলো আমাকে?

মাঠের মতো এক উঠোন মাঝখানে নিয়ে চওড়া পিলার দেয়া ঘরগুলো দেখলে কেমন যেন একটা গা ছমছম ভাব আসে। রূপকথা মনে পড়ে যায়। আত্মীয়তার সুবাদে বহুবার গিয়েছি সেই বাড়িটিতে। এক উঠোন, অনেক ঘর, অনেক লোকজন। ঘরগুলোর প্রতিটি নোনাধরা দেয়াল আর চটা ওঠা দোতলার সিঁড়িটি জানান দেয় ক্ষয়ে যাওয়া আভিজাত্য। বাড়ির বাসিন্দাদের আচার ব্যবহারেও আভিজাত্য ঝরে ঝরে পড়ে। এমন যে বাড়ি, সে বাড়ি হঠাৎ করে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো? মাঠের মতো উঠোনটা নেই আর। দেয়াল উঠেছে নতুন করে, বাড়িটা হয়েছে তিনটে টুকরো। দেখে ভেতরে প্রবেশের ইচ্ছেটাই কেন যেন মাটি হয়ে গেলো। অথচ বাড়িটা টুকরো হওয়ায় আমার কোনো স্বার্থহানী হয়নি। তবু কেন এ শূন্যতাবোধ, কেন এ হাহাকার বুকের ভেতর? জানি না!

আসলেই কী জানি না? আমার খুব গোপন বেদনারা, কী বলে তারা? হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকি হৃদয়ের অলিগলি। এ প্রশ্নের উত্তর আমাকে পেতেই হবে যে! মনে পড়ে….. ধূসর হয়ে আসা কিছু স্মৃতি। চোখ বুঁজে ফেলি। ভেসে ওঠে একটি উঠোন, গোল করে ঘিরে রেখেছে একের পর এক ঘর সেই উঠোনটা। উঠোনের এককোণে একটা কুয়ো, ভীষণ গভীর। বহু বহু গভীরে দেখা যায় নিকষ কালো জল! আমি কুয়োর মধ্যে ঝুঁকে আওয়াজ করি, ফিরে আসে সে আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়ে। তারপর আবার আওয়াজ করি….আবার…..আবার……………
একটা পানখাওয়া, জর্দার সুবাস ছড়ানো মুখ থেকে শোনা যায়, “অতো নিচে ঝুঁকিস না বলছি, পড়ে যাবি তো কুয়োর ভেতর!”
পরম স্নেহে এসে টেনে নিয়ে যায় সে আমাকে তার ঘরের দাওয়ায়। সারাদিন ধুলোকাদায় খেলে বেড়ানো এই আমার জামা প্যান্ট পাল্টে দিয়ে আবার নিয়ে যায় কুয়োতলায়। সড়সড় শব্দে বালতিবাঁধা দড়ি গিয়ে ঝপাং করে পড়ে কুয়োয়। আবার সড়সড় শব্দে উঠে আসে দড়িবাঁধা বালতি, এবার সেটি জলে ভরা। টলটলে ঠাণ্ডা সে জল দিয়ে স্নেহময়ী সেই হাত ধুইয়ে দেয় আমার পা-হাত-মুখ। পরিপাটি হয়ে আমি দাওয়ায় বসি চুপটি করে। একবাটি সর্ষের তেলে মাখা মুড়ি এনে খাওয়ায় আমাকে আর বলে, “আর অমন করিস না কখনও, বুঝলি?”
জর্দার সুবাসে আমার সব এলোমেলো হয়ে যায়। আমি আহ্লাদে গলে গিয়ে বলি, ” আর অমন করবো না দাদি!”
তারপর সন্ধ্যা ঘনায়। আমার মা জানে, দাদির আদরে বাঁদর আমি হয়তো ঘুমিয়েই পড়েছি! সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ি আমি। দাদির মুখে সেই জর্দার সুবাস আর রূপকথাদের ভিড়ে হারিয়ে যাই একেবারেই!

এই তো খুঁজে পেয়েছি! ওই স্মৃতিদের ভিড়েই তো লুকিয়ে আছে আমার বুকের ভেতর হু হু করে ওঠার রহস্য! স্মৃতির সেই উঠোনটা আমি বোধহয় ফিরে পেয়েছিলাম এই উঠোনের মাঝে। বোধহয় কেন, নিশ্চয়ই পেয়েছিলাম! স্মৃতির উঠোনে দেয়াল উঠেছিলো, একাধিক টুকরোয় বিভক্ত হয়েছিলো, নিশ্চিহ্ন হয়েছিলো কুয়োটা। আমার গোপন বেদনাবোধ তো এদেরকে ঘিরেই। আমার মন চায়নি এ বিভক্তি। চেয়েছিলো একটা উঠোন, অনেক ঘর, অনেক লোকজনের কোলাহল। চেয়েছিলো একটি মায়ার বাঁধন….. যে বাঁধনে এক সুতোয় বাঁধা থাকবে সব্বাই।

কিন্তু তা হয়নি, তখনও…… এখনও। এভাবেই আমরা বিচ্ছিন্ন হই, ভাগ হয় আমাদের উঠোন, আলগা হয়ে যায় মায়ার বাঁধনগুলো। না না, দোষ দিই না কাউকে! পরিস্থিতি হয়তো এমনটাই দাবি করে। হয়তো প্রয়োজন ছিলো এই বিভক্তিরও। তবুও অকারণ এই শূন্যতাবোধ তৈরি হয়, হয়তো সবার নয়, কারও কারও, তবু হয়! হয় বলেই বুঝতে পারি, যতই ভাগ হোক, দূরে সরে যাই না কেন যতই, সেটা সাময়িক। একটা অদৃশ্য সুতো রয়েই যায়। একটা অদৃশ্য মায়াজাল বিছানো আছে আমাদের মাঝে। যে মায়াজাল আটকে রেখেছে সবাইকে। যতই চেষ্টা করি, সে জাল কেটে পুরোপুরি বের হতে পারবো না আমরা কখনও। যতবার দেখবো কোনো উঠোন টুকরো হতে, ততবার ব্যথিত হবো, ততবার গ্রাস করবে এক অদ্ভুত শূন্যতা…… ভালোবাসাময়!

৩০৩জন ১৫৭জন
14 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য