শুভ জন্মদিন গুরু

নীলকন্ঠ জয় ৮ মে ২০১৪, বৃহস্পতিবার, ১০:১৪:০৬পূর্বাহ্ন বিবিধ ১২ মন্তব্য

images (3)

‘হে নতুন,
দেখা দিক আর-বার
জন্মের প্রথম শুভক্ষণ’

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মদিনে এভাবেই নতুনকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। আর তাইতো গুরুর জন্মদিনে তার অনুরাগীরা সাড়া দিয়েছেন সানন্দে। তিনিও বারে বারে ফিরে আসেন বাঙালীর মনে, মননে, চিন্তায়, সব অভিব্যক্তিতে।

আজ পঁচিশে বৈশাখ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৩তম জন্মবার্ষিকী। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের এ দিনে ধরণীর বুকে রবির কিরণ ছড়িয়ে এক শিশু জন্ম নিয়েছিলো কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে। কে জানত এই শিশুই ভবিষ্যতের বিশ্বকবি? ইংরেজিতে তারিখ ছিল ১৮৬১ সালের ৭ মে।

আজ বাঙলা ২৫ শে বৈশাখ কবিগুরুর জন্মদিনে সোনেলা পরিবারের পক্ষ থেকে জানাই শ্রদ্ধা এবং জন্মদিনের শুভেচ্ছা।2d07546ce8f86b65effb2a1137bdcb36

তাঁর পিতা ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭–১৯০৫) এবং মাতা ছিলেন সারদাসুন্দরী দেবী (১৮২৬–১৮৭৫)। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পিতামাতার চতুর্দশ সন্তান। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার ছিল ব্রাহ্ম আদিধর্ম মতবাদের প্রবক্তা। রবীন্দ্রনাথের পূর্ব পুরুষেরা খুলনা জেলার রূপসা উপজেলা পিঠাভোগে বাস করতেন।

১৮৭৫ সালে মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের মাতৃবিয়োগ ঘটে। পিতা দেবেন্দ্রনাথ দেশভ্রমণের নেশায় বছরের অধিকাংশ সময় কলকাতার বাইরে অতিবাহিত করতেন। তাই ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হয়েও রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা কেটেছিল ভৃত্যদের অনুশাসনে। শৈশবে রবীন্দ্রনাথ কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নর্ম্যাল স্কুল, বেঙ্গল অ্যাকাডেমি এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে কিছুদিন করে পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু বিদ্যালয়-শিক্ষায় অনাগ্রহী হওয়ায় বাড়িতেই গৃহশিক্ষক রেখে তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ছেলেবেলায় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে অথবা বোলপুর ও পানিহাটির বাগানবাড়িতে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করতেন রবীন্দ্রনাথ।

শান্তি নিকেতনে মহত্মা গান্ধীর সাথে
শান্তি নিকেতনে মহত্মা গান্ধীর সাথে

আমরা অনেকেই হয়তো জানি না আজ জাতীয় পর্যায়ে কবির স্মৃতিধন্য শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর ও দক্ষিণডিহিতে পালিত হবে সরকারি উদ্যোগে নানা অনুষ্ঠান। রাজধানী ঢাকায় সরকারি পর্যায় ছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন রবীন্দ্রজয়ন্তী উদ্যাপন করবে। কবিগুরুর জন্মদিন উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা কবির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

বিস্ময়কর প্রতিভার বিচ্ছুরণে নিজেকে কবিগুরু থেকে বিশ্বকবিতে পরিণত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাঙালির চিন্তা, মনন, অনুভূতির এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে তার সৃজনশীলতার ছোঁয়া পড়েনি। সত্য, সুন্দর, ন্যায় ও কল্যাণের পথে ধাবিত করেছেন জাতির মননকে। বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতি বিনির্মাণের অগ্রপথিক এ কবি। জন্মের দেড়শ বছর পরও শিল্প-সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই দীপ্তিমান তিনি।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানগণ কি বলেছেন রবি ঠাকুর সম্পর্কে সংক্ষেপে জানা যাক।

রবীন্দ্রনাথের বিশালতা ও তার সৃষ্টির অপূর্ব মাধুর্যকে অন্তরাত্মা দিয়ে উপলব্ধি করতে হলে রবীন্দ্রচর্চার বিকল্প নেই। রবীন্দ্রচেতনার আলোকে ন্যায়ভিত্তিক-শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা পাবে এবং মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় হবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিস্ময়কর প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ। তার ক্ষুরধার লেখনী থেকে বেরিয়ে এসেছে বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী চিন্তা-চেতনা। রবীন্দ্রনাথ একাধারে কবি, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ, কথাসাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক। তার হাতেই বাংলা কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য পূর্ণতা পেয়েছে। আসন পেয়েছেন বিশ্ব দরবারে। [রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ খান]

বিশ্বব্যাপী দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও বৈষম্যের বিলোপ সাধন এবং ধর্ম-বর্ণ-ভাষায় বৈচিত্র্য সমুন্নত রাখতে রবীন্দ্রনাথের জীবন ও দর্শন উজ্জ্বল এক আলোকবর্তিকা। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী রবীন্দ্রনাথ ছিলেন শান্তির কবি, মানবতার কবি ও প্রকৃতির চিরন্তন সৌন্দর্যের কবি। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বৈচিত্র্যের সাধক। কালজয়ী এ কবি জীবন ও জগেক গভীরভাবে নিরীক্ষণ করেছেন। সাহিত্যের সব শাখায় তার অনন্যসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। জীবন সম্পর্কে তার দূরদর্শী চিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তার সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। [প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা]

আমাদের জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে বিশ্বকবির সুগভীর প্রভাব বিদ্যমান। নিজের অতুলনীয় প্রতিভায় শুধু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠাই করেননি, পাশাপাশি কর্মচঞ্চল এই মানুষটি আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এশিয়ার প্রথম নোবেল পুরস্কার পাওয়ার বিরল সম্মান অর্জনকারী রবীন্দ্রনাথ তার উপন্যাস, কবিতা ও গানে গভীর জীবনবোধ, প্রকৃতির সঙ্গে সংলগ্নতা ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর আস্থা প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে এক অনাবিল শান্তি ও স্বর্গীয় আনন্দের আবহ তৈরি করে। আমরা গর্ববোধ করি তার রচিত গান আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে পেয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার অনাবিল স্মৃতিতে একদিকে যেমন স্বজাতির মূঢ়তা, স্থবিরতার বিপন্ন ছবি ফুটিয়ে তুলেছিলেন, আবার অন্যদিকে তিনি জাতীয় জীবনের সব অচলায়তন ভেঙে বিশ্বের অতি অগ্রসর জাতিগুলোর কীর্তিময় অর্জনগুলোকে গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।[সাবেক বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া]

রবি ঠাকুরের নিজ হাতে আঁকা ছবি 'ড্যান্সিং গার্ল'
রবি ঠাকুরের নিজ হাতে আঁকা ছবি ‘ড্যান্সিং গার্ল’

ছায়ানট ১৪১৬ বঙ্গাব্দ থেকে রবীঠাকুরের জন্মদিন উদ্যাপনে শুরু করে রবীন্দ্র-উত্সব। এবারের আয়োজন হচ্ছে ২৬ ও ২৭ বৈশাখ। উত্সবের উদ্বোধন হবে আগামীকাল সন্ধ্যা ৭টায় সম্মেলক নৃত্য-গীতের মধ্য দিয়ে। এ আয়োজনে সম্মেলক ও একক গান ছাড়াও থাকছে নৃত্য, পাঠ ও আবৃত্তি। উত্সবে অংশ নেবেন ঢাকাসহ দেশের নানা অঞ্চলের প্রবীণ-নবীন ও প্রতিশ্রুতিমান শিল্পী।

রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি অভিধায় ভূষিত করা হয়। রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন। তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়। তাঁর সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খণ্ডে চিঠিপত্র ও চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত। এছাড়া তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের রচনা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

 

সংক্ষেপে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনীঃ

আট বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন।

১৮৭৪ সালে “তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা” এ তাঁর “অভিলাষ” কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা।

১৮৭৮ সালে মাত্র সতেরো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার ইংল্যান্ডে যান।

১৮৮৩ সালে মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়।
১৮৯০ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের শিলাইদহের জমিদারি এস্টেটে বসবাস শুরু করেন।
১৯০১ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের ‘শান্তিনিকেতনে'”বিশ্বভারতী” ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানেই পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করেন।
১৯০২ সালে তাঁর পত্নীবিয়োগ হয়।
১৯০৫ সালে তিনি বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।
১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন। কিন্তু ১৯১৯ সালে  জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি সেই উপাধি ত্যাগ করেন।

১৯২১ সালে গ্রামোন্নয়নের জন্য তিনি “শ্রীনিকেতন” নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে “বিশ্বভারতী” প্রতিষ্ঠিত হয়।

দীর্ঘজীবনে তিনি বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করেন এবং সমগ্র বিশ্বে বিশ্বভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করেন।

১৯৪১ সালে দীর্ঘ রোগভোগের পর পৈত্রিক বাসভবনেই তাঁর মৃত্যু হয়।

তথ্যসূত্রঃ সম্পূর্ণ অন্তর্জালের বিভিন্ন ব্লগ, পত্র-পত্রিকা এবং উইকিপিডিয়া থেকে খন্ড খন্ড আকারে সংগৃহীত।

২৩৪৭জন ২৩৪৪জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ