শুভ্র পরীঃ ( ৩য় এবং শেষ পর্ব )

তার ছেঁড়া ১২ ডিসেম্বর ২০১৩, বৃহস্পতিবার, ০৩:৩৯:০৬পূর্বাহ্ন বিবিধ ১৩ মন্তব্য

শুভ্র পরীঃ ( ৩য় এবং শেষ পর্ব )

একদিনের কথা । আমার শুভ্র পরী এক কাজিনের বাসায় বেড়াতে গেল । তখন বর্ষাকাল । সারাদিন হৈ হুল্লোড় করে নাবিলা যখন বাসায় গিয়েছিল তখন সে খুব ক্লান্ত । তাই আমায় বলে দিয়েছিল রাতে ঘুমাই যাবে ।

রাত তখন প্রায় ১:৩০ । ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল । আমি সবেমাত্র ঘুমোতে যাব তখনি নাবিলার ফোন আসল । ফোন রিসিভ করতেই ওইপাশ থেকে কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই ।

-কাঁদছ কেন ?
-ভয় পাচ্ছি ।
-কেন ?
-বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ।
-বোকা মেয়ে । এতে কাঁদার কি আছে ?
-জানি না । ভয় পাই যে ।
-কান্না থামাও । না হইলে কিন্তু ফোন রাখলাম ।

এর পর কান্নার শব্দ আরো বেশি করে শোনা যাচ্ছিল । আমার আবার কান্না সহ্য হত না । তাই রাগ করে ফোন কেটে দিলাম । নাবিলা তখন ভয়ে এবং কষ্টে আরো বেশি করে অশ্রু বর্ষন শুরু করল ।

২০ মিনিট পর আমি আবার ফোন দিলাম ।

-হ্যালো ?
-ফোন কেটে আবার ফোন দিলা কেন ?
-তুমি এখনও কান্না থামাও নাই ?
-কাঁদব, আরো বেশি করে কাঁদব । আমি কাঁদলে তাতে তোমার কি ?
-কান্না থামাও । এখনো ভয় পাচ্ছ ?
-হুম ।
-ভয় পেয় না । আমি তোমার কাজিনের বাসার সামনে দাড়ায় আছি । তুমি ঘুমাও ।
-কিহ ! রাত ২ টার দিকে বৃষ্টিতে ভিজে তুমি এখানে কেন ?
-তুমি যে ভয় পাচ্ছ ।
-হি হি হি ! পাগল আমার !

এরপর কিছুক্ষন কথা বলে নাবিলা ঘুমিয়ে পড়ল ।আর আমি ভালবাসার টানে ভোর পর্যন্ত সেখানে ঠাঁয় বসে রইলাম যেন আমার পরী ঘুম ভেঙ্গে আর কেঁদে না ওঠে ।

পরেরদিন বিকালেই নাবিলা বাসায় চলে আসল । এসেই আমার সাথে জিদ করে বসল পরশু তাকে নিয়ে ঘুরতে যেতে হবে । আমি এককথাতেই রাজি হয়ে গিয়েছিলাম ।

পরশু এসে গেল । আমি বাসার নিচে দাড়িয়ে আমার পরীর জন্য অপেক্ষা করছি । যেহেতু নাবিলা আমাদের ফ্ল্যাটের উপর তলাতেই থাকত তাই আমি আমার বাসার আসে পাশেই হাটাহাটি করতে থাকলাম । যখন নাবিলা বেড় হয়ে আসল , তখন তাকে দেখে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল । এই মেয়েটা কি সত্যই আমার শুভ্র পরী ? নাবিলা গোলাপী রংয়ের একটি শাড়ী পড়েছিল । চোখে গাঢ় কাজল , হাতে কাঁচের চুড়ি , কপালের মাঝখানে ছোট্ট একটি গোলাপী টিপ আর সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হল নাবিলা চোখে গোলাপী ফ্রেমের চশমা পড়েছিল ! তার থেকে আমি চোখ ফেরাতে পারছিলাম না । ও এসেই আমাকে বলল ,

– অমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছো কেন ?
– ( মুখে নির্লিপ্তভাব এনে বললাম ) না মানে , তুমি চশমা পড়ছ তো তাই একটু অবাক হয়েছি । আচ্ছা তুমি চশমা নিলা কবে ?
– এটা এমনি পড়লাম । ভাবলাম শাড়ীর সাথে চশমা পড়লে আমায় আরো বেশি ম্যাচিউরড লাগবে ।
– হুম বুঝলাম । তোমায় সুন্দর লাগছে !
– সেটা আমি আগে থেকেই জানি ।

কথাটা বলেই নাবিলা খিল খিল করে হেসে উঠেছিল । এবং আমি আরেকবার মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম ।

কিছুক্ষণ কথা বলার পর আমরা রিক্সা নিয়ে লেকের দিকে যেতে থাকলাম । নাবিলার মুখ দিয়ে কথার ফুলফুঝি ছুটছিল । আর আমি সেই কথার ফুলগুলো হৃদয়ের শোকেসে সাজিয়ে রাখছিলাম । হঠাৎ কোথা থেকে কি জানি হয়ে গেল !

রিক্সা থেকে আমি রাস্তার বাম পাশে ছিটকে পড়েছিলাম । আমার শুভ্র পরী ও আমার থেকে একটু দূরে গিয়ে পড়েছিল । সবকিছু যেন একমুহূর্তের মাঝে ঘটে গিয়েছিল । আমি কোমরে আর মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম । কিন্তু এত কিছুর মাঝেও আমি আমার পরীকে খুজছিলাম । ওই তো সে , রাস্তার ধারে গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে । তার মাথা থেকে রক্তের বন্যা বয়ে যাচ্ছিল । কেন জানি নাবিলাকে তখন অনেক সুন্দর লাগতেছিল । মনে হচ্ছিল হাজার রক্তলাল গোলাপের মাঝে একটা শুভ্র সাদা গন্ধরাজ চুপটি করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে । ধীরে ধীরে চারপাশ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল । এরপর আর কিছুই মনে নেই । শুধুই অন্ধকার !

জ্ঞান ফিরলে নিজেকে নার্সিং হোমের বেডে আবিষ্কার করি । ডান পাশে আব্বু আর আম্মু । তারা কাঁদছেন । কিন্তু আমি আমার পরীকে খুজছিলাম । বেশিক্ষণ খুজতে পারলাম না । তার আগেই সব অন্ধকার !

আমার পা দুটো হাঁটুর উপর থেকে কেটে ফেলা হয়েছিল । সারা শরীরে ইলেকট্রিক তারে ভরা ছিল । দিন দিন চোখের জ্যোতি কমে যাচ্ছিল । কথাও বলতে কষ্ট হত । তবুও যতদূর জেনেছি , নাবিলা কোমায় চলে গিয়েছে । আমি সর্বদা মন থেকে চাইতাম , আল্লাহ তুমি আমার পরীকে সুস্থ করে দাও ।

হয়ত আর বেশিদিন বাঁচব না । কারণ আমার শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে । কৃত্রিম ভাবে বেঁচে আছি বলা যায় । শুধু একটাই শেষ ইচ্ছা , শুভ্র পরী , তুমি ভাল থেকো , সুখে থেক । তোমার ওই হাসি অক্ষয় থাকুক , হয়ে থাকুক অমলিন ।

>>>

” জিসান ” এর লেখা এই ডায়েরীটা বন্ধ করে অপু চোখের পানি মুছে নিল । একজন মানুষ কাউকে এতটা ভালবাসতে পারে তা কল্পনাতীত । সন্ধ্যা হয়ে গেছে । অপু বাসা থেকে বের হল । মনটা ফ্রেশ করা দরকার ।

রাস্তা দিয়ে হেটে যেতে অপু সামনের ছয় তালা বিল্ডিং টার দিকে তাকালো । হ্যাঁ , এইটাই তো জিসানের বাসা । আর ওইতো একটা পরীর মত সুন্দর মেয়ে রেলিং এ হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে !!!

বিষন্ন মুখে একা একা দাড়িয়ে আছে জিসানের শুভ্র পরী । কিন্তু জিসান নেই তার পাশে । না না , অবশ্যই আছে , হয়ত বাতাসের সাথে মিশে আছে । পরীকে সে একা ফেলে কোথাও যাবে না । অপু আর দাড়ালো না । মাথা নিচু করে চোখ মুছতে মুছতে যেতে থাকল । দূরে অন্ধকারে একসময় শুভ্র পরী মিশে গেল ।

( এখনও মাঝে মাঝে মাঝরাতে নাবিলা নামের মেয়েটিকে একা একা সেই ছয়তলা বাড়ীর ছাদে দেখা যেত । কিন্তু , কেউ তার সেই খিল খিল হাসি দেখে নাই ! )

¤ সমাপ্ত ¤

২১২জন ২১১জন
0 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য