আরো তিন সপ্তাহ আগে সীতাকুণ্ড পাহাড়ে উঠার ইচ্ছে হয়েছিল। বউয়ের বান্ধবীর বাড়ির দাওয়াত বাঁধা হয়ে দাড়ালো।পরের শুক্কুরবারে আবার মেয়ে বায়না ধরলো ছোট কাকুর হউর বাড়ি বেড়াতে যাবে,তাই হলো না যাওয়া সেই শুক্কুরবারেও। আজ শুক্কুরবারের আগের দিন, আমার নীল গেঞ্জি নীল হাপপেন্ট (যা আমি নদী কিংবা পাহাড়ে গেলেই সাথে নেই) সহ কাঁদে ঝুলানো বেগটা দেখি রেডি হয়ে সোফার কোনায় বসে আছে। বুঝলাম তারই কাজ,হয়তো ভেবেছে কাল শুক্কুরবার আমাকে আর দাবাইয়া রাখা যাবে না।আমিও ভুলেই গিয়েছিলাম বরং গোছানো বেগটাই মনে করিয়ে দিলো আজ বিসুদবার। তেপান্তরের এমডি সাব্বির ভাইকে ফোন দিলাম সীতাকুণ্ডে কোন টুর আছে কি না,কোন সিট টিট খালি আছে কি না।উনি বললেন সীতাকুণ্ডে এ সপ্তাহে নেই তবে রাঙামাটি টুর আছে কিন্তু সিট সব ফিলাপ। আপনি যেতে চাইলে মেনেজ করে দিতে হবে,রাত সারে দশটায় সায়দাবাদ হুজুরের বাড়ি গেইট থেকে ছেড়ে যাবে।রাঙামাটি অনেক বারই যাওয়া হয়েছে বিধায় সীতাকুণ্ডই যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিলো। যাইহোক সবই আল্লাহর ইচ্ছা। সারে চারটায় মেসেজ পাঠালাম— ভাই সিদ্ধান্ত ফাইনাল, লাল পাহাড়ের দেশের উদ্দেশ্যেই রওনা দিলাম।মেসেজে রিপ্লাই এলো, চলে আসেন ভাই , আল্লাহ ভরসা।

 

গাজীপুর থেকে জাস্ট টাইম ৫টার ট্রেনে উঠলাম সারে ছয়টার মধ্যে পৌঁছে যাবো ঢাকা, আনুষাঙ্গিক কাজ সেরে সারে দশটায় লাল পাহাড়ের দেশের উদ্দেশ্য ঢাকা ছাড়বো। টঙ্গী স্টেশনের অনেক আগেই দেখি ট্রেন একদম ধীর গতিতে এগোচ্ছে। বগির ভিতরে নানারকম ভীতিকর  মন্তব্য কানে আসছে, ইঞ্জিনে আগুন ধরেছে,চাকা লাইন চুত হয়েছে, ইঞ্জিন ব্রেক ফেইল করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি,সাথে আছে রেল লাইনের পাশের রাস্তা দিয়ে  চলমান মানুষ গুলোর আর্তচিৎকার আর সতর্ক সংকেতও।বগির ভিতরে সবার চোখেমুখে আতংক, আল্লাহকে ডাকছে,দোয়া দুরুদ পড়ছে। ইতিমধ্যে ধীরগতির ট্রেন থেকে অনেকই লাফিয়ে নেমে পরছে।এমনই একটা ভীতিকর পরিবেশে আমার কাছেও মনে হলো আজরাইল আমার আসেপাশেই অবস্থান নিয়েছে,  কাকে নিবে কাকে রাখবে তাই হয়তো ভাবছে। এরই মধ্যে একটা খালি ইঞ্জিন এসে ট্রেনটাকে টেনে টংগী স্টেশন নিয়ে  আসলো।যাবার পথে এমন একটা বাধা পরে গেলো!এখান থেকেই বাসায় ফিরে যাবো,না কি বেড় হয়েছি যখন রাঙামাটিই যাবো।কি করি কি করবো তা ভাবতে ভাবতে ঢাকা চলে আসলাম।

 

যথারীতি ৪২ জন টুরিস্টবাহী আমাদের বাসটি সায়দাবাদ থেকে রাঙামাটির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো।সবার মধ্যে আনন্দ আর বাধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস, —- লাল পাহাড়ের দেশে যাচ্ছে। এদের মধ্যে কলেজ পড়ুয়া একটা গ্রুপ যারা এই প্রথম লাল পাহাড়ের দেশে যাচ্ছে। তাদের আনন্দ আর উচ্ছ্বাস ছিলো বাধভাঙ্গা দিশেহারা। রাত গভীর হতে লাগলো।আনন্দে ক্লান্ত ভোমরা গুলো নাক ডাকা শুরু করিলো।আমি আস্তে আস্তে আমার জানালা খুলে দিলাম কারন বসন্ত বাতাসের সাথে শীতও যে চুপিচুপি মিলেমিশে থাকে। চান্নি-পসর রাইতের ঐ ভরা চাঁদটা আমাকে কি যেনো বলছে,আমার সাথে সাথে সেও ছুটে চলেছে লাল পাহাড়ের দেশে।যানজট বিহীন রাতের রাস্তা, কতো শতো মাইল বেগে আমাদের গাড়িটা যে ছুটে চলেছে— কে জানে?আমিও তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে গেলাম,জেগে নেই জেগে আছি টুয়েন্টি পার্সেন্ট—-এমনই একটা অবস্থা।তখনো নিশী ভোর হয় নি।হঠাৎই বিকট শব্দ, ভুমিকম্পের মতো ঝাঁকুনি। সবাই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো, দোয়া দুরুদ আর খোদা ভগবানকে ডাকতে লাগিলো।আমি জাগিয়া উঠিলাম, দেখিলাম আজরাইল আমার সামনেই দাড়িয়ে আছে,এবার বুঝি আর রক্ষা নেই। ড্রাইভার হেল্পার উদাও,বাস থেকে নামার দরজা চেপ্টা হয়ে লক হয়ে গেছে,  বেরুবার কোন পথ নেই। নিজেরাই ভেঙে ফেললাম দরজা জানালা, বের হয়ে আসলাম অনেকেই অক্ষত অবস্থায় কিন্তু একজন ইতিমধ্যে স্পট ডেথ আর তিনজন গুরুতর আহত। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের লোক আসলো।মাইকে দুর থেকে ফজরের আজানের সুর ভেসে আসলো।একটু একটু করে নিশি ভোর হতে লাগলো।নিজেদেরকে খুঁজে পেলাম সীতাকুণ্ড বাজার/পাহাড়  থেকে অনেকটা কাছে আর আমাদের গন্তব্য স্থল  রাঙামাটি থেকে অনেক অনেক দুরে এক নির্জনতার মাঝে।

 

আমাদের টুরিস্ট গাইডকেও এখন আর খুঁজে পাচ্ছি না।এদিকে প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে আমি প্রায় অস্থির,হয়তো আরো অনেকেই। যেদিক থেকে একটু আগে আজানের সুর ভেসে আসছিল সেদিক বরাবর হাটতে লাগলাম। বেশ খানিক হাটার পর দেখতে পেলাম সেই মসজিদ। পাশেই ছোট্ট একটা সুন্দর  পুকুর,বাঁধাই করা ঘাট।পুকুর পারের ঐ দিকটায় তাকাতেই পেয়ে গেলাম কাংখিত টয়লেট। একটা তালা দেয়া আরেকটায় ভিতরে কেউ আছে বলে মনে হলো।আমি আর পারছিলাম না,মসজিদের ভিতর উঁকি দিলাম। এক বৃদ্ধা কোরআন তালোয়াত করছিলেন।আমি বললাম, কাকা শুনছেন? আমি কি আপনাদের টয়লেট ব্যাবহার করতে পারি? একটু চাবিটা দিবেন? বৃদ্ধ বললো,  যাও যাও খুলাই আছে, কেউ নাই। আমি দৌড়ে গিয়ে দেখি সত্যি তাই। আহ কি শান্তি! ওম শান্তি।

 

এসে দেখি ৫০%ই নাই, ভয় পেয়ে যার যার মতো রানিং বাস থামিয়ে উল্টো পথে ঢাকা ফিরে গেছে। ঐ গ্রুপটা সহ ১৫-২০ জন তখনো টং দোকানে বসে চা বিড়ি খাচ্ছে আর কি করবে কি করবে তাই ভাবছে। এমন একটা হৃদয় বিদারক পরিস্থিতির মাঝে কি করে প্রস্তাব দেই— কাছেই সীতাকুণ্ড পাহাড় এবং গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত, চলো আমরা পাহাড় ঘুরে সন্ধ্যার বাসে ঢাকা ফিরি— সাহস পাচ্ছিলাম না।এমন সময় একজন হাল্কা সুর তুললে সাথে সাথেই আমি সেই সুরকে গারো সুরে পরিনত করি।

 

চন্দ্রনাথ পাহাড় চট্টগ্রাম এর সীতাকুণ্ড বাজার থেকে ৪কি.মি. পূর্বে অবস্থিত একটি পাহাড় যা দর্শনার্থীদের কাছে ট্রেকিং এর জন্যে অন্যতম জনপ্রিয় একটা রুট। চন্দ্রনাথ পাহাড় এর উচ্চতা আনুমানিক ১০২০ ফুট। চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ওঠার জন্যে ২টা রাস্তা আছে। ডানদিকের রাস্তা প্রায় পুরোটাই সিঁ‌ড়ি আর বামদিকের রাস্তাটি পুরোটাই পাহাড়ী পথ, কিছু ভাঙ্গা সিঁ‌ড়ি আছে। বাম দিকের পথ দিয়ে উঠা সহজ আর ডানদিকের সিঁ‌ড়ির পথ দিয়ে নামা সহজ।

 

প্রায় ২ থেকে২.৫ ঘণ্টা ট্রেকের পর দেখা মিলবে শ্রী শ্রী বিরূপাক্ষ মন্দির। প্রতিবছর এই মন্দিরে শিবরাত্রি তথা শিবর্তুদশী তিথিতে বিশেষ পূজা হয়। এই পূজাকে কেন্দ্র করে সীতাকুণ্ডে বিশাল মেলা হয়। সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ পাহাড় এলাকায় বসবাসকারী হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে বড় ধরনের একটি মেলার আয়োজন করে থাকেন। যেটি শিবর্তুদর্শী মেলা নামে পরিচিত। এই মেলায় বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ডসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য সাধু এবং নারী-পুরুষ যোগদান করেন।

 

বিরূপাক্ষ মন্দির থেকে ১৫০ ফুট দূরেই রয়েছে চন্দ্রনাথ মন্দির যা চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। এই ১৫০ ফুট রাস্তার প্রায় ১০০ ফুটই আপনাকে উঠতে হবে খাড়া পাহাড় বেয়ে যেখানে নিজেকে সামলে রাখা অনেকটাই কষ্টকর। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আপনি দেখতে পাবেন একদিকে সমুদ্র আর অন্য দিকে পাহাড়ের নির্জনতা। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবেন উঁচু-নিচু পাহাড়ের সবুজ গাছপালার দিকে। প্রশান্তিতে জুড়িয়ে যাবে চোখ,ভরে উঠবে মন।

 

 

অবশেষে ঠিকই তিন সপ্তাহ পরে, কতো ঘটনা দুর্ঘটনাকে পেছনে ফেলে —

 

দুর্গম পাহাড়ের গা ঘেঁষে, ট্রেকিং করে করে,

উচু নিচু আঁকাবাকা সর্পিল পথ বেয়ে বেয়ে,

ঈশ্বরের কৃপায় সীতাকুণ্ড পাহাড়ের চুড়ায় দাঁড়িয়ে,

আজ এই আমি,শুক্কুরবারের ভবঘুরে।

চন্দ্রনাথ মন্দিরের আঙিনায়

এগারোশো ফুট উচুতে দাড়িয়ে–

নয়নাভিরাম প্রকৃতিকেই শুধু দেখছি।

 

শুনেছি সীতাকুণ্ডের এই বাঁকে, নিরজনতার মাঝে,

বারোটি বছর না কি, কাটিয়ে ছিলো সীতা,

নৈসর্গিক এই প্রকৃতির কোলে, বনবাসী হয়ে।

 

ভবঘুরে মনটাও যে আজ—–বনবাসী হতে চায়,

দিনশেষে তবুও সে,

কেনো তবে, খোঁয়াড়েই ফিরে যায়।।

 

 

১১৫জন ১১জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ