শিশু সাহিত্যঃ শেয়াল পন্ডিতের পাণ্ডিত্য।

নীলকন্ঠ জয় ১৫ জানুয়ারী ২০১৪, বুধবার, ১০:২৪:৩৩পূর্বাহ্ন গল্প ১৬ মন্তব্য

শেয়াল মামা পন্ডিত বলিয়াই স্বীকৃত। বনে জঙ্গলে মাথা উঁচু করিয়াই চলেন তিনি। কিন্তু ফাঁদে পড়িয়া সদ্য খোয়া যাওয়া লেজটি নিয়ে বিশেষ দুশ্চিন্তায় পড়িয়াছেন তিনি। বহুপূর্বে তাহার পরদাদারও একই অবস্থা হইয়াছিলো। সে যাত্রায় বনের প্রাণীরা শেয়াল জাতির পান্ডিত্যে একটা কলঙ্কের দাগ আঁকিয়া দিয়াছিলো। তাহার পরদাদা প্রাণীকুলে ব্যাপক ক্ষোভ এবং সমালোচনার মুখে পড়িয়াছিলেন বনের আর সকলের লেজ কাটিবার ফন্দী আটিয়া ধরা পড়িয়া।

ছবিঃ অন্তর্জাল হইতে সংগৃহীত
ছবিঃ অন্তর্জাল হইতে সংগৃহীত

দুই প্রজন্ম পর একই পরিস্থিতির সম্মুখিন যে তাহাকেও হইতে হইবে ইহা কি ভুলেও তিনি কখনো ভাবিয়াছিলেন? অদৃষ্ট এমনই নির্মম। মান-সম্মান যাহা ছিলো তাহার সমস্তটাই ম্লান হইয়া যাইতেছে লেজ খোয়ানোর লজ্জ্বায়। লেজ ছাড়া প্রাণী ! হা ঈশ্বর রক্ষা করো!! বুদ্ধিমানকে বুদ্ধি দাও!!! মানীর মান রক্ষা করো !!!!

সমগ্র দিন পূর্ব বনে কাটাইয়া ঘোর অন্ধকারে পা টিপিয়া টিপিয়া ডেরায় ফিরিতেছিলেন পন্ডিত মহাশয়। বিশেষ নজর রাখিতেছিলেন চতুর্দিকে যাহাতে কেহ তাহাকে এই দুরাবস্থায় দেখিতে না পায়। ডেরায় ফিরিয়া প্লান করিয়া কিছু একটা বাহির করিতে হইবে। কিন্তু যেথায় ব্যাঘ্রের ভয় সেথায় নাকি প্রহর কাটিয়া যায়। বলা নেই কওয়া নেই রাজা মহাশয়ের খাস পেয়াদা সামনে আসিয়া হাজির হইলো।
– আরে পন্ডিত মহাশয় এতো রাতে কোথা হইতে?
– ইয়ে পেয়াদা সাহেব , গিয়াছিলাম রাহুর দশা কাটাইতে।
– কাটিয়াছে?
– সবই ঈশ্বরের কৃপা। আসি তবে।

ভাগ্যিস অন্ধকারে পেয়াদা বেটা তাহার লেজের দিকে নজর দিতে পারেন নাই। ‘যাক বাবা এ যাত্রায় বাঁচিয়া গেলাম’ মনে মনে একথা বলিয়া ডেরায় ফিরিলেন পন্ডিত শেয়াল।

সমগ্র রাত্রি নিদ্রাহীন কাটিলো তাহার। শেষ প্রহরে এক মহাবুদ্ধি মাথায় চাপিলো তাহার। ডেরার মুখে সূর্য উদিত হইবার পূর্বেই ঝোপঝাড় দিয়া ঢাকিয়া ফেলিলেন। নিজপুত্র ফটিককে দিয়া বনের রাজা বাঘ মামাকে বিশেষ সংবাদ পাঠাইলেন। হন্তদন্ত হইয়া বাঘ মামা ডেরার মুখে আসিয়া হাক ছাড়িলেন।
– কিহে পন্ডিত তোমার নাকি অসুখ করিয়াছে?
– আমার অসুখে দুশ্চিন্তা নহে রাজা মহাশয়। গিয়াছিলাম দূর দেশে হস্ত দেখাইতে। রাহুর দশা হইতে মুক্ত হইতে। ফিরিলাম দুঃখের সংবাদ বহন করিয়া। এ দুঃখ আমার একার নহে প্রিয় রাজা মহাশয়, এই দুঃখ সমগ্র রাজ্যের।
– বিচলিত হইয়া পড়িতেছি, খুলিয়া বলো।
– যখন রাজ্যের ভাগ্য গননা করিতে বলিলাম জ্যোতিষকে, তখন তিনি এমনই এক দুঃখের সংবাদ দিলেন যাহাতে সমগ্র রাত্রি ঘুমাইতে পারি নাই রাজা মহাশয়।
– ভনিতা ছাড়িয়া আসল কথাটা বলিয়া ফেলো পন্ডিত, আমাকে দুঃশ্চিতায় ফেলো না।
– জ্যোতিষ রাজ্যের ভাগ্য গননা করিয়া বলিলেন তোমাদের রাজার আয়ুষ্কাল ফুরাইয়া আসিতেছে শনির অমঙ্গল প্রভাবে। দ্রুত ব্যাবস্থা না লইতে পারিলে মহা সর্বনাশ হইবে তাহার।
– কি সে ব্যবস্থা খুলিয়া বলো।
– জ্যোতিষ মহাশয় বলিলেন এই রাজ্যের সব থেকে পন্ডিত ব্যক্তির এক পক্ষ কাল সূর্যের মুখ দেখা নিষিদ্ধ, তাহার সহিত…
– তাহার সহিত কি? খুলিয়া বলো জলদি।
– ইহা বলিতে আমার ভয় করিতেছে প্রিয় রাজা মহাশয়।যদি নির্ভয় দেন…
– তুমি নির্ভয়ে বলিয়া ফেলো।
– জ্যোতিষ বলিলেন পন্ডিত ব্যক্তির এবং তাহার সহিত আরো কয়েকজন শক্তিমান ব্যক্তির লেজ কাটিয়া ফেলিতে হইবে। যাহাতে শনির কু প্রভাব কাটিয়া যায়। আমি গতরাত্রেই নিজ হস্তে মহান রাজার শান্তির নিমিত্তে এবং রাজ্যের মঙ্গলার্থে নিজের অতিপ্রিয় লেজটি কাটিয়া ফেলিয়ায়াছি।
বলিয়া মায়াকান্না জুড়িয়া দিলো চতুর শেয়াল পন্ডিত। আর একথা শুনিয়া রাজা মহাশয় হুংকার ছাড়িয়া পেয়াদাকে ডাকিলেন।
– প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতি মন্ত্রী, উপমন্ত্রী সবাইকে ডাকা হউক এখুনি। এই রাজ্যের ক্ষমতাধর এই সকল ব্যক্তিবর্গের লেজ কর্তন করিবার আশু নির্দেশ দেওয়া হইলো। তাহার সহিত এই সকল মহান ব্যক্তিদের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননার ব্যবস্থাও করা হউক।
– যথা আজ্ঞা।

সন্ধ্যার পূর্বেই একে একে প্রধানমন্ত্রী, পাঁচজন মন্ত্রী, দুই জন প্রতিমন্ত্রী এবং একজন উপমন্ত্রীর লেজ কর্তন সম্পন্ন হইলো। নৈশভোজের আয়োজন করিয়া শিয়াল পন্ডিতকে রাজ্যের এবং রাজার সর্বত্তম বন্ধুর মর্যাদা দেওয়া হইলো। সকল কর্তিত লেজগুলোকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সমাহিত করা হইলো।

এভাবেই চতুর শেয়াল পন্ডিত পরদাদার কলঙ্কের দাগ মুছিয়া নতুন ইতিহাস রচনা করিলেন। ইহার জন্যই বলা হইয়া থাকে ‘শেয়াল পন্ডিতের মেধার কাছে জঙ্গলের সব মেধাই চীরকাল পরাজিত হয়।’

৩৬৭জন ৩৬৭জন
0 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

️️ 🍂️️ 💝 ️️ 🌟 🌺 💐 💥 🌻 🍄 🌹 💐 ⭐️ 🎉 🎊