শিশুসাহিত্যঃ ভূত পনি

হিলিয়াম এইচ ই ১২ আগস্ট ২০১৫, বুধবার, ০১:৩৫:৫২পূর্বাহ্ন বিবিধ ১১ মন্তব্য

সে অনেক অনেক কাল আগের কথা। যখন রেডিও টেলিভিশন আবিষ্কার হয়েছিল তখনকার কথা। এক দেশে এক পিচ্চি থাকতো নাম বল্টু। গোলগাল চেহারার বল্টুর বাবা ছিলেন কৃষক। ওর আর কেও ছিল না। চিকনে বল্টুর গায়ের রং শ্যামলা  আর মাথায় কাকের বাসার মতো চুল ছিল। বল্টু ক্লাস ফাইভে পড়তো। যে গ্রামে ও থাকতো সেখানে বড়রা কাজ করতো আর ছোটরা পড়ালেখা করতো। বাসা থেকে পাক্কা দুই কিলোমিটার হেটে তাকে স্কুলে যেতে হয়। স্কুলে যাবার পথের কিছুদূরে একটা অতিকায় তেতুল গাছ পরে। গ্রামের মুরুব্বীরা বলেন ঐ তেতুল গাছে নাকি ভূত আছে। গাছটা দেখতেও ভূতের মতো। গাছটা এতটাই বড় যে দিনের বেলাতেও এর নিচে কেমন জানি একটু  অন্ধকার হয়ে থাকে। রাতের বেলা তো দূরের কথা দিনের বেলাই কেও ওখানে যেতে চায় না। পাড়ার বাকি বাচ্চারা গাছটার দিকে ভয়ে চোখ তুলে তাকায় না তবে বল্টু স্কুলে আসা যাওয়ার পথে গাছটাকে দেখতে দেখতে যায়। সেদিক থেকে বল্টু একটু সাহসী বটে। স্কুলে যাবার পরই বল্টুর মন খারাপ হয়ে যায়। স্কুলের সবকিছু বল্টুর কাছে ভালো লাগলেও অংক টিচারটাকে তার ভালো লাগে না। সে শুধু শুধুই বল্টুর উপরে ক্ষ্যাপা থাকে। শুধুমাত্র যে বল্টুর ওপরে তাই না। ক্লাসের বাকি বাচ্চাদের ওপরও উনি ক্ষ্যাপা। অংক পারলেও মারে না পারলেও শাস্তি দেয়। সে একটা না একটা দোষ বের করে মারবেই। সবাই রীতিমতো বিরক্ত। তাছাড়া তিনি দেখতেও ভয়ংকর। মাথায় বিশাল বড় একটা টাক। বল্টুরা একদিন মজা করে বলেছিল “টাক্কু মাথা চাইর আনা, চাবি দিলে ঘুরে না।” স্যারের কানে কথাটা যেতে বেশিক্ষণ লাগেনি। পরে বল্টুদের মাথাই চাইর আনা হবার উপক্রম!! তিনি মোটা একটা চশমা পড়ে থাকে, চোখের ভ্রু সবসময়ই কুচকানো থাকে। কবে যে তিনি শেষবারের মত হেসেছিলেন তার হিসেব পাওয়া যায় না। তাছাড়া উনার হলুদ হলুদ দাঁত কেই বা দেখতে চায়। আর সারাক্ষণ একটা বেত হাতে নিয়ে ঘুরে।  আজকে বিশাল বড় একটা হোমওয়ার্ক দিয়েছে। বল্টু সারারাত জেগে করেছে বটে কিন্তু সে জানে তাকে শাস্তির হাত থেকে কেও বাচাঁতে পারবে না। তাইতো আজ বল্টুর মন খারাপ।

যথারীতি অংক ক্লাস শুরু হল।
: বল্টু??? হোমওয়ার্ক করেছিস?
: জ্বি স্যার।
: তাহলে বসে বসে কি কলা দেখছিস? খাতা নিয়ে আয় হতচ্ছাড়া কোথাকার।
: এই নিন স্যার।
স্যার ভালো করে খাতা দেখতে লাগলো। একদম খুটিয়ে খুটিয়ে। আর ওদিকে বল্টুর হার্ট খাঁচা ছেড়ে বের হবার উপক্রম!!!
: কিরে??  এটা কি?
: কি স্যার?   বল্টু ভয়ে ভয়ে খাতায় তাকালো।
: কি মানে? পৃষ্ঠার ভাজ কেন?
: উল্টাতে গিয়ে পরেছে।
: কি? আমার হোমওয়ার্ক একদম পরিষ্কার থাকবে জানিস না? আর এইযে এটা, এটা কি??
: স্যার বানান ভুল হয়েছিল তাই কেটে দিছি।
: বানান ভুল হবে কেন? অংকে কোন কাটাকাটি থাকবে না। আমার হোমওয়ার্কে কোন কাটাকাটি থাকবে না। খাতা একদম পরিষ্কার চাই। এই হোমওয়ার্ক আমি নিব না। দেখি, হাত দাও!
বল্টু তো ওখানেই শেষ হয়ে যায় অবস্থা। কি করার, স্যারের কথার একটু এদিক সেদিক হলে তো আরও খবর আছে। বল্টু কাঁপতে থাকা বাম হাতটা বাড়িয়ে দেয়।
: এইতো ভালো ছেলে। বাম হাতে পাঁচ।
তারপর স্কেল কতৃক হাতের সংঘর্ষে পাঁচবার বিকট আওয়াজ হল। সারা ক্লাস শুধু নিরব দর্শক হয়েই রইলো। শুধুমাত্র যে বল্টুই মার খেয়েছে তা না। ক্লাসের বাকিরাও কমবেশী শাস্তি পেয়েছে।

শাস্তি পেয়ে বল্টুর মন খারাপ। তার উপর পরেরদিন দ্বিগুণ হোমওয়ার্ক দিয়ে দিয়েছে। সেটা না করলে পরেরদিন তিনগুন হবে। কিভাবে যে কি করবে বল্টু ভেবে পায় না। বিকেলে বাসায় গিয়ে গোসল করে খেয়েই পড়তে বসলো। বিকেলে খেলতেও গেল না বল্টু। হোমওয়ার্ক করতে করতে রাত অনেক হল। আর কিছুতেই বল্টুর ভালো লাগছিল না। অতঃপর বল্টু সিদ্ধান্ত নেয় যে সে কাল স্কুলেই যাবে না। যা হবার হবে। বল্টু কি রোবট নাকি যে তাকে যা দিবে তাই সে পুরোদমে করবে? এই সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত করে বল্টু ঘুমাতে গেল।

সকাল হবার সাথে সাথেই আরেক চিন্তা মাথায় ভর করলো। স্কুলে না গিয়ে সারাদিন বাসায় বসে থাকলে বাবার কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে। এটা এড়ানোর জন্য বল্টু স্কুলের নাম দিয়ে বেড়িয়ে পরলো। সারাদিন এদিক ওদিক করে বিকেলবেলা বাসায় আসলো। তারপর নিয়ম মেনেই মাঠে গেল খেলতে। সময় তো ভালোই কাটছিল কিন্তু মাঠের পাশের রাস্তাতেই অংক স্যার হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন –
: ওই বল্টু, আজকে স্কুলে যাস নাই কেন? এদিকে আয়।
কথা বলতে না বলতেই স্যার বল্টুর দিকে আসতে লাগলো। বল্টু অবস্থা বেগতিক ভেবে চোখ কান বন্ধ করে উল্টা দিকে দৌঁড় লাগালো। কোন দিক বিবেচনা করলো না। শুধু দৌঁড়ে পালালো। অনেকক্ষণ পরে ক্লান্ত হয়ে বল্টু একটা গাছের নিচে বসলো। জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিতে নিতে আসেপাশে ভালো করে দেখে নিল। নাহ, কেও নেই। একটু নিশ্চিন্ত হয়ে উপরে তাকাতেই বল্টু আবিষ্কার করলো সে ঐ ভয়ংকর তেতুল গাছের তলে। বল্টুর গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো। ভয়ে ভয়ে এক পা দো পা করে পেছাতে লাগলো, তখনই নাকি কন্ঠে কেও বলে উঠলো,
– কিঁরেঁ যাঁচ্ছিঁসঁ কোঁতাঁয়?
উপর থেকে কে যেন বলে উঠলো। বল্টু তাকাতে চায় না, কিন্তু তারপরও উপরে তাকায়। দেখে ডালে দুটো পা ঝুলছে। ভয়ে বল্টু সাদা হয়ে যাচ্ছিল। দৌঁড়ে পালাবে এমন সময় ডাল থেকে ভূতটা লাফ দিয়ে বল্টুর সামনে পড়লো। চিকন বেগুনি রঙ্গের একটা শরীর, মাথাটা বড়, চোখগুলোও বেশ বড় বড়। আর মাথায় ললিপপের মতো দুটো শিং!! কিছুক্ষণ পর পর সেগুলো স্প্রিং এর মতো তিরিং বিরিং করে নড়ছে।
– এঁইঁ মাঁঝঁ বিঁকেঁলেঁ কোঁথাঁয় যাঁচ্ছঁ শুঁনিঁ? আঁজঁ পেঁয়েঁছিঁ তোঁকেঁ।
– ইয়ে না মানে আমি কিছু করিনি।
বল্টু ভয় পেয়েছে দেখে ভুতের বাচ্চাটাও হেসে দিল। ভুতের হাসির সাথে বল্টুও হেসে দিল। কারণ ভূতের বাচ্চার সামনের দাঁত কয়েকটা নেই। তা দেখে ভূতের বাচ্চা গাল ফুলিয়ে বললো,
– সেঁ কিঁ !! তুঁমিঁও আঁমাঁকেঁ দেঁখেঁ হাঁসঁছঁ? সঁবাঁই আঁমাঁকেঁ দেঁখেঁ হাঁসেঁ! আঁমাঁকেঁ কেঁওঁ পঁছঁন্দঁ কঁরেঁ নাঁ। এঁই দেঁখো নাঁ সঁবাঁই ভঁরদুঁপুঁরে বিঁলে গেঁছে মৃঁগেঁল মাঁছের কাঁটা চাঁবাঁতে আঁমাঁকে কেঁউ নেঁয় নিঁ, আঁমিঁ নাঁকি ভূঁত হঁবাঁরঁ মঁতোঁইঁ নাঁ।
ভূতের বাচ্চার মন খারাপ দেখে বল্টু র মন খারাপ হয়ে গেল। বেচারা খেতে না পেয়ে কতই না কষ্টে আছে। বল্টু সাহস নিয়ে বললো,
– আরে মন খারাপ করছ কেন? আমার নাম বল্টু। ক্লাস ফাইভে পড়ি।
– আঁমিঁ পঁনিঁ। আঁমিঁ কোঁথাঁওঁ পঁড়িঁ নাঁ। তঁবেঁ আঁমিঁ অঁনেঁকঁ কিঁছুঁ জাঁনিঁ। ভূঁতঁদেঁরঁ অঁনেঁকঁ কিঁছুঁ জাঁনঁতেঁ হঁয়ঁ।
-তাই নাকি? কি কি জানো তুমি?
– এঁই যেঁমন ধঁরো উঁড়তে জাঁনি, ইঁচ্ছে কঁরলে অঁদৃশ্য হঁয়ে যেঁতে পাঁরি, পাঁনির নিঁচে যঁতক্ষঁন খুঁশি থাঁকতে পাঁরি।
– ও আচ্ছা।
– কিঁন্তু তুঁমি এঁই ভঁরদুঁপুরে এঁখাঁনে কিঁ কঁরছিঁলে?
– আমি আসলে এখানে একটু লুকিয়ে থাকতে চেয়েছিলাম। সরি তোমাকে বিরক্ত করার জন্য।
– আঁরেঁ ওঁসঁবঁ কিঁছুঁ নাঁ। লুঁকাঁতেঁ চাঁওঁ কেঁনঁ?
বল্টু পনিকে সবকিছু খুলে বললো।
– হিঁ হিঁ হিঁ! বেঁশ মঁজাঁর তোঁ। তুঁমিঁ চাঁইঁলেঁ আঁমিঁ তোঁমাঁকে সাঁহাঁয্য কঁরতেঁ পাঁরি। আঁমিঁ ওঁকে ভঁয় দেঁখাঁতে পাঁরব।  কিঁন্ত তাঁর আঁগে তোঁমাঁকে আঁমার দোঁস্ত হঁতেঁ হঁবে। আঁমাঁর তোঁ কোঁন দোঁস্তো নেঁই তাঁই সঁব সঁমঁয় আঁমাঁর মঁন খাঁরাঁপ থাঁকে।
– ঠিক আছে। আজ থেকে আমরা দোস্তো।

এরপর বল্টু আর পনি ফিসফিস করে বুদ্ধি বের করলো, কিভাবে নিস্তার পাওয়া যায়। সবকিছু শেষে বল্টু গাছ তলা থেকে ভালো ছেলের মতো সোজা বাসায় ফিরলো।

পরদিন বল্টু স্কুলে গেল। নিজ জায়গায় বসে সে মুচকি হাসতে লাগলো। বল্টুর সাথে যে পনি অদৃশ্য হয়ে আছে তা কেও টেরই পাচ্ছে না। যথারীতি স্যার আসলো।
– কিরে বল্টু। এদিকে আয়,  কাল স্কুলে আসিস নাই কেন?
বল্টু স্যারের সামনে চুপ করে দাড়িঁয়ে থাকলো।
– দাঁড়া,  তোর নামটা এখনই খাতা থেকে কেটে দিচ্ছি। লাল কলমটা কইরে?
টেবিলের ওপরে রাখা কলমটাকে ধরতে যাবে আর তখনই কলমটা দূরে সরে গেল। স্যার অবাক হয়ে গেলেন। হাতটা আরেকটু বাড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কলমটা আরও দূরে সরে গেল। স্যার তো রেগে গেলেন।
– এসব হচ্ছে কি?? তুই করছিস এসব তাইনা?
বল্টু উদাস ভঙ্গিতে বলল,
– কই স্যার? আমি তো কিছুই দেখছি না।
– ওরে হতচ্ছাড়া, মিথ্যে বলছিস?  তোর একদিন কি আমার একদিন।
স্যার দাড়িঁয়ে গেলেন। কি আশ্চর্য, টেবিলের ওপরে বেত রাখা ছিল সেটা হঠাৎ গায়েব হয়ে গেল কই। ওপরে তাকিয়ে দেখলেন বেতটা ভাসছে।
– হিঁ হিঁ হিঁ, এঁটা কিঁ আঁর ওঁ কঁরঁতেঁ পাঁরঁবে? এঁটা তোঁ আঁমি কঁরঁছি! আঁসো, আঁমাঁকে মাঁরঁতে আঁসো।
স্যার তো অনেক ভয় পেয়ে গেলেন। তোতলাতে তোতলাতে বললেন,
– ক্ক ক.. কে কে তুমি? কি চাও?
– আঁমি ভূঁত। দেঁখ তোঁ তোঁমাঁর পেঁছনেঁর চেঁয়াঁরটা ভাঁসছেঁ কিঁনা?
স্যার ভয়ে ভয়ে পিছনে তাকালেন। দেখলেন চেয়ারটা মেঝে থেকে কয়েক ফুট উপরে ভাসছে। স্যারের ভয়ার্ত চেহারা দেখে সারা ক্লাসে হাসির রোল পরে গেল।
– ক.. ক. কি চাই? কি চাই তোমার?
– শুঁনেঁছি তুঁমি নাঁকি শুঁধুঁ শুঁধুঁই বাচ্চাঁদের শাঁস্তি দাঁও? এটাঁ কিঁ ঠিঁক হচ্ছেঁ? আঁর দিঁবে নাঁ কিন্তুঁ। নঁইঁলে প্রঁতিঁ রাঁতে তোঁমাঁর বাঁসাঁয় হাঁনাঁ দিঁব।
– ঠিক আছে ঠিক আছে, আমি ওদেরকে শুধু শুধু শাস্তি দিব না।

তারপর থেকে সবকিছুই ঠিক হয়ে গেল। স্যারের ক্লাস করতে কারও কোন অসুবিধা হতো না। তবে বল্টুর যে নতুন একটা বন্ধু হয়েছে সেটা কেও জানলো না, যার সাথে বল্টু রোজ বিকেলে হাডুডু খেলতো।

বি দ্রঃ আমি আগে কখনো বাচ্চাকাচ্চাদের জন্য কিছু লিখি নাই। এটাই আমার প্রথম চেষ্টা। সোনেলাতে আগে কেও শিশুদের জন্য লিখেছেন কিনা জানি না। ভুল হলে বলবেন। উৎসর্গ করলাম আমার ভাগ্নে ভাগ্নিদের। 🙂

একটা বিষয় খেয়াল করলাম, সোনেলায় শিশুসাহিত্য নামক কোন ক্যাটাগরি নাই। মডুদের কাছে এই ক্যাটাগরির দাবী জানাই নইলে কিন্তু ভূত পনি কে ডাক দিব

৫৭৯জন ৫৭৯জন
0 Shares

১১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ