সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

শিরোনামহীন

আরজু মুক্তা ৯ মে ২০২১, রবিবার, ০৩:১৭:৩৮অপরাহ্ন গল্প ২৮ মন্তব্য

চাকরীটা ছাড়ার কথা ছিলো না। ব্যাট বল একসাথে কাজ করলো না। আমার হাজব্যান্ডের বদলি, যেতে হবে। অথচ আমাকে বদলি দিলো না। বিদায় নেয়ার সময় আমার এক কলিগ বললো, ” আপা, কতোদিন বিশ্রাম নেন না। এবার নতুন জায়গায় গিয়ে ছ মাস বিশ্রাম নিয়ে নবউদ্যমে কাজ শুরু করিয়েন। ”

সেট হতে না হতে শুরু হলো করোনা। আমাদের মধ্যবিত্তের টানাপোড়ন। বিধাতার দেয়া বিশ্রাম শেষ হয় না। স্বপ্নে দেখি,  ” একটা লাল টকটকে সূর্য। নদীতে ভেড়ানো নৌকা, সলাজ বৌ এর উঁকি ঝুঁকি। ”

টিং টং!  টিং টং!  কলিং বেল বেজে ওঠে। পড়িমরি করে ছুটে গিয়ে দরজা খুলি। সারি সারি লাশ।

প্রথমজনের কাফনের কাপড় তুলে দেখি, আমার প্রেমিক। মনে হলো, এইতো সেদিন টুংটাং এসএমসএস। ” লাবণ্য আমি চলো যাচ্ছি। দিগন্ত থেকে আর এক দিগন্তে। আর হয়তো কখনো দেখা হবে না। নিষ্প্রাণ শহরের, তীব্র নিরবতায়।” বার্তাটা পড়ে টুপটাপ চোখের  থেকে কী পড়েছিলো জানিনা। তবে বাষ্পীভুত হতে সময় নেয়নি। আনমনে ঢিপঢিপ হৃদযন্ত্রটা বলেছিলো, ” ভালো থেকো !” আজ আঁকড়ে ধরেও লাভ নেই।

২য় লাশটি দেখে আঁতকে উঠি। আমার স্কুল জীবনের বন্ধু। কিছুদিন আগের কথা, ফোন পেয়ে নদীর ঘাটে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ওর কী এক শখ ভাসলো!  সাঁতরে নাকি নদীর এই তীর থেকে ঐ তীরে যাবে। বলে,” এখন তো নদী শুকায় গেছে। ১০০ গণতে গণতে ফিরে আসবো। ” আর এখন সেই নদীকে আমি খুঁজি।

৩য় জন আমাদের দুধ ওয়ালা। বাকুয়া ঘাড়ে করে দুধ নিয়ে আসে যাত্রাপুর থেকে। আমরা যখন ছোট ছোট তখন থেকেই দেখি তার একই চেহারা। এতো পরিশ্রমে তার চেহারা নষ্ট হয়নি। বিস্মিত !  অবাক রোগের কাছে আত্মসমর্পণ।

সিনেমার দৃশ্যপটের মতো মাথাটাও ঘুরে যায়। রাস্তা থেকে শহর — শহর থেকে নগরে চোখ চলে যায় অনেক দূরে। সিঁড়ি বেয়ে শুধু নামি আর নামি। মায়াবী চোখের মেয়েটি মায়ের সাথে আসতো কাছ করতে। আজ তাড়া নেই। মাকে বলবে না। ” ও মা, চলতো, বড় দেরি হয়ে গেছে। ”

এবার আমি উপরে উঠে আসি। ক্লান্তিহীন পথ আর ভালো লাগে না। মোবাইলটা হাতে নিয়ে শায়রা বানু কে ফোন দেই। ” দুঃখিত কাঙ্খিত নাম্বারটিতে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।” বুকটা ধরাস ধরাস করে। আবার দেই —–! সেই একই কণ্ঠস্বর !  ” দুঃখিত…………  হচ্ছে না !” বুঝলাম ও আর এই পৃথিবীতে কোনদিনও রিসিভার তুলবে না।

টিভির সামনে গিয়ে বসি। মৃত্যু কি সহজলভ্য? মনে হয় ; একেক জনের মৃত্যু একেকটা অধ্যায়। আমরা যখন চলি ফিরি। তখন ভাবি চিরকাল বাঁচবো। কিন্তু মৃত্যু আসে নিঃশব্দে, কোন প্রস্তুতি না নিয়ে।

টিভি দেখা বাদ দিয়ে। কলম নিয়ে বসি। এই খানেও মৃত্যু ছাড়া কিছু আসে না। মৃত্যুকে আর উদযাপন করবো না। মৃত্যু আসবে বলেই জীবন জীবিত থাকে। ” Death shall be died ! ” কিন্তু এ কোন কারবালা ?  কার মহিমা ?

যুবকরা ” Hundred days in solitude ” পড়ে এখন ঘরে বসে কী বোর্ড চাপে। স্ক্রিনে স্ক্রিনে খবর, কাভার ফটো। ” অক্সিজেন দরকার। আইসিইউ খালি নাই। শামীম তার মাকে নিয়ে ৩০০ মাইল পড়ি দিয়ে পৌঁছালো হাসপাতালে। ছেলেকে নিয়ে মায়ের আহাজারি।  বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গুলি। গরীবের পেটে লাথি। রিকশা উল্টে রেখেছে পুলিশ। আমরা খামু কী?  আমাদের তো সঞ্চয় নেই। রংপুরে কিছু ছাত্রছাত্রীর উদ্যোগে ১০০ জনের ইফতার। এক টাকায় প্রতিদিন আহার করাচ্ছে বিদ্যানন্দ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া টু হাট হাজারী। মোদি আসলো বলেই করোনা বাড়লো ————— স্ক্রল করতে করতে ইউটিউবে চলে আসি। সেজেগুজে দুই নারী রান্না শেখাচ্ছে। আবার রাস্তায় নামি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ফুটেছে বরুণ ফুল। আর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নীল মনি কান্ত ফুল। এসব দেখে আবারও গুগলে গিয়ে খবর পড়ি।

মানবজাতি কি ধ্বংস হবে?  না এইখানে দাঁড়িয়ে নতুন করে গল্প শুরু হবে। একটা নতুন জীবনের জয়গান।  যেখানে ভালোবাসা সত্যিকারের ভালোবাসা হবে।

 

উৎসর্গ : ব্লগার খাদিজাতুল কুবরাকে। আল্লাহ তাঁকে শক্তি দান করুন।

৪৪৫জন ৯৪জন
40 Shares

২৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য