হঠাৎ করেই একদল তরুন জড়ো হল শাহবাগে, হাতে প্ল্যাকার্ড, নির্ঘুম রাত, এবং ধীরে ধীরে আরো অনেক মানুষের যোগ দেয়া, মিডিয়া কাভারেজ, স্লোগান ইত্যাদি।

শাহবাগ নিয়ে দুই-একটা আবেগী পোস্ট চোখে পরেছে।  নিঃসন্দেহেই এটা আবেগের ব্যাপার, এত বড় আন্দোলন ইতিপূর্বে এ প্রজন্ম আর মনে হয় দেখেনি, আজীবন তারা মনে রাখবে। পাশাপাশি কিছু প্রোপাগান্ডাও চলে আসলো – গাজা, বিরিয়ানি, অশ্লীলতা, নাস্তিকতা, এমন হাজারো কথাই শুনলাম। তবু শাহবাগ তো মন থেকে আস্বীকার করে ঝেড়ে ফেলা না। এক বড় ভাইয়ের কাছে ছাত্রলীগের ইনভোল্‌ভ্‌মেন্টের আভাসও পেলাম। তবু বিশ্বাস হারাতে মন চায়নি। যাইহোক, আজ এই সময়ে এসে মনে হয় এখনো কিছু হিসাব মেলানোর বাকি আছে, বোঝার আছে, তারই চেষ্টা করছি।

প্রথমতঃ “যুদ্ধাপরাধ” শব্দটা কিভাবে জনপ্রিয় হল এবং “রাজাকারে”র প্রতিস্থাপন হিসেবে দেখা দিল, সেটা এখন গবেষণার বিষয় হতে পারে। তবে সময়টা মনে হয় সাবেক ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের আমলের। লীগ সরকার আসার পর অনেকেই আশা করছিল এবার বিচার হবেই। কিন্তু প্রতিনিয়ত মনে হত সরকার এটা নিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা করছে। ভার্সিটিতে প্রায়ই দেখতাম ছাত্রলীগের ব্যানারে যুদ্ধাপরাধীর বিচার চেয়ে প্রোগ্রাম। ভাবতাম, ছাত্রলীগ তো সরকারেরই বি-টিম, এখনকার ছাত্র রাজনীতি যেমন আর কি, ওরা কেন দাবী জানাবে? তারচেয়ে সাধারণ মানুষ কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে এরকম দাবী ঠিক মানাতো।

যাইহোক, বাচ্চু রাজাকার পলাতক হিসেবে ফাসীর রায় পেল, এমনটাই অনেকের ধারণা। বাচ্চু রাজাকার এখন দৃশ্যপটের বাইরে। কিন্তু খুনী কশাই কাদের মোল্লার মৃত্যুদন্ড দেয়া হল না। কেন হল না, সেই হতাশা থেকেই শাহবাগের জন্ম, সেই ফাসীর দাবী! স্পষ্ট দাবী এটা, কোন ভেজাল নেই।

কিন্তু শুরু থেকেই একটা বিষয় প্রায় সবাই এড়িয়ে গেছে অথবা এখনো যায় – এই যে ফাসীর দাবীটা, এটা কার কাছে? সরকারের কাছে, নাকি বিচারকের কাছে? বিচার বিভাগ তো এখনো শাসনতন্ত্র থেকে আলাদা হয়নি, তাই দায়টা সরকারের উপর কিছুটা হলেও বর্তায়। কেন সরকারের কাছে দাবী চাওয়া হল না? কারণ বিশিষ্ট ব্লগার যারা আন্দোলনের প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে, তারা আদপে আওয়ামী পন্থী ছিল বলে? সরাসরি সরকারের কাছে দাবী করলে একটা সরকার-বিরোধী গন্ধ এসে যায়? নাকি এ ব্যাপারটা তাদের নজর এড়িয়ে গেছে?

শাহবাগের হঠাৎ জাগরণ দেখে অনেকে নতুন কিছু আশা করেছিল। ভেবেছিল এ থেকে হয়তো একটা পরিবর্তন আসতে পারে। বলা হয়েছিল শুধু ফাসীর দাবীর পাশাপাশি অন্য অনেক বিষয়েও দাবী তোলার কথা, যেহেতু যুব-সমাজ দেশ নিয়ে তাদের সচেতনতার প্রিচয় দিতে পেরেছে। কিন্তু যে কারণেই হোক, এই প্রস্তাবকে স্বাগতম জানানো হল না। বরং “বিচার চাই, তবে…” এরকম কথা চালু করে হাস্যরস চলল, যাকে তাকে ট্যাগ দেয়া হল ইচ্ছামত। এমনকি সরকারের ভিতরকার রাজাকারদেরও বিচার দাবী করা গেল না।

অর্থাৎ, তাদের দাবী একটাই – ফাসী। এর বাইরে কিছু বলা যাবে না। ঠিক আছে মানা গেল, কিন্তু সেই এক দাবীর মধ্যে কি তারা আদপে সীমাবদ্ধ থাকতে পেরেছে? ধীরে ধীরে দফার লিস্ট কি বড় হয়নি? কাদের মোল্লার ফাসী থেকে যুদ্ধাপরাধীদের ফাসী, সেখান থেকে জামাত নিষিদ্ধ করা, সেখান থেকে ধর্মীয় রাজনীতি বন্ধ করা, তারপর পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা, পণ্য বর্জন করা ইত্যাদি ইত্যাদি। এর ভিতরে সীমান্তে মানুষ হত্যার দায়ে ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা বা অন্তত একটা স্লোগান দিলে কি এমন অশুদ্ধ হয়ে যেত? দিন শেষে আমাদের স্বাধীনতা বিপন্ন হওয়ার প্রশ্নটাই তো মূল, নয় কি?

আরেকটা ব্যাপার ছিল ব্লগার থাবা বাবা’কে শাহবাগ এবং মিডিয়ায় জোর করে আস্তিক বানানোর চেষ্টা এবং ঘটা করে তার জানাজা পড়ানো। কি দরকার ছিল? বরং এটা আরো অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একজন আন্দোলনকারীর খুন হওয়াটা যেই প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারত, সেটা আস্তিক-নাস্তিক বিতর্কের মধ্যে হারিয়ে গেল, কি অদ্ভূত!

শুরুর দিকে শাহবাগের নিরপেক্ষতা আমরা দেখেছি। লীগের বড় বড় নেতারা সেখানে দাড়ানোর সাহস পায়নি, তাদের নামিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যে কি হল? আবুল মাল মুহিতের মত মন্ত্রীও সেখানে আপ্যায়িত হয়ে এল। কিভাবে? শুরুতে তাহলে কি এসব অভিনয় ছিল? নাকি শাহবাগ শেষ পর্যন্ত সত্যি সত্যি সরকারের পান্ডাদের দখলে চলে গিয়েছিল? রুমি স্কোয়াড কিংবা বাম সংগঠনগুলোর দাবী তো ভিন্ন কিছু ছিল না, তাদের কেন আলাদা রাখা হইল, এমনকি হাতাহাতিও করা হল তাদের সাথে? সব মিলিয়ে মনে হয় তারা মোটেও ঐক্যবদ্ধ ছিল না, অথবা আরো খারাপ যেটা যে কিছু লোক সরকারের কাছে তাদের মাথা বিক্রি করে এসেছে। এদের সরকার যা বলায়, এরা তাই বলে, যা করায়, তাই করে। সরকারের দেয়া পুলিশী নিরাপত্তা, খাবার পানি এবং টয়লেট, ইত্যাদির কাছে তারা ঋণী হয়ে পরে।

আর এসবের মাঝে হঠাৎ দেখলাম কোটা-বিরোধী আন্দোলন নিয়ে রেশারেশি, পুলিশী একশন, এবং শেষ পর্যন্ত আন্দোলনরত ছাত্রদের গণহারে “ফকিন্নি পুত” বলে ট্যাগ দেয়া! সব দেখে তখন মনে হয়েছিল– “শাহবাগ, তুমি কার?”

 

সব মিলিয়ে শাহবাগকে এখন মনে স্থান দেয়াটা বড় কষ্টকর হয়ে দাড়িয়েছে। জানি না, সেই পাঁচ ফেব্রুয়ারির মত আবার একটা কিছু ঘটে যাওয়া সম্ভব কিনা। যেটা আরো বস্তুনিষ্ঠ হবে, যেখানে কোন সন্দেহ, রেশারেশি থাকবে না, যা স্বপ্ন দেখাবে এক নতুন বাংলাদেশের। আজ এ পর্যন্তই।

৬৬২জন ৬৬২জন
0 Shares

২৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ