শব্দগত

রিতু জাহান ২১ জুন ২০২২, মঙ্গলবার, ১০:৫৮:৫৯পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ১২ মন্তব্য

 

ইটের পর ইট গেঁথে মাঠের এ ধানি জমিতে কঙ্ক্রীট-মিক্সারের এক আবাসস্থল গড়ে উঠছে। এইতো বছর দুয়েক আগেও আমি যখন এদিকে চোখের ট্রিটমেন্টএ আসতাম তখন যতোদূর দৃষ্টি যেতো শুধু ফসলি জমিই চোখে পড়তো। খুব করে চেয়েছিলাম মানে নিজের সাথে নিজের এক পণ ছিলো আমি কখনো ফসলি জমি নষ্ট করব না। তার বুকে গড়ে উঠবে না অন্তত আমার আবাসস্থল। জীবন চিন্তা ভাবনা সব মেলেই বা কোথায়! আজকাল আমার অনেক হিসেবই বড় গোলমেলে।

“সম্পদও সম্পত্তির” এই শব্দগত ও এর অর্থগত পার্থক্যে আমি সম্পদেই মনোযোগ দিয়েছি বরাবর। আদতে কতোটুকু পার্থক্য!
যেমন উদাহরন দিয়ে যদি বলি, বস্তুগত কাঠামোয় অর্থকড়িকে সম্পত্তির আওতায় ফেলি আর নিজের মনুষ্যগুনাবলী যা অন্যের জন্য হিতকর এবং সন্তানদেরও সেরকম ভাবে মানুষ করে তুলে তাদের সমাজের সম্পদ হিসেবে গড়ে দিয়ে যেতে পারি এটাই পার্থক্য কি না আমার জানা নেই। পার্থক্য যা-ই হোক অর্থবহ হোক।

যেটা বলছিলাম যে, এ বয়সে এসে অঙ্ক কষে দেখলাম আদতে জীবন আদর্শিক কিছু হিসেব একেবারে মিলছে না।
“বিসর্জিত স্বপ্ন অর্থহীন” সেদিন আমার ছেলে আমাকে এ শব্দটা বললে আমি চুপ করে কিছু সময় বসে ছিলাম। এ শব্দটা বলে সে নিজেকে বুঝিয়েছে, জীবনে একটাই স্বপ্ন একটাই চয়েজ রাখতে নেই, থাকা উচিৎ থার্ড চয়েজ পর্যন্ত। আমার সন্তানের ভিতর আমি ঢুকিয়েছিলাম মাথার উপর ঐ যে বিস্তৃত মহাকাশ তা জানার আগ্রহ। বয়স অনুপাতে সে বিষয়ের উপর বেশ বই তার পড়া। তার সংগ্রহশালাও অনেক।

আমি স্বপ্ন দেখতাম আমার সন্তান বিরাট বড় বিজ্ঞানী হবে, মহাকাশ বিজ্ঞানী হবে। আবিষ্কারক হবে। সেরকম মেধা, চিন্তা, ইচ্ছা ও স্বপ্ন সবই আমার ছেলের ছিলো।

আসলে নিন্ম মধ্যবিত্ত বঙ্গীয় সমাজে এমন সব স্বপ্ন বিলাসিতাই। জীবন জীবিকার তাগিদে আমরা বাচ্চার সে স্বপ্ন ডাইভার্ট করে দেই টেকনিক্যালি। বাচ্চাকে আমি আমরা বুঝিয়ে দেই, আদতে জীবন জীবিকা ও ক্যারিয়ার গঠনে দীর্ঘমেয়াদি এমন পড়াশোনার কোনো মানে হয় না। সামর্থ্য ও সুযোগ এখানে বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

আমরা বাচ্চার মাথায় ঢুকিয়ে দেই এমন দিকে ফোকাস করতে যে অল্প বয়স ও অল্প সময়েই তুমি একটা ভালো ক্যারিয়ার গড়ে ফেলতে পারো। তাতে অবশ্যই পাওয়ার ও অর্থ থাকা আবশ্যিক।

হ্যাঁ, আমি ঠিক এই কাজটিই করেছি। আমার বাচ্চাকে তার স্বপ্ন থেকে জোর করে তুলে এনে জীবিকার তাগিদে বাঁচতে শিখাচ্ছি। সন্তানের সামনে কতো বড় মিথ্যে স্বপ্ন প্রবর্তক আমি তা আমার সন্তানের হতবিহ্বল দৃষ্টি দেখলেই বুঝতে পারি।
আমি আমার সন্তানের স্বপ্নের খুনি বলতেই পারি। একমাত্র এই খুনটা করার অপরাধে কোনো বাবা মায়ের সাজা হয় না।

আজকাল নিজেকে নিয়ে ভাবি আর খুব করে খুঁজি নিজেকে।
আমি আসলেই নিজেকে খুব করে খুঁজছি। আমার এমন কিছু আচরন বা জীবনের বোধ থেকে চিন্তা করে আমি দেখলাম আমি আসলে আমার উল্টোদিকে হাঁটছি? জনস্রোতে আমি মিশে যাচ্ছি।

আজ হুট করে মনে হলো জীবনে যে সব সুযোগ খুব সহজে স্মুথলি ধরা দিয়েছিলো তা যদি আমি সাদরে গ্রহন করতাম তবে জীবন চলাটা সহজ হতে সহজতর হতো। তাতে আমার আত্মা মরে যেতো এটাও ঠিক।

আমার জীবনবোধ নিয়ে আমি এখন প্রতি পদে পদে বিব্রত হই, হচ্ছি। পদমর্যাদা,  সার্টিফিকেট সব মিলিয়ে আমি আসলে বিব্রত!
মানুষের প্রশ্নের বাণ, তোষামোদি চিন্তা ভাবনায় আমি আজকাল মুষড়ে যাই।
আমার জ্ঞানের পিপাসা ও তার আহরণ সেখানে নগন্য হয়ে যায়।

“তৃপ্তিতেই প্রাপ্তি” আমি সব সময় বিশ্বাস করেছি এ শব্দটাতে। হ্যাঁ, আমার তৃপ্তির সংখ্যা কম না।
যদিও প্রতি মানুষভেদে তৃপ্তি শব্দের ব্যাখ্যাটাও আলাদা। কেউ কারো ক্ষতি করে অর্থ জোগাড়কেও তৃপ্তি মনে করে।
হাজার কোটি টাকার ঘুষ খেয়ে বছরে দুইজন মানুষকে হজ্জ্বে পাঠিয়ে কিছুটা পাপ মোচন করাকেও তৃপ্তি মনে করে।
কোটি টাকার দূর্নীতি করে দুই চার পয়সা প্রকাশ্যে দান করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। আর কিছু মানুষ কোটি টাকার হাতছানি থেকে মুখ ফিরিয়ে  কারো উপকার করে মাথায় আশীর্বাদের হাত বুলানোর যে শান্তির পরশ তা পেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর তৃপ্তিময় জীবন চাইতে পারে। তাতে যতোই দুঃখ কষ্ট বিষাদচূড়ায় মেঘের ভেলা ভাসাক না কেনো তা সহ্য করারও এক আশ্চার্য ক্ষমতা আছে এসব মানুষদের। নিজের চোখে না দেখলে আমি তা উপলব্ধি করতে পারতাম না।

তাই জীবন নিয়ে আমার সামান্য আফসোস থাকলেও আমি মোটেও দুঃখ বিলাসী নই,, দুঃখ বিলাসী মানুষদেরও আমার অপছন্দ।

‘এটা একান্তই আমার’ এই ভাবনায় পড়ে আমি জীবনের সূক্ষ্মতম আনন্দটুকু নষ্ট করতে চাইনি।  কারণ, আমি যা উপভোগ করে বাঁচতে শিখেছি তা হলো জীবনের কুমারী মুহূর্ত সময়টুকু।
তাই “ভগ্নাংশ হৃদয়” “ভগ্নাংশ” শব্দটাকে নিয়ে আমি ভেবেছি ভেঙেছি। একে নেড়েচেড়ে দেখলাম আমার ভাগে পড়া ভগ্নাংশ মুহূর্ত কালই মধুর। এ আমার দারুন কুমারি মুহূর্ত।

এর বাইরে বাকি বর্ধিত অংশটুকু যা আমার কাছ থেকে জোর করে বা ছলচাতুরী করে যারা কেড়ে নিয়েছে আমি তাতে মনে মনে হেসেছি। কোনো ধরনের উচ্চবাচ্চ্য করিনি। এসব নিয়ে শব্দ দূষণ করিনি। কারণ, আমি তো ধরেই নিয়েছি ওটা আমার নয়, আর তাই আমি তা রাখতে পারি না।আমি এর কোনোকিছুই আগলে রাখার চেষ্টা করিনি কখনো। মুঠো যতো শক্ত করা হয় ততো দ্রুতই তা দুর্বল আর আগলা হয়ে যায়। তাই অতি আদিখ্যেতা আচরণ আমার কারো সাথেই হয়নি। এমনকি তার সাথেও না। তাই স্বামী স্ত্রী সম্পর্কে কৈফিয়ত ও একে অন্যের জীবন নিয়ে দখলদারী নামক বিশ্রি ব্যাপারটা ধোপে টেকেনি। সম্পর্ক ও সম্পদে দখলদারি চলে না অন্তত।

কোনো এক সময় “পরিমিতিবোধ” শব্দটার সাথে পরিচিতি হই। যে কোনো শব্দ ও তার সঠিক প্রয়োগ নিয়ে আমি বেশ ভাবি।
সবক্ষেত্রে আমি নিশ্চিত পরিমিতি মেনে চলেছি। তাই দূরত্ব আমার পছন্দ। এতোদিনে আমাকে যারা চিনেছে ওরা জানে আমি যথাসম্ভব দূরত্ব মেইনটেইন করে চলি। তারমানে এই নয় আমি অসামাজিক।
হা হা, নিজেকে দূরত্বের বিরহ বিলাসী বলাই যায়।

আমি পরিমিতিবোধ শব্দটা শুধুমাত্র যেখানে রাখিনি তা হলো আমার সন্তানদের ব্যাপারে।
সেখানে যে মাতৃত্ববোধ তার পরিমাপ হয় না কোনোকালেই।
এখানেই আমি অঢেল, অশেষ, আমার সম্পূর্ণটা।

‘দিনশেষ আমি একা, কেউ কারো নয়’
ইদানীং এ বাক্যটা নিয়ে আমার আপত্তি আবার আপত্তি নয় এমন।
এই কথাটা যাদের বেলায় খাটে না তা হলো সন্তান। সন্তান সব সময়ই আমার অংশ। হোক সে দূরে বা কাছে।
আসলেই কি আমরা দিনশেষে একা?
কই একা? আমার তো একা মনে হয় না কখনো! আমার একার অবসর মুহূর্তে আমি বই পড়ছি, যা শব্দের কারুকাজ নিয়ে  আমার পাশে বসে কেউ শব্দ নিয়ে খেলছে আর আমি মুগ্ধ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তা উপভোগ করছি।
ক্যাসেট প্লেয়ারে মৃদু সুরের মূর্ছনায় আমি ডুবে থাকছি।
এরা সবাই আমার সঙ্গদানে সদা প্রস্তুত। শুধু সঙ্গী চয়েজ করা আমার দায়িত্ব। আস্ত গোটা একটা মানুষের কি খুব দরকার সঙ্গ পেতে। সত্যিটা হলো মানুষের বুকে যা সয় না তা কাগজের বুকে সয়।
একটা মানুষ আপনাকে আপনার ঐ একার দুর্বল সময়টার উপহাস করবে আপনাকে বিব্রতও করবে কিন্তু কাগজ কখনোই করবে না।

“মাথাগরম” আমাকে সবাই মাথাগরম একজন মানুষ বলে। কিন্তু আমার এই স্বভাব বৈশিষ্টে আজও কারো ক্ষতি হয়নি। আমি প্রতিবাদ করেছি। আমার পিছনে শত্রুর সংখ্যাও তাই কম নয়। কিন্তু আদতে আমি আসলে কতোটুকু মাথা গরম একজন মানুষ!!
কারণ আমি তো জানি আমি নিজেকে যথেষ্ট কন্ট্রোল করতে পারি।

হসপিটাল কোয়ার্টারে যখন থাকতাম তখন সব কাকু আন্টিরা মামনি ছাড়া ডাকতো না।
সেখানেও দুই একটা পরিবার যে ছিলো না হিংসা করে শত্রুতা করার তাও না। করেছে, তাদের মেয়েদের সাথে আমার তুলনা করে বিশ্রিরকম শত্রুতা করেছে।
তাতে আমি সাময়িক কষ্ট পেলেও বা বিব্রত হলেও সে আদরের যায়গাটা আমার কখনো কমেনি।
এখন সে সব পরিবারের মেয়েদের দিকে তাকালে তাদের দুঃখ দুর্দশায় আমার সত্যিই করু্ণা হয়।
জীবন পথের প্রতি বাঁকে বাঁকে হাজার ভালবাসার মাঝে  নিত্য নতুন গুটিকয়েক মানুষের এই হিংসা নামক শত্রুতা আমি আজও টেনে নিয়ে চলছি। হোঁচট খাচ্ছি।

‘না’ বা ‘হ্যাঁ ‘ আমি চট করে এই উত্তরটা দিতে পারি। এতে করে সম্পর্ক নষ্ট হলেও আমি বিচলিত হই না। কারণ, আমার সাথে যার সম্পর্ক তার এই শব্দ দুইটা শোনার মতো সামর্থ্য থাকতে হবে।

আজকাল সবকিছুতেই মানুষের নেগেটিভ একটা ভাবনা বা দোষ খোঁজার চেষ্টা আছেই। আমি হুট করে রেগে গেলেও
যে কোনো বিষয়ের উভয় দিকটা ভাবি।

রাত আটটার পরে দোকান পাট বন্ধে আমি এতোটুকুও বিচলিত নই।
কারণ, সবকিছু একবারে বন্ধ হওয়ার চেয়ে রয়ে সয়ে বুঝে শুনে ব্যবহার করাটা বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। রাতে এতো আলোকসজ্জার কি খুব দরকার আছে?
দিনের শুরুটা আপনি হিসাব করুন সেখান থেকে শুরু করুন।
একজন ক্রেতা তার দরকারি জিনিসপত্র অবশ্যই তার প্রয়োজনমতো সংগ্রহ করবে।
এটাতে এতো বিচলিত হওয়ার আমি কিছু দেখি না। বা অভিযোগ তোলারও কিছু দেখি না।
“অভিযোগ” একটা সম্পর্কে এক পক্ষের  হাজার দোষ থাকা সত্ত্বেও বার বার সে অভিযোগ করলেও সে সম্পর্ক টেকে না ভেঙে যায়। তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সব ব্যাপারে এতো অভিযোগ করলে নিজের সাথে নিজের বাস করাটাই কঠিন হয়ে যাবে।
এইযে এতো এতো নেগেটিভ ভাবনা, বিচলিত মোনোভাবে আপনি আমি রুক্ষ থেকে রুক্ষ হয়ে গেছি।
“কম্প্রোমাইজ” “সহনশীলতা ” শব্দ আছে যার সাথে আমরা আমাদের পরিচিত করাতে পারছি না।
এ ব্যর্থতা আমাদের নিজেদেরই।

বর্তমানে গোটা পৃথিবীই ভালো নেই। একটা বড় মহামারী নিয়ন্ত্রণ হয়েও হচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদি এমন মহামারি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। তারপর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল বাজবে বাজবে ভাব। খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ বড় রাষ্ট্রগুলোতে যুদ্ধ তো চলছেই।
একবার ভাবুন তো দীর্ঘ সময় ধরে আপনার একেবারে মৌলিক চাহিদা পূরণের বিদ্যুৎটুকুও নেই। তখন?
তখন আপনার রাতের মার্কেটের আলোর ঝলকানি অসহ্য লাগবে।
জীবনের সাথে শব্দের মেলবন্ধন খুঁজে তার সাথে পরিচিত হওয়াটা জরুরি।
কারণ জীবনের সাথে জড়িত সবকিছুই অর্থবহ।

#বালিয়াড়ি_ভাবনা

,,,জাহান,,

১২৮জন ১০জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন



লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য




ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ