শঙ্খনীল কারাগার… এই প্রথম।

নৃ মাসুদ রানা ২৯ নভেম্বর ২০১৯, শুক্রবার, ১২:৩৮:০১অপরাহ্ন বুক রিভিউ ১৪ মন্তব্য

‘কারা কানন’ নামের বাড়ী থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। সেই বাড়ীর উনিশ বছর বয়সী মেয়ে যে রোজ সকালে ছাদে উঠে হারমোনিয়ামে গলা সাধতেন। ছাদের চিলেকোঠায় আশ্রিত থাকতেন বি.এ পাস চাকরি প্রার্থী আজহার হোসেন। গোপনে মনে মনে পছন্দ করতেন ছাদে তালিম নেওয়া মেয়েটিকে। হয়তো অনেক ভালোবাসতেন আর নিজের করে চাইতেন বলেই একদিন তিনি পেয়ে যান স্বপ্ন-কন্যা শিরিন সুলতানাকে।
হতদরিদ্র, বেকার আজহার দেড়শো টাকা ভাড়ার এক বাসায় বিবাহিত জীবন শুরু করেন স্ত্রী ও এক কন্যা সন্তানকে নিয়ে। অবশ্য কন্যা সন্তানটি শিরিন সুলতানার আগের সংসারের। তার আগের স্বামীর নাম ছিল আবিদ হোসেন। শিরিন সুলতানার অতীত বলতে কন্যা সন্তানটি (রাবেয়া)।
দিন অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে সংসারে আসে বড় ছেলে খোকা, তারপর রুনু, ঝুনু, মন্টু এবং শেষমেশ নিনু। নিনু জন্ম নেওয়ার সময় ২৩ বছর সংসার জীবনের ইতি টানেন শিরিন সুলতানা। এই ২৩ বছরে তিনি কখনো বাবার বাড়িতে যাননি, গানপাগল মানুষটি ভুলেও গান গায়নি। বিবাহ বিচ্ছেদ আর অপূরনীয় স্বপ্নের জন্যই হয়তো স্বাভাবিক হতে পারেনি।
আজহার হোসেন একঘেয়েমি ধরনের মানুষ। সবসময় হিনমন্যতা এবং চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। স্ত্রী গত হওয়ার পর তিনি হাসি-খুশি জীবনে ফিরে আসে। সম্ভবত তিনি ভাবতেন উচ্চবংশের এম.এ পড়া গানপাগল মেয়ের স্বামী হওয়ার যোগ্য নন। এজন্যই এতোদিন আড়ালে ছিলেন।
বড় ছেলে (খোক) কলেজের প্রফেসর। কিটকি নামের খালাতো বোনকে ভালবাসত, কিন্তু প্রকাশ করতে পারেনি। সে ভেবেছিলো কিটকিও তাকে ভালবাসে। কিন্তু হঠাৎই কিটকির বিয়ে হয়ে যায়। মায়ের ভালবাসা অনুভব করার সুযোগ হয়নি খোকার। এজন্য তার মনে গভীর বেদনা ছিল। কাছের বন্ধু বলতে বড় বোন রাবেয়া।
বিয়ের বয়স পাড় হলেও বিয়ে হয়নি রাবেয়ার। সেকারনেই তার আগে ছোট বোন রুনুর বিয়ের কথা ওঠে। কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির জন্য মনসুরের সাথে বিয়ে হয়না। বিয়েটা হয় ঝুনুর সাথে। সেই কষ্টে ভুগতে থাকে রুনু। বুক ভরা কষ্টে পরপারে চলে যায় রুনু।
কালো চেহারার জন্য ছেলেরা রাবেয়াকে মা কালী বলে ডাকতো। এদুঃখে সে আর কলেজে যায়নি। পড়াশুনা বাদ দিয়েও আবার নতুন করে কলেজে ভর্তি হয়, পড়াশুনা করে চাকরি নেয় স্কুলে। আজহার হোসেন মেয়ের জন্য ফর্সা করার ক্রীম sevenday beauty programme কিনে দেন। যেটা ছিল রাবেয়ার কাছে প্রচন্ড মূল্যবান। ঠিক যেন বিশ টাকার এক কৌটো ভালবাসা। কিন্তু সে জানতো আজহার হোসেন তার জন্মদাতা নয়। এগারো বছর বয়স থেকেই সে এই সত্যটা জানে। বুক অবধি কষ্ট চেপে, বুকের হাড়গুলো কষ্টের চাপায় ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও সে কখনো প্রকাশ করেনি। শুধু কষ্টে পুড়ে পুড়ে দেহের পর্দাগুলো ছাই করে ফেলেছে। তবে এক হৃদয়স্পর্শী চিঠিতে বহুদিনের পুরনো কষ্টের কথা লিখে জানায় তার সবচেয়ে কাছের মানুষ খোকাকে। সে চিঠির প্রতিটি শব্দে থাকে তার নিজের কষ্টের ইতিহাস, অনুতপ্তের ইতিহাস, মায়ের কথা, বাবার কথা, আবিদ হোসেনের কথা, রুনু, ঝুনু, মন্টু, নিনু আর খোকার কথা।
সংসারের মধ্যে মন্টু একেবারেই ভিন্ন। পত্রপত্রিকায় তার লেখা ছাঁপা হয়। দুইটা বইও রয়েছে তার। ছোট্ট নিনুও নিজের দুনিয়ায় নিজের মত করে বেড়ে উঠছে।
‘দিতে পারো একশো ফানুস এনে?
আজন্ম সলজ্জ সাধ – একদিন আকাশে কিছু ফানুস ওড়াই’।
পুরো বইটিতে চুপচাপ মানুষের ভেতরেও যে কতগুলো অব্যক্ত চাহিদা থাকে, ভালবাসার তাগিদে দেহের মধ্যে যে হাহাকার, দেহের কলকব্জাগুলোয় যে ঝং পরা, মনের থোকেথোকে অসঙ্গতিগুলোই যেন প্রকাশ পায় দুটো লাইনে। দুটো পঙক্তিমালা প্রতিটি চরিত্রের ভাস্কর্য।
পরিবারের এতগুলো মানুষ কাছাকাছি থেকেও জানতে পারেনি কারো না পাওয়ার ব্যাথা, বিরহের কথা, অনুতপ্তের কথা, প্রিয়মুখের হারিয়ে যাওয়া মিষ্টি কথা। কারণ উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রই নিজেকে ঘিরে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরী করেছিলো। যে দেয়ালের মধ্যে কেউ কখনো প্রবেশ করতে পারেনা, যে দেয়ালের ভেতরের কথাগুলো প্রকাশ পায়না, অনুভূতিগুলো ধুঁকে ধুঁকে শ্বাসকষ্টে মরে, ইচ্ছা আকাঙ্খাগুলো ছুঁয়ে দেখার কেউ নেই – এই অদৃশ্য দেয়ালের নামই ‘শঙ্খনীল কারাগার’।

১৮০জন ৯৬জন
4 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য