লোভ (দ্বিতীয় পর্ব)

দিপালী ২১ নভেম্বর ২০২০, শনিবার, ০৫:০২:৪৭অপরাহ্ন গল্প ৮ মন্তব্য

#লোভ (দ্বিতীয় পর্ব)

সেদিনের পর থেকে রোদেলার সাথে কথা বলে না চন্দন। তাতে কিছু আসে যায় না রোদেলার। সে প্রতিদিন আগের মতই চন্দনের সাথে স্কুলে যায়। আসা যাওয়ার পথে চন্দনের হাত ধরে থাকে। শুধু কথা একটু কম বলে।

চার দিন পর কথা বলে চন্দন। রোদেলার সাথে কথা না বলে উপায় নেই তার। চন্দন একজন পরজীবি। তাকে মাথা নত করেই বাঁচতে হবে।

সামনে বার্ষিক পরীক্ষা। রোদেলার জ্বালা যন্ত্রনায় একদম পড়তে পারেনি চন্দন। তাই শেষ সময় টুকু নাকে মুখে পড়ার চেস্টা করছে।

তাতেও শান্তি নেই চন্দনের। রোদেলাকে এড়িয়ে চলাতে সে কবীর চাচাকে দিয়ে চন্দনকে অনুরোধ করায় যেন চন্দন নিজের পড়ার পাশাপাশি রোদেলাকেও একটু সাহায্য করে।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় চন্দনের সাথে পড়তে বসে রোদেলা। পড়ার টেবিলের চেয়ারে বসে চন্দন আর চকিতে বসে রোদেলা। চন্দন খুব মনোযোগ দিয়ে অংক করছিল হঠাৎ রোদেলা চকি থেকে উঠে গিয়ে চন্দনকে জোরে ঝাপটে ধরে। রোদেলার হাত থেকে নিজেকে কোন মতে ছাড়িয়ে ঘর থাকে দৌড়ে পালায় চন্দন ।

সারা রাত কড়ই গাছ তলায় বসে কাঁদে চন্দন। চন্দন বার বার বুঝতে চায় কেন রোদেলা আপা তার সাথে এমন করে। সে তার চেয়ে বয়সে ছোট। তারে সে বড় বোনের মতন শ্রদ্ধা করে।

সকালে রোদেলার সাথে চোখাচোখি হলে চোখ নামিয়ে নেয় চন্দন । ভাবলেশহীন রোদেলা। আজ স্কুলে যাবে না চন্দন তাই রোদেলাও স্কুলে গেল না। সারা দিন ঘর বন্ধ করে শুয়ে রইল চন্দন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এলেও কেউ চন্দনের খোঁজ করল না।

আগ দুপুরে এক মুঠ ভাত খেয়ে কবীর সরদার সালিশি  করতে গেছে তিন গ্রাম পার হয়ে সিন্দুকছড়া গ্রামে। ফিরবে পরের দিনে বিকেলে। আর রোদেলার মা তো বিছানায় থাকা রোগী। চন্দনের সব কিছু এক রকম রোদেলায়ই দেখা শোনা করে। আজও তারই চন্দনের খবর রাখার কথা থাকলেও রোদেলা ইচ্ছে করেই চন্দনের খোঁজ করেনি। এমন কি দুপুরে খেতে পর্যন্ত ডাকেনি।

সন্ধ্যার পর কাজের খালার কাছে খেতে চাইলে রোদেলা খাওয়া দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে কিনা জানতে চাইলে না খেতেই ফিরে আসে চন্দন।

খানিক ক্ষন পর চন্দনের জন্য খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকে রোদেলা। চন্দন চকির উপর উপুর হয়ে শুয়ে আছে। কাঁদছে কিনা বুঝা যাচ্ছে না।

কর্কশ স্বরে রোদেলা-

: তোর জন্য ভাত আনছি।

সাড়া দেয় না চন্দন।

: বুঝছি তোর ক্ষিদা লাগে নাই। আমি ভাত নিয়া চইলা গেলাম।

উঠে বসে চন্দন।

রোদেলা ভাত মাখিয়ে চন্দনের মুখের সামনে নিয়ে বলে-

: হা কর।

বিনা বাক্য হা করে ভাত মুখে নেয় চন্দন।

রোদেলা খুব যত্ন করে চন্দনকে ভাত খাওয়াতে থাকে। এক সময় চন্দন জানতে চায়-

: রোদেলা আপা তুমি আমার সাথে এমন কর ক্যান?

: তোরে কত বার কইছি আমারে আপা ডাকবি না।

: আমি তোমারে বড় বইনের মতন শ্রদ্ধা করি।

: এখন থাইকা আর করবি না।

: ক্যান করব না? আমি তো তোমার ছোট ভাইয়ের মতন।

: হ, তুই আমার ছোড ভাইয়ের মতন কিন্তু ছোড ভাই তো না। তোরে আমার খুব ভাল রে লাগে চন্দন। মনে হয় তোরে নিয়া কোথাও পালায় যাই।

: এই সব তুমি কি কও রোদেলা আপা?

: ঠিকই কই। আমি তোরে ভালবাসি চন্দন। তোর সাথে সংসার পাতাইতে চাই।

: এই সব গুনার কথা তুমি আর কোনদিন কইবা না।

রোদেলা চন্দনের সামনে থেকে ভাতের থালা সরিয়ে নিয়ে বলে-

: তাইলে তুই বাকীটা রাইত আধ পেট খাইয়া থাক।

তারপর কড়া গলায় চন্দন কে সাশিয়ে বলে-

: শোন চন্দন তুই যদি আমার কথা মতন না চলিস তবে মনে রাখিস এই বাড়িতে আজই তোর ভাত শ্যাষ। কাইল  বিকালে আব্বা ফিরা আসলে তোর নামে এমন নালিশ করুম যে আব্বায় তোরে আর এক মুহুর এই বাড়িতে জায়গা দিত না ঠিক আড়তের ম্যানেজারের মতন।

ম্যানেজারের কথা শুনে বিস্মিত হয়ে যায় চন্দন। নির্বাক তাকিয়ে থাকে হিংস রোদেলার দিকে।

একটু দম নিয়ে রোদেলা আরো বলে-

: শোন চন্দন তুই আমাগো বাড়ির আশ্রিত। আশ্রিত ক্যান?  কারন তোর দুনিয়ায় যাওনের কোন জায়গা নাই। কিন্তু তুই যদি আমারে বিয়া করিস তাইলে পুরা দুনিয়াডা হইব তোর। কবীর সরদারের একমাত্র কইন্যা আমি। সব সম্পত্তির একমাত্র মালিক। আমার পরে আমি যারে বিয়া করমু মালিক হইব সে। সারা জীবন পায়ের উপর পা তুইলা খাইয়াও শ্যাষ করতে পারবি না।

শোন চন্দন তোরে আইকার রাইতটা চিন্তা করার সময় দিলাম। সূর্য উঠার আগেই ইয়েস নো জানাবি। অহন ঘুমা।

সারা রাত চোখের দুপাতা এক করতে পারল না চন্দন। রোদেলাকে তার ভাল লাগে না। অনেকটা অসহ্যই লাগে। কিন্তু রোদেলাকে বিয়ে করলে সে হতে পারবে বিত্তবান । কবীর সরদারের সমস্ত সম্পত্তির মালিক হবে সে আর রোদেলা। তাকে আর খাওয়া পড়া থাকা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।

অতি দ্রুততার সাথে রোদেলার ঈশারার পুতুল হয়ে উঠল চন্দন । কৈশর না পেরুতেই যৌবনের স্বাদ পেল দেহ মনে। শুধুমাত্র শারীরিক যুদ্ধের সময় টুকু ছাড়া রোদেলাকে এখনও ভাল লাগে না চন্দনের ।

প্রথম যেদিন রোদেলার ইচ্ছার কাছে নতজানু হতে হয়েছিল চন্দনকে সে রাতটি কখনও ভুলবে না সে। খুব কষ্ট হয়েছিল তার। সারা রাত কেঁদেছিল চন্দন আর মনে মনে ক্ষমা চেয়েছিল নূরীর কাছে।

নূরী, চন্দনের মামাত বোন। নিজ বাবার অত্যাচারের হাত থেকে পালিয়ে এসে যে মামার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল চন্দন সেই মামার তিন মেয়ের মধ্যে সব চেয়ে ছোট মেয়ে নূরী।

নূরী চন্দনের চেয়ে দুই বছরের ছোট। নূরী দেখতে খুব সুন্দর। ছাত্রী তুখোর। নূরীর মনটাও খুব নরম।

নূরী বুঝতে পারে কিনা চন্দন জানে না কিন্তু চন্দন মনে মনে নূরীকে ভালবাসে। আর এই ব্যাপারটা সম্ভবত  চন্দনের মামী আঁচ করতে পেরেছিলেন। হয়ত সে জন্যই মামী চন্দনকে আর তাদের বাড়িতে রাখতে চাননি। এতে মামীর কোন দোষ দেখে না চন্দন। কোন পিতামাতা কি চাইবে কোন ছিন্ন মূল ছেলের কাছে তাদের মেয়েকে তুলে দিতে?

মনুমিয়া চন্দনের আপন মামা না। মনুমিয়া চন্দনের মায়ের চাচাত ভাই হলেও আপন ভাইয়ের চেয়ে কম কিছু নয়। চন্দনের মায়ের জন্মের বছর না গড়াতেই চন্দনের দাদা মারা গেলে চন্দনের দাদির অন্য ঘরে বিয়ে হয়ে যায়। সেই থেকে চন্দনের মা তার চাচার বাড়িতে মানুষ হয়। মনুমিয়া বাড়ির একমাত্র ছেলে। তাই মনুমিয়ার সংসারে চন্দনের মায়ের আদরের কোন কমতি ছিল না।

মনুমিয়ার পৈত্রিক ভিটা ছিল পদ্মার পাড়ে। এক সময় বিশাল গৃহস্থি ছিল তাদের। মনুমিয়ার আব্বা ছিলেন একটু সৌখিন প্রকৃতির মানুষ। গান বাজনা আড্ডা এই সব নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। বেশির ভাগ জমি বর্গাচাষে দিয়ে রাখতেন। তাতেও মনুমিয়াদের সংসারে লক্ষ্মীর কমতি থাকত না।

দেখে শুনে ভাল ঘর, ভাল বংশ দেখে চন্দনের মায়ের বিয়ে দেন মনুমিয়ার আব্বা। বিয়ের পর ভাল থাকলেও চন্দনের জন্মের পর থেকে সমস্যা শুরু হয়। তিনি কেন যেন ভাবতেন চন্দন তার নিজের সন্তান না। চন্দনের সত্যিকারের পিতা মনুমিয়া। স্বামী অত্যাচার সহ্য করেও স্বামীর সংসারে পরে থাকতেন চন্দনের মা! এভাবেই চলছিল। হঠাৎ দুইদিনের জ্বরে মারা যান চন্দনের মা। চন্দনের মায়ে মৃত্যুর দুই সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় বিয়ে করেন চন্দনের আব্বা। চন্দনের সৎ মা ভাল ছিলেন। তিনি চন্দনকে ভালবাসতেন। ঠিক মত খেতে পড়তে দিতেন।

কালক্রমে দিনে দিনে পদ্মার ভাঙ্গনে পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে থাকে মনুমিয়াদের জায়গা জমি। ধীরে ধীরে বর্গাচাষীদের বাদ দিয়ে নিজেরাই হাল চাষ করতে শুরু করে দিলেন। এতে সংসার এক রকম চললেও ধীরে ধীরে অবশিষ্ট জমি টুকুও গিলে খেল পদ্মা । এরপর শেষ অবলম্বন বসতভিটাও আর ধরে রাখতে পারলেন না। সেটিও তলিয়ে গেল পদ্মায়। তারপর থেকে পাশের গ্রামের এক বিওবানের পরে থাকা ভিটায় বাস করতে শুরু করে মনুমিয়ার পরিবার। রোগে শোকে দেহ ত্যাগ করলেন প্রথমে মনুমিয়ার মা পরে মনুমিয়ার বাবা। এক সময় জমি বর্গা দিলেও এখন মনুমিয়া নিজেই একজন বর্গা চাষী। ছোট বেলা থেকেই মনুমিয়ার হাপানীর রোগ আছে তাই চাষাবাদও তেমন করতে পারে না। সংসারে বারো মাসই অভাব অনটন লেগে থাকে।

চন্দন যত বড় হতে থাকে চন্দনের আব্বা চন্দনকে তত অপছন্দ করতে থাকেন। উঠতে বসতে অপমান করতেন। খাওয়া পড়ার খোটা তো দিতেনই আবার কথায় কথায় বাড়ি ছেড়ে মনুমিয়ার বাড়িতে চলে যেতে বলতেন। একদিন চন্দনের সৎ মা নিজের বাড়ি থাকতে কেন মনুমিয়ার বাড়ি চলে যাবে বলে প্রতিবাদ করায় চন্দনের সৎ মায়ের গালে জোড়ে এক চড় বসিয়ে দেন চন্দনের আব্বা।

সেদিন রাতেই কাউকে কিছু না বলে পালিয়ে মনুমিয়ার বাড়িতে চলে আসে চন্দন ।

চন্দনের মাধ্যমিকের রেজাল্ট প্রত্যাশার বাইরে খারাপ হল। রোদেলা অকৃতকার্য। মন ভেঁঙ্গে গেল কবীর সরদারের।

রোদেলার বিয়ের জন্য পত্র খুঁজতে শুরু করে দিলেন কবীর সরদার। চন্দনের সাথে রোদেলার মেলামেশাটি আজকাল সবার চোখে পরে। তা থেকে বাইরে নন কবীর সরদার।

রোদেলা চন্দনের চেয়ে বয়সে বড়। নিজের মেয়ে বলে অস্বীকর করেন না কবীর সরদার যে রোদেলা দেখতে সাধারন অসুন্দরের চেয়েও ব্যতিক্রম অসুন্দর। বন্ধু মনু বিশ্বাস করে চন্দনকে তার কাছে রেখে গেছে। চন্দন তার আশ্রিত। এ রকম একটা বিষয়কে তিনি কোন ভাবেই প্রশ্রয় দিতে পারেন না।

চন্দন বুঝতে পেরেছিল তার মাধ্যমিকের রেজাল্ট খারাপই হবে। রোদেলার কারণে তার লেখাপড়া করার উপায় ছিল না। পড়াশুনা যখন হচ্ছিলাম না তখন চন্দন মনে মনে একবার ভেবেছিল রোদেলার কথামত রোদেলাকে বিয়ে করে বিওবান হবার। কিন্তু এখন তো সে গুড়েও বালি। রোদেলার জন্য পাত্র দেখছেন কবীর সরদার। রোদেলাও তাতে আপওি করছে না।

….. চলবে

 

 

৯১জন ৩জন
0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য