লোকমান হেকিমের কেরামতির গল্প-৪

নিতাই বাবু ১২ অক্টোবর ২০১৯, শনিবার, ১১:৫৯:৩১অপরাহ্ন গল্প ৩১ মন্তব্য

গল্পের তৃতীয় পর্ব এখানে ➘

লোকমান হেকিমের কেরামতির গল্প-৩

গল্পের তৃতীয় পর্বের শেষাংশ:➷

কুলসুম দরিয়ার মাঝে পৌঁছতে আর অল্প ক’দিনের পথ বাকি। এরপরই শুরু হবে কোঁয়া কোঁয়া আর লোকমান হেকিমের কেরামতি।

কোঁয়া কোঁয়ার সাথে সেদিন লোকমান হেকিমের কথা-বার্তা এ-ই পর্যন্তই শেষ। মানে পাকাপাকি কথা। কোঁয়া কোঁয়া আর লোকমান হেকিমের কথা-বার্তার সময় বাদশা যে জ্ঞানহারা হয়ে পড়েছে, তা ছিল বন্ধু লোকমান হেকিমের অজানা। বাদশার সাথে কথা হয় সাগর ভ্রমণের যাত্রাপথে ক’দিন আগে। শেষ বিরতির সময়। বাদশার মুল্লুক থেকে জাহাজ ছেড়ে আসার পর থেকে লোকমান হেকিমের সাক্ষাৎ হয়েছিল দুই-তিন বার। তাও সাগর পথে জায়গায় জায়গায় বিরতির এক ফাঁকে দেখা করতেন। আলাপও সারতেন গোপনে। এছাড়া লোকমান হেকিম এই যাত্রাপথে কোনও সময় জাহাজের উপরে উঠে বাদশার সাথে দেখা করতে পারেনি, দেখা করে-ও-নি।এভাবেই যাচ্ছে দিন, গড়াচ্ছে মাস। এভাবেই চলছে জাহাজ। পাড়ি দিচ্ছে সাগরের পর সাগর। এভাবে আর দুইএক দিন চললেই পৌঁছে যাবে কুলসুম দরিয়ার মাঝে। কিন্তু বাদশার কোনও সাড়াশব্দ নেই।

বাদশার সাড়াশব্দ না পেয়ে লোকমান হেকিম নিজে থেকেই কোঁয়া কোঁয়াকে জিজ্ঞেস করলো, ‘ভাবীসাহেবা, আমার বন্ধুর তো কোনও সাড়াশব্দ পাচ্ছি না। উনি কি ঘুমাচ্ছে?’ কোঁয়া কোঁয়া বললো, ‘চিন্তার কোনও কারণ নেই, ‘উনি ঘুমাচ্ছে।’ আসলে কিন্তু বাদশা জ্ঞানহারা হয়ে বিছানায় পড়ে রয়েছে। কোঁয়া কোঁয়া মিথ্যের বলার কারণ হলো, লোকমান হেকিমকে শুধু শান্তনা দেওয়া। যদি বলে বাদশা জ্ঞানহারা, তাহলে লোকমান হেকিম সোজা উপরে চলে আসবে। লোকমান হেকিম যেন উপরে না আসে, তাই মিথ্যে কথা বলা। এরপর অবশ্য বাদশার জ্ঞান আপনা-আপনি ঠিকই ফিরেছে। বাদশার জ্ঞান ফেরার পর কোঁয়া কোঁয়াকে দেখেই বাদশা আবার ভয়ে কেঁপে উঠলো।

বাদশার এই অবস্থা দেখে কোঁয়া কোঁয়া বাদশার সামনে গিয়ে আস্তে আস্তে বললো, ‘আপনি ভয় পাবেন না। আমি আপনার কোনও ক্ষতি করবো না। আপনি আমাকে জঙ্গল থেকে টেনে নিয়ে আপনার মহলে ঠাঁই দিয়েছেন। তা আমি ভুলে যেতে পারি না। যদিও আমি মানুষ নই, তবুও আমি আপনার ক্ষতি করবো না। যদি আপনার ক্ষতি করার ইচ্ছে আমার থাকতো, তাহলে তো আমি আপনার মহলে বসেই ক্ষতি করতে পারতাম। আপনি যখন সোনা বনে হরিণ শিকারে গেলেন, তখনও আমি ক্ষতি করতে পারতাম। কিন্তু আপনার ক্ষতি আমি করিনি। শুধু আশ্রয় নিয়েছি আমার মনোমত আহার সংগ্রহের জন্য।

‘আমি ছোটবেলা থেকে সোনা বনে ঘুরেফিরে বড় হয়েছি। বাবাকে দেখিনি। মায়ের মুখে শুনেছি আপনার মতো এক রাজা হরিণ শিকারে এসে বাবাকে তীর মেরে মেরে ফেলেছে। আমার মাকে মরেছিল একজন হেকিম। ওই হেকিম প্রায়ই সোনা বনের গহীনে গিয়ে ঔষধি গাছগাছালি সংগ্রহ করতো। একসময় বনের গহীনে আমার মায়ের গন্ধ উনার নাকে লাগলো। আমার মা-ও হেকিমের সামনা-সামনি হয়ে গেল। ওমনি হেকিম উনার বানানো ঔষধ আমার মায়ের উপর নিক্ষেপ করে। এরপর মায়ের মৃত্যু হয়েছে মনে করে হেকিম তাড়াতাড়ি সোনা বন থেকে চলে যায়। মা বনের গহীনে পড়ে ছটফট করছিল। তখন আমি ছিলাম খুবই ছোট। সেদিন আমি ছিলাম এক বড় গাছের গর্তের ভেতরে। যেখানে মা আমাকে রেখে আহারের সন্ধানে বেরিয়েছিল। আমি গর্তের ভেতরে ঘুমিয়ে ছিলাম। চিৎকার শুনে দৌড়ে মায়ের সামনে আসি। মা আমাকে ধরে কেঁদে কেঁদে বলে গিয়েছিল, একজন মনুষ্য হেকিম মায়ে শরীরে কি যেন নিক্ষেপ করেছিল। এরপরই মায়ের মৃত্য হয়।

‘মায়ের মৃত্যুর পর আমি একা হয়ে গেলাম। সোনা বনে পশুপাখি ধরে ধরে খেতাম। খেতে খেতে সব পশুপাখি শেষ করে ফেললাম। আমার ভয়ে সোনা বনে পশু তো আসতোই না, একটা পাখিও উড়ে আসতো না। যখন আর আহার সংগ্রহ করতে পারছিলাম না, তখন ভিন্ন বেশে রাতের অন্ধকারে সোনা বনের আশপাশের গ্রামে ঢুকতাম। মানুষের গরুছাগল হাঁস মুরগী ধরে ধরে খেতেম। এমনকি ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে সময় সময় মানুষও ধরে খেয়ে ফেলতাম। ভোর না হতেই আবার সোনা বনের গহীনে চলে আসতাম। এভাবে চলতে চলতে সোনা বনের আশপাশের গ্রামের মানুষজন আমাকে বধ করার জন্য উঠেপড়ে গেলে যায়। আমিও ছিলাম মনুষ্য ভয়ে। কারণ আমার বেশ ধরার কেরামতি আর শারীরিক শক্তি যতই থাকুক-না-কেন, মানুষের বুদ্ধির কাছে আমি সবসময়ই শূন্য। আমি বুদ্ধিহীন শক্তিহীন কেবল মানুষের কাছেই।

‘তাই আমি মানুষকে খুবই ভয় পাই না। মানুষের ভয়ে ভয়ে থাকতে থাকতে এমন সময় আপনার দেখা পেলাম। মানুষ বেশে আমার সামনে এলাম। আপনি আমাকে পরিধান করার মত বস্ত্র দিলেন। আদর করে বুকে টেনে নিলেন। আপনার স্ত্রীর মর্যাদা দিলেন। আমিও আশ্রয় পেলাম। আপনার মুল্লুক হলো আমার নতুন মুল্লুক। আপনার মুল্লুকের মানুষের কাছে আমি ছিলাম অজানা। তাই ক’দিন রাতের অন্ধকারে মনের আনন্দে আহার করেছিলাম। মনে করেছিলাম সারাজীবন এভাবে থেকে মনের আনন্দে ঘুরাঘুরি করবো। কিন্তু তা বুঝি আর হলো না। আমি যে মানষ নই, তা টের পেয়ে গেল আপনার বন্ধু লোকমান হেকিম।

‘আমি এখন বুঝতে পেরেছি আমার মাকে কে মেরেছিল। আমি নিশ্চিত, আমার মাকে আপনার এই বন্ধু লোকমান হেকিমই মেরেছিল। এখন আবার উনারই একটা পরীক্ষার মধ্যেও আমি পড়ে গেলাম। যা কিনা কুলসুম দরিয়ার তালা আছে কি নেই, সেই পরীক্ষা। আমি তা প্রমাণ অবশ্যই দেখাবো। এরপর হবে লোকমান হেকিমের সাথে আমার বোঝাপড়া। আপনি নির্ভয়ে থাকুন!’

কোঁয়া কোঁয়ার জীবন কাহিনী শুনে বাদশা আবারও হার্টফেল করলো। তখন কোঁয়া কোঁয়া জ্ঞানহারা বাদশাকে বিছানায় শোয়াইয়া দিলেন। বাদশা নীরবে নিঃশব্দে ঘুমাচ্ছেন। জাহাজ চলছে শোঁ শোঁ করে। সগরের ঢেউয়ের শব্দে উপর থেকে কোঁয়া কোঁয়ার কথার আওয়াজ নিচে আসেনি। তাই আর লোকমান হেকিম তাঁদের কথা কিছুই শুনেনি। লোকমান হেকিম শুধু কুলসুম দরিয়ায় পৌঁছানোর অপেক্ষায় থাকলো।

একসময় বেতের জাহাজ কুলসুম দরিয়ার মাঝে পৌঁছাল। লোকমান হেকিম মাঝি-মাল্লাদের থামতে বললেন। মাঝিরা জাহাজের বৈঠা টানা বন্ধ করলেন। জাহাজ থামলো। লোকমান হেকিম কোঁয়া কোঁয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘ভাবীসাহেবা, ‘আপনি কি সজাগ? আমরা কিন্তু কুলসুম দরিয়ার মাঝখানে আছি। এখানে শুধু পানি আর পানি। নিচে কোনও তলা নেই।’ কোঁয়া কোঁয়া আবারও হেসে বললো, ‘আপনি একজন মস্তবড় হেকিম হয়ে আহাম্মকের মতো কথা বলছে কেন? সব দরিয়ার তলা আছে। তলদেশ আছে। সাগরের তলাই যদি না থেকে তো সাগরের পানি থাকছে কিসের উপরে? এই দরিয়ারও তালা আছে। তা আমি অবশ্যই প্রমাণ দেখাবো।’ লোকমান হেকিম বললেন, ‘এটা আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না ভাবীসাহেবা। আপনার কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে আপনাকে অবশ্যই এর প্রমাণ দেখাতে হবে। আর আপনি আগেও বলেছেন কুলসুম দরিয়ার যে তলা আছে, তা আপনি প্রমাণ করে দেখাবেন। আমি ভাবীসাহেবা আপনার প্রমাণ দেখার অপেক্ষায় আছি। দেরি না করে আপনি আপনার কেরামতি শুরু করুন! আমি উপর থেকে তা পর্যবেক্ষক করতে থাকি।’ কোঁয়া কোঁয়া বললো, ‘ঠিক আছে, আমি এক্ষুনি সাপের রূপধারণ করে দরিয়ার নিচে যাচ্ছি। দরিয়ার তলায় গিয়ে আমি আমার লেজ নাড়াচাড়া করলেই, বুঝে নিবেন আমি কুলসুম দরিয়ার তলার মাটি স্পর্শ করেছি।’ এছাড়াও আমি ফিরে আসার সময় আমার মুখে করে কুলসুম দরিয়ার নিচের মাটি নিয়ে আসবো।’

লোকমান হেকিম বললো, ‘ঠিক আছে ভাবীসাহেবা, আপনি যেকোনো রূপধারণ করে কুলসুম দরিয়ার নিচে যেতে পারেন। আমি উপর থেকে তা দেখছি।’ মুহূর্তেই কোঁয়া কোঁয়া এক সাপের রূপধারণ করে ফেললো। জাহাজের নিচতলা থেকে লোকমান হেকিম দেখছে, জাহাজের জানালা বেয়ে এক বিশাল সাপ কুলসুম দরিয়ায় নামছে।

চলবে…

এখানে☛লোকমান হেকিমের কেরামতির গল্প-৫ শেষ পর্ব!

 

১৯৭জন ২০জন
5 Shares

৩১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য