বুশেনওয়ার্ল্ডে বন্দীদের সিরিয়াল নাম্বার ট্যাটু

 

বুশেনওয়ার্ল্ড।
Buchenwald

মানবতার সমাধি, উদ্ধত দুর্বিনীত এবং অমানবিক থার্ড রাইখের রক্তের বিশুদ্ধতায় শ্রেষ্ঠত্ব তত্বের উল্লাসভুমি। যার প্রবেশপথে লেখা ছিল “Jedem das Seine” অর্থ “everyone gets what he deserves” যার সম্বন্ধে বলা হয় বুশেনওয়ার্ল্ড হলো গ্রীক পুরানের স্ট্রিং। মৃত্যু যেখানে ছিলো নৈমিত্তিক অনুলেখ্য ঘটনা। ধারনা করা হয় বন্দীর সংখ্যা ছিল ২৫০,০০০ এবং মৃতের সংখ্যা আনুমানিক ৫৬০০০। এই ক্যাম্পে প্রথমদিকে মুলত ধরে আনা হতো ভিন্নমতাবলম্বি এবং টি ফোর প্রোগ্রামের আওতাধীন জার্মানদের , এরপরে হলোকাস্ট শুরু হবার পর ইহুদীদের এবং শেষের দিকে এলাইড এয়ার ফোরস এর একদল কানাডিয়ান বিমানসেনাকেও এই ক্যাম্পে রাখা হয়।

ক্যাম্পটি সরাসরি পরিচালিত হত এসএস অফিসার এবং পারসোনেলদের অধীনে। শুধুমাত্র কমান্ডিং পর্যায়েই নয় এমনকি সাধারন গার্ডদেরও নিয়োগ দেওয়া হত এসএস ট্রুপস থেকে। অধিকাংশ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ক্ষেত্রেই অবশ্য এই একই ব্যাপার …… কেননা এসএস ছিলো রাইখস ফুয়েরার হিমলারের সরাসরি তত্বাবধানে, এবং এসএস এর প্রথমদিকের ট্রুপসদের অধিকাংশই হিটলারের নিজের সিলেক্ট করা ট্রুপস ছিলো। তাই এসএস ট্রুপস ছিলো জার্মান সেনাবাহিনীর সবচে বেশী অভিজাত এবং দক্ষ ব্যাটালিয়ন । বন্দী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তাই এসএস অফিসারদের ইচ্ছাই ছিলো আইন। এমনকি অন্য জাতির কাউকে (নন জার্মান) কাউকে বিয়ে করার কারনেও লেবার ক্যাম্পে যেতে হয়েছে অনেককেই ,যেমন তানজানিয়ান মাহজুব বিন আদম মোহামেদ। তিনি এক জার্মান মহিলাকে বিয়ে করে বার্লিনে বসবাস করছিলেন সিক্রেট পুলিশ তাকে এবং তার স্ত্রী দুজনকেই গ্রেফতার করে লেবার ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়।

ক্যাম্পটি ১৯৩৭ সালে উইমারের গথিক ওকের বন পরিষ্কার করে তৈরি করে থার্ড রাইখ। যে গথ ওক লিভ ছিল জার্মান বাহিনীর সম্মানের প্রতিক তা হয়ে ওঠে মানবতার জন্য অভিশাপের প্রতীক। এবং ভাগ্যের নির্মম প্রতিশোধ যে লেবার ক্যাম্পে দাম্ভিক জার্মানরা তাদের ইচ্ছেমত ভিন্নমতের জার্মান, প্রতিবন্ধী , অক্ষম, হোমসেক্সুয়ালিস্ট, ইহুদী, এবং যুদ্ধবন্দীদের তাদের সমরাস্ত্র কারখানাগুলোয় শ্রমদাস হিসেবে ব্যাবহার করেছে ১৯৪৫ পর্যন্ত। সেই একই ক্যাম্পে তাদেরকেও থাকতে হয়েছে যুদ্ধবন্দী হিসেবে, রাশানদের তত্বাবধানে,স্পেশাল ক্যাম্প টু নামে ১৯৫০ এর জানুয়ারিতে সোভিয়েতরা বুশেনওয়ার্ল্ড ইস্ট জার্মান মিনিস্ট্রি অফ ইন্টারনাল এফেয়ারস এর হাতে তুলে দেওয়ার আগ পর্যন্ত।

পুরো দুনিয়ার তাবৎ বন্দীশালার মধ্যে সবচে অমানবিক পরিবেশ ছিলো এই নাজী ক্যাম্প গুলোয় ,বিভীষিকা বুঝতে এক কানাডিয়ান বিমানসেনার অনুভুতিটুকুই যথেষ্ট, বুশেনওয়ার্ল্ড দেখার পর

As we got close to the camp and saw what was inside… a terrible, terrible fear and horror entered our hearts. We thought, what is this? Where are we going? Why are we here? And as you got closer to the camp and started to enter [it] and saw these human skeletons walking around—old men, young men, boys, just skin and bone, we thought, what are we getting into?
—Canadian airman Ed Carter-Edward’s recollection of his arrival at Buchenwald

বুশেনওয়ার্ল্ডে বন্দীদের সিরিয়াল নাম্বার কব্জিতে ট্যাটু করে দেওয়া হতো।অর্থাৎ চিরজীবনের জন্য একজন স্বাধীন মানুষের উপর বন্দিত্বের ছাপ দিয়ে দেওয়া হলো। জার্মানিতে আজো কব্জীতে নাম্বার ট্যাটু করা অতি বৃদ্ধ কাউকে কাউকে দেখা যায় , এবং অধিকাংশ জার্মানরাই তাদের সামনে মাথা হেট করে রাখেন। এইসব ক্যম্পে বন্দীদের জুতোয় ফিতে পরতে দেওয়া হতোনা , কেউ যাতে আত্মহত্যা করতে না পারে তাই। ধুকে ধুকে মরা ছাড়া মুক্তির কোন উপায় ছিলনা।

এসএস এর প্রতিটি সৈনিক ছিলো নির্দয় কিলিং মেশিন তাই তাদের বিনোদনও ছিলো বন্দীদের মৃত্যুতেই। কব্জির ট্যাটু করা নাম্বার লটারী করে বন্দীদের খোলা মাঠে ছেরে দিয়ে খুনে রটওয়াইলার কুকুর লেলিয়ে দেওয়া ছিল নৈম্যত্তিক আমোদ। কিংবা রাইফেলের কুদো দিয়ে মেরে মেরে একটা একটা হাড় ভেঙ্গে বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখার শাস্তি নিয়মিত বরাদ্দ ছিলো হিটলারের বিরোধিতা কারী রাজনৈতিক বন্দীদের জন্য।

মানবতার প্রতি অভিশাপ এই ক্যাম্প জানুয়ারি ১৯৫০এ জার্মানদের হাতে তুলে দেওয়ার পর ঐ বছরেরি অক্টোবরে মেইন গেট ,হাসপাতাল ব্লক এবং গার্ডের দুইটি ওয়াচটাওয়ার স্মৃতি হিসেবে রেখে সকল বন্দীদের ব্যারাক সমুহ ধংস করে দেওয়া হয়। সেই থেকে ২য় মহাযুদ্ধের স্মারক যাদুঘর হিসেবে ব্যাবহৃত হচ্ছে বুশেনওয়ার্ল্ড।

৪৪৭জন ৪৪৭জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ