লেখকের বন্ধু

রোকসানা খন্দকার রুকু ৮ নভেম্বর ২০২১, সোমবার, ০৮:৫২:৪২অপরাহ্ন গল্প ১৩ মন্তব্য

‘একটা ঝোলা ব্যাগ কাঁধে আর লম্বা চুল- দাঁড়িতে কিছু মানুষ নিজেকে লেখক হিসেবে দাবী করে। আজকাল আবার এই দলে যোগ হয়েছে মহিলারাও। টিভি সিরিয়াল দেখে বাকি সময়টুকু তারা ফেসবুকে এর, ওর লেখা কোট করে নিয়ে কিছুমিছু লিখে নিজেকে লেখক হিসেবে দাবী করে।’- এমন কথা শুনছিলাম বিয়ে বাড়ির স্বনামধন্য লোকেদের মুখে।

আমি অনিন্দিতা হক, লেখালেখি করি। আমার এক বন্ধুর সাথে বিয়ের দাওয়াত খেতে এসেছি। যার বিয়ে তিনি সরাসরি আমাকে দাওয়াত দেননি। আমার বন্ধুকে বলেছেন আমাকে সাথে নিয়ে যেতে। কারণ তার মাধ্যমেই একদিন পরিচয়ের সুযোগ হয়েছিলো। ঘটনাটা এমন- আমি কাজ থেকে ফিরছিলাম বন্ধুর অফিসের সামনে দিয়ে। অনেকগুলো চকলেট হাতে, ভাবলাম তিনি চকলেট পছন্দ করেন কিছু দিয়ে যাই, খুশি হবেন। আমাকে দেখে তিনি আহ্লাদে আটখানা হবেন এমনটাও ভেবেছিলাম। আমার ধারনা ভুল প্রমানিত করে তিনি আহ্লাদীর বদলে চায়ের অর্ডার করলেন। অবশ্য বড় কর্মকর্তাদের সবার সাথে আহ্লাদীপনা মানায় না।

সরকারী অফিসের আদা ছাড়া লাল চা আমার কাছে ছাগলের মুতের মতো লাগে। তবুও আমি মনোযোগ দিয়ে খেতেই থাকলাম বন্ধু তখন ফাইলে মুখ গুঁজে। এমন সময় তার ফোন এলো। তিনি আসছি বলে দোতলায় চলে গেলেন। অনেকক্ষণ চা শেষ করে বসে আছি, তার ফেরার খবর নেই।

অগত্যা উঠতেই যাচ্ছিলাম এমন সময় তিনি আমাকে ফোন দিলেন- অনিন্দিতা আসেন, আপনাকে উপরে ডাকছে।

কে ডাকছে, দেখতে দোতলায় গেলাম। গিয়ে দেখি তিনি অন্যসহকর্মীর সাথে জাম্বুরা মাখা খাচ্ছেন। আমাকেও সামান্য খেতে দেয়া হলো। ততক্ষনে বুঝলাম তার আজকের সহকর্মীই আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। এই পরিচয়ের সুবাদেই আমার আজকের দাওয়াত। অন্য কেউ হলে নিশ্চয়ই আসতো না, আমি এসেছি। সম্মান বলে কথা আছে। তাছাড়া এমন মানুষদের সাথে মিশতে পারাটাও ভাগ্যের ব্যাপার।

আর যাকে বন্ধু বললাম তিনি আদতে আমার বন্ধু কিনা এখনো জানা যায়নি। মুখ ফুটে তিনি কখনোই কিছু বলেননি। এমনকি ফেসবুকেও তিনি আমার বন্ধু নন। পরিচয়ের অল্পদিন পরেই আমি তাকে ফেসবুকে রিকু পাঠালাম। লেখালেখি করি, এমন গুণী মানুষ থাকলে সাহস হয়। আর যদি কমেন্টে পরামর্শ দেন তাহলে তো অনেক বড় পাওয়া। বেশ কদিন অপেক্ষার পরও রিকোয়েস্ট একসেপ্টই হলো না। ভাবলাম বন্ধু বোধহয় খেয়ালই করেননি। তাই মনেও করিয়ে দিলাম।

তিনি হেসে জানালেন- সবাইকে আমি একসেপ্ট করিনা। বিরক্ত লাগে। অনেকের ফ্যান, ফলোয়ার বেশি তাদের তো আরও না।

আমার তো তেমন ফ্যান ফলোয়ার নেই। হয়তো আমার মতো সস্তা মানুষ তার লিষ্টে নেই। তিনি আমাকে তা বলতে পারছেন না। হোক; আমি মন খারাপ করি নি। একই ভাবে প্রথম পরিচয়ের দিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি তার ছোট ছোট প্রয়োজনে সাড়া দিয়েছি। কারন তিনি আমার শহরে এসেছেন, কিছুই চেনেন না। তাই তার পাশে থাকা দরকার।

সকল সম্পর্কের একটা বহিপ্রকাশ জরুরী। তাই আমি বন্ধুত্বের আশায় আমার সমস্ত আগ্রহ, আহ্লাদীপনা দেখিয়ে ফেলেছি। তিনি দেখাননি কিংবা বলেনও নি। এজন্য মাঝে মাঝে মনে হয় তিনি আমার উপর কি করুনা করেন? প্রায়ই ভালো রেস্টুরেন্টে খাওয়ান, দামী গিফট হাতে ধরিয়ে দেন। আমি সানন্দে গ্রহন করি, তার অসম্মান করিনা। তবে আমি কিছু দিতে চাইলে তিনি কঠোরভাবে না করেন।

তবুও আমি তার পিছু ছাড়ি না। এই যে খবরটা দিয়ে তিনি আমাকে বিয়ে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে এলেন এও বা কম কিসে! আমার মতো নগন্য মানুষের জন্য এ অনেক বড় পাওয়া। তাই বেশ খুশি মনেই আমি সুন্দর দেখে একটা শাড়ি কিনে বিয়ে খেতে চলে এসেছি।

আমার বন্ধুর কোন কথাই আমি ফেলতে পারিনা।একদিন তিনি ঘরের চাবি বাড়িতে ফেলে এসেছেন, আমাকে ফোন দিলেন। আমি লোক খুঁজে তার ঘর খোলার ব্যবস্থা করলাম। তিনি ডাক্তারের কাছে যাবেন, আমাকে ডাকলে দৌড়ে যাই। তিনি তার বাসার একটা চাবি আমায় দিয়ে রেখেছেন। হয়তো তিনি ট্রেনিং এ গেছেন আমি সব দেখে রাখছি। বিদেশ টুরে গেছেন, আমিই তার বাসা ভাড়া দিয়ে দিচ্ছি। বেশ যত্ন করে আমি তার ঘর ঝেডে মুছে পরিস্কার করে রাখি। কারন আমার ভীষন ভালো লাগে, তিনি আমায় কাজে হলেও পাশে পাশে রাখেন বলে।

যখন যেভাবে যেমন করে তিনি আমাকে চান আমি তার ডাকে সাড়া দেই। আজ তার বাজার জরুরী, আমি দৌড়ে যাই। ব্যাগ হাতে নিয়ে বেশ টিপে টিপে মাছ- মাংস দেখে কিনে দেই।

তবুও তিনি আক্ষেপ করেন- ঢাকা শহরের চেয়ে দাম বেশি, অনেক বেশি।

আমি তো আর ঢাকা শহরে থাকিনি, কখনো বাজারও করা হয়নি। তাই নিজের এলাকার দাম বেশি এই অপরাধে অপরাধী হাসি দেই। চরম অপরাধবোধ কাঁধে নিয়ে রিকশায় তার সাথে ছোট হয়ে বসে থাকি। তিনি সারাক্ষন আমার এলাকার খারাপ দিকগুলো বলতে থাকেন। আমি মাথা নেডে সম্মতি জানাই। কারন দামী মানুষরা যা বলেন সবসময় সত্যিই বলেন!

আমার বন্ধুর জন্য জিনিসপত্রের বেশ দরদাম করি। মাঝে মাঝে বহুদিনের পরিচিতদের সাথেও তর্ক করি। তাকে খুশি করার জন্য বকাও দেই। তারা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকায়।দেখে শুনে সব কেনার পর দোকানদার কাকু আমাকে বলেন- বেটি তোমার জন্যই কমে দিলাম! তুমি অনেক ভালো আবার এসো।

মন ভরে যায়। আমি অতি সাধারণ মানুষ বলেই হয়তো দোকানদারেরাও আমার বন্ধু। তারা আমাকে বেটি ডাকে। ভালো মাছ এলে ফোন দিয়ে জানায়। যেতে না পারলে বাসায় দিয়ে যায়। আমার কাছে মনে হয় কম দামেই জিনিস রাখে।

এই দোকানদার কাকুর মেয়ের বিয়ের সময় তার কিছু টাকা দরকার ছিলো। তার কাষ্টমার অনেক বড় বড় উঁচু মানের লোকজন তবুও তিনি আমাকেই জানালেন সমস্যার কথা? আমার তখন মনে হয়েছিলো, আমার টাকা না থাক, যে বিশ্বাসে তিনি আমার কাছে হাত পেতেছেন তা অন্তত ফেরানো যাবে না। আমি ধার করে নিয়ে তাকে টাকা দিয়েছিলাম।

বলছিলাম বন্ধুর কথা, তার সকল কাজে পাশে থাকতে পারলে নিজেকে আমার ধন্য মনে হয়। আবার নিজেকে ব্যস্ত দাবী করে না যাই তিনি যদি মাইন্ড করেন, যদি আর কখনো না ডাকেন। তাছাড়া তাকে একা ছাড়তেও আমার ভয় হয়। তাই সন্ধ্যারাতে তার যেন কোন অসুবিধা না হয় সেজন্য গায়ে হলুদেও ছিলাম। তিনি ফুল নেবেন, তিনদোকান দেখলেন তারপর শুরু হলো প্যাকিং। এই ছেলেগুলো আমাকে ফুল দেয়, আমি রিকশায় বসেই নেই। আমি প্যাকিং করি না, মেকি মনে হয়। তারা তাজা, ভালো ফুলই দেয়। আজ আমার বন্ধু অভিযোগ করলেন তাদের প্যাকিং ভালো না। ঢাকায় নাকি অনেক সুন্দর করে প্যাক করে। তার কথা আমার সাবানের এডের মতো লাগলো- নতুন মোড়কে, নতুন আঙ্গিকে। ভেতরে সাবান দিনকে দিন ছোটই হয়।

আমি তবুও সম্মতি জানালাম ও বললাম- তোমরা আসলেই কিচ্ছু জানো না।

হলুদ বাড়ি তবুও আমি সবসময় যেমন থাকি তেমনই গেলাম। আর আমার বন্ধু জমজমাট মেরুন শাড়িতে ফুল হাতে। আমি তাকে কনের সাথে বেশ কিছু ছবিও তুলে দিলাম। আমারও ইচ্ছে হলো একটা ছবি তুলি। সাহস করে স্টেজে উঠতেই আমার বন্ধুটি সরে অপর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। আমি ছবি না তুলেই নেমে গেলাম।

আমাদের একদম ঘরের ভেতরে নিয়ে মিষ্টি, দই এসব খেতে দেয়া হলো। আমার মিষ্টি জাতীয় খাবার খুব একটা পছন্দ না তবুও যিনি খেতে দিলেন তিনি কনের বড় বোন, একজন সাব- জাজ। তাকে না করা কেমন দেখায়। তাই মিষ্টি খুবই পছন্দ এমনভাবে খেতে থাকলাম। আমি তার পরিচিত নই। তবে বন্ধু যেহেতু একজন বিসিএস, আমিও তাই হবো হয়তো। তাই তিনি জানতে চাইলেন, আমি কতোতম ব্যাচের!

আমার মাথা তুলে সহজ উত্তর- আমি কোনদিন এ পরীক্ষায় বসি-ই নাই। লেখালেখি করি, তাতেই সময় যায়।

সাব জাজের মুখ মুহুর্তেই কালি হয়ে গেলো। আমার মতো একজন ফেসবুকিয় অখ্যাত লেখককে তিনি বিষেশভাবে, নিজ হাতে আপ্যায়িত করছেন এ ভীষন অসম্মানের। আমি তাকে কষ্ট দেবার অপরাধে খাওয়া বন্ধ করলাম।সাব- জাজ তখন আমার বন্ধুর দিকে তাকিয়ে। হয়তো মনে মনে তাকে প্রশ্ন করছেন- আপনি কি করে এইসবের সাথে মেশেন?

আমার বন্ধু করুনার চোখে শুধু দেখলেন আমার দিকে। তার আর কি দোষ! তিনি চাকুরীর সুবাদে অল্পদিন এ শহরে। সাহায্যের কাউকে খুঁজে পাননি। সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। শুধু আমাকে চাইলেই পাওয়া যায়। সময়মতো অন্যকেউ এলে কিংবা সমস্ত গুছিয়ে নেয়া হয়ে গেলে আমাকে আর তার প্রয়োজন হবে না। তখন নিশ্চিন্তে বাদ দেবেন, এখন যতোদিন চলে চলুক!

বিদায় নিচ্ছিলাম, আমার বন্ধুকে তার কলিগ বুকে জডিয়ে বিদায় দিলেন। সাব- জাজ সাহেবাও গায়ে হাত বুলিয়ে বিদায় দিলেন। আমি হাত তুললাম- আসি বলার জন্য। এতোকরে তুলে খাওয়ালেন কৃতজ্ঞতা বলে তো কথা আছে।তিনি মুখ ঘুরিয়ে অন্যকে বিদায় দেয়ার ভান করে আমার দিকে তাকালেনও না।

আমার মনে হলো, তুমুল ভয় এই সব মানুষদের মনে বাস করে। যদি কোনদিন কোথাও দেখা হলে আমার মতো কেউ আহ্লাদী পরিচয়ের হাসি দিয়ে লোককে দেখিয়ে দেয়, তিনি তার অনেক পরিচিত তাহলে তো সম্মান বলে কিছু থাকবে না। তাই তারা সাধারণদের এডিয়ে চলেন।

হলুদ শেষ হতে বেশ রাত হয়েছে। আমার বন্ধুটি রিক্সা থেকে নেমে শুধু বললেন- ওকে!

গটগট করে হিলের আওয়াজ তুলে নিজের বাসার গেটে ঢুকলেন। আমি ভাড়া দিতে দিতে রিকসাঅলা মামার সাথে গল্প করলাম তার বাড়ি, ছেলেমেয়ে এসবের। নাম্বারটাও নিয়ে রাখলাম, অন্যসময় ডাকবো বলে। কারন আমার বন্ধু ভীষন বেড়াতে পছন্দ করেন। সব রিক্সা মামা ভালো হয় না। এই মামা ভালো। অন্তত আমার বন্ধু বলবেন আমার এলাকার রিক্সাঅলা ভালো। এটিতে করে আমরা রিক্সা ভ্রমনে যাবো, তবে যেদিন তিনি আমাকে ডাকবেন!!

ঈদানিং বন্ধু আর আমাকে সবকাজে ডাকেন না। একা করেন কিংবা অন্যকেউ করেন হয়তো। ভাবলাম তিনি হয়তো রাগ করেছেন কোন কারনে আর সেদিন আমারও ভীষন ইচ্ছে হচ্ছিলো বন্ধুর সাথে বেড়ানোর। তাই তাকে ফোন দিলাম। তিনি আমায় জানালেন তিনি ভীষন ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এখন আর আগের মতো সময় হবে না আমাকে দেবার।

সেই ব্যস্ততা তার আর কমেনি। বন্ধুর সাথে আমার অনেকদিন দেখা হয়না, কথাও হয় না। ব্যস্ত মানুষ বিরক্ত করতে ফোন দেই না। তবে খবর পাই এখন তার আশেপাশে অনেক সুযোগ্য সুধীজনের আনাগোণা। তিনি তাদের নিয়েই ব্যস্ত। আর আমি ছিলাম ’ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলা’। এখন আমাকে আর তার প্রয়োজন হবার কথা না।

শুনেছি তিনি তুমুল প্রেমেও পড়েছেন। বিয়ে সামনের মাসেই। আমাকে তিনি দাওয়াতও দেননি। তাতে আমার কষ্ট হয়নি কারণ অতি সাধারনদের কষ্ট বলে কিছু থাকতে নেই!

১৭০জন ৩০জন
0 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য