পৃথিবীর সব খেলাগুলোর মধ্যে এক মাত্র ফুটবল খেলাটিই সব চেয়ে জনপ্রিয়।বলে পায়ের রণকৌশল এবং দৌড় বিদ্যায় যিনি পারদর্শী তিনিই সেরা তিনিই জনপ্রিয়।দলের ক্ষেত্রে একক কোন পারফরমের কোন ভিত্তি নেই যদি না দলের সম্মেলিত শক্তির পরস্পরের সমযোতা বা দক্ষতা না থাকে।এ ক্ষেত্রে মেসিকে নিয়ে মারাদোনা বলেছিলেন,মেসি নিঃসন্দেহে একজন ভাল খেলোয়ার কিন্তু তার সাথে আর যারা আছেন তারা যদি মেসিকে চালাতে না পারেন তবে মেসি কোন সফলতাই আনতে পারবে না।তাই একক কেউ নয় ফুটবল কাপ জয়ের নায়ক।সম্মেলিত দেহের শক্তি বুদ্ধিমত্তা পায়ের কৌশল ইত্যাদি পারদর্শীতাই ফুলবল খেলার জয়ের সূচনা।

রাশিয়া মুলতঃ খেলোয়ারদের ভ্রমণের সময় বাঁচানোর জন্য কেবল রাশিয়ার ইউরোপীয় অংশে অবস্থিত বিভিন্ন স্টেডিয়ামগুলোতে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের খেলাগুলি অনুষ্ঠিত হচ্ছিল।রাশিয়ার প্রায় ১১টি শহরের ১২টি স্টেডিয়ামে সর্বমোট ৬৪টি ম্যাচ আয়োজন করা হয়েছিল।সেই অনুযায়ী আসছে ১৫ই জুলাই ২০১৮  রাশিয়ার রাজধানী মস্কো শহরের লুঝনিকি স্টেডিয়ামে এই আসরের ফাইনাল খেলাটি অনুষ্ঠিত হবে আর ২০১৮ এ ফিফা বিশ্ব কাপের শিরোপা বিজয়ী দল যারা হবেন তারাই ২০২১ সালে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা কনফেডারেশন্স কাপের জন্য সরাসরি উত্তীর্ণ হবেন।ফাইনাল খেলবেন বিশ্বকাপ ফুটবল আসরে প্রথম বারের মতন যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ ক্রোয়েশিয়া এবং পৃথিবীর পরাশক্তিগুলোর একটি নয়াভিরাম আইফল টাওয়ারের দেশ ফ্রান্স

ফ্রান্স ফুটবল টিমটি বিশ্বকাপ ফুটবল আসরের কয়েক বারের চ্যাম্পিয়ণ আর ক্রোয়েশিয়া তাদের তুলনায় দুধের শিশু।তবে কী নেই দলটিতে?আর্জেন্টিনা ব্রাজিল কিংবা জার্মানের চেয়েও শক্তিশালী মিড ফিল্ড যদি কোনো দলের থাকে তা কেবল ক্রোয়েশিয়াই আছে।বার্সেলোনা এবং রিয়াল মাদ্রিদ বিশ্ব সেরা দুটি ক্লাব সেখানকার দুই সেরা মিড ফিল্ডার হচ্ছেন ইভান র্যাকিটিক এবং লুকা মাদ্রিচ সঙ্গে আরো আছেন,মাতেও কোভাচিচ,ইভান পেরিসিকের মত মিড ফিল্ডার।মিডফিল্ড যাদের যত বেশি শক্তি শালী,দলটাও তাদের তত শক্তিশালী।সেই মিডফিল্ডদের একজন লুকা মাদ্রিচের মনে এক ভাবনা ছিলো,ফুটবল মানুষকে বাঁচতে শেখায় বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে অদম্য লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা জোগায় যেমনটি দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে বিধ্বস্ত জার্মানরা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল এই ফুটবলের হাতটি ধরে।১৯৫৪ বিশ্বকাপে হাঙ্গেরিকে হারানোর গল্প জার্মানিতে রূপকথারই গল্প ছিলো।ক্রোয়েশিয়া আর লুকা মদ্রিচের গল্পও তেমনটি,কোনও ম্যাজিকের গল্পের চেয়ে কম নয়।

১৯৫০ সালে যখন যুগোস্লাভিয়া ভেঙে সার্বিয়া তৈরি হয় তখন ক্রোয়েশিয়া যুক্ত হয় সার্বিয়ার সঙ্গে তার আগে দীর্ঘকাল ক্রোয়েশিয়া ছিলো যুগোস্লাভিয়ার একটি অংশ।ক্রোয়েশিয়াদের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই শুরু হয়েছিল আশির দশকের শেষের দিকে যা নব্বই দশকের শুরুতেই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্ম প্রকাশ করে এই ক্রোয়েশিয়া।যুদ্ধ বিদ্ধস্ত একটি দেশ নিজেদের বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার মঞ্চ হিসেবে ফুটবলকে বেছে নিলেন।যেমনটা চার বারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী,ক্লাব ফুটবলে বিশ্বের অন্যতম সেরা তারকা লুকা মদ্রিসও ব্যাতিক্রম নয়।তবে তার একজন সফল ফুলবলার হয়ে বেড়ে উঠার জীবনের বাস্তবতা ছিলো খুবই করুণ খুবই ত্যাগ তিতিক্ষা আর সংগ্রামের।যুদ্ধ বিধ্বস্ত ক্রোটদের এক সময় প্রতি নিয়ত দিন কাটত প্রাণভয়ে,অনাহারে।

১৯৮৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ায় জন্মেছিলেন লুকা।সেখানকার রীতি অনুযায়ী, গ্রাম আর পরিবারের পূর্ব সূরীদের নামানুসারে নবজাতকের নাম রাখার নিয়ম ছিল তাই লুকা মদ্রিচের দাদার নাম ছিল লুকা আর গ্রামের নাম মদ্রিচি।দাদা আর গ্রামের নামের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল লুকা মদ্রিচ।সার্বিয়ান সেনা বাহিনীতে মেকার হিসেবে কাজ করতেন লুকা মদ্রিচের বাবা।তাঁর দাদা সিনিয়র মদ্রিচও সার্বিয়ান সেনা বাহিনীতে কাজ করতেন।ছোট্ট এই মদরিচিতে শহরে মাঝে মাঝেই সাবেক যুগোস্লাভ সেনা বাহিনীর নৃশংস অত্যাচার চলত।সে সময় সার্বিয়া চেয়েছিলো মদরিচি শহর ছেড়ে চলে যাক ক্রোটরা।১৯৯১-এর ডিসেম্বরে এমনই এক দিন সার্বিয়ার সেনা বাহিনী ছয় বছর বয়সী শিশু ফুটবলার মদ্রিচের সামনেই নৃশংস ভাবে খুন করল তাঁর ঠাকুরদাকে।গ্রেনেড ছুঁড়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁর বাড়িও তাও দেখতে হল তাকে।এক সময় বাধ্য হয়ে মদ্রিচের বাবা-মা তাঁকে আর তাঁর ছোট বোনটিকে নিয়ে আশ্রয় নিলেন একটি জাদার নামক একটি শরণার্থী শিবিরে।এখানেই বড় হন মদ্রিচ।কিন্তু এখানে ছিলো না বিদ্যুৎ, না ছিলো আধুনিক কোনও পরিষেবা।এখানে প্রত্যহ প্রতিনিয়ত গ্রেনেড আর বুলেটের শব্দ পাওয়া গেলেও খাবার বা পানীয় জল কিছুই মিলত না ছিলো না পর্যাপ্ত।মদ্রিচের ছেলেবেলায় খেলার জন্য কোন উপযুক্ত মাঠও ছিলো না সেখানে।সেই শহরের প্রতিটি প্রান্তে ল্যান্ড মাইন পুঁতে রাখতো সার্বিয়ানরা।তাইতো শিশু মদ্রিচদের শরণার্থী শিবিরের বাইরে বেরোবার অনুমতি ছিলো না। কিন্তু তার অদম্য জেদ আর ইচ্ছা শক্তিকে বোধ হয় দমিয়ে রাখতে পারেননি  আর তাইতো সে জেদকে সঙ্গী করেই আজ দুর্বিষহ শৈশবের স্মৃতি ভুলে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের সেরাদের কাতারে।
ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দশ বছর বয়সে ক্রোয়েশিয়ান ক্লাব হাজদুকে গিয়েছিলেন লুকা মদ্রিচ।কিন্তু ছোট খাট গড়ন আর লিকলিকে শরীর হওয়ার কারণে তাঁকে দলেই নেয়নি হাজদুক।আশাহত  হয়েও আশা ছাড়েনি সে।পনেরো বছর বয়সে আরেক ক্লাব ডায়নামোতে নাম লেখাতে সক্ষম হলেন মদ্রিচ।শুরু হলো আবারো ফুটবলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই।২০০৪–০৫ মৌসুমে ডায়নামো থেকে ধারে ইন্টার জাপ্রেসিকোতে খেলেন লুকা মদ্রিচ।এই ক্লাবের তৎকালীন কোচ গ্রিকো বোডানের বর্ণনাতে- নিজে খেলার পাশা পাশি পুরো দলকেই খেলায় লুকা মদ্রিচ।সে রক্ষণের সাথে আক্রমণ ভাগের সেতু বন্ধনের রচয়িতা।এজন্যই সে অনন্য,বিশ্ব সেরা লুকা।ক্রোয়েশিয়ার বিভিন্ন ক্লাব ঘুরে ২০০৮ সালে ইংলিশ ক্লাব টটেনহ্যামে যোগ দেন মদ্রিচ।তখনিই ২০১০–১১ মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের মূল পর্বে স্থান করে নেয় দলটি।এর পরই মদ্রিচকে নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে বড় বড় ক্লাব গুলো।২০১২ সালে মদ্রিচকে দলে ভেড়ায় রিয়াল মাদ্রিদ।স্প্যানিশ সংবাদ মাধ্যম মার্কার জরিপে ২০১২–১৩ মৌসুমে সবচেয়ে বাজে সাইনিং হিসেবে নির্বাচিত হন মদ্রিচ।তখনো হাল ছাড়লেন না তিনি।ধীরে ধীরে মাদ্রিদের মূল একাদশে জায়গা করে নিলেন মদ্রিচ।অসাধাণ নৈপুণ্যের মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের প্রাণ ভোমরা কেবল তিনিই।গত পাঁচ বছরে চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতা অন্যতম সেরা এই ক্লাবটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ও এই ছোট্টক্রোয়েট জাদুকর।তার মতে যুদ্ধ আমাকে প্রেরণা যুগিয়েছে।

আগামীকাল ১৫ জুলাই ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ রবিবার রাত ৯টায় মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ফাইনালে  মুখো মুখি হবে ফ্রান্স এবং  ক্রোয়েশিয়া।পঞ্চম বারের মত বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে এবারই প্রথম বারের মতো ফাইনালের টিকেট উঠে এসেছেন ক্রোয়েশিয়া।এর আগে বিশ্ব কাপে তাদের সর্বোচ্চ অর্জন ছিল সেমিফাইনাল।১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে খেলেছিল তারা।এবারের বিশ্ব কাপে ক্রোয়েশিয়া এখন পর্যন্ত যে ছয়টি ম্যাচ খেলেছে তার প্রত্যাকটিতেই জয় পেয়েছেন।এ নিয়ে  ষষ্ঠবারের মতো মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফ্রান্স এবং ক্রোয়েশিয়া।এর আগের পাঁচ বারের খেলায় ফ্রান্স জয় পেয়েছিল তিনটি ম্যাচে আর বাকি দুইটি ম্যাচ ড্র হয়েছিলো।
এ দিকে ফ্রান্স এ নিয়ে তৃতীয় বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ‍উঠেছেন।এর আগে তারা ১৯৯৮ সালে চ্যাম্পিয়ন ও ২০০৬ সালে রানার আপ হয়েছিলেন। এবারের বিশ্ব কাপে কিলিয়ান এমবাপ্পে-জিরুড-গ্রিজ ম্যানদের ফ্রান্স এখন পর্যন্ত যে ছয়টি ম্যাচ খেলেছে তার পাঁচটিতে জিতেছে ও একটি ম্যাচ ড্র করেছে।এবার দেখা যাবে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত বহু ঘনট অঘটন আর ফুটবল তারকা মেসি নেইমার রোনালদোদের দলকে পিছনে ফেলে শেষ হতে যাওয়া বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮ তে কে জয়ী হন।তবে বহু খেলার সফল ভবিষৎধ্যানীর উটের মতে জিতবে এবার ক্রোয়েসিয়া।আমার সাপোর্টও সেদিকে —যেন হয় মানবতাহীন নিষ্ঠুরতম যুদ্ধ উদ্বাস্তুদের জীবন সংগ্রামীদের জয়।

শুভ কামনা 
“ক্রোয়েসিয়া”

তথ্য ও ছবি কালেক্টসন
কৃতজ্ঞতায়:অনলাইন

২৬০জন ২৬০জন
0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য