বিয়ের অনুষ্ঠান।নিমন্ত্রিত অতিথিদের ভীরে জাঁকজমক কনে পক্ষের প্যাঁরিসের একটি চার্চ।বিয়ের সমস্ত আয়োজন পরিপুর্ণ শুধু বর আসার অপেক্ষা।বিয়ে পড়ানোর পাদ্রীও অপেক্ষায় ক্লান্ত।সময় অতিবাহিত হলেও বর আসছে না কেন এই ভেবে কনের বাবা মসিঁয়ে লরেষ্ট তার এক ঘনিষ্ট বন্ধুকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করলেন।

-কী ব্যাপার!তোমরা সবাই এসে পড়েছো।আমাদের আয়োজনের কোন কমতি নেই শুধু বর আসলেই শুভ কাজটা শুরু করতে পারি-তোমার বন্ধু কোথায়?দেখোনা একটু খোজ করে কোন আসার পথে কোন বিপদ আপদ হলো কীনা?

কনের বাবার কথা মতে বন্ধুটি বরের খোঁজে বের হলেন।বন্ধুটি সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজেও যখন পেলেন না তখন মাথায় চিন্তা এলো তার বন্ধুটি যে কাজ পাগলা ! দেখি একটু ল্যাবরেটরিতে গিয়ে-খোজঁ করে দেখি-সেখানে থাকলেও থাকতে পারে।ল্যাবরেটরিতে গিয়ে দেখলেন বিয়ের পিড়িঁতে বসতে যাওয়া তার প্রিয় বন্ধুটি সব কিছু ভুলে গিয়ে যেন একটি টেবিলের উপর তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে গবেষনার কাজে মগ্ন।তিনি কাজে এতোটাই মনযোগী ছিলেন যে তার বন্ধু আগমনের কোন শব্দই তার কর্ণ স্পর্শ করলনা।বন্ধুটি রাগে জিদে তার কাছে গিয়ে বললেন।

-কীরে আজ না তোর বিয়ে! তোর কী কোন কান্ডাজ্ঞান নাই-চার্চে এতোগুলো অতিথী লোক তোর অপেক্ষায়- তোর অপেক্ষায় তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে বসে আছে তোর বাগদত্তা!আমি আমরা তোকে খোঁজে খোঁজে হয়রান আর তুই কীনা সব ভুলে এখানে পড়ে আছিস?
বরের স্বাভাবিক উত্তর।
-কিছুই ভুলিনি বন্ধু,তবে হাতের কাজটা শেষ করতে পারিনি বলে যেতে দেরী হচ্ছিল।

জ্বী পাঠক আমি কাজ পাগলা লুই পাস্তুরের কথা বলছি যে কীনা জীবনের সকল প্রয়োজনের চেয়ে কাজটাকে সবচেয়ে বেশী প্রধান্য দিতেন।বিয়ে পরবর্তী সময়েও ভালবেসে বিয়ে করা তার স্ত্রীও বেশ সহযোগীতাপূর্ণ ছিলেন।১৮৪৯ সালে বিয়ে করা তার স্ত্রী মেরি লরেন্তেও তার গবেষনা কাজে সায় দিয়ে তার পাশে থেকে উৎসাহ যুগিয়েছেন।তার সম্পর্কে লুই বলেন-
“সে শুধু আমার স্ত্রীই নয় সে আমার গবেষনা কাজের একজন ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা”।

বিজ্ঞান সাধনার সাধক মানবতায় মন কাদে।মানবতার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারলে জীবন সার্থক হবে বলে মনে করেন।ঊনবিংশতাব্দীর মানবতার কল্যায়ণে উৎসর্গ করা বিজ্ঞানীদের মধ্যে লুই অন্যতম।সে সময় ফ্রান্স এবং জার্মান দুইটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে দ্বন্দ সংঘাত লেগেই থাকত।একে অন্যকে ধ্বংস করতে উভয় ব্যাতি ব্যাস্ত ছিলো।উভয় জাতিকে কল্যায়ণ বয়ে আনতে লুই তার গবেষনা কাজে দিন রাত পরিশ্রম করে গেছেন।কখনো কখনো সে তার আবিষ্কারে বাচিয়ে দিয়েছিলেন লক্ষ লক্ষ জীবন।কখনো কখনো বাঁচিয়ে দিয়েছেন দেশের অর্থনৈতীক ধ্বংস হয়ে যাওয়া ব্যাবসা বানিজ্য সহ অনিশ্চিৎ জীবন ধারা।

সংক্ষিপ্ত আকারে জেনে নেই বিশ্ব মানবতার কল্যায়ণে আবিষ্কিত তার উল্লেখ্যযোগ্য অবদানগুলো। 

জলাতঙ্ক!এক অজানা রোগের নাম-এক ভীতিকর রোগ যা হলে মানুষ অনেকটা কুকুর স্বভাব সুলভ আচরণ করেন ,পানি দেখলে ভয় পান।ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় প্রাচীন গুহায় অঙ্কিত চিত্রেও কুকুর কামড়ের ছবি।এই ভয়াবহ রোগটিকে নির্মুল করতে যখন বিশ্ববাসী আতঙ্কিত তখনি আর্বিভাব ঘটে লুই পাস্তুর নামের এক মহৎ মানবতাবাদী বিজ্ঞানীর। তাহলে আসুন জেনে আসা যাক কে এই বিজ্ঞানী?বিজ্ঞানী হয়ে উঠার কী তার রহস্য ?

১৮২২ সাল।ফ্রান্সের এক হত দরিদ্র পরিবারের চামড়া ব্যাবসায়ীর জিন জোসেফ পাস্তুর।মানবতা ভরা তার মন।অশিক্ষিত তিনি খুব আক্ষেপ করে একদিন বলেছিলেন-

“আহা যদি আমি লেখাপড়া করতাম তাহলে হয়তো আমাকে এমন দুগন্ধময় ময়লা আর্বজনায় চামড়া সংগ্রহের কাজ করে জীবন চালাতে হতো না”।

ঈশ্বর মহান।তিনি সব বান্দার মনের খবর রাখেন হয়তো সেই কারনে একদিন ঈশ্বর তাদের সংসারকে আলোকিত করতে তার স্ত্রীর কুল জুরে একজন পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন।ঠিক সেই সময় জিন জোসেফ পাস্তুর তার ছেলেকে তিনি যত কষ্টই হউক না কেন তাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেন।


লুই পাস্তুরের জন্ম ১৮২২ সালে এক দরিদ্র পরিবারে হলেও তার পিতা শপথের কথা মনে রেখে ব্যায় বহুল বিদ্যালয়ে ভর্তি করান।লুই লেখাপড়ার পাশা পাশি বাবার ব্যাবসায়ীক কাজেও সহযোগীতা করেন কিন্তু পড়ালেখায় মাঝে মধ্যে অনিহায় এসে পড়তেন।
লুইয়ের পরিবার যেখানে বসবাস করতেন তা ছিলো জঙ্গলে ভরা।উচুনীচু পাহাড় আর দুর্ভেদ্য জঙ্গল।সে সময় সে সব জঙ্গলে বসবাস করত হিংস্র নেকড়ের দল।এই সব নেকড়ে দলবেধে জঙ্গল হতে বের হয়ে হঠাৎ হঠাৎ লোকালয়ে এসে মানুষজন কামড়াতে লাগলেন।একদিন তাদের প্রতিবেশী প্রায় আটদশকে নেকড়ে কামড়ালে পুরো এলাকাটি আতঙ্ক আর ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।গ্রামবাসীরা যদিও ঐ নেকড়েটিকে হত্যা করে কিন্তু নেকড়ে কামড় দেয়া ঐ আটদশ জনের মধ্যে পাচ ছয় জনের নেকড়ে স্বভাব লক্ষ্য করা যায়।খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাদের শারিরীক অবস্থা খারাপের দিকে ধাপিত হয় এবং কিছু দিনের মধ্যে তারা জলাতঙ্ক রোগে সবাই মারা যান।এমনকি এমন একটিও রেকর্ড নেই সেই সময় কেউ জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত বেচে গেছেন।তখন এ রোগের গন্তব্য ছিলো নিশ্চিৎ মৃত্যু।

সে সময় বালক লুই এ সব ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীতায় নিজেকে মানব জাতিকে পৃথিবীর শ্রেষ্ট জীব ভাবতে কষ্ট হত।সামান্য নেকড়ে,বাদুর,বিড়াল,ইদুরের কামড়ে জলাতঙ্ক রোগ হলে তা ভাল করে দেয়া বা প্রতিরোধের ক্ষমতা মানুষের নেই তা তিনি অবাক হতেন। সেই ভাবনা তাকে বেশ কষ্ট দিতো।শুধু লুই বালক কেন সেই সময়ে কারো পক্ষেই এ রোগ প্রতিরোধের কোন চিকিৎসাই জানা ছিলো না ।তখন এ রোগের কোন ঔষধই তৈরী হয়নি।
মানুষ কেন জলাতঙ্ক রোগের কাছে এতো অসহায় হবে? কেনই বা বিজ্ঞ মানুষ এ রোগ সারাতে ঔষধ তৈরীতে অক্ষম? এমন সব বিষয় নিয়ে খুব মনক্ষুন্ন অবস্থায় বসেছিলেন ঘরে তখন তারা পিতা জানতে পারলেন তার এমন মনক্ষুন্ন ভাবে বসে থাকার ঘটনা।পিতা তখন তাকে অভয় দিয়ে বললেন।

-কেউ না পারুক তুমি কেন আবিস্কার করছো না এ রোগের প্রতিষেধক টিকা।ঠিক মত লেখা পড়া করো দেখবে তুমিই পারবে এ মহামারী রোগের প্রতিষেধক টিকা তৈরী করতে-তুমিই পারবে এ ভয়কে জয় করে সমস্ত মানব জাতির কল্যায়ণ বয়ে আনতে।

লুই বাবার এমন সাহসী কথা তার মনে গেথেঁ যায়।সে মনে মনে পণ করে ভাল ভাবে লেখাপড়া করে এ রোগের প্রতিষেধক টিকা সে আবিষ্কার করবেন।লেখা পড়ায় মনযোগী লুই ১৮৩১ সালে প্রাথমিক এরপর মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করলে উচ্চ শিক্ষার্থে ১৮৩৮ সালে তার পিতা তাকে প্যারিসে পাঠান।সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে এক সময় সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে অধ্যাপনায় যোগ দেন।


তার আবিষ্কারে উঠে আসে চমকপ্রদ কিছু তথ্য।প্রায় সব খাদ্যেই ছোট বড় কিছু প্রানী থাকে যা খালি চোখে দেখা যেতো না।সুক্ষ্ম অনুবিক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখতে হত।তিনি এক সময় তা আবিষ্কার করে এ সব সুক্ষ্ম প্রানীগুলোর নাম দিয়েছিলেন “জীবাণু”।লুই এক সময় এক সময় লক্ষ্য করলেন খাদ্যে এই অনু জীবাণুগুলো উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারেন না।তখন তিনি দুধকে ৭৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তাপ দিয়ে দেখলেন তাপহীন দুধ যত ক্ষননা ভাল এবং খাবার উপযোগী থাকে তার চেয়ে বেশী সময় ভাল এবং খাদ্য উপযোগী থাকে তাপ দিয়ে গরম করে নিলে। তখনি তিনি চিন্তা করলেন যদি খাদ্যগুলো জীবানুর প্রভাবে নষ্ট হতে পারে তবে মানব দেহেও কোন না কোন জীবানু প্রবেশ করলে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান।জলাঙ্কতক রোগ হওয়ার বেলায় হয়তো এমনি কিছু ঘটনা ঘটে থাকে।সেই মুহুর্তে তিনি যেন জলাঙ্কতক রোগ প্রতিরোধের টিকা আবিষ্কারের দিক খুজেঁ পেয়ে গেলেন।

তার মহানুবভতা মন কেদেঁ উঠে-যদি সে কোন না কোন ভাবে জলাঙ্কতক রোগের ঔষধ আবিষ্কার করতে পারতেন তাহলে অসংখ্য মানুষকে নিশ্চিৎ মৃত্যুর হাত হতে রক্ষা করতে পারতেন।এই ভাবনায় সে তার গবেষনা ল্যাব্রেটরিতে আরো বেশী মনযোগী হলেন।যেখানেই শুনেছেন জলাতঙ্ক রোগের কথা সেখানেই ছুটে যেতেন।সম্ভব হলে কামড়ানো নেকড়ে ধরে তার রক্ত নমুনা পরীক্ষা চালিয়ে যেতেন।নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে গবেষনা কাজ সহজ করার জন্যে তার ল্যাব্রেটরির পাশেই তিনি হিংস্র নেকড়ে পুষতেন।গবেষনার এক পর্যায়ে জলাতঙ্ক রোগের জন্য কোন জীবাণু দায়ী তা আবিষ্কার করে ফেললেন।

তিনি লক্ষ্য করলেন জলাতঙ্ক রোগের বাহক নেকড়ে সহ অন্যান্য প্রানীদের শরিরের সাথে লালায়ও এ রোগের জীবাণু বিদ্যমান।যখন কোন জলাতঙ্কে আক্রান্ত প্রানী যখন কোন মানুষ কিংবা প্রানীদের কামড়ায় তখন ঐ প্রানীর মুখ থেকে আসা লালার সংস্পর্শে আসা প্রানীও এ রোগে আক্রান্ত হয়।এ ভাবেই লুই নিশ্চিত হন জলাতঙ্ক রোগের কারন এবং এ রোগ কী ভাবে প্রানী থেকে মানুষ বা অন্য কোন প্রানীদের মাঝে ছড়ায়।

এবার লুই আরেকটি চিন্তায় পড়লেন,কী ভাবে মানব দেহে এ রোগের সমাধী করবেন কারন মানব দেহতো আর গরম দুধের মত গরম করে তাপমাত্রা বৃদ্ধি করা যাবেনা তবে তিনি জানতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে প্রতিটি মানব দেহেই শরিরে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা থাকে আমরা যাকে বলি ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যাবস্থা।কিন্তু তখনো তিনি বুঝতে পারছেনা তাহলে জলাতঙ্ক রোগ কেন মানব দেহ প্রতিরোধ করতে পারছে না। সমস্যা যেমন যেমন আছে তার সমাধানও আছে।
ঠিক সেই সময় তার কাছে ছুটে এলেন তার এক জন বন্ধু।তিনি খবর বয়ে আনলেন মুরগীর মাঝে এক ধরনের কলেরা রোগের কথা যা কীনা খুব দ্রুত ফ্রান্সের মুরগীর এক খামার হতে অন্য খামারে ছড়িয়ে পড়ছে।অসংখ্য মুরগী মারা যাচ্ছে।খামার ব্যাবসায়ীরা দেউলিয়া হয়ে যাবার পথে।লুই এরপর মুরগীর কলেরা রোগ নিয়ে গবেষনা শুরু করে দিলেন।গবেষনার এক পর্যায়ে তিনি লক্ষ্য করলেন এমন কিছু জীবাণু আছে যারা ইমিউন সিস্টেমকে উপেক্ষা করে গোপনে প্রানী বা মানব দেহে রোগে আক্রান্ত করে থাকে। তার ধারনা যদি মানব দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গোপনে আসা জীবাণুগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে তাহলে এর ধ্বংস করাও সম্ভব।

অনেক সাধনার পর তিনি একদিন সফল হলেন।মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া কলেরা রোগবাহী মুরগীর শরীর থেকে রোগের জীবাণু আলাদা করলেন।এরপর এক বিশেষ প্রক্রীয়ায় মুরগীর কলেরা রোগের জীবাণু নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হলেন।তাতে জীবাণুগুলো আর নতুন কোন রোগ সৃষ্টি করতে পারছিলোনা।এরপর তিনি নিষ্ক্রিয় জীবানুর সাহায্যে তার তৈরী টিকা সুস্থ সবল দেহে প্রয়োগ শুরু করলেন।এর ফলাফল ছিলো অত্যান্ত ফলপ্রসু।তিনি যে সব সুস্থ মুরগীগুলোর উপর টিকা প্রয়োগ করছেন সে সব মুরগীগুলো সু্স্থ সবল ভাবে বেচে থাকছে আর যেসব মুরগীগুলোতে টিকা প্রয়োগ করা হয়নি তা কলেরা জীবাণুতে আক্রান্ত হয়ে মারা পড়ছে।অবশেষে লুইয়ের ধারণা সঠিক প্রমাণীত হয়।

তার আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন যখন মুরগির শরীরে প্রয়োগ করেছিলেন তখন ভ্যাকসিনে জীবাণু নিষ্ক্রিয় হবার কারণে মুরগিগুলোর কোনো ক্ষতি হয়নি। অপর দিকে নিষ্ক্রিয় জীবাণু গুলো সক্রিয় জীবাণুর ন্যায় মুরগির শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা থেকে নিজেদেরকে লুকাতে পারে নাই। তাতে করে মুরগীগুলোর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় এবং সক্রিয় উভয় ধরনের জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করা শিখে যায়। তার এ আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে এর পরবর্তী কয়েক দশকে বহু প্রাণঘাতী রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়েছে এবং বলা যায় এখনও হচ্ছে।

লুই পাস্তুর তার গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ভাবলেন, যে প্রক্রিয়ায় মুরগির শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মায়, তা কি অন্য রোগ বা অন্য প্রাণীর বেলাতেও কার্যকর হবে ? হতেও তো পারে! অন্যান্য রোগ যদি জীবাণুর কারণে হয়, তবে জলাতঙ্কের বেলাতেও নিশ্চিত এসব জীবাণু দায়ী। আর এ জীবাণুকে কাবু করতে পারলেই হয়তো জলাতঙ্কের প্রতিষেধক তৈরি করা যাবে। তার ধারণা এবারও সঠিক ছিল। তিনি ঠিক একই তত্ব  ব্যবহার করে জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিনও আবিষ্কার করে ফেললেন।
মদ শিল্প
যখন তার বয়স মাত্র বত্রিশ তখন তিনি লিলে বিশ্ব বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের ডিন ও প্রধান অধ্যাপক হিসাবে নিয়োগ পান এবং সেই সময় ফ্রান্সের অর্থনৈতীক মুনাফা অর্জনকারী বিশ্বখ্যাত ফ্রান্সের মদ ব্যাবসায় ধষ নামতে থাকে।প্রডাক্টসনের পর পরই যখন মদের স্বাদ অতিরিক্ত চুকা হয়ে যায় তখন বিশ্ব বানিজ্যে এর অর্ডার বাতিল হতে থাকে।ফ্রান্স সরকার খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন।অনেক চেষ্টা করেও সমাধন এর কারন খুজে পেতে যখন সরকার প্রায় ব্যার্থ তখন দায়ীত্ব গিয়ে পড়ল লুইয়ের উপর।লুই তার সাধ্য মত গবেষনা শুরু করে অবশেষে মদগুলোকে ১২০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রায় গরম করে দেখলেন মদে আর কোন চুকা ভাব নেই।বাচিয়ে দিলেন দেশে অর্থনৈতীক অচল ব্যাবস্থা।বাচিয়ে দিলেন লক্ষ লক্ষ ব্যাবসায়ীদের জীবন চালিকা ব্যাবসা বানিজ্য।তার এই থিউরিকে বলা হয় পাস্তুরাইজশন ব্যবস্থা।যা পরবর্তীতৈ বহু চিকিৎসক তার এ তথ্য বিভিন্ন কাজে লাগিয়েছেন।
জীবানু তত্ব

অণুজীবের মাধ্যমে কিছু রোগ সংঘটিত হতে পারে এবং সেগুলো জল ও বায়ু দ্বারা ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম।তার এমন তত্ব বেড়িয়ে আসে ১৮৬৭ লুই সরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে যোগদান করেন সে সময় তিনি জীবাণু তত্ব(Bacteriology)নিয়ে গবেষনা করেন।তার এ তত্বের মুল থিম ছিলো অণুজীব কোন বৃহদাকার জীবের শরিরে রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
রেশম শিল্প
সে সময়ে ফ্রান্সের অর্থকারী অন্যান্য শিল্পের মধ্যে রেশম শিল্প ছিলো অন্যতম।১৮৬৫ সালে গুটি পোকায় হঠাৎ অজানা এক রোগের আক্রান্তে শিল্প ও শিল্প সংশ্লিষ্টরা বেশ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিলেন।এর সমাধানে ফ্রান্স সরকারে ভরসার পাত্র ছিলেন পাস্তুর। লুই অনেক গবেষনায় বুঝতে পারলেন রেশম পোকায় এ রোগটি হওয়ার মুলত কারন হল গুটি পোকার বংশগত অথাৎ এরা মায়ের পেট হতেই এ রোগের বীজ নিয়ে আসে।তাই তিনি কেবলমাত্র রোগে আক্রান্ত গুটি পোকাগুলোর উপর গবেষনা শুরু করেন।প্রতিদিন প্রায় আঠারো বিশ ঘন্টা কাজ করে একটানা তিন বছর গবেষনা চালিয়ে এর কারন এবং সমাধান আবিষ্কার করে ফেলেন।
স্পষ্টভাষী ও দেশ প্রেমীক লুই
লুই এর প্রবল দেশপ্রেম নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।সেই সময় ফ্রান্স এবং জার্মানের মধ্যে যুদ্ধের লেলিহান শিখা জ্বলছিলো।দেশপ্রেমিক মন লুই এর মন কাদে যুদ্ধে যাবার কিন্তু তার শারিরীক গঠন এবং গবেষক মন তাকে সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে যেতে না দিলেও তিনি যুদ্ধবাজ জার্মানীর তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছেন যার কারনে সে বছর জার্মানের বর্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মান সুচক ডক্টরস অফ মেডিসিন উপাদি প্রদান করে ছিলেন কিন্তু ফ্রান্সে জার্মান বাহিনীর হামলার নিন্দা স্বরূপ তাকে দেয়া সেই উপাদী ফিরিয়ে দিয়ে একটি চিঠি লিখে পাঠিয়ে দেন বন বিশ্ব বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের নিকট।

দামী দামী সব আবিষ্কারের মজুরী স্বপ্ল নেয়ায় অবাক হয়ে সম্রাট তৃতীয় নেপোলিন তাকে একবার জিজ্ঞাসা করলেন এর কারন কী? তখন তার স্বভাব সুলভ ভাষায় জবাব দিলেন অনেকটা এরকম ভাবে-
“বিজ্ঞানীরা কখনো তার নিজের জন্য বা ব্যাক্তিগত স্বার্থের জন্য কাজ করেন না”।

সম্মাননা ও পদক
১৮৫৩ সালে প্রথম ফার্মাসিউটিক্যাল সোসাইটির পক্ষ হতে রেসমিক অ্যাসিড সংশ্লেষনের জন্য তাকে ১৫০০ ফ্রাঙ্ক সম্মাননা দেন।
১৮৫৬ সালে রামফোর্ড পদক।রেসমিক অ্যাসিডের প্রকৃতি ও আলোর পোলারাইজেশনের জন্য এ পদক পান।
১৮৭৪ সালে কোপালি পদক।রাসায়নিক গাজঁন নিয়ে গবেষনায় এ পদক পান।
১৮৬০ সালে মন্টিওন পুরষ্কার দেন ফ্রেন্স একাডেমী অব সাইন্স।
১৮৬১ সালে জ্যাকার,১৬২ সালে লহম্বার্ট পুরষ্কার এবং ১৮৮৬ সালে লুইকে মেডিজিডির অর্ডার প্রথম শ্রেনীতে ভূষিত করে ১০০০০ অটোম্যান লিরা পুরষ্কার দেন।১৮৮৭ সালে তার সন্মানে গড়ে উঠে পাস্তুর ইনস্টিটিউট।লুইয়ের জীবনে ক্যামেরন পুরষ্কার ও লিউভেনহোক মেডেল সহ অসংখ্য সামরিক বেসামরিক পদক উপাদী সন্মাননা পুরষ্কারে ভূষিত হন।

তার জীবনে সব চেয়ে পরম পাওয়া হল তার জন্মদিনে ফ্রান্স সরকার জাতীয় ছুটি ঘোষনা করেন।সেই অনুষ্ঠানে আসা দেশী বিদেশীদের উপস্থিতে সহজ সরল পাস্তুর বক্তব্যে বলেছিলেন-

“আমি সারা জীবন ধরে বিশ্বাস করেছি,একমাত্র বিজ্ঞান আর শান্তির চেতনাই পারে সমস্ত অজ্ঞতা আর যুদ্ধের বিভীষিকার অবসান ঘটাতে।বিশ্বাস করুন একদিন বিশ্বের সকল দেশই একমত হবেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে,শান্তি-সহযোগীতার পক্ষে আর সেই ভবিষৎ হবে বর্বরদের নয় শান্তি প্রিয় মানব জাতির।

বক্তব্যে বুঝা যায় তিনি যে কতটা মানব দরদী ছিলেন।তার মতে বিজ্ঞানের সকল আবিষ্কারই মানব কল্যায়ণকর নয় কিছু কিছু আবিষ্কার মানব ধ্বংসেরও আছে যা মানুষ হয়ে কখনো আমার কাম্য নয়।

মানব দরদী লুইয়ের সংক্ষিপ্ত জীবনের সীমাহীন কৃতিত্ব বলে শেষ করা সম্ভব নয়।যতদিন বেচে ছিলেন ততদিন মানব কল্যায়ণে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে আজ সে বিশ্বমনে অমর হয়ে আছেন।বিবাহীত জীবনে জীবন সঙ্গীর সহযোগীতা তাকে এতো উচু মাত্রায় নিয়ে যায়।সংসার জীবনে পাচ সন্তানের জনক লুই সন্তানদের শৈশবেই মরণব্যাধি টাইফয়েডে তিন সন্তানকে প্রান কেড়ে নেয়।

১৮৬৮ সালে স্ট্রোক করেন।এ পর্যায় উন্নত চিকিৎসায় বেচে গেলেও ১৮৯৪ সালে ফের আরেকবার স্ট্রোকে শিখার হন।এ পর্যায়ে তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকলে অবশেষে লুই পাস্তুর ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসাবে থাকাকালীন সময়ে ১৮৯৫ সালে পরলোক গমন করেন।

————————————-

লেখাটি পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
ছবি ও তথ্য সহযোগীতায় অনলাইনের বিভিন্ন মাধ্যম,ওয়েভসাইট বিশেষ করে

Roar media.

২৪৩জন ১৩৩জন
32 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য