লাল শার্ট

অনুশঙ্কর গঙ্গোম্যাক্সিম ২৪ নভেম্বর ২০১৩, রবিবার, ১২:৪৮:০১পূর্বাহ্ন বিবিধ ৯ মন্তব্য

ঘরের ছাউনির ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো মুখের উপর পড়েছে। হাবিবা বেগম দুই ছেলেকে নিয়ে ঘুমিয়ে আছে তুলাতলীর বস্তিতে। ওদের বাবা শহরে গেছে কাজের সন্ধানে আজ দুই মাস ,কোন খবরাখবর নেই। ছোট ছেলে জীবন কেঁদে উঠল আম্মু খাওন দাও। হাবিবা বেগমের কপালে চিন্তার রেখা,ঘরে তো কিছুই নেই। বড় ছেলেকে টেনে তুলে বললেন যা বাহিরে যা ,কাজ কাম কইরা কিছু টাকা পয়সা ইনকাম হয় কিনা দেখ। ঘুমকাতুর চোখে উঠে কাজের সন্ধানে বেড়িয়ে পরে বাবু। গতকাল যে বাড়িতে কাজ করেছে আজও সে বাড়ির গেইটে গিয়ে দাড়িয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর বড় সাহেব অফিসে যাওয়ার সময় বলে যায়,” ওই ভিতরে যা, বাগানের আগাছা গুলো পরিস্কার করে ফেল, বিকেলে আমি আসলে একসাথে পানি দিব,সাবধানে করবি যাতে গাছগাছালির কোন ক্ষতি না হয় “।
বাবু ভিতরে গিয়ে বাগানের কাজ করতে লাগল। দুপুরে ওই বাড়ির কাজের লোক এসে ভাত দিয়ে যায়, ভাত গুলো না খেয়ে বাবু রেখে দিল বাসায় এনে সবাই খাওয়ার জন্য। বিকেলে বড় সাহেব এসে বাবুর কাজ দেখে খুশি হয়ে পাঁচশো টাকা দেয়। খুশি মনে বাবু টাকাটা নিয়ে হাটতে থাকে বাজারের রাস্তা দিয়ে, হঠাৎ কাপড়ের দোকানের সামনে শো তে তারপ্রিয় “লাল শার্ট “দেখে থমকে দাঁড়ায়। কাচুমাচু করে দোকানদারের কাছে দাম জানতে চায়। পাঁচশো টাকা শুনে ঘরের পথে পা বাড়ায় বাবু। ভাবতে লাগে পাঁচশো টাকার সাথে একশ টাকা যোগ করলে একমাসের ঘরভাড়া হয়ে যাবে ,তাছাড়া শহরে যাওয়ার সময় আব্বুকে বলেছিল যেন একটি” লাল শার্ট “নিয়ে আসে। ঘরে ফিরে টাকাটা মা কে দিয়ে দুপুরের না খাওয়া ভাত গুলো গরম করে খেয়ে ঘুমাতে যায় বাবু আর জীবন। পরের দিন কাজের আশায় আবার ওই বাড়িতে যায়। আজ বাড়ির গৃহিণী ঘরের কিছু কাজ করার জন্য বাড়ির ভিতরে নিয়ে যায় তাকে । বাবুর পরিবারের কষ্টের কথা শুনে মাসিক বেতনের ভিত্তিতে চাকরিতে রাখতে রাজি হয় সাহেবের স্ত্রী । বেতন তিন হাজার টাকা। চাকরি পেয়ে সন্ধ্যায় খুশি মনে ঘরে ফিরে বাবু, মা কে বলে সব কথা। মা ও খুশি হয় হয়তো কষ্ট কিছুটা কমবে।
কতদিন হলো ওর বাবার কোন খবর নেই, আল্লাহ জানে কি অবস্থায় আছে। প্রতিদিনের মত সে দিন ও চাকরিতে গেল বাবু, আজ সাহেব বলে গেছে পানির ট্যাংক যাতে ভালো করে পরিস্কার করে রাখে। বাবু ছাদের উপর গিয়ে রেলিং দিয়ে ট্যাংকে উঠার সময় তার হাতে থাকা লোহার নলটি ১১০০০ ভোল্টের তারের সাথে স্পর্শ হয়,সাথে সাথে চিৎকার দিয়ে নিচে পড়ে যায়। বাড়ির সবাই এসে তাড়াতাড়ি করে ধরে দেখে বাবু অজ্ঞান। দ্রুত এম্বুলেন্স এনে মেডিকেল নেওয়া হয়, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহার চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। এম্বুলেন্স করে লাশ আনা হলো তুলাতলীর বস্তিতে। ছোট ভাই আর মা কাঁন্নায় ভেঙে পরলেন। বিকেলে বাবুর লাশ দাফন করা হলো পাশের গোরস্তানে। সন্ধ্যা প্রায় নেমে এলোও নিস্তব্ধ পুরো বস্তি। গাছের ডালে দুপুর থেকে ডাকা কাকও এখন আর ডাকছে না,হইতো ছেলেহারা মা ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেছে ,যদি ঘুম ভেঙে যায় সে ভয়ে।
একমাস পর শহর থেকে ফিরে আসে বাবুর বাবা,বাবুর জন্য নিয়ে আসে প্রিয়” লাল শার্ট”। সব শুনে নির্বাক হয়ে যান তিনি। শহরে মাঝরাতে একা রাস্তায় পেয়ে চোর সন্দেহে নিয়ে গিয়ে তিনমাসের জেল দেয় পুলিশ। বাবুর ছোট ভাই জীবন লাল শার্টটি বাঁশের মাথায়
বেঁধে বাবুর কবরের পাশে গেড়ে দিয়ে আসে। দক্ষিণের বাতাসে উড়ছে লাল রংএর বাবুর প্রিয় শার্টটি।

১৯০জন ১৯০জন
0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য