লাল পাহাড়ের দেশে

আরজু মুক্তা ২৬ মে ২০২১, বুধবার, ১২:৩৪:৫১পূর্বাহ্ন অণুগল্প ৩৫ মন্তব্য

দুই বন্ধুর কাজ হলো পতেঙ্গার মেরিন ড্রাইভের রেলিং এ পা ঝুলিয়ে বসে কর্ণফুলী আর বঙ্গোপসাগরের উথাল পাতাল ঢেউ দেখা। পাথরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির কেমন জানি একটা জলপ্রপাতের মতো শব্দ হয় তা শোনা। আর হুটহাট প্ল্যান করে বেড়িয়ে পরা। ছুটি পাইছি। কোন কথা নাই। ব্যাগ গোছাও। ছুটে চলো।

সবাই আমারে ডাকে সন্জীব চাকমা। আদতে আমি পাহাড়ি নই ; বাঙালি।  অচেনা টানে আমিও পাহাড়ি ঝর্ণা হয়ে থেকে গেছি। গতবছর বৈশাখি উদযাপন করেছিলাম রাঙামাটিতে। ওর যেহেতু গাড়ি। শুধু আমার হ্যাঁ বলার অপেক্ষা। আমি ঝট করে বললাম, ” চলো, লাল পাহাড়ের দেশে। ”

আমরা উঠলাম সাজেকের “মেঘ রোদ্দুর ” কটেজে। সাজেকে বেড়াতে গিয়ে একটা কথা মনে হয়েছে। পাহাড়িদের চেনা পরিচিত জায়গাগুলো মানুষের সাথে সাথে প্রকৃতিও তার সবুজ, হলুদ, লাল, কালো নানা রঙের নিশান উড়িয়ে দেয় জোনাকির মতো। ঝাড়লণ্ঠন আকাশের চাঁদোয়ার নীচে অন্ধকার রাতে। এভাবে হয়তো, বনের সাথে বন, ফুলের মধ্যে ফুল, কিংবা স্মৃতির মধ্যে স্মৃতি বেঁধে যায়। চিনবার উপায় নাই।

মেঘ দেখার জন্য দুই বন্ধু খুব সকালে উঠে যেতাম। দূর থেকে চোখে পরতো ” পাহাড় কেমনে আকাশে হেলান দিয়ে ঘুমায়। ” মনে হতো সবুজ কার্পেটে সাদা ধোঁয়া। পাহাড়িরা কোন সকালে উঠে দূরের ঝর্ণা থেকে গোসল সেরে পানি নিয়ে আসতো।

“মা গো !”

শব্দশুনে আমি আর ইমন বাহিরে বের হয়ে দেখি ; তিন পাহাড়ি সুন্দরির,  একজনের স্যান্ডেল ছিঁড়ে গেছে। আর পানির কলস থেকে পানি পরে একাকার।  মনটাই খারাপ হলো। বেচারি এতো কষ্ট করে উপরে উঠেই এই দশা। দ্রুত রুমে গিয়ে স্ট্যাপলার এনে স্যান্ডেল ঠিক করে দেই। মাথার খসে পরা বুনো ফুলটাও দেই কুড়িয়ে। কেমনে জানি পাঁচদিনেই গাঢ় ভাব হয়ে গেলো। গল্প করার থেকে শোনা হয় বেশি। ওদের কণ্ঠের যাদুতে আমরা মুগ্ধ।  আতিথেয়তাও কম যায়না। কতো রকমের যে বুনো ফল খেলাম। কচি বাঁশের তরকারি। বন মোরগ।

ফেরার সময় ঝুড়ি বোঝাই করে আমলকি, কলা, কচি বাঁশ, বাঙ্গি, বিভিন্ন পিঠা দিয়েছিলো। শহরে ফিরে মন বসে না। মন তো লাল পাহাড়ের সবুজ কার্পেটের বুনো ফুলের অকৃত্রিম সৌন্দর্যের চোখের চাহনীতে আটকে গেছে।

ইমন বলে, ” বাদ দে। তোকে মারিয়া মাটিতে পুঁতে রাখবে। কাজ কর। সমুদ্রের ডাক শোন।”

ওকে না বলেই রওনা দেই। পৌঁছে দেখি, চোখের নীচে কালি। নাম তার কনকবালা। আমাকে দেখে আবেগে উচ্ছ্বসিত। ওর মাকে রাখ ঢাক না রেখে বললাম, ” বিয়ে করবো !” শুনে অগ্নিশর্মা হয়ে বললো, ” গেলে একবারে যাবা। ”

সেই থেকে ‘মেঘ মাচাং ‘ কটেজ এর কাছেই একটা রেস্টুরেন্ট দিয়েছি। দুজনেই কাজ করি। ভালোবাসা থাকলে, সব কিছুই জয় করা যায়।

ইমন মাঝে মাঝে আসে আমাদের দেখতে। ওকে বলি, কিছু না দিতে পারলেও তোকে ক্যামিক্যাল মুক্ত ফল সবজি খাওয়াতে এবং দিতে পারবো।

সুখেই আছি। আপনারাও চলে আসেন ” লাল পাহাড়ের দেশে। ”

 

★ ছবি : নিজ

৩৪১জন ৬জন
0 Shares

৩৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য