লাইফ ইজ বিউটিফুল-

বন্দনা কবীর ২৬ আগস্ট ২০১৩, সোমবার, ০১:০২:০৭পূর্বাহ্ন বিবিধ ১৮ মন্তব্য
– এভাবে বলতে হয় না মিতি।
– কি ভাবে বলতে হয় হ্যা? আমি আর পারছিনা সাব্বির, আমি সত্যিই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এবার আমি মুক্তি চাই।
– চাইলেই তো আর সব কিছু পাওয়া যায় না…
– হ্যা যায়, এক’শোবার যায়, ইচ্ছে করলেই যায় । আমি চাইলেই হবে’ মূহুর্তেই খেপে ওঠে মিতি ।
– আহ্‌ কি হচ্ছে?! শান্ত হও প্লিজ। এরকম করলে তোমার শরীর আরো খারাপ করবে…
– আর কত খারাপ করবে? করলে করুক তাহলে। এক্কেবারে বিকল হয়ে যাক খারাপ করে। আমি বাঁচি। আমার আর রোজ মরতে ইচ্ছে করেনা…
– প্লিজ থামো তোমার পায়ে পড়ি। দেখো তোমার শ্বাস ফুলছে…
– ফুলুক। ফুলতে ফুলতে ফেটে যাক একেবারে। তোমারও মুক্তি আমারো মুক্তি… হা হা হা
– আহ্‌ কি হচ্ছে?! কি পাগল হয়ে গেলে নাকি?!
– হ্যা আমি পাগল হয়ে গেছি। একেবারে পাগল হয়ে গেলেও তো ভালো হত, না? এ্যাই সাব্বির? পাগলেরা কি রোগ শোক টের পায়? পায়না, তাই না? আমি তাহলে পুরো পাগল হয়ে যাই? খুব মজা হবে তাহলে। কিছুই টের পাবোনা।সাব্বিরের মাথা ঘুরছিল । এমনিতেই সারা রাত জাগন, তার উপরে ভোর ভোর মিতির এই সব… নার্ভে টান পড়ে সাব্বিরের । বড় একটা শ্বাস ফেলে উঠে নিজের ড্রয়ারটা খোলে চাবি দিয়ে। একটা প্রেশারের অষুধ জ্বীভের তলায় ফেলে চাবি ঘুরিয়ে বন্ধ করে ড্রয়ারটা ।

শকুনির মত তাকিয়ে আছে মিতি সাব্বিরের হাতের চাবির দিকে । ক্রুর চোখে দুই লহমা তাকিয়ে থেকে হা হা করে হেসে ওঠে ।

– চাবি দিয়ে আর কতদিন মৃত্যু ঠেকাবে হ্যা? একদিন তোমার ভুল হবেই।

অসহায় চোখে মিতির দিকে তাকায় সাব্বির। রোগে ভুগে ভুগে মেয়েটার মাথাটা সত্যিই বিগড়েছে। গত সাত মাসে চারবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। দুইবারই উল্টাপাল্টা রাজ্যের অষুধ খেয়ে। হাতের কাছে যত রকমের অষুধ পেয়েছে সবগুলো খেয়ে নিয়েছিল। প্রথমবার সাব্বির ভেবেছিল মিতি বোধ হয় ঘুমের অষুধ চিনতে না পেরে সব ধরনের অষুধই খেয়ে নিয়েছিল। পরের বারে সাব্বিরের সে ভুল ভেঙ্গেছে।
না, ভুলে নয়। মিতি ইচ্ছে করেই অমনটা করেছে। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা প্রায় নেই এমন শরীরে অতোগুলো অদরকারী অষুধ ভালোই কাজ করে। পাঁচ পদের ড্রাগ রিয়েকশনে মৃত্যুর মূল ফটকে প্রায় পৌছেই গিয়েছিল মিতি গেলবার। একবার হাতের রগ কেটে মরার চেষ্টা করেছিল। দূর্বল হাতে ঠিক মত নেইলকার্টারের ছুরিটা ঘষে ওঠার আগেই ঝি মেয়েটা দেখে ফেলেছিল ভাঁজ করা শুকনো কাপড় গুলো মিতির ঘরে রাখতে এসে। তাতেই রক্ষা হয়েছিল সেবার। আরেকবার সিলিং এর সাথে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস নিতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল। কাজের মধ্যে মাথা ফাঁটাই সার। তিনটা স্টিচ দিতে হয়েছিল।

প্রতিবার এই সব পাগলামি করে মিতি আর সব ধরনের যন্ত্রনা পোহাতে হয় সাব্বিরকে। ডাক্তার পুলিশ আত্মীয় স্বজন সবাই মিতির এই সব কান্ডের পেছনে সাব্বিরকেই যে দায়ি করে পরোক্ষে এটা সাব্বির বেশ ভালোই বোঝে। শুধু বোঝেনা তার দোষটা কোথায়? হ্যা, অসহায় সাব্বির অনেক চেষ্টা করেও, হাজার ডাক্তার দেখিয়েও মিতিকে সুস্থ্য করতে পারেনি এটাই বোধ হয় সাব্বিরের দোষ ।

মিতির এই সব পাগলামির ভয়ে সাব্বির এখন সব অষুধ তালা বন্দি করেছে। ধারালো জিনিস পত্র মিতির নাগালের যত দূরে রাখা যায় তাইই রাখে। ফ্যান খুলিয়ে ফেলেছে সিলিং থেকে। গরমকালে হালকা ঠান্ডা দিয়ে এসি অন করে রাখে সারাক্ষন । হাজার দুশ্চিন্তায় সাব্বিরের প্রেশারের রোগ হয়ে গেছে। মিতির টেনশনে কায় কারবারও প্রায় লাটে উঠছে। সাব্বিরের নিজেরই এখন পাগলপ্রায় অবস্থা। তাও ভালো একমাত্র ছেলেটাকে পড়ার জন্য দুবছর আগেই মালয়েশিয়া পাঠিয়ে দিয়েছে। নইলে এই সবে ছেলেটাও…

চোখ জ্বলে ওঠে সাব্বিরের । দুই হাতের ছয় আঙ্গুলে কপালের দুই পাশের রগ চেপে ধরে চোখ বন্ধ করতেই মিতি ডাকে।

– এ্যাই? এ্যাই?
– হুম।
– পানি খাবো।
ক্লান্ত পায়ে প্রায় দুলতে দুলতে উঠে গ্লাসে পানি ঢালে সাব্বির।
– আমার জন্য তোমার অনেক যন্ত্রনা তাই না?’ করুন গলায় কথাটা বলে কাতর চোখে তাকায় মিতি।
কিছু বলে না সাব্বির। আন্তরিক মমতায় পানির গ্লাস এগিয়ে ধরে মিতির মুখের সামনে ।
টপ টপ করে চোখ দিয়ে জল ফেলতে ফেলতে দুই ঢোক পানি খেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেয় মিতি। শান্ত মুখে গ্লাসটা রেখে মিতিকে ধরে শুইয়ে দেয় সাব্বির।

বাইরে সকালের আলো ফুটছে। পাখিদের কিচির মিচির শুরু হয়েছে। মিতির খুব সূর্য দেখতে ইচ্ছে করে হঠাৎ।
পাখিগুলোকে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে । এক দৌঁড়ে ছুটে গিয়ে মাঠটার সবুজ ঘাসের উপরে লেগে থাকা শিশিরে পা ভেজাতে ইচ্ছে করে। ‘আচ্ছা এখন কি কাল? শরৎ না? শিউলি ফুটেছে নিশ্চই নিচের বাগানে?’

পাশ ফিরে দেখে সাব্বির শুয়েছে। চোখ বন্ধ। অনেক চেষ্টা করে মিতি নিজে নিজেই উঠে দাঁড়ায়। দুই কদমে জানালার কাছে গিয়ে থাই গ্লাসের লক সরিয়ে অল্প একটু ফাঁক করতেই হুড়মুড় করে এক রাশ সুঘ্রাণ ছুটে আসে।
‘হ্যা, শিউলি! শিউলিই!! ফুটেছে তাহলে!

মিতির গাল বেয়ে গরম জল গড়িয়ে পড়তে থাকে । শক্ত মুঠোয় জানালার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সুর্য ওঠা দেখে মিতি ।
চোখের সামনে ধীরে ধীরে প্রকৃতির সোনালী বর্ণ ধারন করা দেখতে দেখতে মন ভালো হয়ে যায় মিতির।
ঠোটের কোনে চিলতে হাসি নিয়ে সাব্বিরের দিকে তাকায় । তার ধরে রাখা পর্দাটার ফাঁক গলে এক চিলতে আলো সাব্বিরের মুখের পরে পড়েছে আঁড়াআঁড়ি।

কী সুন্দর লাগছে সাব্বিরকে!! সোনালী প্রকৃতিটার মত লাগছে!!

২৫১জন ২৫১জন
0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য