উৎসর্গঃ

সোনেলা গ্রুপের সন্মানিত সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা, পরম শ্রদ্ধেয় ব্লগার শামসুল আলম ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি। এই লেখাটি তাঁর স্মরণে উৎসর্গকৃত।

বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পাঁচ দশক ইতিমধ্যেই পার হয়ে যাওয়া এই পটভূমিতে এসে দেখা যাচ্ছে, ১৯৭১ সালে যারা কাঁধে রাইফেল নিয়ে পাকিস্তানের শত্রু এবং তাদের এদেশীয় অনুচরদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের আবেগ এবং বর্তমান প্রজন্মের এই সম্পর্কিত ধারণা ঠিক এক সমান নয়।

সত্যিকারের করে বলতে কি বর্তমান তরুণ যুবক যারা ১৯৭১ সালে ছিল নিতান্তই শিশু অথবা অনেকেরই সেদিন জন্মই হয়নি তারা অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানে না। অনেকে এখনো শোনেনি আসলে সেদিন কি ঘটেছিল। কেন বাঙালিরা পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের এদেশীয় সমর্থক রাজাকার-আলবদর বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে সেদিন বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। অনেকে আবার মুক্তিযুদ্ধ সম্বন্ধে যা জানে তার প্রকৃত ইতিহাসের বিকৃত রূপ মাত্র। তারা যা জেনেছে অথবা তাদের যা শেখানো হয়েছে তার সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল প্রেরণার কোন সম্পর্ক নেই।

১৯৭১ এ মার্চের প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধু সশস্ত্র সংগ্রামের সম্ভাবনা দেখতে পান। ৭ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মার্কিন সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরে অর্থাৎ ১৯৭২ সালে এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন – “৭ মার্চ ঢাকা রেসকোর্স মাঠের মিটিং শেষে উপস্থিত দশ লাখ লোক দাঁড়িয়ে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানকে স্যালুট জানায় এবং ঐ সময়েই আমাদের জাতীয় সঙ্গীত চূড়ান্ত রুপে গৃহীত হয়।…..

আমি জানতাম কী ঘটতে যাচ্ছে। তাই আমি ৭ মার্চ রেসকোর্স মাঠে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করেছিলাম এটাই স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য যুদ্ধ করার মোক্ষম সময়। আমি চেয়েছিলাম তারাই (পাকিস্তানি সেনাবাহিনী) প্রথম আমাদের আঘাত করুক কারন আমার জনগণ প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত ছিল।”

৭ মার্চে ‘জাতীয় সংগীত চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়ে যায়’ বঙ্গবন্ধু এই উচ্চারণগত স্বীকৃতির মাধ্যম দিয়েই। সেদিন থেকেই স্বাধীনতা অর্জন সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রমও শুরু হয়ে গিয়েছিল।

২৩ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অনন্য দিন। বঙ্গবন্ধুর এদিনকে ছুটি ঘোষণা করেছিলেন। ২৩ মার্চ বিভিন্ন দল ও ছাত্র সংগঠন বিভিন্ন নামে দিবসটি পালন করে। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ দিবসটিকে ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করে। কাক ডাকা ভোর থেকেই ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানের মধ্য দিয়ে দিবসের সূচনা হয়। প্রভাতফেরী এবং সর্বত্র নতুন বাংলার পতাকা উড়িয়ে ছাত্র যুবকরা মিছিল করে বেড়ায়।

এদিন ভোর পাঁচটায় বিদ্রোহ বাংলার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিজ হাতে তার বাসভবনে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে দেন। আর এরই মাধ্যমে ২৩ বছরের পাকিস্তানি পাঞ্জাবি শাসনের কবল থেকে মুক্তির ঘোষণা আনুষ্ঠিকতা লাভ করে। বেলা ১২টায় তাঁর বাসভবনে আগত এক মিছিলের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন- “আমরা নিশ্চয়ই শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালাতে চাই। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে কোন আক্রমণ আমরা সহ্য করব।”

২৩ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও বঙ্গবন্ধুর উপদেষ্টাদের মধ্যে বৈঠক নিষ্ফল হয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এদিন সর্বক্ষণ ক্যান্টনমেন্টে কাটান এবং পশ্চিম পাকিস্তানী পাঁচজন নেতার সাথে বৈঠক করেন। এদিন ভুট্টোও সারাদিন তার দলের উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠক করেন এবং চূড়ান্ত ষড়যন্ত্রের মতলব করেন।

২৪ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে ‘এমভি সোয়াত’ জাহাজ থেকে সামরিক বাহিনীর অস্ত্র খালাস করার কথা শহরে ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার মানুষ বন্দর এলাকায় ঘেরাও করে রাখে সৈন্যরা যাতে শহরে প্রবেশ করতে না পারে এবং অস্ত্রশস্ত্র নামিয়ে চালান করতে না পারে। তার জন্য সারা শহরে রাস্তায় রাস্তায় জনগণ ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। এদিন প্রতিরোধকারী জনতার ওপর সেনাবাহিনী গুলি চালিয়েছে বলেও খবর পাওয়া যায়।

২৫ মার্চ পাকিস্তানের মাটিতে স্বাধীনতাকামীদের শেষ জনসভা করেন রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রণো এবং কাজী জাফর আহমেদ। কাজী জাফর আহমেদ এদিন শেষ বক্তা হিসেবে পরাধীন বাংলায় সর্বশেষ বক্তৃতা করেন।

এদিকে পাকিস্তানী সৈন্যরা ২৫ মার্চ রাতে কামান, মর্টার, রাইফেল ইত্যাদি নিয়ে অতর্কিতে বাঙ্গালীদের উপর যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে, বঙ্গবন্ধু তখন গ্রেফতার হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে তাঁর সর্বশেষ বাণী বাংলার মানুষের কাছে পাঠান এই বলে- “এই হয়তো তোমাদের জন্য আমার শেষ বাণী। আজ থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। যে যেখানেই থাকো যে অবস্থায় থাকো, হাতে যার যা আছে তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তোল। ততদিন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে যতদিন পর্যন্ত না দখলদার পাকিস্তানিদের শেষ সৈনিকটি বাংলাদেশের মাটি থেকে বহিস্কৃত হচ্ছে এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হচ্ছে।” এরপরে ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বার্তাটি পড়ে শোনানো হয়।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও গোলাবর্ষণের পর বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নতুন করে কোনো ঘোষণা দেয়ার প্রয়োজন ছিলনা। কারণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সকল ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। বাকি ছিল শুধুমাত্র সামরিক দিক। এর প্রধান কারন হচ্ছে ঢাকাসহ সারাদেশে সেনা বাহিনীর গুলিতে লক্ষাধিক পাকিস্তানি সৈন্য অবস্থান করছিল। বঙ্গবন্ধু মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল দিনগুলোতে এই সমস্যাটি শান্তিপূর্ণ মীমাংসার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। তিনি এই সময় বারবার বলেছেন- “সেই হচ্ছে সফল সিপাহসালার যে কম রক্তপাত ঘটিয়ে তার উদ্দেশ্য সাধন করতে পারে।”

রক্তপাত যাতে না ঘটে সে প্রচেষ্টা বঙ্গবন্ধু পালন করেছিলেন। বাংলাদেশের পতাকা গাড়িতে লাগিয়ে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে কয়েক দফা আলোচনা করেছিলেন। ইতিহাস একদিন বঙ্গবন্ধুর শান্তিপূর্ণ মীমাংসার প্রচেষ্টার পক্ষে সাক্ষী দেবে।

রক্তপাতে এড়িয়ে কিভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন করা যায় সেই প্রচেষ্টাই করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এ ব্যাপারে যে সীমাহীন ধৈর্য শেষ পর্যন্ত তিনি প্রদর্শন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু তার জন্য ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন। তারপরও ৩০ লাখ বাঙালিকে প্রাণ দিতে হয়েছে। সে দোষ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের নয়, বরং তা পাকিস্তানি শাসকদের পূর্ব পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।

অবশ্য তার অর্থ এই নয় যে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর আক্রমণ সম্পর্কে পূর্ব অনুমান করেননি। করেছিলেন,  আর করেছিলেন বলেই আক্রমণ শুরু হলে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরু হবে এই ঘোষণা অত্যন্ত স্পষ্ট করে বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ মার্চের রেসকোর্সের ভাষণে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে দিয়েই রেখেছিলেন।

২৫ মার্চ কালরাতে কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে ঢাকা শহরে তার খবর কেউ পায়নি। কারণ ২৬ ও ২৭ মার্চ দুই দিন ছিল কারফিউ। ঘর থেকে বের হতে পারেনি কেউ। কিন্তু শহরের রাস্তাঘাট পরিষ্কার করার কাজে নিয়োজিত সুইপার, ডোম এরা এই ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষী হয়ে আছে। ইতিহাসের সাক্ষী হতে তারা বাধ্য হয় কারণ পাকিস্তানি সেনারা রাস্তাঘাট, নদী, মাঠ প্রান্তরে পড়ে থাকা অসংখ্য গলিত লাশ লুকিয়ে ফেলতে চাইলে এদের প্রয়োজন হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এসব গলিত লাশ লুকিয়ে ফেলার নির্দেশ প্রদান করা হয়।

পাইকারি এই গণহত্যার স্বীকৃতি রয়েছে খোদ পাকিস্তান সরকার কর্তৃক প্রকাশিত দলিলেও। ‘পূর্ব পাকিস্তানের সংকট’ সম্পর্কে যে শ্বেতপত্র পাকিস্তানি সরকার মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রকাশ করেছিল, তাতে বলা হয়- “১৯৭১ সালের পয়লা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষের জীবন নাশ হয়েছিল।” এসব দেখার পরও পরবর্তী ভুট্টো বলেছিলেন – ‘আল্লাহর অসীম দয়া পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে। পরদিন পাকিস্তানের পত্র-পত্রিকায় ভুট্টোর এ মন্তব্য শিরোনাম হয়েছিল।

প্রকৃতপক্ষের ১৯৭১ এর মার্চ মাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্বের সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হলে পৃথিবীর যেখানেই একজন বাঙালি ছিল, সেখানেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তৎপরতা শুরু হয়। প্রত্যেক বাঙালি সন্তান প্রবাসী কিংবা দেশে এক্ষেত্রে তার ন্যূনতম অবদান রাখার চেষ্টা করেছেন। বাংলার আপামর জনসাধারণের অংশগ্রহণে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পরেই ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে।

আজ ২৬ মার্চ ২০২১ সালে এসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির এই সুবর্ণজয়ন্তীতে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি দেশমাতৃকার স্বাধীনতায় অকাতরে নিজের জীবন বিলিয়ে দেয়া শহিদদের এবং জীবিত সকল মুক্তিযোদ্ধাদের। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতার শৌর্যবীর্য অক্ষুণ্ণ রাখার দায়িত্ব এ দেশের প্রত্যেক মানুষের। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের শপথ।

কৃতজ্ঞতা- ডঃ মোহাম্মদ হাননান কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বইটি থেকে লেখার তথ্য সংরক্ষিত।

ছবি- সংগৃহীত

তথ্যসূত্রঃ

★ বঙ্গবন্ধুর সাথে ১৯৭২ সালে ডেভিড ফ্রস্টের সাক্ষাতকার, বাংলাদেশ ডকুমেন্টেস, দ্বিতীয় খন্ড থেকে অনূদিত।

★ দৈনিক আজাদ, ২৪ মার্চ ১৯৭১।

★ স্বাধীনতার দলিল, প্রথম খন্ড।

★ দৈনিক যুগান্তর, ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১।

★ বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র- দ্বিতীয় খন্ড।

★ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, দলিলপত্রঃ তৃতীয় খণ্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয় ১৯৮২ সাল।

★ রবার্ট পেইনঃ ম্যাসাকার, বাংলাদেশ- গণহত্যার ইতিহাসে ভয়ঙ্কর অধ্যায়, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড।

★ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে- মেজর রফিকুল ইসলাম, বীর উত্তম।

স্বাধীনতার ৫০ বছর

——

২৭৮জন ১৩৭জন
17 Shares

১৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ